Published : 25 Jul 2026, 02:55 PM
“পাঞ্জাবিদের শাসন করো, সিন্ধিদের ভয় দেখাও, পশতুদের টাকা দিয়ে কিনে নাও, আর বালুচদের সম্মান করো।”
ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ প্রশাসনের এই পুরনো প্রবাদই বালুচ জাতিসত্তার প্রকৃতি সবচেয়ে ভালোভাবে ব্যাখ্যা করে। পশতু ও বালুচ—এই দুই জাতিগোষ্ঠীকে দমন করা ব্রিটিশদের জন্য সবচেয়ে কঠিন কাজ ছিল বলে ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়। ১৮৪২ সালে কাবুল থেকে ব্রিটিশ সৈন্যদের লজ্জাজনক পশ্চাদপসরণ ওই বাস্তবতারই একটি দৃষ্টান্ত। আজ, প্রায় দুই শতাব্দী পর, বালুচ জাতীয়তাবাদ পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্য অনুরূপ এক দীর্ঘস্থায়ী চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে—যার শিকড় ঔপনিবেশিক ইতিহাসে প্রোথিত হলেও শাখা-প্রশাখা বিস্তৃত হয়েছে সমকালীন ভূরাজনীতির প্রতিটি স্তরে।
ইতিহাসের শিকড়: কালাত থেকে চলমান বিদ্রোহ
বেলুচিস্তানের স্বাধীনতা সংগ্রামের সূচনা ১৯৪৭-৪৮ সালে—ব্রিটিশ শাসনের অবসানের পর তৈরি হওয়া সাংবিধানিক সংকটের মধ্য দিয়ে। ব্রিটিশ আমলে এই অঞ্চলটি সরাসরি শাসিত কিছু এলাকা এবং কালাত, মাকরান, লাসবেলা ও খারানের মতো কয়েকটি দেশীয় রাজ্যে বিভক্ত ছিল।
ব্রিটিশ রাজের অবসান ঘটলে কালাতের খান স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে টিকে থাকার চেষ্টা করেন। তবে ১৯৪৮ সালের মার্চে তিনি পাকিস্তানের সঙ্গে অন্তর্ভুক্তির দলিলে স্বাক্ষর করতে বাধ্য হন। পাকিস্তান সরকারের দাবি অনুযায়ী এটি একটি বৈধ ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়া হলেও, বালুচ জাতীয়তাবাদী গবেষকদের মতে এটি ছিল স্পষ্টতই রাজনৈতিক ও সামরিক চাপের ফল।
এরপর থেকে সেখানে অন্তত পাঁচটি বড় বিদ্রোহ সংঘটিত হয়েছে—১৯৪৮, ১৯৫৮-৫৯, ১৯৬২-৬৩, ১৯৭৩-৭৭ এবং ২০০৩ সাল থেকে শুরু হওয়া চলমান বিদ্রোহ। প্রথম চার দশকের আন্দোলন ছিল মূলত আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন ও প্রাদেশিক অধিকারের দাবিতে, যার নেতৃত্বে ছিলেন উপজাতীয় প্রধান ও ঐতিহ্যবাহী অভিজাত সমাজ।
তবে ২০০০-এর দশক থেকে আন্দোলনের গতিপথ বদলে যায়। বালুচ লিবারেশন আর্মি (বিএলএ) ও বালুচ লিবারেশন ফ্রন্ট (বিএলএফ)-এর মতো সশস্ত্র সংগঠনগুলো সরাসরি পূর্ণ স্বাধীনতাকে মূল লক্ষ্য হিসেবে ঘোষণা করে। আন্দোলনের নেতৃত্বে চলে আসেন ছাত্র, মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবী এবং প্রবাসী বালুচ সংগঠনগুলো। গোয়াদর বন্দর, চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর (সিপিইসি) প্রকল্প, জোরপূর্বক জমি অধিগ্রহণ এবং গুমের ক্রমাগত অভিযোগ এই গণ-অসন্তোষকে আরও তীব্র করেছে।
ইসলামাবাদ এসব আন্দোলনকে শুরু থেকেই সন্ত্রাসবাদ ও বিদেশি মদদপুষ্ট বিচ্ছিন্নতাবাদ বলে দাবি করে আসছে এবং নিরাপত্তার কঠোর কড়াকড়ির মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে। তবে সিপিইসি-এর মূল কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে গোয়াদর বন্দরের গুরুত্ব বাড়ার সাথে সাথে বেলুচিস্তান বৈশ্বিক ভূরাজনীতিতেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, কোটি কোটি ডলারের এই বিনিয়োগের ফল তারা পাননি; বরং অতিরিক্ত সামরিক উপস্থিতির কারণে তাদের দৈনন্দিন জীবনই বিপন্ন হয়ে পড়েছে।
বিতর্কিত ইতিহাস, অমীমাংসিত ভবিষ্যৎ
বেলুচিস্তানের স্বাধীনতা সংগ্রাম নিছক কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদী লড়াই নয়। এটি রাষ্ট্রগঠন, জাতীয় পরিচয়, সম্পদের সুষম বণ্টন এবং কেন্দ্র-প্রান্ত সম্পর্কের এক জটিল রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব—যা পুরো দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতির সাথে গভীরভাবে সম্পৃক্ত।
