Published : 02 Jul 2026, 07:58 PM
ফুটবল বিশ্বকাপের খেলা দেখতে বসলে আমরা সাধারণত যা দেখি—গোল, উল্লাস, পতাকা এবং কোটি কোটি মানুষের সম্মিলিত আবেগ; তার নিচেও অন্য একটি জগৎ আছে। ভিন্ন সেই জগৎ আমাদের দেখতে দেওয়া হয় না বা আমরা দেখার চেষ্টা করি না। এটি পুঁজি, ক্ষমতা এবং রাষ্ট্রের এক জটিল ত্রিভুজ, যেখানে ফুটবল আর কেবল খেলা নয়, রীতিমতন বৈশ্বিক রাজনৈতিক-অর্থনীতির রণক্ষেত্র। এই রণক্ষেত্রের নিয়ম বুঝতে হলে আমাদের তাকাতে হবে ফিফার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, করপোরেট স্বার্থ এবং ক্রীড়া ও কর্তৃত্ববাদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান সম্পর্কের দিকে।
কার্ল মার্ক্সের অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ থেকে শুরু করে আন্তোনিও গ্রামসির সাংস্কৃতিক আধিপত্যের তত্ত্ব এবং আধুনিক বৈশ্বিক শাসনতত্ত্ব পর্যন্ত—সকলেই একটি প্রশ্নকে কেন্দ্রে রেখেছেন। সেটি হলো, বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলো কার স্বার্থ রক্ষা করে? ফিফা এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গেলে একটি অস্বস্তিকর সত্য বের হয়ে আসবে—বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলাধুলার নিয়ন্তা সংস্থাটি গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের চেয়ে বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক সুবিধাকে বেশি অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
ফিফার রাজনৈতিক অর্থনীতি: এক বৈশ্বিক কর্পোরেশন
ফিফার কাঠামোটি বোঝা দরকার। আনুষ্ঠানিকভাবে এটি অলাভজনক সংস্থা, কিন্তু কার্যত একটি বহুজাতিক করপোরেশনের মতো আচরণ করে। এর বার্ষিক আয় বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার, সম্প্রচার স্বত্বের মূল্য আকাশছোঁয়া এবং শীর্ষ কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতা সমসাময়িক বড় করপোরেশনগুলোর নির্বাহীদের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। অর্থনৈতিক সমাজবিদ্যার পরিভাষায় এটিকে বলা যায় ‘ট্রান্সন্যাশনাল ক্যাপিটালিস্ট ক্লাস’ বা বহুজাতিক পুঁজিপতি শ্রেণির একটি সাংস্কৃতিক প্রকাশ। এখানে মুনাফার লক্ষ্য এবং আদর্শের ভাষা পাশাপাশি বিদ্যমান!
২০১৫ সালে ফিফার কেলেঙ্কারির ঘটনা এই কাঠামোকে সবার সামনে উন্মোচন করেছিল। মার্কিন বিচার বিভাগের তদন্তে বেরিয়ে আসে যে, দশকের পর দশক বিশ্বকাপ আয়োজনের অধিকার প্রদানে ঘুষের বিনিময়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই কেলেঙ্কারির পরেও ফিফার প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি মৌলিকভাবে পরিবর্তিত হয়েছে কিনা, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। শিকাগো কাউন্সিল অন গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সের বিশ্লেষক আলেকজান্ডার দুকালস্কি মন্তব্য করেছেন, ফিফা ‘সাদা খামের সংস্কৃতি’ থেকে কর্তৃত্ববাদী শাসনের সক্রিয় অংশীদারে পরিণত হয়েছে, যা আরও গভীর এক সতর্কতার বার্তা দেয়।
কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্র ও ক্রীড়ার আঁতাত
২০১৮ সালের রাশিয়া এবং ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপ একটি প্রবণতা স্পষ্ট করেছে। সেটি হলো, কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রগুলো ক্রমেই আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আয়োজনকে তাদের বৈধতা প্রতিষ্ঠার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। ব্র্যান্ডাইস বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রাউন সেন্টার ফর মিডল ইস্ট স্টাডিজের সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, আরব বিশ্ব ফুটবলকে কেন্দ্রীয় কূটনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করেছে। সৌদি আরব ইতোমধ্যে ২০৩৪ বিশ্বকাপের আয়োজনের অধিকার পেয়েছে এবং ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো থেকে শুরু করে অন্যান্য তারকা খেলোয়াড়দের সৌদি প্রো লিগে নিয়ে আসার মাধ্যমে ফুটবলকে তাদের ভূ-রাজনৈতিক কৌশলের কেন্দ্রে রেখেছে।
