Published : 01 Jul 2026, 03:50 PM
ভেনেজুয়েলার ভূমিকম্প বিধ্বস্ত অঞ্চলগুলোতে ত্রাণ ও উদ্ধার কার্যক্রমে সহায়তার জন্য দেশটিতে ৯০০ জনেরও বেশি সামরিক কর্মী মোতায়েন করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
এছাড়া ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের পুয়ের্তো রিকো এবং কুরাসাওয়ের মতো কৌশলগত কেন্দ্রগুলোতে আরও প্রায় ৮০০ মার্কিন সেনাকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
লাতিন আমেরিকায় নিয়োজিত শীর্ষ মার্কিন জেনারেল ফ্রান্সিস ডনোভানের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্স এই তথ্য জানিয়েছে।
মার্কিন সাউদার্ন কমান্ডের কমান্ডার জেনারেল ডনোভান জানান, গত সপ্তাহের প্রলয়ংকরী ভূমিকম্পের পর মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করতে মার্কিন বাহিনী অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযানে অংশ নিয়েছে।
তারা স্থানীয় বিমানবন্দর এবং বিমান ও নৌ সম্পদ সচল করতে ভেনেজুয়েলাকে সহায়তা করছে।
জেনারেল ডনোভান জানান, মার্কিন সামরিক বাহিনী ভেনেজুয়েলার আকাশে অন্তত ৪ থেকে ৫টি ‘এমকিউ-৯ রিপার’ ড্রোন মোতায়েন করেছে। এই ড্রোনগুলো এবং মায়ামিতে অবস্থিত ১টি ফিউশন সেল যৌথভাবে ভেনেজুয়েলা কর্তৃপক্ষকে আকাশ থেকে গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করছে।

তিনি বলেন, “আগে আমরা যেসব সামরিক সম্পদ এই গোলার্ধের হুমকিগুলো অনুসরণ করতে ব্যবহার করতাম, এখন তা রাস্তাঘাট সচল রাখা এবং ক্ষতিগ্রস্ত ভবনগুলো চিহ্নিত করার কাজে ব্যবহার করছি।”
ভেনেজুয়েলা কর্তৃপক্ষের পক্ষে যা অনেক সময় মাঠ পর্যায় থেকে চিহ্নিত করা কঠিন ছিল, তা ড্রোন দিয়ে সহজ করা হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
মার্কিন সামরিক বাহিনীর এই পদক্ষেপকে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি নাটকীয় পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
কারণ গত ৩ জানুয়ারি ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে মাদক পাচারের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে বিচারের মুখোমুখি করতে নিউ ইয়র্কে উড়িয়ে নেওয়ার জন্য একটি আকস্মিক সামরিক অভিযান চালিয়েছিল মার্কিন বাহিনী। মাদুরো অবশ্য তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন।
গত মাসে ভেনেজুয়েলা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে দেশটির কুখ্যাত অপরাধী চক্র ‘ত্রেন দে আরাগুয়া’র প্রধানকে এক হামলায় হত্যা করে মার্কিন সামরিক বাহিনী। জেনারেল ডনোভান বলেন, “৩ জানুয়ারি খুব বেশি দিন আগের কথা নয়। একটু ভাবুন, এর মধ্যেই এই সম্পর্কটি কতটা বদলে গেছে।”
গত বুধবার ভেনেজুয়েলায় এক মিনিটেরও কম সময়ের ব্যবধানে ৭ দশমিক ২ এবং ৭ দশমিক ৫ মাত্রার দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। এতে হাজার হাজার ভবন ধসে পড়ে এবং ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়েন অসংখ্য মানুষ। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে তাদের জীবিত উদ্ধারের আশা ক্ষীণ হয়ে আসছে।
ভেনেজুয়েলার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেস মঙ্গলবার জানিয়েছেন, এ দিন পর্যন্ত মৃত্যুর সংখ্যা ১৯৪৩ জনে দাঁড়িয়েছে আর কয়েক হাজার মানুষ আহত হয়েছেন। বাস্তুচ্যুত হয়েছেন প্রায় ১৬ হাজার মানুষ।

ভেনেজুয়েলার আইনসভার প্রধান হোর্হে রদ্রিগেস জানান, উদ্ধার অভিযানের ষষ্ঠ দিনে তখন পর্যন্ত মাত্র একজন, তিন বছর বয়সী একটি শিশুকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। তবে উদ্ধার কাজ এখনো অব্যাহত আছে।
ডনোভান জানান, মার্কিন মেরিন সেনারাই প্রথম বিদেশি দল হিসেবে উদ্ধারকর্মীদের সঙ্গে ধ্বংসস্তূপ হাতড়ে জীবিতদের খোঁজার কাজে নেমেছিল। এছাড়া ভার্জিনিয়ার ফেয়ারফ্যাক্স থেকে উদ্ধারকারীদের ভেনেজুয়েলায় উড়িয়ে আনতেও সহায়তা করেছে মার্কিন সামরিক বাহিনী।
এই উদ্ধারকারীরা রোববার একজন মা ও তার ৯ মাস বয়সী শিশুকে উদ্ধারের একটি ভিডিও প্রকাশ করেছে।
মার্কিন জেনারেলের মতে, এই সামগ্রিক অভিযানটি মূলত রসদ বা লজিস্টিকস নির্ভর। আন্তর্জাতিক জীবনরক্ষাকারী ত্রাণ যেন প্রবেশদ্বারগুলোতে স্থবির হয়ে পড়ে না থাকে, তা নিশ্চিত করাই তাদের মূল লক্ষ্য।
বিপর্যয় সামাল দিতে দেরি করায় ভেনেজুয়েলা সরকার তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে। প্রথম দিনগুলোতে বাসিন্দারা হাত, কোদাল ও দড়ি দিয়ে স্বজনদের খোঁজার চেষ্টা করেন। পরবর্তীতে শনিবার থেকে রাষ্ট্রীয় টিভিতে প্রদর্শিত ভিডিও ফুটেজে ভারী নির্মাণ যন্ত্রপাতি দিয়ে উদ্ধার কাজ চালাতে দেখা গেছে।
ভেনেজুয়েলা সরকারের ধীর প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে জানতে চাইলে ডনোভান সতর্কতার সঙ্গে জানান, কারাকাস মূলত গত কয়েক দশকের দুর্বল নেতৃত্বের খেসারত দিচ্ছে, যা দেশটির পরিকাঠামোকে প্রায় ধ্বংস করে দিয়েছে।
এর সঙ্গে ওষুধ ও হাসপাতালের কর্মী সংকট সাধারণ মানুষের ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
ভেনেজুয়েলায় মার্কিন সামরিক মিশন কতদিন স্থায়ী হবে তা স্পষ্ট করেননি ডনোভান। তবে তিনি জানান, তারা সেখানে দীর্ঘমেয়াদে থাকার কোনো পরিকল্পনা করছেন না।
তিনি বলেন, “সেখানে স্থায়ীভাবে থাকার কোনো কথা হচ্ছে না। কাজ শেষ হলেই আমরা ফিরে যাবো।”
তবে এই মানবিক সহায়তা দুই দেশের সামরিক সম্পর্কের বরফ গলাতে সাহায্য করবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।