Published : 02 Jul 2026, 11:35 AM
জাতীয়করণ করা প্রাথমিক শিক্ষকদের জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ ও পদোন্নতি নিয়ে জটিলতার অবসান ঘটল সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের রায়ে।
এর ফলে দেশের প্রায় ৩২ হাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক নিয়োগে আর কোনো আইনি বাধা থাকল না বলে আইনজীবীরা জানিয়েছেন।
প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বে চার সদস্যের আপিল বেঞ্চ বৃহস্পতিবার এ রায় দেয়। বেঞ্চের অপর বিচারকরা হলেন বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম, বিচারপতি মো. রেজাউল হক এবং বিচারপতি ফারাহ মাহবুব।
পদোন্নতি ও জ্যেষ্ঠতা নিয়ে সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্তদের সঙ্গে জাতীয়করণ হওয়া শিক্ষকদের দ্বন্দ্ব থেকে এ মামলার সূত্রপাত।
২০১৩ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর প্রণীত এক বিধিমালায় বলা হয়েছিল, সদ্য জাতীয়করণকৃত শিক্ষকদের অবস্থান হবে সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত সর্বশেষ ব্যক্তির নিচে।
একদল শিক্ষকের রিট আবেদনে বিধিমালার ওই ধারা অবৈধ ঘোষণা করেছিল হাই কোর্ট। ফলে সাড়ে প্রায় ৩২ হাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক নিয়োগ আটকে যায়।
এর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ ও সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্তদের আপিল গ্রহণ করে হাই কোর্টের ওই রায় বাতিল করে দিয়েছে আপিল বিভাগ।
তার ফলে ২০১৩ সালের বিধিমালার ওই ধারা বহাল থাকছে। অর্থাৎ, জাতীয়করণকৃত শিক্ষকদের অবস্থান সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত সর্বশেষ ব্যক্তির নিচেই হবে।
আপিল বিভাগের রায়ের পর অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল সাংবাদিকদের বলেন, “আমাদের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৩২ হাজার প্রধান শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে যে আইনি জটিলতা ছিল, আজকের এই রায়ের মাধ্যমে সেই জটিলতা দূরীভূত হল।"
তিনি বলেন, "সারাদেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রমে আজকের এই রায়টি একটি ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে এই কারণে যে, শিক্ষকদের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে এবং পাঠদানের ক্ষেত্রে একটা শৃঙ্খলা ফিরে আসবে।"
অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, এই আইনি জটিলতার কারণে সারা দেশে প্রায় ৩২ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক ছিলেন না।
“অনেক ক্ষেত্রে হয়ত স্থানীয় আয়োজনে একজনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সরকারের যে প্রধান শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া, বদলি করার যে ব্যাপার আছে, এই মামলার কারণে এত দিন তা কার্যকর হচ্ছিল না। প্রধান শিক্ষকের পদ খালি ছিল। সরকার নিয়োগ দিতে পারছিল না। নানা রকম জটিলতা। আজকের রায়ের পর সেই জটিলতা নিরসন হবে। সরকার প্রধান শিক্ষক নিয়োগ দিতে পারবে। একটা শৃঙ্খলা ফিরে আসবে।”
কেন এই মামলা
সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে এ মামলার শুনানি শেষ হয় গত ১৮ জুন। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল, অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অনীক আর হক, আইনজীবী মুনতাসির উদ্দিন আহমেদ ও আইনজীবী অজিত শীল ।
রিট আবেদনকারী জাতীয়করণকৃত শিক্ষকদের পক্ষে শুনানিতে ছিলেন আইনজীবী সালাহ উদ্দিন দোলন ও মো. মিফতাহ উদ্দিন চৌধুরী।
আর সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকদের পক্ষে শুনানিতে অংশ নেন আইনজীবী রমজান আলী শিকদার ও আইনজীবী এ কে এম হাবিবুর রহমান।
