Published : 26 Jun 2026, 12:47 PM
বাবা সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মতো চীন বা মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মতো ভারত নয়—নিজের প্রিয় ‘মালয়েশিয়া’ দিয়ে ‘প্রথম বিদেশ সফর’ শুরু করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এটিই তার প্রথম ‘রাষ্ট্রীয় সফর’।
২১ জুন মালয়েশিয়া সফর শুরু করেন তারেক রহমান। পরদিন সোমবার সেখান থেকেই চীনে রওনা করেন। আজ ২৬ জুন শুক্রবার বিকেলে চীন থেকে দেশে ফেরার কথা রয়েছে তার।
নতুন সরকারের প্রধানমন্ত্রীর বিদেশযাত্রাকে সামনে রেখে আলোচনায় এসেছে জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার প্রথম দিককার বিদেশ সফরের প্রসঙ্গ। এই লেখায় খুঁজে দেখা হয়েছে কেমন ছিল জিয়াউর রহমানের বিদেশ সফর? কোন কোন দেশে গিয়েছিলেন তিনি এবং কেন?

জিয়াউর রহমানের রাজনীতি পর্যবেক্ষণ করেছেন যারা এবং ১৯৭৭ থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত জিয়াউর রহমানের স্বল্পকালীন শাসনামল নিয়ে এখনও কাজ করে যাচ্ছেন, তাদের মতে, জিয়ার বিদেশ সফর ও বৈচিত্র্যময় পররাষ্ট্রনীতিকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায়। প্রতিবেশী ও আঞ্চলিক স্বার্থ (দক্ষিণ এশিয়া ও সুসম্পর্ক) প্রধান সফর: ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তান। এই দেশগুলো সফরের মূল উদ্দেশ্য প্রতিবেশীদের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বরফ গলানো এবং সীমান্তে শান্তি বজায় রাখা।
জিয়াউর রহমানের এই সফর ও সম্পর্কের অর্জন দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা ‘সার্ক’। যদিও বর্তমানে ‘অচলায়তন’ হয়ে পড়ে আছে এই সংস্থাটি।
আরেকটি প্রধান বিষয় হচ্ছে, ভূরাজনৈতিক ও বৃহৎ শক্তির স্বার্থ। চীন এবং বিভিন্ন পশ্চিমা দেশ—যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশসমূহে সফর। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য বৃদ্ধি করেন তিনি।
রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে জিয়ার সফরের আরেকটি দিক অর্থনৈতিক ও শ্রমিক স্বার্থ। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত ও ইরাক সফর, যার মাধ্যমে মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের ব্যাপক উন্নয়ন ঘটানো হয়। এর মধ্য দিয়ে ‘জনশক্তি রপ্তানি’ শুরু করা সম্ভব হয় এবং ওআইসিতে বাংলাদেশের অবস্থান শক্ত করা সম্ভব হয়।
তার বিদেশ সফরের চতুর্থ দিকটি নিরপেক্ষ ও আন্তর্জাতিক জোট। ‘কোল্ড ওয়ার’ বা স্নায়ুযুদ্ধ চলাকালীন কোনো পরাশক্তির জোটে না গিয়ে ভারসাম্য বজায় রাখতে তিনি কিউবা (হাভানা), জাম্বিয়া (লুসাকা) এবং জোট-নিরপেক্ষ (NAM) সম্মেলনের বিভিন্ন দেশ সফর করেছেন তিনি।
প্রধান সামরিক প্রশাসক হিসেবে জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসে প্রথম ‘রাষ্ট্রীয় সফরে’ যান চীনে। ১৯৯১ সালের মার্চে ক্ষমতায় আসেন খালেদা জিয়া। ওই বছরের ২১ মে ভারতের তৎকালীন সাবেক প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী নিহত হলে তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় যোগ দিতে সংক্ষিপ্ত সফরে নয়াদিল্লি যান খালেদা জিয়া। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর এটাই ছিল খালেদা জিয়ার প্রথম বিদেশ সফর। তবে তিনি প্রথম ‘রাষ্ট্রীয় সফরে’ যুক্তরাষ্ট্রে যান ১৯৯২ সালের মার্চে জর্জ বুশের আমন্ত্রণে।
