Published : 25 Jun 2026, 06:36 PM
প্রেম ও বন্ধুত্বের সনাতনী সংজ্ঞায় বর্তমান প্রজন্ম এক বড় ওলটপালট এনেছে। আগে সম্পর্কের সমীকরণ ছিল সহজ— হয় দুজনে বন্ধু, না হয় প্রেমিক-প্রেমিকা বা বিবাহিত জুটি।
তবে বর্তমান সময়ের তরুণদের, বিশেষ করে জেন-জি এবং মিলেনিয়ালদের ‘ডেইটিং’ অভিধানে যুক্ত হয়েছে নতুন এক পরিভাষা, যার নাম 'সিচুয়েশনশিপ'।
সহজ কথায়, এটি এমন এক সম্পর্ক যা বন্ধুত্বের চেয়ে অনেক বেশি গভীর, তবে প্রথাগত প্রেমের মতো কোনো সামাজিক স্বীকৃতি বা ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি এতে থাকে না।
আপনিও কি অজান্তে এমন কোনো সম্পর্কে জড়িয়ে আছেন? তাহলে বরং লক্ষণগুলো চিনে নেওয়া যাক।
সিচুয়েশনশিপ আসলে কী?
‘সিচুয়েশনশিপ’ শব্দটির আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি মেলে যুক্তরাষ্ট্রের পপ-কালচার অভিধান ‘আরবান ডিকশনারি’-তে।
সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, এটি হল এমন একটি রোমান্টিক ব্যবস্থা যেখানে দুজন মানুষ ডেইট করেন, একসঙ্গে সময় কাটান, এমনকি গভীর শারীরিক বা মানসিক সম্পর্কেও জড়ান; তবে তারা একে অপরকে ‘বয়ফ্রেন্ড’ বা ‘গার্লফ্রেন্ড’-এর মতো কোনো তকমা দেন না।
যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম ইউএসএ টুডে’তে প্রকাশিত ‘হেয়াট ইজ সিচুয়েশনশিপ? ডেফিনেইশন, সাইনস অ্যান্ড হাও ইট ডিফার্স ফ্রম ডেইটিং’ প্রতিবেদনে, মার্কিন সম্পর্ক-বিশেষজ্ঞ ডা. সাবা হারুনি লুরি এবং সমাজবিজ্ঞানী জেসিকা কার্বিনো আধুনিক তরুণদের ‘সিচুয়েশনশিপ’ মানসিকতার কারণ হিসেবে, দায়িত্বহীন সম্পর্কের আকাঙ্ক্ষাকে চিহ্নিত করেছেন।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, আধুনিক যুগের তরুণরা ক্যারিয়ারের ব্যস্ততা এবং ব্যক্তি-স্বাধীনতার কারণে হুট করে কোনো স্থায়ী সম্পর্কের দায়িত্ব নিতে চান না। ফলে তারা প্রেমের সব সুবিধা চান, তবে এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা কোনো পিছুটান বা বাধ্যবাধকতা চান না।
এই মানসিকতা থেকেই সিচুয়েশনশিপের জন্ম।
সিচুয়েশনশিপে থাকার ৪ লক্ষণ
কসমোপলিটান ম্যাগাজিনের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুসারে লক্ষণগুলোর মধ্যে আছে,
কোনো লেবেল বা নাম না থাকা: আপনারা নিয়মিত ঘুরে বেড়ান বা কথা বলেন, তবে কেউ যদি জিজ্ঞেস করে ‘তোমাদের সম্পর্কটা কী?’, তবে আপনারা দুজনেই থমকে যান। সম্পর্কের কোনো নাম দিতে আপনাদের ভীষণ অনীহা।
ভবিষ্যতের কোনো পরিকল্পনা না থাকা: আগামী সপ্তাহে কোথায় ঘুরতে যাবেন তা ঠিক থাকলেও, আগামী এক বা দুই বছর পর আপনারা একসঙ্গে থাকবেন কি না— সেটা নিয়ে কোনো আলোচনা বা পরিকল্পনা না থাকা বা কখনই কথা না হওয়া।
