০২ অক্টোবর ২০২৬, ১৭ আশ্বিন ১৪৩৩

সামনে প্রশংসা, পেছনে নিন্দা: মানুষের দ্বিমুখী আচরণের কারণ

আপনার সামনে যার সমালোচনা, তার সামনেই আবার আপনাকে নিয়ে নিন্দা- কেমন মানুষ তারা!

লাইফস্টাইল ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 05 Jul 2026, 07:08 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:35 PM

‘জানেন ভাই, রহমান সাহেব মানুষটা একদম সুবিধার না!’— অফিসের ক্যান্টিনে বা চায়ের আড্ডায় অত্যন্ত বিশ্বস্ত ভঙ্গিতে কথাটা বললেন আপনারই কোনো এক সহকর্মী। অথচ ঠিক আধঘণ্টা পর দেখলেন, সেই সহকর্মী রহমান সাহেবের কাঁধে হাত দিয়ে হাসিমুখে গল্প করছেন এবং ফিসফিস করে আপনারই কোনো সিদ্ধান্তের সমালোচনা করছেন!

সমাজে এমন ‘মুখোশ’ পরা মানুষের অভাব নেই। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এদের বলা হয় ‘টু-ফেইসড’ বা দ্বিমুখী আচরণের মানুষ।

যার কাছে অন্য একজনের সমালোচনা করছে, আবার সুযোগ বুঝে তাকে নিয়েই আরেকজনের কাছে বিষোদগার করে যাচ্ছে।

আপাতদৃষ্টিতে একে সাধারণ পরনিন্দা মনে হলেও, এর পেছনে রয়েছে মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা।

মানুষ কেন এমন দ্বিমুখী আচরণ করে?

সাইকোলজি টুডে ডটকম’য়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে যুক্তরাজ্যের মনোচিকিৎসক ডা. লিন্ডা বারম্যান-এর গবেষণা অনুযায়ী, কিছু মানুষ মূলত কয়েকটি নির্দিষ্ট কারণে এই কাজগুলো করে থাকেন।

মিথ্যা অন্তরঙ্গতা তৈরি: ডা. বারম্যানের মতে, অনেকে অন্যের সমালোচনাকে ‘সামাজিক আঠা’ হিসেবে ব্যবহার করে। আপনার সামনে অন্য কারও গোপন বা নেতিবাচক তথ্য বলে, সে বোঝাতে চায়— ‘আমি তোমাকে খুব বিশ্বাস করি।’ এতে সাময়িকভাবে একটি কৃত্রিম সম্পর্ক বা ‘বন্ডিং’ তৈরি হয়।

নিরাপত্তাহীনতা ও কম আত্মমর্যাদা: গবেষণায় দেখা গেছে, যারা ভেতরে ভেতরে তীব্র হীনম্মন্যতায় ভোগেন, তারা অন্যদের ছোট করে নিজেদের বড় দেখানোর চেষ্টা করে। অন্যের ব্যর্থতা বা ত্রুটি নিয়ে আলোচনা করলে তাদের অবদমিত অহংকারে সাময়িক তৃপ্তি আসে।

‘সোশ্যাল স্ট্যাটাস’ বা নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা: অন্যের গোপন তথ্য নিজের কাছে রাখাকে এরা এক ধরনের ‘ক্ষমতা’ মনে করে। তথ্য আদান-প্রদান করে তারা অফিসের বা সামাজিকভাবে নিয়ন্ত্রণ, নিজের হাতে রাখতে চায়।

প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ভয়: অনেক সময় নিজেকে টিকিয়ে রাখতে বা সবার প্রিয় পাত্র হতে মানুষ ‘ক্যামেলিয়ন’ বা বহুরূপীর মতো আচরণ করে। সে যখন যার সামনে যায়, তাকে খুশি করতে তার সুরেই কথা বলে।

যারা এই কাজ বেশি করে

ডা. লিন্ডা বারম্যানের মতে, “সব মানুষ স্বভাবগতভাবে দ্বিমুখী হয় না। মূলত নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তিত্বের মানুষের মধ্যে এই প্রবণতা প্রবল।”

সুবিধাবাদী বা চাটুকার: এদের নিজস্ব কোনো আদর্শ থাকে না। নিজের স্বার্থ হাসিল করতে এরা যখন যার পাল্লা ভারী দেখে, তার দলেই যোগ দেয় এবং প্রতিপক্ষের সমালোচনা শুরু করে।

