Published : 01 Jul 2026, 06:27 PM
ভেনেজুয়েলায় ভয়াবহ ভূমিকম্প আঘাত হানার ছয় দিন পর ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে তিন বছর বয়সী একটি শিশুকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। জর্ডানের একটি উদ্ধারকারী দল এই অলৌকিক উদ্ধার অভিযান চালিয়েছে।
ক্লিবার মোরান নামের এই শিশুটিকে লা গুয়াইরা রাজ্য থেকে উদ্ধার করা হয় বলে নিশ্চিত করেছেন দেশটির অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ। এই উদ্ধারকে তিনি “আমাদের মানুষের জন্য আশার আলো” হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
হতাহত ও ক্ষয়ক্ষতি:
গত সপ্তাহের ৭ দশমিক ২ এবং ৭ দশমিক ৫ মাত্রার জোড়া ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১,৯৪৩ জনে দাঁড়িয়েছে। এতে ১০ হাজার জনেরও বেশি মানুষ আহত হয়েছেন এবং আরও হাজার হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন।
মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার স্যাটেলাইট তথ্যের প্রাথমিক মূল্যায়ন অনুযায়ী, এই শক্তিশালী ভূমিকম্পে প্রায় ৫৮,৮৭০টি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে।
জর্ডানের সিভিল ডিফেন্স জানিয়েছে, শিশু ক্লিবারকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে এবং তার শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল রয়েছে।
ভেনেজুয়েলার আইনসভার প্রধান হোর্হে রদ্রিগেস জানিয়েছেন, বর্তমানে রাজধানী কারাকাসে শিশুটির চিকিৎসা চলছে।
সাধারণত ভূমিকম্পের প্রথম তিন দিনকে জীবিত উদ্ধারের জন্য সবচেয়ে সম্ভাবনাময় সময় ধরা হয়। তবে ক্লিবারকে তার অনেক পরে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হল।
লা গুয়াইরায় তীব্র মানবিক সংকট:
ভূমিকম্পে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর একটি হলো লা গুয়াইরা। সেখানে স্থানীয় বাসিন্দারা নিজেরাই উদ্ধার কাজ চালানোর চেষ্টা করছেন।
জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) জানিয়েছে, লা গুয়াইরায় তীব্র খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে, মৌলিক সেবাগুলো ভেঙে পড়েছে এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। ত্রাণ পৌঁছানোর সুযোগ সীমিত হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ছে।
লা গুয়াইরার আঠারো বছর বয়সী একজন বিক্রেতা দানিয়েলা আরমাস, যিনি ভূমিকম্পের সময় মোটরসাইকেল থেকে পড়ে গিয়ে আহত হয়েছিলেন, তিনি সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “কিছু ত্রাণ বিতরণ করা হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু খাবারের জন্য মানুষ একে অপরকে প্রায় মেরেই ফেলছে।”
পরিস্থিতির বর্ণনা দিয়ে তিনি আরও বলেন, “এখানে অবস্থা এখন অনেকটা মোরগের লড়াইয়ের মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
ইউএনএইচসিআর জানিয়েছে, আগামী ছয় মাসে ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত ৩০,০০০ মানুষের জরুরি আশ্রয় ও ত্রাণ সামগ্রী সরবরাহের জন্য প্রাথমিকভাবে এক কোটি পঞ্চাশ লাখ ডলার প্রয়োজন।
অন্যদিকে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) সতর্ক করেছে যে, সেখানকার স্বাস্থ্য পরিষেবা চরম চাপের মধ্যে রয়েছে। টিকাদানের হার কম হওয়ায় হাম ও ডিপথেরিয়ার মতো রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ছে।
আন্তর্জাতিক সাহায্য ও স্বজনদের অপেক্ষা
আইনসভার প্রধান হোর্হে রদ্রিগেজ বলেন, ক্লিবারের উদ্ধার প্রমাণ করে যে এখনও ধ্বংসস্তূপে জীবন খুঁজে পাওয়ার আশা আছে। যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকোসহ বিভিন্ন দেশের আন্তর্জাতিক উদ্ধারকারী দল প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কুকুর ও ভারী যন্ত্রপাতি নিয়ে তল্লাশি চালিয়ে যাচ্ছে।
মঙ্গলবার জাতিসংঘের সাতচল্লিশ টনের একটি ত্রাণের চালান ভেনেজুয়েলায় পৌঁছেছে, যার মধ্যে জরুরি চিকিৎসা সামগ্রী ও নবজাতকদের পরিচর্যার জিনিসপত্র রয়েছে।
এরই মধ্যে নিহতদের দাফন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। লা গুয়াইরা বন্দরের একটি অস্থায়ী মর্গে নিজের পরিবারের সদস্যদের লাশের জন্য অপেক্ষা করছেন উইলকার মোলাল্লা।
উইলকার মোলাল্লা বলেন, “আমার পরিবারে মোট এগারো জন সদস্য ছিলেন।”
আক্ষেপ করে তিনি আরও যোগ করেন, “তাদের মধ্যে কেবল দুজন বেঁচে আছি, কারণ ভূমিকম্পের সময় আমরা কাজের জায়গায় ছিলাম।”