Published : 01 Jul 2026, 05:25 PM
ডিজিটাল ডেইটিংয়ের যুগে অনেকেই নিয়মিত নতুন সম্পর্কের জন্য নিজেদের উন্মুখ রাখেন। তবে কখনও কি গভীরভাবে ভেবে দেখেছেন, ঠিক কী কারণে ডেইটিং করছেন বা সম্পর্কে জড়াতে চাচ্ছেন?
সত্যিই কি মনের মানুষের সঙ্গে আত্মিক বন্ধন খুঁজছেন, নাকি কেবল নিজের অহং বা ‘ইগো’কে তৃপ্ত করতে অপরের কাছ থেকে একটু প্রশংসা ও মনোযোগ বা ‘ভ্যালিডেইশন’ পাওয়ার চেষ্টা করছেন?
মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, সত্যিকারের সম্পর্কের আকাঙ্ক্ষা আর কেবলই ‘মনোযোগ পাওয়ার ক্ষুধা’ বা ‘ভ্যালিডেইশন ডেটিংয়ে’র মধ্যে সূক্ষ্ম তবে গভীর পার্থক্য রয়েছে।
মানুষের চেয়ে ‘পার্টনার’ পাওয়ার ভাবনা যখন বড়
ডেইটে গিয়ে যদি মন বর্তমান মুহূর্ত ছেড়ে বারবার ভবিষ্যতে চলে যায়— যেমন সম্পর্কে জড়ালে জীবন কেমন হবে বা মনে ভেতর যে ধারণাটা আছে সেটার সঙ্গে সামনে থাকা মানুষটির সঙ্গে মিলছে কি-না- এসব নিয়ে ভাবনা কাজ করে, তবে আপনি বাস্তবে নন, কল্পনায় বাস করছেন।
আন্তর্জাতিক ডেইটি অ্যাপ ‘হিঞ্জ’-এর ‘ইন-হাউস লাভ অ্যান্ড কানেকশন’ বিশেষজ্ঞ এবং এবং নিবন্ধিত মার্কিন ‘ম্যারেজ অ্যান্ড ফ্যামিলি থেরাপিস্ট’ মো আরি ব্রাউন সেল্ফ ডটকম’য়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলেন , “সত্যিকারের আগ্রহ সবসময় সামনের মানুষটির বাস্তব রূপের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়। তাকে একজন রক্ত-মাংসের পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে দেখতে হবে। নিজের কোনো ফ্যান্টাসি বা সস্তা রূপকথার চরিত্র হিসেবে নয়।”
সামনে থাকলে গভীর প্রেম, দূরে গেলেই শূন্যতা
অনেকের ক্ষেত্রে দেখা যায়, সামনাসামনি থাকলে চমৎকার রসায়ন ও কথাবার্তা জমে ওঠে। তবে আলাদা বা কাছাকাছি না থাকলে, সেই আগ্রহ বা ‘এনার্জি’ কর্পূরের মতো উবে যায়।
নিউ ইয়র্ক সিটির ক্লিনিকাল মনোবিজ্ঞানী ও সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ ডা. সাবরিনা রোমানফ একই প্রতিবেদনে, এটিকে ‘পারফর্মেটিভ কেমিস্ট্রি’ বা কৃত্রিম রসায়ন বলে অভিহিত করেন।
মানে হল, আসলে কেবল সেই মুহূর্তের মনোযোগটুকুই উপভোগ করছেন। মানুষটির প্রতি কোনো প্রকৃত আবেগীয় বিনিয়োগ বা টান নেই।
শুরুতেই অতিরিক্ত আবেগ প্রকাশ
সম্পর্কের গভীরতা বাড়াতে মনের কথা খুলে বলা জরুরি। তবে পরিচয়ের শুরুতেই নিজের সব অতীত কষ্ট বা ‘ট্রমা’ একসঙ্গে উজাড় করে দেওয়া মোটেও ভালো লক্ষণ নয়।
ডা. সাবরিনা বলেন, “দ্রুত অন্তরঙ্গতা তৈরির এই শর্টকাট চেষ্টা আসলে কোনো বিশ্বাসের ভিত গড়ে না। এটি মূলত অপরের কাছ থেকে দ্রুত সহানুভূতি ও নিজেকে ‘বিশেষ কেউ’ ভাবার একটি সাময়িক তাড়না মাত্র।
টেক্স বা বার্তায় নিয়মিত, কিন্তু বাস্তবে দেখা করায় অনীহা