পাকিস্তানের সরকারি বয়ান ১৯৪৮ সালের অন্তর্ভুক্তিকে বৈধ চুক্তি হিসেবে দেখায়, আর বেলুচ জাতীয়তাবাদীদের কাছে এটি এক অন্যায্য ও অসম চুক্তির ফসল। এই দুই বিপরীতমুখী অবস্থানই প্রমাণ করে কেন বেলুচিস্তান ইস্যুতে একপক্ষীয় কোনো সিদ্ধান্তে আসা অসম্ভব। যতদিন অর্থনৈতিক বঞ্চনা ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের সংকট অমীমাংসিত থাকবে, ততদিন এই সংগ্রামের ইতিহাস কেবল অতীত নয়, বর্তমান দক্ষিণ এশীয় ভূরাজনীতিরও এক জীবন্ত প্রশ্ন হয়েই থাকবে।
প্রতিবেশী আফগানিস্তান ও ইরানের অবস্থান
বালুচ জনগোষ্ঠীর উপস্থিতি কেবল পাকিস্তানেই সীমাবদ্ধ নয়—তারা ইরানের সিস্তান-বেলুচিস্তান প্রদেশ এবং আফগানিস্তানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলেও ছড়িয়ে আছে। তাই এই সংকট কেবল পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়, বরং এটি এক জটিল আঞ্চলিক সমীকরণ।
ঐতিহাসিকভাবে আফগানিস্তান, বিশেষ করে মোহাম্মদ দাউদ খানের শাসনামলে (১৯৭৩-৭৮) ডুরান্ড লাইন বিরোধকে কেন্দ্র করে বালুচ ও পশতুন জাতীয়তাবাদীদের রাজনৈতিক আশ্রয় ও সহানুভূতি দিয়েছিল। তবে পরবর্তীতে সোভিয়েত হামলা, দীর্ঘ গৃহযুদ্ধ এবং তালেবানের উত্থানে আফগানিস্তানের নিজস্ব সংকট এতটাই গভীর হয় যে বালুচ ইস্যুটি তাদের পররাষ্ট্রনীতি থেকে হারিয়ে যায়। বর্তমানে ক্ষমতাসীন তালেবান প্রশাসন পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে সরাসরি হস্তক্ষেপ না করার নীতি মেনে চলছে।
অন্যদিকে ইরানের অবস্থান তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি কঠোর। ইরানের সীমানায় প্রায় ২০-২৫ লাখ সুন্নি বালুচ বসবাস করায় তেহরানের ভয়—পাকিস্তানে বালুচ আন্দোলন গতি পেলে তার আঁচ নিজ ভূখণ্ডেও পড়বে। এ কারণে ইরান বরাবরই পাকিস্তানের ভৌগোলিক অখণ্ডতাকে সমর্থন জানিয়েছে এবং জৈশ আল-আদল-এর মতো সংগঠনের হামলার প্রেক্ষাপটে দুই দেশ সীমান্ত নিরাপত্তা ও বিদ্রোহ দমনে সহযোগিতা বাড়িয়েছে—যদিও পারস্পরিক অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগও অব্যাহত রয়েছে। সব মিলিয়ে, আফগানিস্তান ও ইরান—উভয়েই বর্তমানে প্রকাশ্যে বালুচ স্বাধীনতাকে সমর্থন করে না; বরং সীমান্ত নিরাপত্তা ও নিজ নিজ ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষাই তাদের অগ্রাধিকার।
মার্কিন ভূরাজনীতি ও বেলুচিস্তান সমীকরণ
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেলুচিস্তান ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ চোখ পড়ার মতো। তবে এর পেছনে কোনো মানবিক সহানুভূতি নেই, আছে কেবল অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ। বেলুচিস্তানের রেকো দিক তামা ও সোনার খনি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অব্যবহৃত প্রাকৃতিক খনিজ ভাণ্ডার। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও আধুনিক প্রযুক্তি খাতের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় এসব খনিজের দিকে নজর রেখেই ওয়াশিংটন এ অঞ্চলে দৃষ্টি দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে এই খনি প্রকল্পে বড় অংকের বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, আর পাকিস্তান সরকারও ওয়াশিংটনে লবিস্ট নিয়োগ করে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে প্রতিরক্ষা ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে।
তবে এই হিসাব-নিকাশের ভেতরেই এক বড় বৈপরীত্য রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র যেখানে বিপুল বিনিয়োগ করতে চায়, ওই বেলুচিস্তান গত দুই দশক ধরে এক রক্তাক্ত সশস্ত্র সংগ্রামের কেন্দ্রস্থল। ওয়াশিংটন বালুচ লিবারেশন আর্মিকে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে, যা বালুচ জাতীয়তাবাদীদের স্পষ্ট বার্তা দেয় যে যুক্তরাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত ইসলামাবাদের নিরাপত্তার স্বার্থকেই প্রাধান্য দিচ্ছে।