নাটকীয়তা প্রিয় মানুষ: কিছু মানুষ শান্ত পরিবেশ সহ্য করতে পারে না। দুজনের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি বা ঝগড়া লাগিয়ে তারা আড়ালে দাঁড়িয়ে সেই ‘ড্রামা’ বা নাটক উপভোগ করে।

পরশ্রীকাতর বা হিংসুটে: অন্য কারও সাফল্য বা ভালো অবস্থান যারা সহ্য করতে পারে না, তারা সরাসরি কিছু বলতে না পেরে পেছনে পরনিন্দার মাধ্যমে ওই ব্যক্তি চরিত্র নষ্ট করার চেষ্টা করে।

এদের কাছ থেকে সাবধানে থাকার ৫টি উপায়

মনোবিজ্ঞানী এবং সম্পর্ক-বিষয়ক বিশেষজ্ঞরা এই ধরনের বিষাক্ত মানুষদের থেকে দূরত্ব বজায় রাখার জন্য কিছু কার্যকর পরামর্শ দিয়েছেন।

তথ্য আদান-প্রদানে সীমারেখা টানা: মার্কিন ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট ডা. শেরি ক্যাম্পবেল, সাইকোলজি টুডে ডটকমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলেন, “যে ব্যক্তি তোমার সামনে অন্য কারও গোপন কথা বা ত্রুটি অনায়াসে ফাঁস করছে, সে নিশ্চিতভাবেই তোমার ব্যক্তিগত তথ্যও অন্যের কাছে গিয়ে বলবে।”

তাই এই ধরনের মানুষের সামনে নিজের দুর্বলতা, ব্যক্তিগত জীবন বা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করা থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

কথোপকথন ঘুরিয়ে দেওয়ার কৌশল: ক্যালিফোর্নিয়ার সম্পর্ক বিষয়েক বিশেষজ্ঞ এবং লেখক ডা. ওয়েন্ডি এল. প্যাট্রিক  ‘সাইকোলজি টুডে’-তে প্রকাশিত প্রতিবেদনে একটি কৌশল শিখিয়েছেন।

তিনি বলেন, “যখনই এই ধরনের মানুষ তোমার সামনে অন্য কারও বাজে সমালোচনা শুরু করবে, তখন কৌতুহল না দেখিয়ে বা কথায় সায় না দিয়ে সরাসরি বলো, ‘আচ্ছা, এই সমস্যাটা নিয়ে তুমি তার সঙ্গে সরাসরি কথা বললেই তো সহজে সমাধান হয়ে যায়।’ এই একটি বাক্যেই অপর পক্ষ বুঝে যাবে যে, আপনি তার এই নোংরা আলোচনা পছন্দ করছ না।”

অসহযোগিতা বা নীরবতার নীতি: যুক্তরাজ্যের মনস্তাত্ত্বিক গবেষণা সংস্থা ব্রিটিশ সাইকোলজিক্যাল সোসাইটি (বিপিএস)-এর গবেষকদের মতে, পরনিন্দাকারী মানুষরা মূলত শ্রোতার কাছ থেকে এক ধরনের ‘আবেগীয় সমর্থন’ বা উদ্দীপনা খোঁজে।

তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, “সে যখন অন্য কারও নামে নেতিবাচক কথা বলবে, তখন হাসাহাসি করা, অবাক হওয়া কিংবা ‘তাই নাকি?’, ‘ঠিক বলেছ’, ধরনের সম্মতি দেওয়া থেকে পুরোপুরি বিরত থাকতে হবে। এই নীরবতা বা উদাসীনতা দেখালে, সে এই আচরণ করতে স্থায়ীভাবে নিরুৎসাহিত হবে।”

‘রিঅ্যাক্ট’ না করে সাড়া দেওয়া: হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের মনোবিজ্ঞান বিভাগের গবেষক ও আঘাত-বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ডা. জুডিথ হার্মান -এর মতে, “দ্বিমুখী আচরণ করা মানুষরা প্রায়শই অন্যদের উত্তেজিত করে নিজে আড়ালে থেকে ‘ভিকটিম কার্ড’ খেলার চেষ্টা করে।”

