Published : 07 Sep 2026, 03:36 AM
‘দ্য লিটিল বয় ফরম রোজারিও সেন্টা ফে...’ পিটার দ্রুরির সেই অমর কবিতা কানে ভাসছে চার বছর ধরে। পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে বেজে উঠেছে সেই কবিতার তাল-ছন্দ-লয়। নিজের অবিশ্বাস্য কণ্ঠ ও শব্দমালার যোগে যে কবিতা তিনি বলেছেন, তা দ্রুরিকেও অমরত্ব দিয়েছে। আহ পিটার দ্রুরি!
কবিতার শক্তিই এই অমরত্বের কারণ। তবে কবিতার সাবজেক্টের যে শক্তি, সেটিও কি অনুঘটক নয়? যে সাবজেক্ট নিজেই অমরত্ব পেয়ে গেছে, তাকে নিয়ে যেমন-তেমন শব্দে কথা গাথলেই তো কবিতা হয় না। কবিতাকে কবিতা-উত্তীর্ণ হতে হয়; হতে হয় শিল্পোত্তীর্ণ। আবার, উত্তীর্ণ হলেও তো অমরত্বের নিশ্চয়তা নেই। আছে কি? যখন সাবজেক্টের নাম লিওনেল আন্দ্রেস মেসি!
২.
এই লেখার শিরোনামটি বেশ অদ্ভুতুড়ে। বলতেই পারেন, এ কেমন শিরোনাম! কিন্তু, যখন আপনি জানবেন, কোনো শব্দ দিয়েই একজন মানুষকে আর ব্যাখ্যা করা যাচ্ছে না, তখন নিশ্চিত বুঝবেন, শিরোনাম নির্বাচনের ক্ষেত্রে একজন লেখকের ‘কত ধানে কত চাল’ বের হয়ে গেছে!
আপনি আরও জানুন, ‘লিওনেল মেসি’ শব্দবন্ধ কিংবা ‘মেসি’ পদটি শুধুই বিশেষ্য নয় বিশেষণও বটে। যখন একজন মানুষকে সংজ্ঞায়িত করার জন্য আর কোনো বিশেষণ খুঁজে পাওয়া যায় না, তখন তিনি নিজেই একটা ‘বিশেষণে’ পরিণত হন। হয়ে ওঠেন শীর্ষবিন্দু।
যেমন, আইনস্টাইন বা আইনস্টাইনিয়ান—অলোকসামান্য কীর্তিমান বোঝাতে এটি এক সন্দেহাতীত বিশেষণ। খেলাধুলার ইতিহাসে এমন জায়গায় পৌঁছেছেন হাতেগোনা কয়েকজন। বক্সিংয়ে মোহাম্মদ আলী, ফুটবলে পেলে ও দিয়েগো ম্যারাডোনা, ক্রিকেটে ডন ব্র্যাডম্যান কিংবা বাস্কেটবলে মাইকেল জর্ডান।
এই তালিকায় অতি অনিবার্যভাবেই প্রবেশ করেছেন লিওনেল মেসি। সম্প্রতি নয়, বহু আগেই। অন্তত চার বছর আগে তো বটেই। ২০২২ সালের ১৮ ডিসেম্বর, কাতারের লুসাইল স্টেডিয়ামের সেই সর্বংসহা রাতের যবনিকায় পিটার দ্রুরি যে মহাকাব্যিক মোহনমন্ত্র উচ্চারণ করেছিলেন, তার মধ্যে কি প্রকাশিত হয়নি অভিধানে ভুক্তিযোগ্য এক বিশেষণের? অমরত্ব পাওয়া এক বিশেষ্য পদ কি সে রাতেই অমর এক বিশেষণে পরিণত হয়নি?
৩.
আরেকটি বিশ্বকাপ চলছে। মেসিও খেলছেন। মাত্র ১৯ বছর বয়সে বিশ্বকাপের মঞ্চে নেমেছিলেন, ২০০৬ সালে। টানা একদম শীর্ষে থেকে ক্যারিয়ারের প্রান্তে চলে এসেছেন। রেকর্ডের পর রেকর্ড ভাঙছেন। গড়ছেন। ইতিহাসের প্রথম ফুটবলার হিসেবে ষষ্ঠ বিশ্বকাপের ম্যাচে নেমেছেন। রেকর্ড। বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতার আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছেন। রেকর্ড। অথচ, কে জানত, বিশ্বজয়ের পর কাতারেই যার শেষ দেখে ফেলেছিলাম আমরা, তাকে আমেরিকান বিশ্বকাপেও দেখা যাবে!
