Published : 02 Jul 2026, 06:29 PM
বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে দলগুলো তাদের সামর্থ্য প্রদর্শন করে, কিন্তু নকআউট পর্বে প্রকাশ পায় তাদের চরিত্র। সেখানেই পরিসংখ্যানের চেয়ে সিদ্ধান্ত, বল দখলের চেয়ে কার্যকারিতা এবং সৌন্দর্যের চেয়ে ফলাফল বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ইতিহাসও বারবার মনে করিয়ে দিয়েছে, বিশ্বকাপের ট্রফি জিততে হলে শুধু ভালো ফুটবল খেললেই হয় না, ঠিক সময়ে ঠিক কাজটি করতে হয়। মাঠে নিজেদের কৌশলকে কার্যকর প্রমাণ করতে হয়।
২০২৬ বিশ্বকাপের নকআউটে ওঠা স্পেনকে দেখে প্রথম যে প্রশ্নটি মনে আসে, সেটি হলো দলটির প্রতিপক্ষ আসলে কে? যে দলের বিপক্ষে খেলবে? নাকি সে নিজেই? এই দলটি কি গত দুই বিশ্বকাপের নকআউট ব্যর্থতার ইতিহাস বদলাতে পারবে? নাকি আবারও বলের দখল, অসংখ্য পাস এবং নান্দনিক ফুটবল শেষ পর্যন্ত স্কোরবোর্ডের কাছে পরাজিত হবে? প্রশ্নটি নতুন নয়। প্রায় এক দশক ধরে এটি স্প্যানিশ ফুটবলের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
২০১০ সালের ১১ জুলাই জোহানেসবার্গে যখন আন্দ্রেস ইনিয়েস্তার শট নেদারল্যান্ডসের জালে জড়িয়ে গেল, তখন শুধু একটি বিশ্বকাপের ফাইনাল শেষ হয়নি। অনেকের কাছে সেটি ছিল একটি ফুটবল দর্শনের সর্বোচ্চ স্বীকৃতি। সেই স্পেন বিশ্বাস করত, বলের দখল ধরে রাখা আক্রমণের প্রথম শর্ত, আর ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করাই জয়ের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পথ। টিকিটাকা তখন কেবল একটি কৌশল ছিল না; ছিল ফুটবল খেলার একটি দার্শনিক অবস্থান।
কিন্তু ফুটবলের ইতিহাস বলে, এটি কোনো দর্শনের প্রতি স্থায়ীভাবে অনুগত থাকে না। যে কৌশল এক যুগে বিপ্লব ঘটায়, পরের যুগে প্রতিপক্ষ সেটির প্রতিষেধকও খুঁজে বের করে। আধুনিক ফুটবলের গত এক দশকের ইতিহাস আসলে সেই প্রতিষেধক আবিষ্কারের ইতিহাস। ইউরোপের অনেক দল বুঝে গেছে, স্পেনের বিরুদ্ধে বলের জন্য লড়াই করার প্রয়োজন নেই। বরং বল তাদের কাছেই ছেড়ে দেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। সুতরাং স্পেনকে হারাতে চাইলে নিজেদের রক্ষণভাগ সংকুচিত কর, সেন্ট্রাল করিডোর বন্ধ কর, ধৈর্য ধর এবং সুযোগ এলে পাল্টা আঘাত কর।
এই কৌশলে ফললাভও হয়েছে। ২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপে স্বাগতিক দলের বিপক্ষে স্পেন ১,১৩৭টি পাস দিয়েছিল। বলের দখল ছিল প্রায় ৭৫ শতাংশ। কিন্তু ম্যাচ শেষ হয়েছিল ১-১ সমতায়। পরে টাইব্রেকারে বিদায়। চার বছর পর কাতারেও প্রায় একই গল্প। মরক্কোর বিপক্ষে ১,০১৯টি পাস, ৭৭ শতাংশ বলের দখল, কিন্তু নির্ধারিত ও অতিরিক্ত সময়ে একটি গোলও হয়নি। ফলে আবারও টাইব্রেকার, আবারও বিদায়।
প্রশ্ন হলো এই দুই ম্যাচকে দুর্ঘটনা হিসেবে দেখব নাকি একটি প্রবণতা হিসেবে বিবেচনা করব। দ্বিতীয়টিই যৌক্তিক, কারণ ফুটবল কেবল সংখ্যার খেলা নয়, সংখ্যার অর্থ বোঝার খেলাও। স্পেনের পাসের সংখ্যা যত বেড়েছে, প্রতিপক্ষের আত্মবিশ্বাসও যেন তত বেড়েছে। তারা জানত, বল ঘুরছে মানেই বিপদ তৈরি হচ্ছে না। বাম থেকে ডান প্রান্তে আবার ডান থেকে বাম প্রান্তে বল ছুটছে। মাঝমাঠে অসংখ্য ছোট ছোট পাস। কিন্তু প্রতিপক্ষের কম্প্যাক্ট রক্ষণভাগের ভেতরে ঢোকার