কাতারের বিশ্বকাপ বিনিয়োগের পরিমাণ ২২০ বিলিয়ন ডলার ছিল, যা কোনো সাধারণ বিনিয়োগ নয়। প্রতিটি স্টেডিয়াম, প্রতিটি পাঁচতারকা হোটেল, প্রতিটি মিডিয়া প্রচারণা একটি কৌশলগত লক্ষ্য পূরণের জন্য পরিচালিত হয়েছে। আর সেটি হলো, কাতারকে বৈশ্বিক মঞ্চে একটি ‘মডার্ন, ওপেন’ রাষ্ট্র হিসেবে উপস্থাপন করা। এই ‘ইমেজ’ তৈরির বিনিয়োগ কাতারের গ্যাস কূটনীতি ও আঞ্চলিক সুরক্ষার কৌশলের সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত ছিল।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বকাপ আয়োজনও এই তত্ত্বের বাইরে নয়। ট্রাম্প প্রশাসন এই আসরকে একটি কূটনৈতিক সুযোগ হিসেবে দেখছে। এটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে মার্কিন নেতৃত্বের শক্তি দেখানোর একটি মঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। ‘দ্য কনভার্সেশন’ প্রকাশিত একটি বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, ট্রাম্পের জন্য বিশ্বকাপ হলো একটি ‘সফট পাওয়ার ক্যু’-এর সুযোগ। কিন্তু মানবাধিকার নিয়ে উদ্বেগ, অভিবাসন নীতি–এই সুযোগকে ‘নিজের জ্বালে বল ঢোকানো’র আশঙ্কায় পরিণত করেছে।
গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও ফুটবলের মঞ্চ
ফিফার নিজস্ব মানবাধিকার নির্দেশিকা রয়েছে, যা জাতিসংঘের মানবাধিকার নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ২০২৬ বিশ্বকাপই প্রথম, যেখানে আয়োজক শহরগুলোকে মানবাধিকার রক্ষার প্রতিশ্রুতি লিখিতভাবে জমা দিতে হয়েছে। আটলান্টায় শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি, ডালাসে মানব পাচার প্রতিরোধ ও ভ্যাংকুভারে বৈষম্যমুক্ত পরিবেশের অঙ্গীকার— এগুলো নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করেছে। কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের প্রতিবেদনে এই প্রবণতাকে ইতিবাচকভাবে দেখা হয়েছে, অন্তত কাগজে-কলমে।
কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবে প্রয়োগের মধ্যে ব্যবধানটি এখনো ব্যাপক। ফেয়ারস্কয়ার নামে একটি মানবাধিকার সংগঠন ‘রিবুট’ নামে একটি প্রচারণা শুরু করেছে, যার লক্ষ্য ফিফাকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সংস্কার করা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক রাজ্যের অ্যাটর্নি জেনারেল টিকিটের মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি নিয়ে তদন্ত শুরু করেছেন। এই চাপগুলো একটি সুস্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে যে ফুটবলের ভক্তরা এবং নাগরিক সমাজ আর শুধু মাঠের খেলা দেখে সন্তুষ্ট নয়, তারা মাঠের বাইরের খেলার নিয়মও বদলাতে চায়।
উন্নয়নশীল বিশ্ব: দর্শক নাকি অংশগ্রহণকারী?
বাংলাদেশ, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, নাইজেরিয়ার মতো উন্নয়নশীল দেশগুলো বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় দর্শক বাজার, কিন্তু এর গভর্ন্যান্স কাঠামোতে তাদের প্রভাব নগণ্য। কোটি কোটি মানুষ টেলিভিশনের সামনে বসে বিশ্বকাপ দেখেন, কিন্তু সম্প্রচার স্বত্বের বড় অংশ ইউরোপীয় ও মার্কিন করপোরেশনগুলোর হাতে। বৈশ্বিক ক্রীড়া অর্থনীতির এই কেন্দ্র ও প্রান্ত কাঠামো—যেখানে দক্ষিণ গোলার্ধের দেশগুলো উৎপাদন করে প্রতিভা এবং উত্তর গোলার্ধ নিয়ন্ত্রণ করে অর্থ—এটি কি ফুটবলের জন্য টেকসই ভবিষ্যৎ নির্মাণ করে?
