Published : 26 Jul 2026, 02:39 AM
আজকের পৃথিবীতে মুরগি হলো সবচেয়ে সাধারণ এবং সর্বত্র পাওয়া যায় এমন খাবার। এটি কেবল একটি পাখি নয়, বরং বিভিন্ন সংস্কৃতি ও ভৌগোলিক সীমারেখা পার করে আসা এক বৈশ্বিক নাগরিকও বটে। আপনি যদি লন্ডনের কোনো রেস্তোরাঁয় যান, দেখবেন এক প্রজন্মের ব্রিটিশরা বিশ্বাস করে যে ‘চিকেন টিক্কা মাসালা’ তাদের জাতীয় খাবার। আবার সুদূর চীনেও একই জনপ্রিয়তা নিয়ে রাজত্ব করছে ‘কেএফসি’।
কিন্তু এই যে মুরগি আজ আমাদের প্লেটের শোভা বাড়াচ্ছে, তার পেছনের ইতিহাসটা ১০ হাজার বছরের পুরনো এবং ডাইনোসরের গল্পের মতোই রোমাঞ্চকর।
গল্পের শুরুটা করা যাক খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীর প্রথম দিকের একটি কিংবদন্তি দিয়ে। এথেন্সের জেনারেল থেমিস্টোক্লিস তখন পারস্য বাহিনীর আক্রমণ ঠেকাতে যুদ্ধের ময়দানে যাচ্ছেন। পথে তিনি দেখলেন রাস্তার ধারে দুটি মোরগ প্রচণ্ড লড়াই করছে। তিনি তার ক্লান্ত সেনাদের থামিয়ে বললেন, “একটু তাকিয়ে দেখো! এই মোরগগুলো কিন্তু তাদের দেবতা, পূর্বপুরুষ, স্বাধীনতা কিংবা সন্তানদের নিরাপত্তার জন্য লড়ছে না। তারা লড়ছে স্রেফ একে অপরের কাছে হার না মানার এক সহজাত জেদ থেকে।”
ইতিহাস বলে, সেই সাধারণ পাখির লড়াকু মানসিকতা দেখে গ্রিক সৈন্যরা এতটাই অনুপ্রাণিত হয়েছিল যে তারা পারস্য বাহিনীকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করে। আর সেই সভ্যতাই আজ সেই বীর মোরগদের বংশধরদের মশলা দিয়ে মাখিয়ে কড়া করে ভেজে সস দিয়ে খাচ্ছে। মুরগিরা যদি গভীর চিন্তা করতে জানত, তবে তারা নিশ্চিতভাবেই ভাবত যে তাদের পূর্বপুরুষদের সেই ‘বীরত্ব’ দেখানোটা সম্ভবত খুব একটা বুদ্ধিমানের কাজ হয়নি!
প্রত্নতাত্ত্বিকদের একটি বড় অংশ মনে করেন, মুরগিকে প্রথমে পোষ মানানো হয়েছিল খাবারের জন্য নয়, বরং মোরগ লড়াইয়ের জন্য। এমনকি বিশ শতকের আগে পর্যন্ত মুরগির অর্থনৈতিক বা পুষ্টিগত গুরুত্ব ছিল যৎসামান্য। বিখ্যাত লেখক জ্যারেড ডায়মন্ড তার ‘গানস, জার্মস অ্যান্ড স্টিল’ বইয়ে মুরগিকে স্রেফ একটি ছোটখাটো গৃহপালিত প্রাণী হিসেবে উল্লেখ করেছেন, যা ঘোড়া বা গরুর মতো মানব ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখত না।
তবুও মুরগি কিন্তু ধর্ম, শিল্প এবং বিজ্ঞানে তার সরব উপস্থিতি রেখে গেছে। প্রাচীন মিশরে নীল নদের বন্যা যেন আশীর্বাদ হয়ে আসে, তাই মন্দিরে মুরগির ডিম ঝুলিয়ে রাখা হতো। পারস্যের জরাথ্রুস্টবাদে মোরগকে ভাবা হতো ‘শুভ আত্মা’, যার ডাক ভোরের আগমন আর অন্ধকারের বিনাশের বার্তা নিয়ে আসে।
রোমানদের কাছে মুরগি ছিল অনেকটা ভাগ্য গণনার যন্ত্রের মতো। যুদ্ধের আগে রোমান সেনাবাহিনী মুরগিকে খাবার খেতে দিত। যদি মুরগিগুলো খুব পেটভরে খেত, তবে ধরে নেওয়া হতো যুদ্ধে জয় নিশ্চিত। খ্রিস্টপূর্ব ২৪৯ অব্দের এক নৌ-যুদ্ধের আগে যখন মুরগিগুলো খাবার খেতে চাইল না, তখন রাগান্বিত হয়ে রোমান কনসাল সেগুলোকে সমুদ্রের জলে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বলেছিলেন, “না খেলে তবে জলই খা!” ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, সেই যুদ্ধে রোমানরা চরমভাবে পরাজিত হয়েছিল।