দরজা খুলতে পারছে না স্পেন। আটকে দিচ্ছে 'লো-ব্লক'। যা আসলে এক ধরণের ধৈর্যের ফাঁদ। এই ফাঁদে প্রতিপক্ষকে দৌড়াতে হয় না, বল কাড়তে হয় না, শুধু অপেক্ষা করতে হয়। কারণ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আক্রমণকারী দলের অস্থিরতাই তাদের সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ হয়ে ওঠে। এ কারণেই বলা যায়, স্পেনের সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ কোনো নির্দিষ্ট দেশ নয়। তাদের সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ একটি কৌশল। এই বিশ্বকাপেও কেপ ভার্দের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্র সেই পুরোনো উদ্বেগকে আবার সামনে নিয়ে এসেছে। বলের দখল ছিল স্পেনের, উদ্যোগও ছিল তাদের, কিন্তু প্রতিপক্ষ ডি-বক্সের সামনে এমন একটি রক্ষণাত্মক প্রাচীর গড়ে তুলেছিল, যা ভাঙার মতো পর্যাপ্ত বৈচিত্র্য স্পেন খুঁজে পায়নি।
তবে এখানেই বিশ্লেষণ থামিয়ে দিলে ভুল হবে। কারণ ২০২৬ সালের স্পেনকে ২০১৮ কিংবা ২০২২ সালের সঙ্গে এক কাতারে রাখাও অন্যায়। এই দলটি একই দর্শনের উত্তরাধিকার বহন করলেও তার প্রকাশভঙ্গি আলাদা। আর সেই পার্থক্যই হয়তো নির্ধারণ করবে, লা রোজার সামনে অপেক্ষা করছে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি, নাকি পরিবর্তন। এই দলটি কেবল ২০১০ সালের উত্তরাধিকার বহন করছে না, সেই উত্তরাধিকারকে অগ্রসর একটি জায়গায় নিয়ে গিয়েছে। টিকিটাকার মূল দর্শন এখনও আছে, তবে সেটি আর নিজেই নিজের উদ্দেশ্য নয়। এখন বলের দখলকে দেখা হচ্ছে আক্রমণের একটি মাধ্যম হিসেবে, গন্তব্য হিসেবে নয়।
এই পরিবর্তনের সূচনা কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তের হাত ধরে। তার অধীনে স্পেন আবারও বলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখে, কিন্তু প্রয়োজন হলে দ্রুত ট্রানজিশনে যায়, উইং বদলায়, ওয়ান-অন-ওয়ান পরিস্থিতি তৈরি করে এবং ঝুঁকি নেয়। ২০২৪ সালের ইউরো জয়ের পর ফুয়েন্তের একটি মন্তব্য বর্তমান দলটির সবচেয়ে নির্ভুল পরিচয় বলে মনে হয়েছে, "বল দখল গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু গোলটাই শেষ কথা।" এই একটি বাক্যই আসলে গত এক দশকে স্প্যানিশ ফুটবলের বিবর্তনের সারাংশ।
২০১০ সালের স্পেন প্রতিপক্ষকে পাসের বৃত্তে বন্দি করত। ২০২৬ সালের স্পেন প্রতিপক্ষের ডিফেন্সিভ কাঠামো ভেঙে স্পেস তৈরি করতে চায়। এই দুইয়ের পার্থক্য সূক্ষ্ম হলেও মৌলিক। আগের স্পেন বিশ্বাস করত, ধৈর্যই শেষ পর্যন্ত প্রতিপক্ষকে ভেঙে দেবে। বর্তমান স্পেন বিশ্বাস করে, ধৈর্যের পাশাপাশি বিস্ফোরণও প্রয়োজন। সেই দায়িত্ব এখন কাঁধে নিয়েছেন বিস্ফোরক দুই উইঙ্গার, লামিন ইয়ামাল ও নিকো উইলিয়ামস। গত দুই বিশ্বকাপে স্পেনের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা ছিল, প্রতিপক্ষের কম্প্যাক্ট রক্ষণকে ব্যক্তিগত দক্ষতায় ভাঙতে পারে এমন খেলোয়াড়ের অভাব। ইয়ামাল ও নিকো সেই শূন্যতা পূরণ করেছেন। একজন ডান দিক থেকে ভেতরে ঢোকেন, অন্যজন বাম দিক থেকে গতি দিয়ে রক্ষণকে প্রসারিত করেন। ফলে প্রতিপক্ষের ডিফেন্সিভ ব্লক আর আগের মতো সংকুচিত থাকতে পারে না। ঘনত্ব নষ্ট হয়, প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগে তৈরি হয় প্রবেশের জায়গা। ২০২৪ ইউরোতে এই দুই উইঙ্গারের যৌথ অবদানই প্রমাণ করেছে, আধুনিক স্পেন শুধু পাসে নয়, ড্রিবলেও ম্যাচের ভাগ্য বদলে দিতে পারে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পেদ্রির সৃজনশীলতা, দানি ওলমোর হাফ-স্পেস দখলের ক্ষমতা, মিকেল ওইয়ারসাবালের ফিনিশিং এবং মার্ক কুকুরেলার নিরবচ্ছিন্ন ওভারল্যাপ। এই বৈচিত্র্যই বর্তমান স্পেনকে আগের দুই বিশ্বকাপের দল থেকে আলাদা করেছে। তবুও স্পেনের সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষাটি খেলোয়াড় নয়, পরিস্থিতি। প্রতিপক্ষ যদি হাই প্রেস করে, তাহলে স্পেনের সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়। কারণ ইয়ামাল, নিকো কিংবা ওইয়ারসাবালের সামনে তখন খোলা জায়গা তৈরি হবে। কিন্তু যদি আবারও কোনো দল নিজেদের অর্ধে নেমে গিয়ে পাঁচ কিংবা ছয়জনকে বক্সের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়, তাহলে সেই পুরোনো প্রশ্ন আবার ফিরে আসবে। স্পেন কি যথেষ্ট দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারবে? তারা কি বক্সের বাইরে বল ঘোরানো থেকে বেরিয়ে এসে বক্সের ভেতরে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারবে?
এই কারণেই কেপ ভার্দের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্রকে নিছক একটি দুর্ঘটনা বলে মনে হয় না। আবার এটিকে ভবিষ্যতের নির্ণায়ক ভাবাও ঠিক নয়। বরং এটি একটি সতর্কবার্তা। নকআউটে স্পেনের সামনে কী ধরনের চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে, সেই চ্যালেঞ্জের একটি আগাম নমুনা। এখানেই নকআউট ফুটবলের নির্মমতা। গ্রুপ পর্বে ভুল করা যায়, কারণ সামনে আরেকটি ম্যাচ থাকে। কিন্তু নকআউটে একটি ভুলই পুরো টুর্নামেন্ট শেষ করে দিতে পারে। সেখানেই বড় দল আর চ্যাম্পিয়ন দলের পার্থক্য তৈরি হয়। বড় দল ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করে। চ্যাম্পিয়ন দল মুহূর্ত নিয়ন্ত্রণ করে।
২০১০ সালের স্পেনের নকআউট যাত্রা মনে করুন। চারটি ম্যাচ, চারটি জয়, প্রতিটি ১-০ ব্যবধানে। সেই দলটি প্রতিপক্ষকে উড়িয়ে দেয়নি। কিন্তু প্রতিবার প্রয়োজনীয় মুহূর্তটি নিজেদের করে নিয়েছিল। বিশ্বকাপের ইতিহাসে সেটিই ছিল তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। ২০২৬ সালের স্পেনের সামনে তাই আসল প্রশ্নটি প্রতিপক্ষকে নিয়ে নয়। প্রশ্নটি নিজেদের নিয়েই। তারা কি বলের দখলকে আবারও স্কোরবোর্ডের দখলে রূপ দিতে পারবে? তারা কি পাসের সংখ্যা নয়, গোলের সংখ্যাকে নিজেদের পরিচয় বানাতে পারবে? তারা কি অবশেষে নকআউটকে দিশা হারিয়ে ফেলার পর্ব না ভেবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে? যদি পারে তাহলে এই দল অনেক দূর যেতে সক্ষম। আর যদি আবারও লো-ব্লকের গোলকধাঁধায় আটকে যায়, তাহলে ইতিহাস নির্মমভাবে নিজের পুনরাবৃত্তি ঘটাবে।
এই কারণেই এবারের নকআউট স্পেনের জন্য শুধু কয়েকটি ম্যাচ নয়; এটি একটি ফুটবল দর্শনের বিচারমঞ্চ। স্পেন হয়তো আরেকটি বিশ্বকাপ জিতবে, হয়তো জিতবে না। কিন্তু এবারের নকআউট ঠিক করে দেবে, টিকিটাকা শুধু ইতিহাসের একটি অধ্যায়, নাকি এখনও কার্যকর একটি ভাষা।
জয় প্রকাশ সরকার লেখক ও সাংবাদিক। ই-মেইল: [email protected]