Published : 01 Jul 2026, 06:46 PM
ইরানের বিশ্বকাপ শেষ হয়েছে। গ্রুপ পর্বে কোনো ম্যাচ না হেরেও তারা রাউন্ড অব ৩২-এ (নকআউট পর্বে) যেতে পারেনি। তবে ওই মাঠের ফলাফলকে ছাপিয়ে গোটা টুর্নামেন্টজুড়ে ইরানের সঙ্গে যা হয়েছে, তা এখন বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ থেকে উঠে এসে, যে চরম প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ইরান তাদের ‘তিন ম্যাচের বিশ্বকাপ’ শেষ করেছে, তার জন্য প্রশংসায় ভাসছে তারা। একই সঙ্গে এটিও আলোচিত হচ্ছে যে, ইরানের সঙ্গে যা হয়েছে তা কি অন্যায্য ছিল না? এবারের বিশ্বকাপ কি তবে বাণিজ্য আর অন্যায্যের বিশ্বকাপ হিসেবে পরিচিত হতে যাচ্ছে?
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মার্কিন হোমল্যান্ড সিকিউরিটি সেক্রেটারি মার্কওয়েন মুলিনের মন্তব্য। এই সোমবার ওয়াশিংটনে এক সরকারি অনুষ্ঠানে তিনি বলেছেন, যখনই শুনেছেন যে ইরান নকআউট পর্বে যেতে পারেনি, তিনি ‘খুশিতে নেচেছেন’ এবং ‘কয়েকটি গানও গেয়েছেন’।
শুরুটা হয়েছিল বিশ্বকাপ শুরুর অনেক আগে। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের উত্তেজনা তখন তুঙ্গে। সব দল যখন এবারের বিশ্বকাপের আয়োজক দেশ যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডার পথে, ইরান ফুটবল দল তখনো নিশ্চিত ছিল না যে তারা আদৌ বিশ্বকাপ খেলতে পারবে কিনা। যুক্তরাষ্ট্র প্রথমে ইরান দলকে ভিসা দিতে অস্বীকৃতি জানায়। ওই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে খেলোয়াড়রা আপিল করেন। প্রথম দফায় মাত্র ৪ জন খেলোয়াড় ভিসা পেলেও বাকি ১১ জন খেলোয়াড়ের ভিসা পেতে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে। তবে খেলোয়াড়েরা ভিসা পেলেও সাপোর্ট স্টাফদের সাথে চরম বৈষম্যমূলক আচরণ করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত ম্যাচগুলোতে ইরান দল কোনো পূর্ণাঙ্গ সাপোর্ট বা লজিস্টিক টিম পায়নি। অর্থাৎ, খেলোয়াড়দের বাইরে আর কোনো ব্যাকরুম স্টাফকে যুক্তরাষ্ট্রে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। এমনকি ইরান ফুটবল দলের কোনো কর্মকর্তা কিংবা বিশ্বকাপ দেখতে ইরান থেকে আসা কোনো দর্শককেও যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।
ইরানি ফুটবল দলকে যুক্তরাষ্ট্রে রাতে ঘুমাতেও দেওয়া হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত ম্যাচগুলো তাদের খেলতে হয়েছে মেক্সিকো থেকে যাতায়াত করে। কল্পনা করুন, ৯০ মিনিট ফুটবল খেলে একটা দলকে আবার হাজার কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে মেক্সিকোতে ফিরে যেতে হয়েছে ঘুমানোর জন্য! এটি কিন্তু আগে থেকে নির্ধারিত ছিল না; এই পরিবর্তন আনা হয় টুর্নামেন্ট শুরু হওয়ার ঠিক আগে। ইরানি ফুটবলারদের প্রশিক্ষণ ক্যাম্প অ্যারিজোনা থেকে মেক্সিকোর তিজুয়ানায় সরিয়ে নিতে বাধ্য করা হয়।
ঘটনা এখানেই শেষ নয়। প্রতি ম্যাচ খেলার সময় তারা যখন মেক্সিকো থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণ করেছে, এয়ারপোর্টে পদে পদে হয়রানির শিকার হতে হয়েছে; সম্মুখীন হতে হয়েছে ব্যাপক তল্লাশির। একবার তো অধিনায়ককে ছাড়াই বাকি দলকে মাঠের উদ্দেশ্যে রওনা হতে হয়েছে। অতিরিক্ত জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তাকে দলের সাথে পরে এসে যোগ দিতে হয়।
বিশ্বকাপ যাত্রা শেষ হওয়ার সাথে সাথেই ইরানের সব খেলোয়াড়ের ভিসা বাতিল করেছে কর্তৃপক্ষ। সেই উচ্ছ্বাস ধরা পড়েছে ওয়াশিংটনের ব্রিফিংয়ে মুলিনের কণ্ঠে, “আমি খুব খুশি যে ওদের বিশ্বকাপ পর্ব এখানেই শেষ, ওরা আর ফিরে আসছে না।”
এরপরের মন্তব্যগুলো আরও বর্ণবাদী, “আমরা যখন তাদের ভিসা বাতিল করতে পারলাম এবং তাদেরকে আমেরিকার মাটি ছাড়তে বলতে পারলাম, তখন আমি এত খুশি হয়েছিলাম যে খুশিতে নেচেছি এবং দু-একটা গানও গেয়ে ফেলেছি।”