নিয়মিত মেসেজে চমৎকার প্রশংসা হচ্ছে, দিনরাত ‘চ্যাটিং’ চলছে। তবে যখনই বাস্তবে দেখা করার বা কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা করার কথা আসে, তখনই বিষয়টি এড়িয়ে যান বা অস্পষ্ট রাখেন।
ডা. রোমানফ বলেন, “যারা শুধুই নিজের ‘ইগো’ বা অহংকার বাড়াতে চান, তারা অপর মানুষকে ঝুলিয়ে রাখতে ভালোবাসেন।”
‘শুধু নিজেকে কেউ পছন্দ করছে’— এই ভালো লাগার অনুভূতিটুকু জিইয়ে রাখতেই তারা যোগাযোগ রক্ষা করেন।
খেয়াল-খুশি মতো আসা-যাওয়া
যখন একা বোধ করছেন, একঘেয়ে লাগছে বা একটু বাড়তি মনোযোগ দরকার, ঠিক তখনই কেবল ওই মানুষটির সঙ্গে যোগাযোগের পারদ তীব্র হয়ে ওঠে। আবার নিজের প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলেই হুট করে গায়েব হয়ে যান।
ডা. রোমানফ ব্যাখ্যা করেন, “সত্যিকারের সম্পর্কের ক্ষেত্রে ধারাবাহিকভাবে চেষ্টা বা ‘এফোর্ট’ থাকে। তবে ভ্যালিডেইশনের ক্ষেত্রে তা আসে কেবল নিজের অভ্যন্তরীণ চাহিদা অনুযায়ী জোয়ার-ভাটার মতো।
সবার সঙ্গে একই ছকে কথা বলা
একেকজন মানুষকে গভীরভাবে জানার পরিবর্তে, কেবল সবার কাছ থেকে মনোযোগ পাওয়াই হয় আসল লক্ষ্য, তবে আপনার ডেইটিংয়ের ধরন হয়ে উঠবে ছকবাঁধা।
যুক্তরাষ্ট্রের লং আইল্যান্ডের মনোবিদ ড্যানিয়েল ম্যাডোনা বলেন, “যখন কেউ ভিন্ন ভিন্ন মানুষের সঙ্গে একই কণ্ঠে, একই প্রশ্ন আর একই কায়দায় কথা বলেন, তখন বুঝতে হবে তিনি আসলে কোনো সুনির্দিষ্ট সম্পর্ক গড়তে চান না; বরং তিনি ডজন ডজন মানুষের মনোযোগের স্রোতে নিজেকে ভাসিয়ে রাখতে চান।”
পাওয়ার চেয়ে ‘তাড়া’ করার আনন্দ বেশি
মানুষটি যতক্ষণ অধরা বা একটু দূরে দূরে থাকে, ততক্ষণ তীব্র আগ্রহ থাকে। তবে যেই সে সম্পূর্ণভাবে ধরা দেয় বা নিজের ভালোবাসা প্রকাশ করে, অমনি সব উৎসাহ ধপ করে নিভে যায়।
ড্যানিয়েল ম্যাডোনা বলেন, “এটি প্রমাণ করে যে আপনি মানুষটিকে ভালোবাসেননি, বরং তাকে জয় করার বা তার কাছে নিজেকে কাঙ্ক্ষিত প্রমাণ করার যে তীব্র ‘ইগো বুস্ট’ অহংকার কাজ করেছিল, সেটাই ভালোবেসেছিলেন।”
এই চক্র থেকে বের হওয়ার উপায়
বিশেষজ্ঞ মো আরি ব্রাউনের মতে, “প্রথম কাজ হল, নিজেকে দোষ দেওয়া বন্ধ করা। সম্পর্কের ক্ষেত্রে অন্যের মাধ্যমে প্রশংসিত হতে চাওয়া খুব স্বাভাবিক প্রবৃত্তি। তবে এবার ডেইটে গিয়ে অপর মানুষটি আপনাকে পছন্দ করছে কি-না, সেই চিন্তায় মগ্ন না থেকে নিজেকে কিছু বাস্তব প্রশ্ন করুন— ‘আমি কি এই মানুষটার পাশে স্বস্তি পাচ্ছি?’, ‘আমি কি সত্যি তাকে জানতে আগ্রহী?’ ‘নাকি আমি স্রেফ ভালো সাজার অভিনয় করছি?’
যখন অন্য সবার মতামত বা সামাজিক স্বীকৃতির পর্দা সরিয়ে কেবল নিজের ভালো লাগার পাশাপাশি অন্যকে প্রাধান্য দিতে পারবেন, তখনই ‘পারফরম্যান্স’ বা কৌশল দেখানোর বদলে জন্ম নেবে একটি খাঁটি ও সুন্দর ভালোবাসার সম্পর্ক।
আরও পড়ুন