সংগ্রামের নোট ওয়েবসাইটের তথ্য বলছে, ১৯৯১ সালের ১৪ অক্টোবর কমনওয়েলথ সম্মেলনে যোগ দিতে জিম্বাবুয়ে গিয়েছিলেন খালেদা জিয়া। যাত্রাপথে তিনি সৌদি আরবে বিরতি নেন এবং ওমরাহ পালন করেন।
১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথের পর রাষ্ট্রীয় সফরের ক্ষেত্রে প্রথম ইরানে, এরপর ওই বছরের জুলাইয়ে মিয়ানমার সফর করেন জিয়া। একই বছরের ডিসেম্বরে স্বেচ্ছায় শুভেচ্ছা সফরে যান ভারত। রাষ্ট্রপ্রধান থাকাকালে জিয়াউর রহমান তিনবার ভারত সফর করেছেন।
১৯৭৫ সালের ১৫ অগাস্ট বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার পরিবারের হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে ভারতের সঙ্গে আন্তরিক, বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের ছন্দপতন ঘটে। ক্ষমতার পটপরিবর্তনের মধ্য দিয়ে উভয় দেশের মধ্যে আস্থার সংকট স্পষ্ট হয়ে ওঠে; সৃষ্টি হয় টানাপোড়েন। এই ‘অনাস্থা আর বিশ্বাসের’ সংকটের মধ্যে আসে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর। ‘জনতা-সৈনিকের’ অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ক্ষমতার কেন্দ্রে আসেন আলোচিত সেনা অফিসার জিয়াউর রহমান। কার্যত তখন থেকেই ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠেন তিনি।
বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়ে থাকে, ক্ষমতা গ্রহণের পরই বাংলাদেশের প্রতি সমর্থন আদায়, অর্থনৈতিক সাহায্য-সহযোগিতা লাভ এবং বৈশ্বিক রাজনীতিতে ভূমিকা রাখায় সচেষ্ট ছিলেন জিয়াউর রহমান।
১৯৭৬ সালের ২৯ নভেম্বর প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্ব গ্রহণের পর ১৯৭৭ সালের ২ থেকে ৫ জানুয়ারি চারদিনের রাষ্ট্রীয় সফরে চীন যান সাবেক এই রাষ্ট্রপতি। ওই বছরের ২১ এপ্রিল রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেওয়ার পর তার প্রথম বিদেশ সফর হয় ৮ থেকে ১৫ জুন। কমনওয়েলথ সরকারপ্রধানদের সম্মেলনে যোগ দিতে তিনি যুক্তরাজ্য সফর করেন।

সংগ্রামের নোটবুক ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৭ সালের ৭ মার্চ চারদিনের রাষ্ট্রীয় সফরে ইরান গেছেন জিয়াউর রহমান।
ওই বছরের ২০ জুলাই চারদিনের রাষ্ট্রীয় সফরে জিয়াউর রহমান যান মিয়ানমারে।
১৯৭৭ সালের ১৯ ডিসেম্বর শুভেচ্ছা সফরের অংশ হিসেবে ভারত যান একদিনের জন্য। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম তার সফরটিকে ‘বড় আন্তর্জাতিক সফর’ হিসেবে বিবেচনা করে। ওই সময় ভারতের পাশাপাশি পাকিস্তান ও নেপাল সফর করেন জিয়া।
বিএনপির চেয়ারপারসনের মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান বলছেন, ওই সফরে প্রোটোকল ভেঙে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মোরারজি দেশাই ও রাষ্ট্রপতি নীলম সঞ্জীব রেড্ডি স্বয়ং বিমানবন্দরে উপস্থিত হয়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে স্বাগত জানান।