প্রথম ম্যাচে নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে গোল করে মোহাম্মদ মোহেবি দর্শকদের দিকে ছুটে গিয়ে স্ট্যানগান তাক করার মতো করে উদযাপন করেছিলেন। গোল করার পর বিচিত্র ভঙ্গিতে উদযাপন ফুটবলারদের জন্য নতুন কিছু নয়। কিন্তু ইরানের জন্য যেন সবকিছুই আলাদা! ওই উদযাপনের জন্য ব্যাপক হয়রানির শিকার হতে হয়েছিল মোহেবিকে। নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়তে পড়তে বেঁচে গেছেন তিনি।
তিন ম্যাচের একটিতেও হারেনি ইরান। মিশরের সাথে যে সূক্ষ্ম ভিএআরে ইরানের গোলটি বাতিল করা হয়েছে, সেটি খুঁটিয়ে দেখার জন্য মাইক্রোস্কোপের দরকার পড়বে। তিন ম্যাচে ড্র করে তিন পয়েন্ট নিয়ে এক পর্যায়ে ইরানের সমীকরণ দাঁড়ায় এরকম: অন্য গ্রুপে অস্ট্রিয়া ও আলজেরিয়া ম্যাচে যে কোনো এক দল জিতলেই ইরান তৃতীয় স্থানে থাকা দলগুলোর মধ্য থেকে রাউন্ড অব ৩২-এ উঠে আসবে এবং প্রথমবারের মতো নকআউট খেলার যোগ্যতা অর্জন করবে। কিন্তু ওই দুই দল যেন জিততেই চাইল না! যেহেতু তথ্য-প্রমাণ নেই, আমি ম্যাচটিকে পাতানো বলছি না; কিন্তু আন্তর্জাতিক মিডিয়া ইতোমধ্যে ওই ম্যাচকে ‘সমঝোতার ম্যাচ’ বলে আখ্যা দিয়েছে। ৯০ মিনিটে ২-২ গোলে সমতায় থাকা ম্যাচে শেষ ৬ মিনিটে গোল হয়েছে আরও দুটি।
সবচেয়ে দুঃখজনক দিকটি হলো, এসব অব্যবস্থাপনা নিয়ে অভিযোগ করলেও ফিফা কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। ইরানের ড্রেসিংরুমে এসে ফিফা সভাপতি আশ্বাস দিয়ে গেলেও সেটি শেষ পর্যন্ত কেবলই ‘আশার বাণী’ হয়ে থেকে গেছে। ইরানের প্রধান কোচ আমির গালেনোইয়ের কণ্ঠে সেটিই ক্ষোভ হয়ে ঝরেছে, “আমাদের দল ছিল টুর্নামেন্টে সবচেয়ে নিপীড়িত”। আর সিয়াটলে নিজেদের শেষ ম্যাচের পর ইরানের অধিনায়ক মেহদি তারেমি তো কোনো রাখঢাকই রাখেননি। পরিষ্কার বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র চায় না ইরান নকআউট পর্বে উঠুক। তিনি বলেছেন, “এখানে আমাদের সবকিছুর বিরুদ্ধে লড়তে হচ্ছে। আমি জানি না অন্যরা একমত হবে কিনা, কিন্তু আপনি যদি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখেন তাহলে আমি বলব—হ্যাঁ, এটাই হয়েছে আমাদের সাথে।”

ফলে ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বিরাজ করা হরমুজ প্রণালীর রাজনৈতিক উত্তেজনা ফুটবল মাঠে গিয়ে পড়েছে বেশ ভালোভাবেই। মার্কিন কর্মকর্তা মুলিনের ব্যঙ্গের জবাবে সেটিই টেনে এনেছেন ইরান ফুটবল ফেডারেশনের কর্মকর্তা। তার মতে, আমেরিকানদের এমন অবিচার ও মিথ্যার সাথে ইরানিরা অভ্যস্ত, ফলে তারা এসবে আর অবাক হয় না।” তবে এসব মন্তব্য এটাই প্রমাণ করে যে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল নন। যারা আন্তর্জাতিক আইন মানতে চান না, তারা এমন বৈশ্বিক ক্রীড়া আয়োজন করেন কী করে?”—যোগ করেন তিনি।
ইরান থেকে নিজ দলকে সমর্থনের জন্য কোনো দর্শক আসতে না পারলেও, মাঠে ইরানের সমর্থনে প্রচুর দর্শককে গলা ফাটাতে দেখা গেছে। সেটি ইরানি খেলোয়াড়দের অভিভূত করেছে। বেলজিয়ামের বিরুদ্ধে লস অ্যাঞ্জেলেসে গর্বের ড্রয়ের পর ইরানি ফুটবলারদের রেখে যাওয়া চিঠিতে সেটিই প্রতিফলিত হয়েছে।
দর্শকদের উদ্দেশ্যে চিঠিতে তারা লিখে গেছে, “ফিফার আয়োজন করা বিশ্বকাপ ফুটবল শুধু স্টেডিয়াম ও টিকিটের বিষয় যে নয়, সেটি আপনারা আমাদের দেখিয়ে দিয়েছেন। প্রকৃত আতিথেয়তা হলো সম্মান, মানবতা এবং মর্যাদা। আমরা এই বিশ্বকাপ থেকে গর্ব নিয়ে বিদায় নিচ্ছি, তবে একটি মৌলিক প্রশ্ন রেখে যাচ্ছি—সব দল কি সত্যিই সমান সুযোগ পেল? পেশাদারত্বের মানদণ্ড কি মানা হলো?”
‘ফুটবল বিশ্বকে এক করে’ স্লোগান তোলা ফিফার কাছে এই প্রশ্নের উত্তর আছে কি না, কে জানে!
রাজু নূরুল উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ ও লেখক। বর্তমানে সোমালিয়া সরকারের অর্থ, পরিকল্পনা ও বিনিয়োগ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র অ্যাডভাইজার হিসেবে কর্মরত। যোগাযোগ: [email protected]