১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

তালিকাভুক্ত কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন জমা ৬ মাসে নিতে চান বিএসইসি চেয়ারম্যান

“রোড শো করার কাজটি নিয়ন্ত্রক সংস্থার না। বাজার তদারকি করাও নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাজ না। আমাদের কাজ হলো নীতিমালা তৈরি ও সহজতর করা, আমরা তা করব।”

নিজস্ব প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 03 Jul 2026, 01:56 AM

Updated : 11 Sep 2026, 03:33 PM

তিন মাসের বদলে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন জমা ছয় মাসের ভিত্তিতে করার কথা বলেছেন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান মাসুদ খান।

একই সঙ্গে পুঁজিবাজারে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, তালিকাভুক্তির প্রক্রিয়া আরও সহজ ও দ্রুত করা, খরচ কমিয়ে আনা, তদারকিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহারসহ পুঁজিবাজার উন্নয়নে নিয়ন্ত্রক সংস্থার একগুচ্ছ পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেছেন তিনি।

রাজধানীর নিকুঞ্জে বৃহস্পতিবার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) টাওয়ারে বক্তব্য রাখছিলেন তিনি। ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন (ডিবিএ) ‘মিট অ্যান্ড গ্রিট’ শীর্ষক এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

এতে গত ৪ জুন বিএসইসির দায়িত্ব নেওয়া মাসুদ খান প্রতি প্রান্তিকে তালিকাভুক্ত কোম্পানির অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশের বিষয়ে বলেন, “আমিও এই পেইনের মধ্যে দিয়ে এসেছি। এই পেইন আমি বুঝি। তাই তিন মাস পর রিপোর্টিং চাইব না। এটাকে ছয় মাসে নিয়ে যাব, পরে আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী সময়ে হবে।”

তার ভাষ্য, আন্তর্জাতিক মানে উন্নতি করে শুধু বছর শেষে একবার বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে।

বর্তমানে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিকে তিন মাস পর পর অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করতে হয়। এর মাধ্যমে বিনিয়োগকারীরা কোম্পানিটি কেমন চলছে সেটির একটি ধারণা পান।

একই সঙ্গে আর্থিক প্রতিবেদন মূল্যায়নে কমিশনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) টুলস ব্যবহারের পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন তিনি।

এতে আইপিও (প্রাথমিক গণ প্রস্তাব) প্রক্রিয়ার আবেদন দ্রুত শেষ করা সহজ হবে বলে মনে করেন তিনি। 

‘বাজার তদারকি নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাজ না’

বিএসইসি চেয়ারম্যান বলেন, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ করতে যার যা কাজ, সেটি সেই প্রতিষ্ঠান করবে। 

“রোড শো করার কাজটি নিয়ন্ত্রক সংস্থার না। বাজার তদারকি করাও নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাজ না। আমাদের কাজ হলো নীতিমালা তৈরি ও সহজতর করা, আমরা তা করব।”

‘‘স্টক এক্সচেঞ্জের কাজটি তারা করবে। এখন থেকে কোম্পানি পরিদর্শনে স্টক এক্সচেঞ্জের আগাম অনুমতি লাগবে না কমিশনের। যার যার কাজ সেই করবে।’’

তিনি বলেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাজ হলো সমস্যার সমাধান করা। এই মানসিকতা নিয়ে কাজ করতে সব কর্মচারীদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। 

“আমি এসেছি করপোরেট খাত থেকে। তাদের দুঃখটা কি তা জানি। আমি তা হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করেছি। তাদের সেই পেইনটা কমিয়ে আনব।’’

‘তালিকাভুক্তির খরচ কমানো হবে’

বর্তমান আইপিও প্রক্রিয়া ‘ফ্রেন্ডলি’ না মন্তব্য করে বিএসইসি চেয়ারম্যান বলেন, ‘‘এটাতে আইপিও হতে পারেন না। আমরা তালিকাভুক্তি প্রক্রিয়া আরো সহজ করব। সব খরচ ও বার্ষিক ফি কমিয়ে আনব। তাদেরকে তো আগে আসতে দিতে হবে। তারা যেন আসে।’’