লিওনেল মেসির ৩৯তম জন্মদিনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ভক্তদের কেক কাটার দৃশ্য মনে করিয়ে দেয়, ফুটবল জাদুকরের প্রতি বাঙালির ভালোবাসা কতটা গভীর
৩৯ বছর হলো রোজারিওর সেই ছোট্ট বালকের। প্রতিবার বিশ্বকাপ আসে, আর ২৪ জুন আরও বেশি মহানন্দিত হয়ে ওঠে। কাতারে হয়নি, কারণ প্রচণ্ড দাবদাহের কারণে বিশ্বকাপ হয়েছিল শীতকালে। কিন্তু, আগের পাঁচটির মধ্যে চারটি আসরেই মেসির এই জন্মবার্ষিকী এক বিশেষ ব্যঞ্জনা নিয়ে হাজির হয়েছিল। চারদিকে রব উঠে যেত, মেসিময় বন্দনায় ছেয়ে যেত ভক্তদের দুনিয়া। এবারও সেটাই হলো। অনিবার্যভাবেই মেসি তার শেষ বিশ্বকাপ খেলতে এসেছেন। ফলে তার জন্মবার্ষিকীর উন্মাদনা বেশি হতোই। কিন্তু, তাতে বাড়তি রসদ দিয়েছে তার নান্দনিক ফুটবলীয় শিল্পের ‘মেসিগিরি’!
৪.
এমনিতে বিশ্বকাপ জিতে যাওয়ার পর, সর্বকালীন ফুটবলীয় অমরত্ব অর্জনে তার আর কিছুই করার প্রয়োজন ছিল না। এমনকি, কারও কাছে কিছু প্রমাণ করার নেই বলে, এবারের আসরে না খেললেও চলত। কিন্তু, মেসি খেললেন। বলা ভালো, তার শরীরে এখনও খেলাটা আছে। আর অবিশ্বাস্য সত্য হলো, খেলাটা এই পরিমাণে আছে যে, উত্তরোত্তর মেসি আরও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছেন।
গত আসরে ‘এবার নয় তো, কখনই নয়’ নামক একটা ভয়ালবার্তা পর্বতপ্রমাণ চাপ তৈরি করেছিল মেসি ও আর্জেন্টিনার ওপর। বড় বিষয় হলো, এবার সেসবের কোনোই বালাই নেই। মেসির তা-ই দ্বিতীয়বার কাপ জয়ের জন্য বাড়তি গোলাবারুদেরও দরকার নেই। তবুও, তিনি গতবার যেখানে শেষ করেছিলেন, এবার যেন সেখান থেকেই শুরু করেছেন।
এই যে চাপ-টাপ বা তাপ-উত্তাপ, তা ক্যারিয়ারে কম লাগেনি তার। ইউরোপের ফুটবলীয় পেশাদারিত্বে শরীরের কতটা নিংড়ে দিতে হয়, তা এক কথায় ব্যাখ্যাতীত। কিন্তু, তিন বছর আগে মেসি সেটিও অতিক্রম করে এসেছেন। ইন্টার মিয়ামিতে আর কোথায় সেই বার্সা-পিএসজির মতো শারীরিক-মানসিক ধকল! যুক্তরাষ্ট্রে খেলছেন বলে সেখানকার পরিবেশগত অভিজ্ঞতাটাও কাজে লাগছে। ক্লাব ফুটবলের ধকল নেই, বিশ্বকাপ জয়ের চাপ নেই—ক্যারিয়ারে এমন নির্ঝর-রূপী সময় আর কবে কাটিয়েছেন লিওনেল মেসি?
নির্ভার এই ৩৯ বছর বয়সী মেসিকে কি এজন্যই তরুণ মেসির মতোই এমন ভয়ঙ্কর সুন্দর দেখাচ্ছে?
৫.