রমজান আলী শিকদার মামলার সার্বিক দিক, আইনি প্রেক্ষাপট এবং শুনানির বিষয়বস্তু ব্যাখ্যা করে সেদিন বলেন, বাংলাদেশে এক সময় প্রচুর বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ছিল, যেগুলো এনজিও বা নিজস্ব প্রাইভেট ম্যানেজিং কমিটির মাধ্যমে পরিচালিত হত। সেখানে নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতার কোনো সুনির্দিষ্ট নিয়ম বা কড়াকড়ি ছিল না।
পরে বিভিন্ন সময়ে শিক্ষকদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সরকার ১৯৭৪ সালের 'টেকিং ওভার' আইনের অধীনে এই স্কুলগুলোকে অধিগ্রহণ বা জাতীয়করণের সিদ্ধান্ত নেয়। প্রাথমিক পর্যায়ে জাতীয়করণের জন্য ২৬ হাজার ১৯৩টি বিদ্যালয় নির্বাচন করা হয়।
জাতীয়করণের পর শিক্ষকদের চাকরি কীভাবে পরিচালিত হবে, তা ঠিক করে দিয়ে ২০১৩ সালে একটি সার্ভিস রুলস বা বিধিমালা প্রণয়ন করা হয়। সংবিধানের ১৩৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী এই বিধিমালা চূড়ান্ত করতে সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) মতামতের প্রয়োজন ছিল।
পিএসসির ইতিবাচক মতামতের পর ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বরে এটি চূড়ান্ত করা হয় এবং শিক্ষকদের নিয়োগ ১ জানুয়ারি ২০১৩ থেকে ভূতাপেক্ষভাবে কার্যকর করা হয়।
জাতীয়করণ বা অধিগ্রহণের সময় এই শিক্ষকদের বেশ কিছু বড় ছাড় ও সুবিধা দেওয়া হয়েছিল। প্রথমত, সরকারি চাকরিতে প্রবেশের সাধারণ বয়সসীমা (৩০ বা ৩২ বছর) তাদের জন্য শিথিল করা হয়। দ্বিতীয়ত, যাদের প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত বা পেশাগত যোগ্যতা ছিল না, তাদের যোগ্যতা অর্জনের জন্য তিন বছর সময় দেওয়া হয়।
পাশাপাশি তারা বেসরকারি খাতে যে কয় বছর চাকরি করেছিলেন, তার ৫০ শতাংশ সময় এবং ভবিষ্যৎ অবসরকালীন পেনশন, গ্র্যাচুইটি ও সিলেকশন গ্রেড সুবিধার ক্ষেত্রে গণনার সুযোগ দেওয়া হয়। অর্থাৎ, কেউ যদি বেসরকারি স্কুলে ১০ বছর শিক্ষকতা করে থাকেন, সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে তার ৫ বছর গণনা করার বিধান রাখা হয়।
কিন্তু এরপর পদোন্নতি ও জ্যেষ্ঠতা নিয়ে সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্তদের সঙ্গে জাতীয়করণ হওয়া শিক্ষকদের দ্বন্দ্ব তৈরি হয়।
‘অধিগ্রহণ করা বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক (চাকরির শর্তাদি নির্ধারণ) বিধিমালা, ২০১৩’ এর ৯(১) ধারায় বলা ছিল, সদ্য জাতীয়করণকৃত শিক্ষকদের অবস্থান সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত সর্বশেষ ব্যক্তির নিচে নির্ধারিত হবে।
কিন্তু অধিগ্রহণকৃত শিক্ষকরা তা মানতে চাননি। পূর্ববর্তী বেসরকারি চাকরির বিষয়টি তুলে ধরে তারা সরাসরি সরকারি নিয়োগপ্রাপ্তদের উপরে অবস্থান বা জ্যেষ্ঠতা দাবি করেন। সেই দাবিতে বিধিমালার ৯(১) ধারা চ্যালেঞ্জ করে ২০১৭ সালে হাই কোর্টে রিট আবেদন করেন বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে জাতীয়করণ করা বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা।
শুনানি শেষে হাই কোর্ট ২০১৯ সালের ১১ মার্চ শিক্ষকদের পক্ষে রায় দেয় এবং বিধিমালার ৯(১) ধারার ওই নির্দিষ্ট অংশটিকে সংবিধানের সঙ্গে ‘সাংঘর্ষিক ও অবৈধ’ ঘোষণা করে।
এই রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ আপিল বিভাগে 'লিভ টু আপিল' দায়ের করে, যা ২০২২ সালের ২০ নভেম্বর মঞ্জুর করে আপিল বিভাগ। পাশাপাশি হাই কোর্টের ওই রায়ের কার্যকারিতা স্থগিত করা হয়।
লিভ টু আপিল মঞ্জুরের পর ২০২৩ সালে রাষ্ট্রপক্ষ আপিল করে। এ ছাড়া সরকারি প্রাথমিকে সরাসরি নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকরাও আপিল বিভাগে আবেদন করেন।
চার বছর পর চূড়ান্ত শুনানি শেষে আপিল বিভাগ যে রায় দিল, তাতে বিধিমালার ৯(১) ধারা বহাল থাকল।