তিনি বলেন, শুধু খরচ বেশি হওয়ার কারণে অনেক কোম্পানি বাজারে তালিকাভুক্ত হতে চায় না। তারা ব্যাংকে যায় টাকা তুলতে।

বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী পুঁজিবাজারের শেয়ার লেনদেনের নিষ্পত্তি সময় ধাপে ধাপে ‘টি প্লাস শূন্যতে’ নামিয়ে আনার কথা বললেও এক্ষেত্রে কিছু সমস্যা হওয়ার কথা বলেছেন বিসিএইসি চেয়ার‌ম্যান।

তিনি বলেন, ‘টি প্লাস টু’ থেকে ‘টি প্লাস শূন্যতে’ নামিয়ে আনার ক্ষেত্রে কিছু সমস্যা হতে পারে। একটা অব্যবস্থাপনা হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। বাজার অগভীর হওয়ায় এখনই সেই দিকে যাওয়া হবে না।

‘‘মার্কেট আরও ম্যচিউরড হোক, তার পরে যাব। এর আগেতো টি প্লাস ওয়ান করতে পারি।’’

পুঁজিবাজারের বিষয়ে নেওয়া সিদ্ধান্ত বা জরিমানা কার্যকরে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল চালু ও বিদ্যমান ট্রাইব্যুনালকে সক্রিয় করার পরিকল্পনার কথাও বলেন তিনি।

অনুষ্ঠানে ডিবিএ সভাপতি সাইফুল ইসলাম অভিযোগ করেন, অতীতে রোডশো’র নামে বিএসইসি কর্মকর্তারা ‘জোর করে টাকা নিয়ে বিদেশে খরচ করেছে’। 

“রোড শো করা নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাজ না। এটি স্টক এক্সচেঞ্জেরও কাজ না। রোড শো করবে মার্চেন্ট ব্যাংক। তারা প্রতিষ্ঠান আনার কাজটি করবে, তারা যদি না পারেন, তাহলে তাদের মার্চেন্ট ব্যাংকের লাইসেন্স বাতিল করেন। নতুনদের লাইসেন্স দিন।’’

সিসিবিএল প্রতিষ্ঠায় ৩০০ কোটি টাকা খরচের পরিকল্পনার সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘‘সিসিবিএল এ ডিএসইর অংশ বাড়ানো হোক। সিসিবিএল এর মত প্রতিষ্ঠান বানাতে ভারত-পাকিস্তানের খরচ হিসাব করলে দেড়শ কোটি টাকার বেশি লাগার কথা না। তাদের সফটওয়্যারও ভালো।’’

সরকারি প্রতিষ্ঠান আইপিওতে আনার রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির বিষয়টিও তুলে ধরেন তিনি।

ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান, মার্চেন্ট ব্যাংক ও সম্পদ ব্যবস্থাপকদের তদারকি ও নিয়ন্ত্রণ করতে যুক্তরাষ্ট্র বা জাপানের মত একটি মডেল দাঁড় করানোর প্রস্তাব করেন তিনি।

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব পাবলিকলি লিস্টেড কোম্পানিজের সভাপতি রিয়াদ মাহমুদের অভিযোগ, তালিকাভুক্ত কোম্পানির বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) করার আগে ‘টাকা দিতে হয়’।

তবে কোথায় কোথায় এই টাকা দিতে হয় সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো ধারণা দেননি তিনি।

তার এ কথার সূত্র ধরে পরে বিএসইসি চেয়ারম্যান মাসুদ খান বলেন, ‘‘আগে যখন স্বশরীরে উপস্থিত হয়ে এজিএম হতো তখন অনেকেই নানাভাবে কোম্পানিকে চাপে রাখতেন। দলবলে এসে হাজির হতেন।’’

লাফার্জ হোলসিমের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা থাকার সময়ে একটি এজিএমে এমন সমস্যা হওয়ার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, ওই সময়ে এক মন্ত্রীকে ফোন দিয়ে বিষয়টি সামাল দিতে হয়।

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন ডিএসইর পরিচালক শাকিল রিজভী ও মিনহাজ মান্নান ইমন।