Published : 02 Jul 2026, 08:59 PM
জন্মসূত্রে যুক্তরাষ্ট্রে নাগরিকত্ব বাতিলের চেষ্টায় সুপ্রিম কোর্টের রায়ে বড় ধাক্কা খাওয়ার পর অন্যান্য পথ বা উপায় থাকতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প।
তবে আইনি ও অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মার্কিন সংবিধান সংশোধন করা ছাড়া সাধারণ কোনো আইনের মাধ্যমে ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষে এই নাগরিকত্ব কাঠামো পরিবর্তন করা প্রায় অসম্ভব।
মঙ্গলবার ৬-৩ ভোটে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিরা যুক্তরাষ্ট্রে জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব বাতিল নিয়ে ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশ খারিজ করে দিয়েছেন।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ট্রাম্প দায়িত্ব নেওয়ার পর জারি করা ওই আদেশে বলা হয়েছিল, যেসব শিশুর মা-বাবা অস্থায়ী বৈধ মর্যাদায় যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন অথবা বৈধ কাগজপত্র ছাড়া আছেন, তাদের শিশুরা যুক্তরাষ্ট্রে জন্মালেও স্বয়ংক্রিয়ভাবে মার্কিন নাগরিকত্ব পাবে না।
ইতালির ফ্লোরেন্সে অবস্থিত ইউরোপিয়ান ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউটের রবার্ট শুম্যান সেন্টারের প্রভাষক রেইনার বাউবক বলেন, সুপ্রিম কোর্টের রায় আশ্চর্যজনক না হলেও এটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
কারণ, এটি নথিপত্রহীন অভিবাসীদের সন্তানদের অন্তর্ভুক্ত করে মার্কিন রাজনৈতিক ব্যবস্থার একটি উদার ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ধারণাকে রক্ষা করেছে। বাউবক আল জাজিরাকে জানান, ভবিষ্যতে আইন করে এই ব্যবস্থা পরিবর্তন করার সম্ভবনা তেমন নেই।
আদালত সংবিধানের একটি স্পষ্ট ও আক্ষরিক ব্যাখ্যা দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করায় সাধারণ আইনের মাধ্যমে জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব সীমিত করার ক্ষেত্রে কংগ্রেসের রিপাবলিকান সংখ্যাগরিষ্ঠদের সব পথ বন্ধ হয়ে গেছে। এখন এটি বদলাতে হলে সংবিধান সংশোধন করতে হবে, যার সম্ভাবনা কার্যত শূন্য।
যুক্তরাজ্যের বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিবাসন বিষয়ক প্রভাষক নান্দো সিগোনা একই মত প্রকাশ করে বলেন, কংগ্রেস যদি সংবিধান সংশোধনের মতো অত্যন্ত কঠিন পথ বেছে না নেয়, যার জন্য ব্যাপক দ্বিপক্ষীয় সমর্থন প্রয়োজন, তবে কেবল সাধারণ আইন পাসে তাদের যে কোনও চেষ্টা আদালতে একরকম নিশ্চিতভাবেই তাৎক্ষণিক সাংবিধানিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।
আদালতের রায়ে ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়া:
সুপ্রিম কোর্টের রায়কে দেশের জন্য ‘খুবই খারাপ’ বলে অভিহিত করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। একই সঙ্গে তিনি একই লক্ষ্য অর্জনের জন্য বিকল্প পথ খোঁজার ইঙ্গিত দিয়েছেন।
তিনি প্রস্তাব করেছেন, কংগ্রেসের রিপাবলিকান সদস্যরা সাধারণ আইন পাসের মাধ্যমে জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব পাওয়ার যোগ্যতা সীমিত করার চেষ্টা করতে পারে।
ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখেছেন, “আমাদের দেশের জন্য ব্যয়বহুল এবং অন্যায্য এই জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব বন্ধ করতে কংগ্রেসের আজ থেকেই কাজ শুরু করা উচিত। এ বিষয়ে তারা আমার পূর্ণ ও চূড়ান্ত সমর্থন পাবে!”