১৯৮০ সালের ২১ জানুয়ারি জাতিসংঘের শিল্প উন্নয়ন সংস্থা (ইউনিডো) সম্মেলনে যোগ দিতে ভারতে যান জিয়াউর রহমান। আঞ্চলিক কমনওয়েলথ সম্মেলনে যোগ দিতে একই বছরের ৩ সেপ্টেম্বর আবারও ভারতে যান তিনি।

ব্রিটিশপেথডটকমে প্রাপ্ত বার্তা সংস্থা রয়টার্সের [১] খবরে বলা হয়, ১৯৭৭ সালের ১৯ ডিসেম্বর ভারত সফর করেন জিয়া। তাকে বিমানবন্দরে অভ্যর্থনা জানান দেশটির রাষ্ট্রপতি সঞ্জীব রেড্ডি এবং প্রধানমন্ত্রী মোরারজি দেশাই।
ওই সফরে জিয়াউর রহমান ভারত সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নয়ন ও গঙ্গার পানি বণ্টন সংক্রান্ত আলোচনা করেন; যা বিদেশি বিশেষজ্ঞদের কাছে একটি ‘গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহাসিক’ পদক্ষেপ বলে আলোচিত।
১৯৯১ সালে ক্ষমতায় এসে খালেদা জিয়ার সরকারও ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে জিয়াউর রহমানের নীতিকেই গ্রহণ করে। ওই বছরের ২১ মার্চ বিএনপির নতুন সরকার তাদের পররাষ্ট্রনীতি প্রথম জনসমক্ষে প্রকাশ করে।
দায়িত্ব গ্রহণের পর পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ. এস. এম. মোস্তাফিজুর রহমান সরকারের পররাষ্ট্রনীতি সম্পর্কে অবহিত করে বলেন, খালেদা জিয়ার সরকার শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়ার অনুসৃত পররাষ্ট্রনীতিই হুবহু বজায় রাখবে এবং এতে কোনো পরিবর্তন হবে না।
মোস্তাফিজুর রহমান ভারতের সঙ্গে সুপ্রতিবেশীসুলভ ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার এবং আলোচনার মাধ্যমে সব অমীমাংসিত সমস্যা সমাধানের কথা উল্লেখ করেন।
১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর গৃহবন্দিত্ব থেকে মুক্ত হয়ে পুনরায় সেনাপ্রধানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন জিয়াউর রহমান। পরে একই দিনে সেনাসদর দপ্তরে এক বৈঠকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার পরিচালনার জন্য একটি নতুন প্রশাসনিক কাঠামো সাজানো হয়। জিয়াউর রহমান ১৯ নভেম্বর ১৯৭৬-এ প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হন। শেষ পর্যন্ত ২১ এপ্রিল ১৯৭৭ সালে রাষ্ট্রপতি সায়েম পদত্যাগ করলে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হন।
৪১ বছর বয়সে ক্ষমতারোহণ করেই বিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক উন্নতির উদ্যোগের পাশাপাশি আন্তর্জাতিকভাবেও বাংলাদেশকে শক্ত অবস্থান দিতে স্ব-উদ্যোগী হন জিয়াউর রহমান।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক এস এম লুৎফুর রহমান তার ‘পররাষ্ট্রনীতি ও প্রেসিডেন্ট জিয়া’ শীর্ষক [২] প্রবন্ধে বাংলাদেশ প্রসঙ্গে উল্লেখ করেন, ‘স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ হিসেবেও পরিচিত ছিল না। জিয়াউর রহমান দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের এই করুণ অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে সচেষ্ট হন এবং ক্রমে ক্রমে তিনি (জিয়াউর রহমান) চীন, ভারত, পাকিস্তান, সোভিয়েত ইউনিয়ন (বর্তমান রাশিয়া) ও মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলেন। এক্ষেত্রে তিনি তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী শামসুল হকের অতুলনীয় দক্ষতা ও কর্মতৎপরতার সহায়তা লাভ করেন।’