আশ্চর্যের বিষয় হলো, যে ইহুদি-খ্রিস্টান সংস্কৃতিতে ‘ম্যাটজো-বল স্যুপ’ বা ‘সানডে চিকেন ডিনার’ এত জনপ্রিয়, তাদের আদি ধর্মগ্রন্থে মুরগিকে নিয়ে খুব একটা মাতামাতি নেই। ওল্ড টেস্টামেন্টে ঈশ্বর লাল মাংসের তুলনায় পাখির মাংসের প্রতি বিমুখতা দেখিয়েছেন। এমনকি পাপের প্রায়শ্চিত্ত হিসেবেও পায়রা বা ঘুঘু উৎসর্গ করা চলত, কিন্তু মুরগি নয়।
আবার যিশু খ্রিস্ট যখন জেরুজালেমের মানুষের প্রতি তার ভালোবাসার উপমা দিতে গিয়ে মুরগির সঙ্গে তুলনা করেছিলেন, সেই ছবিটাও কেন যেন ইউরোপীয় শিল্পকলায় খুব একটা জায়গা পায়নি। উল্টো সেন্ট পিটার যিশুকে তিনবার অস্বীকার করার পর মোরগের ডাক তাকে সেই ভুলের কথা মনে করিয়ে দিয়েছিল। সেই থেকে মোরগ যেন ‘বিশ্বাসঘাতকতার নিরব সাক্ষী’ হয়ে গেল। এই কারণেই হয়তো ইংরেজি ভাষায় ‘চিকেন’ শব্দটা কাপুরুষতা বা অকারণ উদ্বেগের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মুরগির বংশলতিকা খুঁজে পাওয়া যেকোনো রাজবংশের ইতিহাসের চেয়েও জটিল। ডিএনএ বিশ্লেষণ নিশ্চিত করেছে যে আজকের মুরগির আদি পূর্বপুরুষ হলো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ‘লাল বনমোরগ’, বৈজ্ঞানিক নাম ‘গ্যালাস গ্যালাস’। চার্লস ডারউইনও এই ধারণা পোষণ করেছিলেন।
এই বুনো পাখিগুলো খুব বেশি উড়তে পারত না, যা মানুষকে সহজেই তাদের ধরে পালনের সুযোগ করে দেয়। বিজ্ঞানীরা ২০০৪ সালে মুরগির পূর্ণাঙ্গ জিনোম ম্যাপ তৈরি করেন এবং দেখা যায়, হাজার বছরের বিবর্তনে মানুষের হাতে পড়ে মুরগির জিনে অদ্ভুত সব পরিবর্তন এসেছে। যেমন, ‘টিবিসি ওয়ান ডি ওয়ান’ নামের একটি জিনের মিউটেশনের ফলে আজকের মুরগিরা অতি দ্রুত চর্বি বাড়াতে পারে। এটি গ্লুকোজ মেটাবলিজম, বৃদ্ধি এবং শক্তি সঞ্চয়ের সঙ্গেও যুক্ত। আবার আরেকটি মিউটেশনের ফলে তারা বুনো মুরগির মতো নির্দিষ্ট ঋতুতে নয়, বরং সারা বছর ডিম পাড়তে পারে। এটিকে বহু জিনের সম্মিলিত নির্বাচনের ফলও বলা যায়।
মুরগির জয়যাত্রার এক বড় মোড় ছিল মিশর। খ্রিস্টপূর্ব ২০০০ অব্দের দিকে মেসোপটেমিয়ায় মুরগির অস্তিত্ব পাওয়া যায়। তবে মিশরীয়রা যখন এই পাখির ডিম ফোটানোর জন্য কৃত্রিম ‘ইনকিউবেটর’ বা উনুন আবিষ্কার করল, তখন থেকেই মুরগি পালনের চিত্রটা বদলে গেল।
তারা কাদা-মাটির বিশাল বিশাল উনুন বা ওভেন তৈরি করত এবং খড় আর উটের মল পুড়িয়ে এমন এক তাপমাত্রা তৈরি করত যা ডিম ফোটার জন্য একদম উপযুক্ত। এই ইনকিউবেটরের পদ্ধতিটি মিশরীয়রা কয়েকশ বছর গোপন রেখেছিল। এর ফলে মুরগিরাও ডিম থেকে বাচ্চা ফোটানোর ডিউটি থেকে মুক্তি পেল এবং আরও বেশি ডিম পাড়তে শুরু করল।
রোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর ইউরোপে মুরগির আভিজাত্য অনেকটা কমে গিয়েছিল। কিন্তু ঊনবিংশ শতকের পর অ্যান্টিবায়োটিক এবং ভিটামিন আবিষ্কারের পর মুরগি পালন এক ভয়ংকর শিল্পে রূপ নেয়। এর আগে মুরগির জন্য সূর্যের আলো খুব জরুরি ছিল, কারণ তাদের ভিটামিন ডি লাগত। এখন মুরগিকে চার দেয়ালের ভেতর কৃত্রিম আলোয় ঠাসাঠাসি করে পালন করা সম্ভব।

আজকের পৃথিবীতে মানুষের তুলনায় মুরগির সংখ্যা প্রায় তিনগুণ বেশি। এক কেজি মুরগির মাংস তৈরি করতে যে পরিমাণ খাবার লাগে, তা গরু বা খাসির তুলনায় অনেক কম। ফলে এটি এখন প্রোটিনের সবচেয়ে সস্তা উৎসে পরিণত হয়েছে। খামারিরা এখন মাত্র ছয় সপ্তাহে একটা মুরগিকে খাওয়ার উপযোগী করে গড়ে তোলেন, যা আজ থেকে ৫০ বছর আগেও ছিল অকল্পনীয়।
মুরগি আজ কেবল প্রোটিন নয়, এটি বিশ্বায়নের প্রতীক। জনপ্রিয় একটি মতে, ‘চিকেন টিক্কা মাসালা’ কীভাবে স্কটল্যান্ডের গ্লাসগোতে জন্ম নিয়ে ব্রিটিশদের প্রিয় খাবারে পরিণত হলো, তা আধুনিক রন্ধন ইতিহাসের এক রোমাঞ্চকর অধ্যায়। আবার চীনের কেএফসির সাফল্যের রহস্য খুঁজতে গেলে দেখা যায়, তারা কেবল ভাজা মুরগি নয়, বরং চীনাদের প্রিয় নুডলস আর ডাম্পলিংও পরিবেশন করে।
আমেরিকার ‘জেনারেল সো’স চিকেন’ নিয়েও রয়েছে মজার গল্প। এই খাবারের নাম যার নামে, সেই ঊনবিংশ শতকের চীনা সেনাপতি হয়তো কক্ষনো এই ডিশের কথা জানতেনই না। এই রান্নাটি জনপ্রিয় করেছিলেন বাবুর্চি পেং চ্যাং-কুয়েই, যিনি তাইওয়ান থেকে নিউ ইয়র্কে এসে নতুনভাবে ডিশটি সাজিয়েছিলেন। আজ সেই ডিশ উল্টো চীনের অনেক জায়গায় ঐতিহ্যবাহী খাবার হিসেবে সমাদৃত হচ্ছে।
মুরগি কেবল খাবারের প্লেটে নয়, মানুষের আধ্যাত্মিক বিশ্বাসেও টিকে আছে। কিউবার সান্টেরিয়া ধর্মে মুরগি উৎসর্গ করা হয়। আবার নিউ ইয়র্কের অনেক পরিবারে মুরগি এখন আদরের পোষা প্রাণী। কেউবা এর বিভিন্ন সুন্দর জাত যেমন ‘সিল্কি’ (যাদের পালক রেশমের মতো নরম এবং মাংস কালো) পালন করে শখের বসে। কিছু বিশেষ জাতের মুরগির এক দিনের বাচ্চার দাম চারশ ডলার পর্যন্ত হতে পারে!
সবশেষে সেই চিরন্তন প্রশ্নে আসা যাক, ডাইনোসর খেতে কেমন ছিল? ৬ বছরের কোনো শিশু যদি জাদুঘরে গিয়ে এই প্রশ্ন করে, তবে তার উত্তর লুকিয়ে আছে আজকের মুরগির মধ্যেই। কারণ অনেক বিজ্ঞানীই মনে করেন, মুরগিই হলো ডাইনোসরের ‘সরাসরি বংশধর’। কিন্তু আধুনিক প্যালিওন্টোলজির মূলধারার মত হলো, “ঠিক মুরগি নয়, পাখিরাই জীবিত ডাইনোসর”। ডাইনোসর বিলুপ্ত হয়ে গেছে সত্য, কিন্তু তারা আমাদের জন্য এক বিচিত্র উপহার রেখে গেছে।
পৃথিবীটা হয়তো এখন আর টাইরানোসরাস রেক্সের দখলে নেই, কিন্তু তাদের এই ছোট্ট উত্তরসূরিরা আমাদের ডাইনিং টেবিল থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক কূটনীতি সবখানেই একচেটিয়া রাজত্ব করে যাচ্ছে।
মূল নিবন্ধ: হাউ দ্য চিকেন কনকোয়ার্ড দ্য ওয়ার্ল্ড, জেরি অ্যাডলার এবং অ্যান্ড্রু ললার, স্মিথসোনিয়ান ম্যাগাজিন, জুন ২০১২