হার্ভার্ড হেল্থ পাবলিশিং-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে তিনি পরামর্শ দেন, “যদি কখনো জানতে পারেন যে, আপনার কোনো পরিচিত ব্যক্তি, আপনারই পেছনে সমালোচনা করেছে, তবে হুট করে রেগে গিয়ে তাকে আক্রমণ করতে যাবে না। বরং শান্ত থেকে এবং কোনো নাটকে না জড়িয়ে তার সঙ্গে নীরবে যোগাযোগ কমিয়ে দিন।”

‘গ্রে রক মেথড’: যদি ব্যক্তিটি অফিসের সহকর্মী বা পরিবারের এমন কেউ হন যাকে পুরোপুরি এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়, তবে মার্কিন মনোবিদ ডাব্লু. কিথ ক্যাম্পবেল-এর প্রস্তাবিত ‘গ্রে রকিং’ পদ্ধতি ব্যবহার করা যেতে পারে।

এর মানে হল, সেই ব্যক্তিটির সঙ্গে কথা বলার সময় নিজেকে একটি ধূসর পাথরের মতো বিরক্তিকর ও আবেগহীন করে ফেলতে হবে। তার সঙ্গে কেবল ‘অফিশিয়াল’ বা প্রয়োজনীয় কথা বলা ছাড়া কোনো ব্যক্তিগত মতামত, অনুভূতি প্রকাশ বা হাসি-ঠাট্টা করা বন্ধ করে দিতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের কথা

গবেষকদের মতে, দ্বিমুখী আচরণ করা মানুষের স্বভাবের একটি বড় অংশজুড়ে থাকে এক ধরনের মানসিক বিকৃতি বা ‘স্যাডিজম’ বা অন্যকে কষ্ট দিয়ে আনন্দ পাওয়া।

মনোবিজ্ঞানের ইতিহাসে আগে মনে করা হতো ‘স্যাডিজম’ বা অন্যকে কষ্ট দিয়ে আনন্দ পাওয়ার বিকৃতিটি কেবল গুরুতর অপরাধী বা উগ্র মানসিক রোগীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।

তবে ২০১৩ সালে কানাডার ইউনিভার্সিটি অব ব্রিটিশ কলাম্বিয়া’র মনস্তাত্ত্বিক গবেষক ইরিন ই. বাকেলস এবং ডেলরয় এল. পলহুস এর নেতৃত্বে একটি গবেষণা পরিচালিত হয়।

আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের সাময়িকী ‘সাইকোলজিক্যাল সায়েন্স’-এ প্রকাশিত ‘বিহেভিওরাল কনফার্মেশন অব এভরিডে স্যাডিজম’ নামের এই গবেষণাপত্রে তারা উল্লেখ করেন, “সমাজে আমাদের চারপাশে ঘুরে বেড়ানো একদম ‘স্বাভাবিক ও ভদ্র’ মানুষের একটা বড় অংশের মধ্যেও অবদমিত রূপে এই মানসিক বিকৃতি বা ‘এভরিডে স্যাডিজম’ লুকিয়ে থাকে।

এই গবেষকদের মতে, দ্বিমুখী আচরণ করা, মানুষের পিঠে ছুরি মারা, গোপনে একজনের কুৎসা অন্যজনের কাছে রটিয়ে সামাজিক সম্পর্ক নষ্ট করা— এগুলো সবই ‘এভরিডে স্যাডিজম’-এর অন্তর্ভুক্ত মনস্তাত্ত্বিক লক্ষণ। এরা অন্যকে মানসিকভাবে হেনস্তা বা ছোট করে এক ধরনের ‘আবেগীয় আনন্দ’ বা বিকৃত তৃপ্তি পায়।

গবেষকদের চূড়ান্ত মূল্যায়ন হল, যেহেতু এটি তাদের দীর্ঘদিনের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য এবং ব্যক্তিত্বের অন্ধকার দিক, তাই এদেরকে বুঝিয়ে বা ভালোবেসে পরিবর্তন করার চেষ্টা করা একেবারেই বৃথা।

নিজের মানসিক শান্তি ও সুস্থতা বজায় রাখতে বুদ্ধিমানের কাজ হল, এদের চিনে নেওয়া এবং নিজের চারপাশে একটি শক্ত দেয়াল বা সীমানা তৈরি করে দূরত্ব বজায় রাখা।

আরও পড়ুন

মানসিক চাপে বারবার প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেওয়ার কারণ

কর্মক্ষেত্রে বিষাক্ত বস চিনবেন যেভাবে

বিষাক্ত পারিবারিক সদস্যদের সামলানোর উপায়