Published : 18 Jun 2026, 07:25 PM
জাতীয়করণ করা প্রাথমিক শিক্ষকদের জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ ও পদোন্নতি নিয়ে মামলায় সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের রায় জানা যাবে আগামী ২ জুলাই।
বৃহস্পতিবার প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বে চার সদস্যের আপিল বেঞ্চ রায়ে এ তারিখ নির্ধারণ করে।
বেঞ্চের অপর বিচারকরা হলেন বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম, বিচারপতি মো. রেজাউল হক এবং বিচারপতি ফারাহ মাহবুব।
রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল এবং সরকারের পক্ষে নিয়োজিত আইনজীবী ব্যারিস্টার মুনতাসির আহমেদ। শিক্ষকদের পক্ষে শুনানিতে অংশ নেন আইনজীবী রমজান আলী শিকদার।
শুনানি শেষে রমজান আলী শিকদার মামলার সার্বিক দিক, আইনি প্রেক্ষাপট এবং শুনানির বিষয়বস্তু তুলে ধরে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, বাংলাদেশে এক সময় প্রচুর বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ছিল, যেগুলো এনজিও বা নিজস্ব প্রাইভেট ম্যানেজিং কমিটির মাধ্যমে পরিচালিত হত।
সেখানে নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতার কোনো সুনির্দিষ্ট নিয়ম বা কড়াকড়ি ছিল না। পরে বিভিন্ন সময়ে শিক্ষকদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সরকার ১৯৭৪ সালের 'টেকিং ওভার' আইনের অধীনে এই স্কুলগুলোকে অধিগ্রহণ বা জাতীয়করণের সিদ্ধান্ত নেয়।
জাতীয়করণের পর শিক্ষকদের চাকরি কীভাবে পরিচালিত হবে, তা ঠিক করে দিয়ে ২০১৩ সালে একটি সার্ভিস রুলস বা বিধিমালা প্রণয়ন করা হয়। সংবিধানের ১৩৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী এই বিধিমালা চূড়ান্ত করতে সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) মতামতের প্রয়োজন ছিল।
পিএসসির ইতিবাচক মতামতের পর ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বরে এটি চূড়ান্ত করা হয় এবং শিক্ষকদের নিয়োগ ১ জানুয়ারি ২০১৩ থেকে ভূতাপেক্ষভাবে কার্যকর করা হয়।
আইনজীবী রমজান আলী বলেন, জাতীয়করণ বা অধিগ্রহণের সময় এই শিক্ষকদের বেশ কিছু বড় ছাড় ও সুবিধা দেওয়া হয়েছিল। প্রথমত, সরকারি চাকরিতে প্রবেশের সাধারণ বয়সসীমা (৩০ বা ৩২ বছর) তাদের জন্য শিথিল করা হয়। দ্বিতীয়ত, যাদের প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত বা পেশাগত যোগ্যতা ছিল না, তাদের যোগ্যতা অর্জনের জন্য তিন বছর সময় দেওয়া হয়।
“এছাড়া আরেকটি বড় সুবিধা হলো, তারা বেসরকারি খাতে যে কয় বছর চাকরি করেছিলেন, তার ৫০ শতাংশ সময় সিনিয়রিটি এবং ভবিষ্যৎ অবসরকালীন পেনশন সুবিধার ক্ষেত্রে গণনার সুযোগ দেওয়া হয়। অর্থাৎ, কেউ যদি বেসরকারি স্কুলে ১০ বছর শিক্ষকতা করে থাকেন, সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে তার ৫ বছর গণনা করার বিধান রাখা হয়।"