এহেন মেসি এবারের বিশ্বকাপে বারংবার দেখাচ্ছেন, যেমন তার পজিশন-সেন্স, তেমনই বল-সেন্স। বল যে পথেই ঘুরে আসুক, হয় মেসি সেখানে হাজির, অথবা বল হাজির মেসির পায়ে। মাত্র ৫ থেকে ১০ সেকেন্ডের সামান্য ফাঁক ও ফুরসৎ পেলেই মেসিময় হয়ে উঠছে একেকটি ম্যাচ।
এবারের বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার প্রথম ম্যাচেই দলের প্রতিটি গোল করার মাধ্যমে হ্যাটট্রিক করেছেন। দ্বিতীয় ম্যাচে পেনাল্টি মিস না করলে আরেকটি হ্যাটট্রিক হয়ে যেত। এমনই এই বুড়ো হাড়ের ভেল্কি। কে বলবে, বিশ্বকাপের অন্যতম ‘বুড়ো’ খেলোয়াড় তিনি! মনোমুগ্ধকরভাবে অভূতপর্ব তার পারফরম্যান্স।
দল হিসেবে আর্জেন্টিনার পারফরম্যান্স গতবারের বিশ্বকাপের ফাইনালের তুলনায় পঞ্চাশ শতাংশ না হলেও, মেসি নামক ম্যাজিকে সওয়ার হয়ে তারা আবারও এই বিশ্বমঞ্চে প্রবল প্রতিপক্ষদের চোখ রাঙাচ্ছে। অবস্থা এমন যে, এই ‘বুড়ো’কে কোনো প্রতিপক্ষ সামলাতে না পারলে, আবারও কাপ চলে যেতে পারে আর্জেন্টিনার ঘরে। কিন্তু, এটাও সত্য, মেসিরও খারাপ দিন আসবে। তখন আর্জেন্টিনা দলগতভাবে এই চ্যালেঞ্জটি কীভাবে মোকাবিলা করে, সেটি দেখার মতো বিষয় হবে।
৬.
আর্জেন্টিনার কি এবার চ্যালেঞ্জ-ট্যালেঞ্জ বলে কিছু আছে? চাপই যেখানে নেই, সেখানে আর চ্যালেঞ্জ কীসের? চ্যালেঞ্জ যদি কিছু থাকে তো, দলগতভাবে টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জেতা আর সেটি মেসিকে উপহার দেওয়া। অবশ্য না জিতলেও ক্ষতি নেই। মেসির অমরত্বে তাতে বিন্দুমাত্র কলঙ্ক লাগবে না। কিন্তু, জিতলে একটা অভূতপূর্ব রেকর্ড হবে, যে রেকর্ডে কেবল মেসি ও তার কয়েকজন সতীর্থরই ভাগ থাকবে।
পর পর দু’বার বিশ্বকাপ জিতেছেন মোট ১৮ জন। যাদের ১৪ জনই ব্রাজিলের ১৯৫৮ ও ১৯৬২ বিশ্বকাপ জয়ের প্রজন্ম। বাকি চার জন ১৯৩৪ ও ১৯৩৮ সালের বিশ্বকাপজয়ী ইতালি দলের খেলোয়াড়। ব্রাজিলের ওই ১৪ জনের একজন ছিলেন পেলে, যিনি ১৯৭০ সালে বিশ্বকাপ জিতে সর্বোচ্চ তিনবার বিশ্বকাপ জয়ের রেকর্ড গড়েছেন এবং আপাতত সেটিও অমরত্ব পাওয়ার দাবিদার হয়ে গেছে। কিন্তু, মূল বিষয় হলো, ১৯৭০ পর্যন্ত বিশ্বকাপের নাম ছিল ‘জুলে রিমে’ ট্রফি। ফলে, নতুন ট্রফির যুগে পরপর দুইবার বিশ্বকাপ জয়ের রেকর্ড কারও নেই।
খুব কাছাকাছি গিয়েছিলেন দিয়েগো ম্যারাডোনা এবং তার ছিয়াশি ও নব্বইয়ের উভয় বিশ্বকাপে খেলা সতীর্থরা; ব্রাজিলের কাফু ও রোনালদো এবং ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাম্পেসহ তার আঠার ও বাইশের বিশ্বকাপ খেলা সতীর্থরা।