সরাসরি নিয়োগকৃত শিক্ষকদের আইনজীবী এ কে এম হাবিবুর রহমান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, "আজকের রায় অনুযায়ী জাতীয়করণকৃত বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা যদি সরকারি বিধিমালা অনুযায়ী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হওয়ার প্রয়োজনীয় সকল যোগ্যতা বা ক্রাইটেরিয়া পূরণ করতে পারেন, তবে জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে তারা প্রধান শিক্ষক হতে পারবেন।"
বিষয়টি ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, যদি সরকারিভাবে সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত কোনো সহকারী শিক্ষকের চাকরির মেয়াদ ৫ বছর হয়, আর জাতীয়করণকৃত কোনো প্রধান শিক্ষকের চাকরির মেয়াদ যদি ৬ বছর হয়, তবে জ্যেষ্ঠতার নিয়মে ওই জাতীয়করণকৃত শিক্ষকই প্রধান শিক্ষক হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে থাকবেন।
“তবে এক্ষত্রে প্রধান শিক্ষক হবার অন্যান্য যোগ্যতা পূরণ করতে হবে । আর যারা আগে থেকেই জ্যেষ্ঠ (সিনিয়র) হিসেবে কর্মরত আছেন, জ্যেষ্ঠতার তালিকায় তারা স্বাভাবিকভাবেই যথানিয়মে এগিয়ে থাকবেন।"
এ আইনজীবী জানান, শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ৬৫:৩৫ অনুপাত বজায় রাখা হচ্ছে। এর মধ্যে ৩৫ শতাংশ পদ পূরণ করা হবে পদোন্নতি বা ডেপুটেশনের মাধ্যমে এবং বাকি ৬৫ শতাংশ পদে পরীক্ষা-নিরীক্ষা তথা সরাসরি নিয়োগ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হবে।
নিয়োগ ও পদোন্নতির বিষয়ে হাবিবুর রহমান বলেন, “যেহেতু বিষয়টি নিয়ে আদালতের রুল এবং স্থিতাবস্থা ছিল, তাই পদোন্নতি ও নিয়োগ বন্ধ ছিল । আজকের এই রায়ের ফলে নিয়ম অনুযায়ী পদোন্নতি ও নিয়োগ কার্যক্রম পরিচালনায় আর কোনো বাধা রইল না।”
রায়ের প্রভাব সম্পর্কে আইনজীবী রমজান আলী শিকদার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, "এই মামলাটি বিচারাধীন থাকায় অধিগ্রহণকৃত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রায় ১ লাখ শিক্ষকের পদোন্নতি ও চাকরির বিষয়টি স্থবির হয়ে পড়েছিল। আজকের রায়ের মাধ্যমে এই স্থবিরতা, কমপ্লিকেশন ও ভুল বোঝাবুঝির অবসান হল।
“আগে দেখা গেছে কোনো কোনো বেসরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা নিয়মনীতি ছাড়াই এলাকার সাধারণ লোকজনের মাধ্যমে প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন, যা আইনসম্মত নয়। এখন প্রকৃত নিয়ম অনুযায়ী সরকার কর্তৃক নিয়োজিত শিক্ষকরাই প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পাবেন।"
এই রায়ের ফলে জ্যেষ্ঠতা নিয়ে কোনো বিশৃঙ্খলা তৈরি হবে কি না—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে অ্যাটর্নি জেনালে বলেন, "দেখুন, আসলে তো এটি দেশের সর্বোচ্চ আদালতের রায়। আর আদালত তো সবসময় রায় প্রকাশ করে নির্মোহভাবে। সুতরাং, আদালতের রায় মেনে নেওয়া রাষ্ট্রের প্রত্যেকটি নাগরিকের দায়িত্ব।”
রায়ের পর সন্তোষ প্রকাশ করে প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম বলেন, "এই রায়ের মাধ্যমে দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতির আইনি বাধা দূর হল। প্রাথমিকে ৩৪ হাজার ৫০০ প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য থাকায় মানসম্মত শিক্ষা ব্যাহত হচ্ছিল। এখন চলতি দায়িত্বপ্রাপ্ত ও সিনিয়র সহকারী শিক্ষকদের মধ্য থেকে পদোন্নতি দিতে আর বাধা নেই।"
সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও সাংগঠনিক সম্পাদক মোহাম্মদ জাহিদুজ্জামান গগনও রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে তারা প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে দ্রুত সময়ের মধ্যে শূন্য পদগুলো পূরণের জন্য সরকারের প্রতি জোর দাবি জানান।
পুরনো খবর
জাতীয়করণের প্রাথমিক শিক্ষকদের জ্যেষ্ঠতা: আপিল শুনানি শেষ, রায় ২ জ
আইনি জটিলতায় ৮৭ হাজার শিক্ষক পদে নিয়োগ-পদোন্নতি আটকা: শিক্ষামন্ত্
চার মাসেও মন্ত্রণালয়ে 'কূল-কিনারা' পাচ্ছেন না শিক্ষামন্ত্রী