কূটনৈতিক সাফল্য অর্জনে জিয়াউর রহমান প্রথমে অন্যান্য মুসলিম দেশের সঙ্গে সম্পর্ক শক্তিশালী করার জন্য চেষ্টা করেন এবং পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে সদ্ভাব বজায় রাখার পরিকল্পনা করেন। দ্বিতীয়ত, তিনি প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে ভ্রাতৃত্ব ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনা করেন।
জিয়াউর রহমানের সরকারে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দায়িত্বে ছিলেন সাবেক কূটনীতিক আমজাদ হোসাইন। ২০০৮ সালের ৩১ মে ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টারে প্রকাশিত এক কলামে [৩] তিনি উল্লেখ করেন, ১৯৭৫ সালের আগপর্যন্ত সৌদি আরব এবং চীন থেকে কোনো স্বীকৃতি পায়নি বাংলাদেশ। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান সৌদি আরব এবং চীনের সঙ্গে দ্রুত সম্পর্ক উন্নয়ন করেন। চীনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নতির লক্ষ্যে প্রধান সামরিক প্রশাসক হিসেবে ১৯৭৭ সালের ৩ জানুয়ারিতে [৪] তিনি চীন সফর করেন। চারদিনের ওই সফরে তিনি পিকিংয়ে অবতরণ করেন।
বিএনপির চেয়ারপারসনের মিডিয়া উইং ও বিএনপি মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান জানাচ্ছেন, ক্ষমতায় আসার আগে জিয়াউর রহমান কর্মজীবনে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পূর্ব পাকিস্তানে এসে পেশাগত দায়িত্ব পালন করেন। আর্মিতে কর্মরত অবস্থায় তিনি পশ্চিম জার্মানিতে প্রশিক্ষণের জন্য যান। সেখান থেকে ফিরে ৭০-এর নির্বাচনের আগে অর্থাৎ তখনকার পূর্ব পাকিস্তানে আসেন। ১৯৭৭ সালের ৩ জানুয়ারি প্রধান সামরিক প্রশাসক হিসেবে চীন সফর করেন। এটা ছিল বাংলাদেশি কোনো নেতার উচ্চপর্যায়ের প্রথম চীন সফর।
১৯৭৮ সালের মার্চ মাসে চীনের উপ-প্রধানমন্ত্রী লি শিয়েন-নিয়েনের নেতৃত্বে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল ঢাকা সফর করে। ১৯৭১ সালের পর স্বাধীন বাংলাদেশে এটিই ছিল চীনা কমিউনিস্ট পার্টির প্রথম উচ্চপর্যায়ের সফর।
১৯৭৭ সালের জানুয়ারিতে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান সেনাপ্রধান হিসেবে চীন সফর করেন, যা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে সুসংহত করতে অবদান রাখা প্রাথমিক পর্যায়ের একটি উচ্চপর্যায়ের সফর ছিল। এই সফরকালে চীন বাংলাদেশের জাতীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রচেষ্টার প্রতি সমর্থন প্রকাশ করে, যা সম্পর্কের রাজনৈতিক ভিত্তিকে আরও মজবুত করে।
চীন পৌঁছানোর পর পিকিং বিমানবন্দরে চেয়ারম্যান হুয়া কুয়ো-ফেং স্বাগত জানাতে আসেন। বিমানবন্দরে সুসজ্জিত সংবর্ধনা লাভ করেন জিয়া। হাজার জনতা চীনের স্থানীয় ধারায় তাকে অভিবাদন জানান। দেওয়া হয়েছিল সেনাবাহিনী ও মিলিশিয়া গার্ড অব অনার।