কিন্তু এরপর পদোন্নতি ও জ্যেষ্ঠতা নিয়ে সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্তদের সঙ্গে জাতীয়করণ হওয়া শিক্ষকদের দ্বন্দ্ব তৈরি হওয়ার বিষয়টি তুলে ধরে এই আইনজীবী বলেন, "নিয়ম অনুযায়ী, যারা সরাসরি সরকারি নিয়োগপ্রাপ্ত (যেমন ১ জানুয়ারি ২০১৩ বা তার আগে নিয়োগপ্রাপ্ত সরকারি শিক্ষক), তাদের অবস্থান অধিগ্রহণকৃত শিক্ষকদের পূর্বে বা জ্যেষ্ঠ হওয়ার কথা। কিন্তু অধিগ্রহণকৃত শিক্ষকরা এটি মানতে চাইছেন না। তারা তাদের পূর্ববর্তী বেসরকারি চাকরির দোহাই দিয়ে সরাসরি সরকারি নিয়োগপ্রাপ্তদের ডিঙিয়ে জ্যেষ্ঠতা দাবি করছেন।
"আমি এই মামলায় সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকদের পক্ষে আইনি লড়াই করছি। আমাদের মূল বক্তব্য হল, অধিগ্রহণকৃত শিক্ষকরা আগে বেসরকারি চাকরিতে ছিলেন এবং পরে জাতীয়করণের মাধ্যমে সরকারি হয়েছেন। অন্যদিকে, সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্তরা শুরু থেকেই নিয়মতান্ত্রিকভাবে সরকারি চাকরিতে আছেন।
“সরকার অধিগ্রহণকৃত শিক্ষকদের ইতিমধ্যে ৫০ শতাংশ পূর্ববর্তী সার্ভিস কাউন্ট করে পেনশনসহ অন্যান্য সুযোগের বড় সুবিধা দিয়েছে। এরপরেও তারা সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্তদের ডিঙিয়ে বা তাদের সিনিয়রিটি লঙ্ঘন করে প্রমোশন দাবি করতে পারেন না। বিধিমালা অনুযায়ী সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্তরাই জ্যেষ্ঠতার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাওয়ার যোগ্য।"
তিনি বলেন, "আজকে প্রাইমারি স্কুল শিক্ষক অ্যাপয়েন্টমেন্ট ও জাতীয়করণের বিষয়টি নিয়ে সকল পক্ষের শুনানি শেষ হল। আমরা মনে করি আমাদের সাবমিশনের প্রেক্ষিতে কোর্ট আমাদের সঙ্গে সহমত প্রকাশ করেছে। এখন বাকিটা আদালতের উপরে।"
মামলার নথি থেকে জানা যায়, ২০১৩ সালে সরকার দেশের ২৬ হাজার ১৯৩টি স্কুল জাতীয়করণ করে এবং শিক্ষকদের চাকরির শর্ত নির্ধারণের জন্য ‘অধিগ্রহণ করা বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক (চাকরির শর্তাদি নির্ধারণ) বিধিমালা, ২০১৩’ জারি করে।
ওই বিধিমালার ৯(১) ধারায় বলা ছিল, সদ্য জাতীয়করণকৃত শিক্ষকদের অবস্থান সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত সর্বশেষ ব্যক্তির নিচে নির্ধারিত হবে।
ওই ধারা চ্যালেঞ্জ করে শাহজামাল সর্দারসহ ৩৮৩ জন শিক্ষক হাই কোর্টে রিট আবেদন করেন।
রিটকারীদের মধ্যে একজন হলেন নওগাঁর প্রতাপদহ রেজিস্টার্ড প্রাথমিক বিদ্যালয়ের (বর্তমানে জাতীয়করণকৃত) প্রধান শিক্ষক মো. আফজাল হোসেন। তিনি ২০১৩ সালের ১২ জুন ওই বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন।
শুনানি শেষে হাই কোর্ট ২০১৯ সালের ১১ মার্চ শিক্ষকদের পক্ষে রায় দেয় এবং বিধিমালার ৯(১) ধারার ওই নির্দিষ্ট অংশটিকে ‘বেআইনি’ ঘোষণা করে।
এই রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ আপিল বিভাগে 'লিভ টু আপিল' দায়ের করে। ২০২২ সালের গত ২০ নভেম্বর আপিল বিভাগ হাই কোর্টের ওই রায় স্থগিত করে এবং জ্যেষ্ঠতা ও বর্তমান পদের অবস্থানের ওপর স্থিতাবস্থা বজায় রাখার আদেশ দেয়।
পরে সরকারের প্যানেল আইনজীবী ব্যারিস্টার মুনতাসির উদ্দিন আহমেদ প্রাথমিক ও গণশিক্ষা অধিদপ্তরকে এক আইনি মতামতে বলেন যে, আপিল বিভাগে এই স্থিতাবস্থা বলবৎ থাকায় পদোন্নতি প্রক্রিয়া চালিয়ে গেলে তা আদালত অবমাননা হিসেবে গণ্য হতে পারে।