একদিকে চীনের সিপিইসি বিনিয়োগ ও গোয়াদর বন্দর, অন্যদিকে মার্কিন স্বার্থ ও ভারত মহাসাগরীয় সামরিক প্রতিযোগিতা—সব মিলিয়ে বেলুচিস্তান এখন যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ইরান ও ভারতের বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক স্বার্থের সংযোগস্থলে পরিণত হয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা পাকিস্তানে চীনের অবস্থানকে দুর্বল না করে আরও মজবুত করবে; কারণ অনিশ্চয়তার মুখে দুই দেশের সুসম্পর্ক আরও দৃঢ় হয়। ফলে বাণিজ্যিক স্বার্থ ও নিরাপত্তা বাস্তবতার গ্যাঁড়াকলে মার্কিন নীতি এক ধরনের দ্বিধাদ্বন্দ্বের মধ্য দিয়েই যাচ্ছে।
“মা চুকে বেলোচানি”: প্রতীকী জাতীয় সংগীত
পাকিস্তানের বেলুচিস্তান প্রদেশের কোনো সরকারি জাতীয় সংগীত নেই। তবে বালুচ জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে একটি দেশাত্মবোধক গান অত্যন্ত জনপ্রিয়, যার প্রথম লাইন হলো, “মা চুকে বেলোচানি” (আমরা বালুচ সন্তান)।
গানটির মূল বক্তব্য বালুচ জাতির পরিচয়, স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা, মাতৃভূমির প্রতি ভালোবাসা এবং আত্মত্যাগের অঙ্গীকার ঘিরে আবর্তিত—আমরা বালুচ জাতি, আমাদের ভূমি স্বাধীন ও মর্যাদাপূর্ণ, আর মাতৃভূমির স্বাধীনতা রক্ষায় জীবন উৎসর্গ করতে আমরা প্রস্তুত। গানটির প্রকৃত রচিয়তা কে, তা নিশ্চিত জানা না গেলেও, বিভিন্ন স্বাধীনতাকামী সংগঠনের অনুষ্ঠানে দীর্ঘদিন ধরে গাওয়া হতে হতে এটিই এখন অ-স্বীকৃত স্বাধীন বেলুচিস্তানের এক প্রতীকী জাতীয় সংগীতে পরিণত হয়েছে।
স্বাধীনতা কত দূর?
বেলুচিস্তান সত্যিই কখনো স্বাধীন হতে পারবে কি না, এর কোনো সহজ উত্তর নেই। তবে বেশিরভাগ আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকের মতে, নিকট ভবিষ্যতে এমন সম্ভাবনা বেশ ক্ষীণ।
প্রথমত, পাকিস্তান বেলুচিস্তানকে নিজেদের ভূখণ্ডের অবিচ্ছেদ্য অংশ মনে করে এবং সেখানে বিপুল সামরিক শক্তি মোতায়েন করে রেখেছে। তাছাড়া সিপিইসি, গোয়াদর ও রেকো দিকের মতো কৌশলগত মেগা-প্রকল্পের কারণে এই অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ হাতছাড়া করার কোনো চিন্তাই পাকিস্তানের নেই।
দ্বিতীয়ত, জাতিসংঘ বা বিশ্বের শক্তিশালী কোনো দেশ বালুচদের এই স্বাধীনতা আন্দোলনে সায় দেয়নি। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, কেবল স্বাধীনতার ঘোষণা দিলেই রাষ্ট্র হওয়া যায় না—তার জন্য প্রয়োজন ভূখণ্ডের ওপর বাস্তব নিয়ন্ত্রণ, কার্যকর শাসন এবং ব্যাপক কূটনৈতিক স্বীকৃতি।
তৃতীয়ত, খোদ বালুচ আন্দোলনের লক্ষ্য নিয়ে বিভাজন রয়েছে—কেউ চায় পূর্ণ স্বাধীনতা, কেউ চায় প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন, আবার কেউবা চায় কেবল সাংবিধানিক সংস্কার।
তবে এর অর্থ এই নয় যে বালুচ প্রশ্ন গুরুত্ব হারাবে। মানবাধিকার লঙ্ঘন, বৈষম্য, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের সংকট ও রাষ্ট্রনীতি সংঘাতকে দীর্ঘমেয়াদে টিকিয়ে রাখছে। সাম্প্রতিক হামলার তীব্রতা ও পরিধি বৃদ্ধি পাওয়াই প্রমাণ করে যে, সামরিক পদ্ধতিতে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। বেলুচিস্তানের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে রাজনৈতিক সংলাপ, ক্ষমতার ন্যায্য বিকেন্দ্রীকরণ এবং অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তির ওপর, সামরিক সমাধানের ওপর নয়। যতদিন এই কাঠামোগত প্রশ্নগুলোর মীমাংসা না হবে, ততদিন বেলুচিস্তান দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে একটি অমীমাংসিত ও উত্তপ্ত অধ্যায় হয়েই থাকবে।
মঞ্জুরে খোদা লেখক-গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। ই-মেইল: [email protected]