কাফু ও রোনালদো তো পেলের রেকর্ডেও ভাগ বসাতে পারতেন, যদি ১৯৯৪ ও ২০০২ সালে বিশ্বজয়ের মাঝে ১৯৯৮-এর আসরে রানার্সআপ না হতো ব্রাজিল। যদিও তর্ক হতোই, চুরানব্বইতে কাফু মাত্র তিনটি ম্যাচ খেলেছিলেন, রোনালদো একটিও খেলেননি, তাহলে তাদের কৃতিত্ব পেলের সমান হয় কী করে, তা যতই তার জেতা শিরোপাটির নাম ‘জুলে রিমে ট্রফি’ হোক না কেন! ফুটবল সম্রাট পেলে তাই ধরা-ছোঁয়ার বাইরে।
কৃতিত্বে বরং পাশাপাশি বসলেও বসতে পারেন ম্যারাডোনা ও এমবাম্পে। যদিও, ছিয়াশির ম্যারাডোনা আর আঠারোর এমবাম্পের তুলনা করাই একটা রসিকতা! আঠারোর এমবাম্পে কে, সেটাই তো দুনিয়া ঠিকঠাক জানত না। বিপরীতে ছিয়াশির ম্যারাডোনাকে নিয়ে বোধহয় এত কথা না বললেও চলে। দুনিয়াতে ওই আসরের ম্যারাডোনার চেয়ে বেশি শব্দ আর কাউকে নিয়ে লেখা বা বলা হয়েছে কি না, সেটাই বরং গবেষণার বিষয় হতে পারে।
তবে, বাইশের এমবাম্পেকে নিয়ে অনেক কথা বলার আছে ফুটবল ইতিহাসে। বিশ্বকাপ ফাইনালে এই প্রথম কারও হ্যাটট্রিকের মহাকাব্য রচিত হলো, অথচ তিনি পরিণত হলেন ট্র্যাজিক হিরোতে!
সে রাতেই তো দিয়েগো ম্যারাডোনার পর আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় মহানায়কে পরিণত হয়েছিলেন লিওনেল মেসি। সে সুবাদেই এবার তার সামনে পর পর দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জেতার সুযোগ। নাকি চ্যালেঞ্জ!
৭.
দিয়েগো ম্যারাডোনা আজ নেই। কিন্তু, আনন্দদায়ক ‘বেদনা’ হলো, আর্জেন্টিনার সমস্ত প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তিতে তিনি মিশে থাকেন। ছিয়াশির ম্যারাডোনার পর আর্জেন্টিনাকে কে হাসাবেন, এ নিয়ে দীর্ঘ তর্ক-বিতর্ক হয়েছে। অবশেষে, ৩৬ বছর পর বাইশে সে হাসি এনে দিলেন মেসি। কিন্তু, নব্বইয়ের ম্যারাডোনা যা পারেননি, কে জানে হয়তো, এখন মেসির কাছে সে অধরা ডাবলটিই খুঁজছেন ভক্তরা।
ফলে, চ্যালেঞ্জ কি একটা অদৃশ্যভাবে আছেই? আছে। কিন্তু, প্রত্যাশা পূরণ না হলেও, হয়তো খেদ নেই। ওই একটা বিশ্বকাপ জয়ই সই। ছিয়াশির মহাকাব্য গাথার পর ‘ফুটবল ঈশ্বরে’র তো আলস্য পাওয়া উচিত ছিল। কিন্তু, তিনি এরপর আরও দুটি আসর খেলেছেন, যার শেষটির কারণে তিনি আজও নিন্দিত। তবুও তো ম্যারাডোনার কিংবদন্তিগাথা স্লান হয়নি। মেসিরও হবে না।
অমরত্ব তার নিশ্চিত। বিশেষণটিই যা এখন কেবল অভিধানে অন্তর্ভুক্ত হওয়া বাকি। এজন্যই এ লেখাটির শিরোনাম ‘মেসিগিরি’!
সৌমিত জয়দ্বীপ সহকারী অধ্যাপক, স্কুল অব জেনারেল এডুকেশন, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়। ই-মেইল: sowmit.joydip.