দ্বিতীয়বার জিয়াউর রহমান চীনে ‘রাষ্ট্রীয় সফরে’ যান ১৯৮০ সালের জুলাইতে রাষ্ট্রপতি থাকাকালে। সফরে চীনা নেতৃত্বের সঙ্গে আলাপকালে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা জোরদার করার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি স্থাপিত হয়।
‘আমার রাজনীতির রূপরেখা’ শীর্ষক গ্রন্থে পাওয়া যায়, ১৯৮০ সালের ২১ জুলাই চীনের পিকিংয়ে প্রধানমন্ত্রী হুয়াকুয়ো ফেং-এর ভোজসভায় যোগ দেন। সেখানে তার বক্তব্যে তৎকালীন বিশ্বের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, দরিদ্র দেশগুলোর অবস্থা, অস্থির বিশ্বে শান্তি আনা, দক্ষিণ এশীয় শীর্ষ সম্মেলন, জিম্বাবুয়ের স্বাধীনতা অর্জনসহ আফ্রিকার মানুষের মুক্তির কথা উল্লেখ করেন।
এই সফরে অর্থ ও বিমান চলাচল সংক্রান্ত চুক্তি সই করেন জিয়া। এরপর থেকে চীন বাংলাদেশের জন্য সাশ্রয়ী সামরিক হার্ডওয়্যারের প্রধান উৎস হয়ে ওঠে।
জিয়াউর রহমান পৃথিবীর সব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট ছিলেন বলে মনে করেন কাজী রিজিয়া খাতুন। ‘জিয়া কেন জনপ্রিয়’ শীর্ষক প্রবন্ধে [৫] তিনি উল্লেখ করেন, ‘মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে তিনি (জিয়াউর রহমান) গভীর সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন। যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, পশ্চিম জার্মানি, ফ্রান্স, চীনসহ পৃথিবীর বহু দেশ তিনি সফর করেছেন। মুসলিম বিশ্বের প্রায় সব দেশেই তিনি গিয়েছেন।’

ইসলামিক নেচার’কে সামনে রেখে মুসলিম বিশ্বে
রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বিশ্বাস করতেন, পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে জোটনিরপেক্ষ নীতি অনুসরণ করার পাশাপাশি মুসলিমপ্রধান দেশ হিসেবে ‘ইসলামিক ন্যাচার’ [৬] নিয়ে সামনে আসবে বাংলাদেশ। দেশের ফরেন পলিসি সমমর্যাদার ভিত্তিতে আঞ্চলিক দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলবে। তার এই নীতির প্রতিচ্ছবি উঠে এসেছে তার রাষ্ট্রীয় উদ্যোগেও।
অধিকাংশ মুসলিমপ্রধান দেশ জিয়াউর রহমান সফর করেছেন। ওই সময় মুসলিম বিশ্বের বিশেষত মধ্যপ্রাচ্য সংকট সমাধানে কূটনৈতিক উদ্যোগ ও দেশগুলোতে বাংলাদেশি শ্রমিক পাঠানোর বিষয়ে ঐতিহাসিক ভূমিকা রাখেন।
৫৬টি মুসলিমপ্রধান দেশের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক নির্মাণে মনোযোগ দেন জিয়াউর রহমান। লেখক কাজী রিজিয়া খাতুনের [৭] ভাষ্য, ‘মুসলিম বিশ্বে জিয়াউর রহমান একজন বিশিষ্ট নেতা হিসেবে পরিচিত ছিলেন।’
১৯৭৭ সালের ২২ ডিসেম্বর ইসলামাবাদ সফর করেন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। মুক্তিসংগ্রামের ছয় বছর পর এটাই ছিল জিয়ার পাকিস্তানে প্রথম সফর। পরদিন ২৩ ডিসেম্বর বার্তা সংস্থা এপির বরাতে নিউইয়র্ক টাইমসের তৃতীয় পৃষ্ঠায় প্রকাশিত হয় ‘বাংলাদেশি লিডার ইন পাকিস্তান ফর টক’ শিরোনামে একটি খবর। প্রসঙ্গত, স্বাধীনতার আগে জিয়া পশ্চিম পাকিস্তানে কর্মরত ছিলেন।
মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে ১৯৮০ সালের ৬ নভেম্বর মরক্কো গেছেন মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি মিশনের লক্ষ্য নিয়ে। দুইদিনের এই সফরে তিনি জেরুজালেম সম্পর্কিত তিন সদস্যবিশিষ্ট কমিটির বৈঠকে যোগ দেন। এই কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন গিনির প্রেসিডেন্ট।