এই প্রশ্নটি বৈশ্বিক রাজনৈতিক অর্থনীতির সঙ্গে সংযুক্ত। নোয়াম চমস্কি থেকে শুরু করে আধুনিক বৈশ্বিক ন্যায়বিচার তাত্ত্বিকরা যে ‘ডাবল স্ট্যান্ডার্ড’ নিয়ে কথা বলেন—একই নিয়মের ভিন্ন প্রয়োগ বিভিন্ন দেশের ক্ষেত্রে—ফুটবলের রাজনীতিও তার ব্যতিক্রম নয়। ইউরোপীয় ক্লাবগুলো আফ্রিকা ও এশিয়া থেকে সস্তায় প্রতিভা সংগ্রহ করে, মূল্য সংযোজন করে নিজেদের কাছে রাখে এবং সম্প্রচার থেকে আয় নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয়।
তবে পরিবর্তনের কিছু বার্তাও আছে। এশিয়া ও আফ্রিকার ফুটবল ফেডারেশনগুলো ধীরে ধীরে আরও শক্তিশালী হচ্ছে। ২০২৬ বিশ্বকাপে ৪৮টি দলের মধ্যে আফ্রিকার নয়টি, এশিয়ার আটটি এবং উত্তর ও মধ্য আমেরিকার ছয়টি দল খেলার সুযোগ পাচ্ছে—যা আগের চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। এই সম্প্রসারণ নিছক বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত হলেও এর একটি রাজনৈতিক ফলাফল আছে আর তাহলো, বিশ্বের আরও বেশি মানুষ এই মঞ্চে অংশীদার হচ্ছেন।
ফুটবলের ভবিষ্যৎ: সংস্কার নাকি পুনর্নির্মাণ?
ফুটবলের রাজনৈতিক অর্থনীতি নিয়ে যারা ভাবেন, তাদের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন হলো–বিদ্যমান কাঠামো সংস্কার করা সম্ভব, নাকি একটি মৌলিক পুনর্নির্মাণ প্রয়োজন? ফেয়ারস্কয়ার, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এবং হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতো সংগঠনগুলো মনে করে, ফিফার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোয় স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং মানবাধিকার সুরক্ষার নীতি সংহত করা সম্ভব। কিন্তু আরেকটি অংশ মনে করে, ফিফার কাঠামো বাণিজ্যিক স্বার্থের এত গভীরে শিকড় গেড়েছে যে, প্রকৃত সংস্কার ছাড়া পরিবর্তন সম্ভব নয়।
২০৩৪ সালের বিশ্বকাপ সৌদি আরবে যাওয়ার সিদ্ধান্তটি এই দ্বন্দ্বকে আরও তীব্র করেছে। সৌদি আরবে শ্রমিক অধিকার, নারী অধিকার ও বাক স্বাধীনতার বিদ্যমান অবস্থা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড থেকে অনেক দূরে। কিন্তু ফিফার বাণিজ্যিক যুক্তি সবকিছুকে ছাপিয়ে যায়—সৌদি আরবের পক্ষ থেকে আসে বিশাল বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি, অবকাঠামো নির্মাণের সক্ষমতা এবং আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক সমর্থন।
এই পরিপ্রেক্ষিতে গ্রামসির হেজেমনি তত্ত্বটি আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। ফুটবল আমাদের কাছে ‘স্বাভাবিক’ মনে হয়, কিন্তু এর বৈশ্বিক কাঠামো অস্বাভাবিক ক্ষমতা-বৈষম্যের ওপর দাঁড়িয়ে। কোটি কোটি দর্শক এই কাঠামোর ভোক্তা আর তাদের আবেগ ও অর্থই এই কাঠামোকে টিকিয়ে রাখে। গ্রামসি বলতেন, এই সম্মতি উৎপাদনের প্রক্রিয়াটিই হলো সবচেয়ে কার্যকর ক্ষমতাচর্চা—যখন শাসিতরা শাসনব্যবস্থাকে স্বেচ্ছায় মেনে নেয়।
কিন্তু ইতিহাস বলে, হেজেমনি চিরস্থায়ী নয়। যখন ভক্তরা মাঠের খেলার বাইরে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেন, যখন নাগরিক সমাজ ফিফার জবাবদিহিতা দাবি করে, যখন সাংবাদিকরা টিকিটের দামের পেছনের গল্প বলেন—তখন সংস্কারের পথ খুলতে পারে। ২০২৬ বিশ্বকাপ এই দিক থেকে একটি পরীক্ষার মঞ্চ–পুঁজি ও রাজনীতির জোট বনাম নাগরিক সমাজের চাপ—কে জিতবে, তা সময়ই বলবে।
বিশ্বকাপের বল গড়ায়, গোল হয়, পতাকা ওড়ে। কিন্তু এই আনন্দের আড়ালে যে রাজনৈতিক অর্থনীতির মহাকাব্য রচিত হয়, তা পড়তে পারা একজন সচেতন নাগরিকের দায়িত্ব। কারণ ফুটবলের ভবিষ্যৎ কেবল মাঠের প্রতিভার ওপর নির্ভর করে না—এটি নির্ভর করে আমরা এই বৈশ্বিক মঞ্চটিকে কীভাবে দেখি, কোন প্রশ্ন জিজ্ঞেস করি এবং কার স্বার্থে এই আসর পরিচালিত হয়, সেই সত্যটিকে কতটা স্বীকার করতে রাজি আছি, তার ওপর।
এম এম মুসা উন্নয়নকর্মী ও গবেষক। ই-মেইল: [email protected]