আগামী নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে এই মামলাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এপ্রিলের শুরুতে ট্রাম্প নিজেই সুপ্রিম কোর্টের মৌখিক যুক্তি শুনানির অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। সুপ্রিম কোর্টে চলমান কোনো মামলার শুনানিতে উপস্থিত হওয়া প্রথম দায়িত্বরত প্রেসিডেন্ট তিনি।
শুনানির মাঝপথেই তাকে ক্ষুব্ধ হয়ে বেরিয়ে যেতে দেখা যায়। এর পরপরই তিনি ট্রুথ সোশ্যালে লেখেন, “আমরাই বিশ্বের একমাত্র দেশ যারা জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব দেওয়ার মতো এত বড় বোকামি করছি!”
হোয়াইট হাউজের ডেপুটি চিফ অব স্টাফ স্টিফেন মিলার এই রায়কে ‘ধ্বংসাত্মক ও ন্যক্কারজনক’ বলে বর্ণনা করেছেন।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে তিনি লিখেছেন, “আমেরিকান নাগরিকত্ব বিশ্বের সবার জন্মগত অধিকার নয়। এটি কেবল এবং শুধুমাত্র আমেরিকানদের। আমাদের জাতীয় বিলীন করে সংবিধানের কোনো ধারা এমনভাবে ব্যাখ্যা করা যায় না।”
মিলার আল জাজিরাকে জানিয়েছেন, সুপ্রিম কোর্টে রায় বিপক্ষে যাওয়ার পরও ট্রাম্প প্রশাসন জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব বাতিলে তাদের লড়াই চালিয়ে যাবে।
যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান আইনে জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব মানে, বাবা-মায়ের অভিবাসন মর্যাদা যেমনই হোক, যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে জন্ম নেওয়া শিশু স্বয়ংক্রিয়ভাবেই মার্কিন নাগরিক হবে।
আদালতের রায়ের সুফল ও সম্ভাব্য প্রভাব:
মাইগ্রেশন পলিসি ইনস্টিটিউট এবং পেনসিলভানিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির মে ২০২৫ সালের এক যৌথ গবেষণায় বলা হয়েছিল, ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশ সফল হলে যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি বছর আনুমানিক দুই লাখ পঞ্চান্ন হাজার শিশু নাগরিকত্ব ছাড়াই জন্মগ্রহণ করত।
এর ফলে দুই হাজার পঁয়তাল্লিশ সালের মধ্যে নথিপত্রহীন জনসংখ্যা সাতাশ লাখ বৃদ্ধি পেত।
পেনসিলভানিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির অনুমান অনুযায়ী, এই নীতি পরিবর্তনের ফলে লাতিনো অভিবাসীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হত। ২০৫০ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে বৈধ নথিপত্র ছাড়া জন্মগ্রহণ করা মানুষের নব্বই শতাংশের বেশি হত এই লাতিনোরা।
অন্যদিকে, এশীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে তুলনামূলকভাবে সবচেয়ে বড় বৃদ্ধি দেখা যেত। বৈধ নথিপত্রহীন প্রতি এক হাজার এশীয় নাগরিকের বিপরীতে ৪১ টি অননুমোদিত শিশুর জন্ম হত, যেখানে লাতিনোদের ক্ষেত্রে এই সংখ্যা প্রতি হাজারে ১৭টি।
ভুক্তভোগী জনগোষ্ঠী কিংবা অভিবাসী পরিবারগুলোই কেবল নয়, বরং এই রায় মার্কিন অর্থনীতির জন্যও সুফল আনবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সেন্টার ফর মাইগ্রেশন স্টাডিজ- এর হিসাব অনুযায়ী, জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের সুবিধাভোগীরা ১৯৭৫ থেকে ২০৭৪ সালের মধ্যে তাদের আয়ের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে ৭ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ডলার অবদান রাখবে।