৮ নভেম্বর দুইদিনের রাষ্ট্রীয় সফরে গিনি যান জিয়াউর রহমান।
১৯৮১ সালের ২৪ জানুয়ারি ইসলামী শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে ছয়দিনের সফরে সৌদি আরব যান তিনি। সৌদি আরবের মক্কায় অনুষ্ঠিত তৃতীয় ইসলামী শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দেন তিনি। সেখানে তিন সদস্যের ‘আল কুদস কমিটি’র একজন নির্বাচিত হন জিয়াউর রহমান। ওই কমিটি তখন ইসরায়েল-ফিলিস্তিন দ্বন্দ্ব নিয়ে কাজ করছিল। এই কমিটির সদস্য হিসেবে জিয়াউর রহমান মরক্কো সফর করেন।
শান্তি মিশনের কাজে আবারও ১৯৮১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি সৌদি আরব, তেহরান ও বাগদাদ সফর করেন ইসলামী শুভেচ্ছা কমিটির সদস্য হিসেবে।
১৯৮১ সালের ১৮ মার্চ তিনদিনের রাষ্ট্রীয় সফরে সেনেগাল [৮] সফর করেন জিয়াউর রহমান। সেনেগালের রাজধানীর বিমানবন্দরে দেশটির রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী দুজনেই সস্ত্রীক জিয়াকে স্বাগত জানান।
শান্তি মিশনের কাজে এই বছরের ২৮ মার্চ পাঁচদিনের জন্য সৌদি আরব সফর করেন জিয়া।
১৯৮১ সালের ১৫ এপ্রিল দুইদিনের সৌহার্দ্যমূলক সফরে নেপাল গমন করেন রাষ্ট্রপতি জিয়া। ৩ মে একদিনের সরকারি সফরে দামেস্ক যান তিনি।
৪ মে সরকারি সফরে পশ্চিম জার্মানি সফর শুরু করেন জিয়াউর রহমান।
১৯৮১ সালের ১২ মে শান্তি মিশনের কাজে ইরাক-ইরান সফর করেন। এটিই ছিল রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শেষ বিদেশ সফর। ওই বছরের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে তিনি নিহত হন।
যদিও এর আগে ১৯৭৯ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি তিনদিনের রাষ্ট্রীয় সফরে ইরাক গেছেন জিয়াউর রহমান। বার্তা সংস্থা এপি নিউজরুমের ওয়েবসাইটে পাওয়া গেছে, সফরে জিয়াকে দেশটির তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আহমেদ হাসান আল বাকার বিমানবন্দরে স্বাগত জানান।
লেখক কাজী রিজিয়া খাতুন তার প্রবন্ধে [৯] জানাচ্ছেন, ইরাক-ইরান যুদ্ধ নিরসনের জন্য জিয়াউর রহমান বিশেষ চেষ্টা চালান। ইসলামী শীর্ষ সম্মেলনে ইরাক-ইরান যুদ্ধ সম্পর্কিত গঠিত নয় সদস্যের কমিটিতে জিয়াউর রহমানও ছিলেন।
ফিলিস্তিনিদের জন্য বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির দৌড়ঝাঁপ তাকে জনপ্রিয় করে তুলেছিল। তার সময়ে ফিলিস্তিনি নেতা ইয়াসির আরাফাত এসেছিলেন ঢাকায়।
মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে বিশেষ করে, তেলপ্রধান দেশ ইরান, লিবিয়া ও সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনে দেশ তিনটিতে সফর করেছেন। তিনটি সফরেই তিনি তৎকালীন আন্তর্জাতিক সংকট সমাধানের পাশাপাশি বাংলাদেশের বিশ্ববাণিজ্য সম্প্রসারণের বাজার ধরার চেষ্টা করেছেন।
তৎকালীন বাদশাহর আমন্ত্রণে ১৯৭৭ সালের জুলাইতে সৌদি আরব সফরে যান জিয়া। তিনদিনের সফরে তিনি বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করা এবং শ্রমবাজারের সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে আলোচনা করেছেন দেশটির সরকারের সঙ্গে। একই বছরে লিবিয়া সফর করে গাদ্দাফির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন জিয়া।

