Published : 02 Jul 2026, 11:00 AM
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের বর্তমান অবস্থা নিয়ে আশাবাদী হওয়ার মতো কারণ খুব কম। বরং বিভিন্ন সূচক গভীর সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে। সহজ ভাষায় বলতে গেলে, কাউকে দশ টাকা ধার দিলে আজ ছয় টাকা ফেরত পাওয়ারও কোনো নিশ্চয়তা নেই।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সদ্য প্রকাশিত ‘ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি রিপোর্ট ২০২৫’ দেশের আর্থিক খাতের গভীর সংকটের চিত্র তুলে ধরেছে, যা দেশের অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের সতর্কবার্তা। ২০২৫ সালের শেষে দেশের ব্যাংকগুলোর মোট দুর্দশাগ্রস্ত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১০ লাখ ৮৭ হাজার কোটি টাকায়, যা আমাদের মোট বিতরণকৃত ঋণের প্রায় ৫৯ শতাংশ! মাত্র এক বছরের ব্যবধানে এই দুর্দশাগ্রস্ত ঋণ বেড়েছে ৪৪ শতাংশ। এই সংখ্যাগুলো কেবল কাগজের হিসাব নয়, এগুলো দেশের আর্থিক খাত কতটা নাজুক অবস্থায় পৌঁছেছে, তারই স্পষ্ট ইঙ্গিত।
অনেকেই হয়তো মনে করেন, দুর্দশাগ্রস্ত ঋণ মানে কেবলই ক্লাসিফায়েড বা খেলাপি ঋণ। বাস্তবতা আরও জটিল এবং উদ্বেগজনক। এই বিশাল অঙ্কের মধ্যে লুকিয়ে আছে পুনঃতফসিলকৃত এবং অবলোপনকৃত ঋণের পাহাড়ও। ২০২৫ সালের শেষে এককভাবে খেলাপি ঋণই দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকায়, যা ২০২৪ সালেও ছিল ৩ লাখ ৪৬ হাজার কোটি টাকা। অন্যদিকে, পুনঃতফসিলকৃত ঋণ ৪ লাখ ৪৭ হাজার কোটি টাকা এবং অবলোপনকৃত ঋণ ৮৩ হাজার ৪৭৯ কোটি টাকা। এই তিনটি সংখ্যাকে একসঙ্গে রাখলে বোঝা যায়, সমস্যাটি শুধু কয়েকটি খেলাপি ঋণের নয়; এটি পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থার জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়।
প্রশ্ন উঠতে পারে, এই বিপুল পরিমাণ দুর্দশাগ্রস্ত ঋণ কি আকাশ থেকে নেমে এসেছে? মোটেও না। এটি দীর্ঘদিন ধরে চাপা থাকা একটি সংকট, যা এতদিন নানা নীতিগত ছাড় ও হিসাবি কৌশলের আড়ালে ছিল। এখন তা কেবল দিনের আলোয় বেরিয়ে এসেছে মাত্র। অতীতে কোনো ঋণ ১৮০ দিন অনাদায়ী থাকলে তবেই তা খেলাপি বলে গণ্য হতো—যা ছিল এক ধরনের আইনি ফাঁকফোকর। কিন্তু ২০২৫ সাল থেকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে ওই মেয়াদ কমিয়ে ৯০ দিন করা হয়েছে। এই একটিমাত্র নীতিগত ও কাঠামোগত পরিবর্তনের কারণেই বছরের পর বছর ধরে লুকিয়ে রাখা হাজার হাজার কোটি টাকার গোপন ও মন্দ ঋণ হঠাৎ করে দৃশ্যমান হয়েছে। সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের আমলে ব্যাংক খাতের দীর্ঘদিনের চাপা সমস্যাগুলো প্রকাশ্যে আনার যে উদ্যোগ শুরু হয়েছিল, এই প্রতিবেদন ওই বাস্তবতাকেই সামনে এনেছে।
ঋণের এই লাগামহীন ও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির প্রত্যক্ষ এবং মারাত্মক প্রভাব পড়েছে ব্যাংকগুলোর মূলধন সংরক্ষণে। ব্যাংক খাতের ঝুঁকিভিত্তিক মূলধন অনুপাত বা সিআরএআর, যা ২০২৪ সালেও ইতিবাচক ৩.০৮ শতাংশ ছিল, তা ২০২৫ সালে এসে ধপাস করে নেমে গেছে ঋণাত্মক ২.৬৪ শতাংশে! এর সরল অর্থ হলো, দেশের ব্যাংকগুলো এখন নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্ধারিত ন্যূনতম মূলধনটুকু ধরে রাখার ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলেছে। এখানেই শেষ নয়; সম্পদের বিপরীতে আয় বা আরওএ ০.৪৩ শতাংশ থেকে নেমে এসেছে ঋণাত্মক ৪.৮১ শতাংশে। আর ইকুইটির বিপরীতে আয় বা আরওই গিয়ে ঠেকেছে অবিশ্বাস্য ঋণাত্মক ২৪৩.৯০ শতাংশে! দেশের ৬১টি তফসিলি ব্যাংকের মধ্যে ১৯টিরই এই দুটি সূচক এখন সম্পূর্ণ ঋণাত্মক। অর্থাৎ, গাণিতিক হিসাবে দেশের প্রতি তিনটি ব্যাংকের একটি এখন চরম আর্থিক সংকটে নিমজ্জিত।
আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলোর দিকে তাকালে এই ব্যর্থতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ভারত, পাকিস্তান এমনকি দেউলিয়া দশা থেকে ঘুরে দাঁড়ানো শ্রীলঙ্কাও তাদের ব্যাংকিং খাতে কঠোর সতর্কতামূলক শৃঙ্খলা ও আন্তর্জাতিক ব্যাসেল মানদণ্ড বজায় রেখে মূলধনের ভিত্তি শক্তিশালী করেছে। অথচ বাংলাদেশ ওই পথে না হেঁটে, বছরের পর বছর ধরে রাজনৈতিক প্রভাবপুষ্ট করপোরেট ও প্রভাবশালী ঋণখেলাপিদের নীতিগত ছাড়, সাধারণ ক্ষমা আর বিশেষ সুবিধা দিয়ে পার পাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। এই যে ‘ছাড় দেওয়ার সংস্কৃতি’ বা কালচার অব ইমপ্যুনিটি—আজকের সংকটের পেছনে এই সংস্কৃতির বড় ভূমিকা রয়েছে।
পুনঃতফসিলকৃত ঋণের চিত্রও উদ্বেগজনক। ২০২১ সালে এর পরিমাণ ছিল ২৬ হাজার ৮০০ কোটি টাকা, যা ২০২৫ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৭০ হাজার ৫০০ কোটি টাকায়। মাত্র চার বছরে এই সাড়ে ছয় গুণ বৃদ্ধি স্বাভাবিক অর্থনৈতিক প্রবণতার ফল নয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশেষ সুবিধা ও ঋণ নবায়নের সুযোগ এই বৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করেছে। কিন্তু পুনঃতফসিল কোনো স্থায়ী সমাধান নয়; এতে করে সংকটকে সাময়িকভাবে আড়াল করা যায়, সমাধান পাওয়া সম্ভব নয়।
ব্যাংক খাতের এই সংকট শুধু ব্যাংকের ভেতরেই সীমাবদ্ধ নয়; এর প্রভাব পুরো অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ে। মূলধন সংকটে থাকা ব্যাংকগুলো নতুন ঋণ দিতে পারে না, ফলে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান দুটোই বাধাগ্রস্ত হয়। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা, যারা অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, পুনঃতফসিলকৃত ঋণের বড় অংশই আটকে আছে উৎপাদনশীল খাতে। শিল্প খাতে ২৯.৫৬ শতাংশ, পোশাক ও টেক্সটাইল খাতে ১৭.৫৬ শতাংশ এবং চলতি মূলধন খাতে ১০.১৯ শতাংশ। দেশের রপ্তানি, ডলার আয় ও কর্মসংস্থানের প্রধান উৎসগুলোতেই যদি বিপুল অঙ্কের অর্থ অচল হয়ে থাকে, তাহলে সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর তার নেতিবাচক প্রভাব অনিবার্য।
তাহলে এই খাদের কিনারা থেকে উত্তরণের পথ কোথায়? প্রথমত, খেলাপি ঋণ আদায়ের জন্য প্রচলিত ধীরগতির আইনি প্রক্রিয়াকে খোলনলচে বদলে দ্রুততর করতে হবে। অর্থঋণ আদালত এবং ট্রাইব্যুনালগুলোকে আমলাতান্ত্রিক জটিলতামুক্ত করে কার্যকর করতে হবে। দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক প্রভাবে দেউলিয়া হওয়া রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকে দেশের সাধারণ করদাতার রক্ত জল করা অর্থে বারবার ‘রি-ক্যাপিটালাইজেশন’ বা মূলধন জোগান দেওয়া বন্ধ করতে হবে। ঋণ দানের ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোকে প্রকৃত ও কঠোর সংস্কারের আওতায় আনতে হবে। তৃতীয়ত, ঋণ অনুমোদন থেকে শুরু করে সার্বিক পর্যবেক্ষণ ও তদারকি পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ায় শতভাগ স্বচ্ছতা, ডিজিটালাইজেশন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। আংশিক বা সাময়িক পদক্ষেপে এই সংকটের সমাধান হবে না; প্রয়োজন গভীর ও কাঠামোগত সংস্কার।
ব্যাংক হলো যে কোনো সচল অর্থনীতির রক্তসঞ্চালন তন্ত্র। ব্যাংকিং ব্যবস্থার এত বড় একটি অংশ যদি সংকটে নিমজ্জিত থাকে, তবে তার নেতিবাচক প্রভাব পুরো অর্থনীতিতে পড়তে বাধ্য। ব্যাংকিং খাতের এই সংকট কাটিয়ে উঠতে হলে এখন আর আংশিক পদক্ষেপে কাজ হবে না; প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক দৃঢ়তা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রকৃত স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। এই তিনের সমন্বয় ছাড়া আমাদের অর্থনৈতিক মুক্তির আর কোনো বিকল্প পথ খোলা নেই।
শোয়েব সাম্য সিদ্দিক ব্যাংকার ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক। ইমেইল: [email protected]