পরিবার বা বন্ধুদের সঙ্গে পরিচয় না করানো: সিচুয়েশনশিপে থাকা সঙ্গীরা সাধারণত সম্পর্কটিকে নিজেদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখেন। একে অপরের বন্ধু বা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করানোর ব্যাপারে তারা একদমই উৎসাহ দেখান না।
যোগাযোগের ধারাবাহিকতাহীনতা: প্রথাগত প্রেমের মতো এখানে প্রতিদিন নিয়ম করে কথা বলার বাধ্যবাধকতা থাকে না। হয়ত টানা তিনদিন চমৎকার সময় কাটলো, আবার পরের চারদিন দুজনের কোনো খোঁজই রইল না।
এর সুবিধা ও মানসিক জটিলতা
সাইকোলজি টুডে ডটকম’য়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, সিচুয়েশনশিপের কিছু সুবিধাজনক দিক রয়েছে।
যেমন— এটি মানুষকে একা থাকার অনুভূতি থেকে বাঁচায়, আবার গভীর সম্পর্কের মতো মানসিক চাপ বা জবাবদিহিতার মুখোমুখি দাঁড় করায় না।
তবে মুদ্রার উল্টো পিঠও আছে। ক্যালিফোর্নিয়ার রিলেশনশিপ থেরাপিস্ট ডা. লিসা ববি প্রতিবেদনে মন্তব্য করেন, “বেশিরভাগ সিচুয়েশনশিপের শেষটা বেশ যন্ত্রণাদায়ক হয়। কারণ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যেকোনো একজনের মনে গভীর ভালোবাসার জন্ম নিতে পারে। আর এই সময় অন্যজন যদি তখনও ‘কোনো প্রতিশ্রুতি দেব না’ অবস্থানে অনড় থাকেন, তবে সম্পর্কে শুরু হয় চরম মানসিক টানাপোড়েন। যা একপর্যায়ে একজনকে তীব্র একাকিত্ব ও বিষণ্ণতার দিকে ঠেলে দেয়।”
সিচুয়েশনশিপ থেকে বের হওয়ার উপায়
এই বিশেষজ্ঞদের মতে, সম্পর্কের অনিশ্চয়তা নিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়লে, নিচের পদক্ষেপগুলো উপকারী হতে পারে।
স্পষ্ট কথা বলা: নিজের মনের অনুভূতি লুকিয়ে না রেখে সঙ্গীর সঙ্গে খোলামেলা কথা বলতে হবে। নিজেদের সম্পর্কের একটি স্থায়ী নাম বা প্রতিশ্রুতি চান কি না, তা পরিষ্কারভাবে জানাতে হবে।
সঙ্গীর অবস্থান জানা: সঙ্গী যদি সরাসরি জানিয়ে দেন, তিনি কোনো দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কে জড়াতে প্রস্তুত নন, তবে নিজেকে আর ধোঁকায় রাখা যাবে না।
নিজেকে সরিয়ে নেওয়া: যদি দুজনের মানসিকতা বা চাওয়া না মেলে, তবে নিজের মানসিক শান্তি ও আত্মসম্মানের খাতিরে এই সাময়িক ব্যবস্থা থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়াই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।
সম্পর্ক সুন্দর হয় স্পষ্টতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধে। সিচুয়েশনশিপ সাময়িকভাবে একাকিত্ব দূর করলেও, দীর্ঘমেয়াদে মনে এক ধরনের শূন্যতা তৈরি করে।
তাই সম্পর্কের চোরাবালিতে পা দেওয়ার আগে নিজের চাওয়া-পাওয়া সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া জরুরি।
আরও পড়ুন
রূপ-টাকা নাকি মানসিক সংযোগ- ভালোবাসা খোঁজার আসল উপায় কী?
বউ থাকলে এক, দূরে থাকলে আরেক: স্বামীদের এই আচরণের আসল রহস্য কী?