১৯৭৭ সালে ইসরায়েল-আরব বিশ্ব সংঘর্ষ চলাকালে সহমর্মিতা জানাতে মিশর সফর করেন জিয়াউর রহমান। রয়টার্সের খবরে [১০] বলা হয়েছে, ওই বছরের ২৩ সেপ্টেম্বর জিয়াউর রহমান মিশর যান। বিমানবন্দরে তাকে রাষ্ট্রপতি আনোয়ার সাদাত ও প্রধানমন্ত্রী মামদুহ সালেম স্বাগত জানান। সফরে কায়রো ও সুয়েজ খাল পরিদর্শন করেন জিয়া।
ক্ষমতাকালে জিয়া কুয়েত, বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাত সফর করেছেন। এই সফরগুলো বাংলাদেশের শ্রমবাজারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

ন্যাশনাল আর্কাইভ ইন সিঙ্গাপুর ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, দেশটির রাষ্ট্রপতির আমন্ত্রণে ১৯৭৮ সালের ১৯ সেপ্টেম্বরে রাষ্ট্রীয় সফরে সিঙ্গাপুর যান জিয়াউর রহমান। তিনি ২১ সেপ্টেম্বর ফিরে আসেন।
রাষ্ট্রপতি হিসেবে সফর ভারতে
ঢাকাস্থ ভারতীয় হাইকমিশন সূত্রে জানা গেছে, ১৯৭৭ সালের ১৯-২০ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এক রাষ্ট্রীয় সফরে ভারতে যান। দ্বিতীয়বার এক দ্বিপক্ষীয় সফরে দিল্লিতে যান ১৯৮০ সালের ২১ জানুয়ারি। এবার তার স্ত্রী খালেদা জিয়াও সফরসঙ্গী ছিলেন। দ্বিতীয়বারের ভারত সফরে জিয়াউর রহমানকে স্বাগত জানান ইন্দিরা গান্ধী।
১৯৭৭ সালে প্রথম সফর সম্পর্কে রয়টার্সের খবরে [১১] প্রকাশ, রাষ্ট্রপতি জিয়া ও প্রধানমন্ত্রী দেশাইয়ের মধ্যে দুই দফায় দুই ঘণ্টারও বেশি সময় আলোচনা হয়। রাষ্ট্রপতির সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে গঙ্গা নদীর জল ভাগাভাগি নিয়ে চুক্তির অনুমোদন। দিল্লিতে জিয়ার সম্মানে অনুষ্ঠিত ভোজসভায় চুক্তিটির উল্লেখ করেন। ওই সফরে তিনি মহাত্মা গান্ধীর প্রতিকৃতিতে সম্মান জানান।

জিয়ার দ্বিতীয়বার ভারত সফরের সময় বিশ্ব আফগানিস্তান ইস্যুতে উত্তাল ও বিভক্ত। ভারত সফরে তখন জাতিসংঘের তৎকালীন মহাসচিব কার্ট ওয়াল্ডহেইম উপস্থিত ছিলেন।
রয়টার্সের [১২] এক প্রতিবেদনে বলা হয়, জিয়াউর রহমানের ওই সফরের মূল লক্ষ্য মূলত আফগানিস্তান ইস্যু ছিল না। তিনি অন্যতম দরিদ্র দেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে তার অর্থনৈতিক উন্নয়নের উদ্বেগের কথা জানিয়েছিলেন। ভারত সফরে দেশটি থেকে অর্থনৈতিক সাহায্য বৃদ্ধি করাই ছিল তার লক্ষ্য।
পররাষ্ট্র বিষয়ক বিশেষজ্ঞরা ভারতের সঙ্গে জিয়া সরকারের সাফল্য আদায়ের মাত্রা খুব বেশি দেখছেন না। কেউ কেউ অবশ্য ফারাক্কা চুক্তিকে বড় করে দেখেছেন।
এ প্রসঙ্গে ঢাকার সরকারি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সেলিম মাহমুদ তার রচিত ‘বাংলাদেশ ভারত সম্পর্ক’ শীর্ষক গ্রন্থের [১৩] ভূমিকায় উল্লেখ করেছেন, ১৯৭৫-এ বাংলাদেশে সেনা অভ্যুত্থানের পর ভারতের কংগ্রেস সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশের মোশতাক বা জিয়া সরকারের সম্পর্কের কোনো উন্নতি লক্ষ্য করা যায় না। কেবল ১৯৭৭ সালের ৫ নভেম্বর জিয়া সরকারের সঙ্গে দেশাই সরকারের ফারাক্কা চুক্তিটিই ছিল একটি বড় ইতিবাচক ঘটনা।
জিয়ার আমলে সৌদি সাহায্য বৃদ্ধি পেলেও ভারতের সহযোগিতা কমে আসে। সেলিম মাহমুদ [১৪] তার গ্রন্থে হিসাব দেখিয়েছেন, ‘মুজিব আমলের তুলনায় জিয়া আমলে প্রাপ্ত সাহায্যের হার মাত্র ১১.১৫ শতাংশ। আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যও সন্তোষজনক ছিল না।’

যুক্তরাষ্ট্র সফর, কৃতজ্ঞতা প্রকাশ
দ্য আমেরিকান প্রেসিডেন্সি প্রজেক্টের ওয়েবসাইটে পাওয়া জিমি কার্টারের বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়েছে, জিয়াউর রহমানকে তিনি ‘মহান নেতা’ হিসেবে সম্বোধন করেন। মুক্তিযুদ্ধের পর তার নেতৃত্বে দেশটিতে অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাস বিভাগের ওয়েবসাইটের [১৫] তথ্য বলছে, ১৯৮০ সালের ২৫-২৭ অগাস্ট মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ব্যক্তিগত সফরে যান জিয়াউর রহমান। তাকে হোয়াইট হাউসে স্বাগত জানান তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিমি কার্টার।
হোয়াইট হাউসের দক্ষিণ লনে দাঁড়িয়ে জিমি কার্টার বলছিলেন, “আমরা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থার গণতান্ত্রিকীকরণের সুবিধাও আলোচনা করেছি। প্রেসিডেন্ট জিয়ার নির্বাচনের ফলে উন্মুক্ত এবং স্বাধীন নির্বাচনি প্রক্রিয়া বিশ্বকে অনুপ্রাণিত করেছে।”
জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য হিসেবে বাংলাদেশ রাষ্ট্রদর্শী ভূমিকা পালন করেছে বলেও ওই ব্রিফে জানান কার্টার। তিনি প্রেসিডেন্ট জিয়ার যুক্তরাষ্ট্র সফরের জন্য গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
সাংবাদিকদের সামনে ব্রিফে জিয়াউর রহমানও উষ্ণ সংবর্ধনার উজ্জ্বল প্রশংসা করেন। জিমি কার্টারের ব্যস্ততার মধ্যে সময় দেওয়ায় তিনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। স্বাধীনতা যুদ্ধের পর জিমি কার্টার সরকার যে বিশাল অর্থনৈতিক সহযোগিতা দেয়, সেটির প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন জিয়া। তার ভাষ্য ছিল, “আপনি যে বিশাল অর্থনৈতিক সহায়তা দিয়েছেন, তা আমাদের অনেক প্রয়োজনীয়তা পূরণ করেছে, যা পূরণ না হলে আমাদের জন্য বিশাল সমস্যা সৃষ্টি হতো।”
যুক্তরাষ্ট্র সফরে ১৯৮০ সালের ২৬ অগাস্ট জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে বক্তব্য রাখেন জিয়াউর রহমান। পরে ওয়াশিংটন থেকে নিউইয়র্ক হয়ে ফ্রান্সের প্যারিসে সফর করেন তিনি।
বিএনপির ফরেন পলিসির পর্যবেক্ষকেরা মনে করেন, প্রেসিডেন্ট জিয়ার পররাষ্ট্রনীতির সাফল্যের মধ্যে অন্যতম হলো ১৯৭৮ সালে শক্তিশালী জাপানকে হারিয়ে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য নির্বাচিত হওয়া। একই সঙ্গে দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহায়তা সংস্থা (সার্ক) গঠনে তার উদ্যোগ ও অবদানের মধ্য দিয়ে তৎকালীন বিশ্বে দক্ষিণ এশিয়ায় একটি সমমর্যাদাপূর্ণ ঐক্য দেখতে চেয়েছিলেন।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সফরের পাশাপাশি জিয়াউর রহমান সাক্ষাৎ করেছেন কিউবার ফিদেল ক্যাস্ট্রোর সঙ্গেও।

‘ইনভেস্টমেন্টের’ আশায় ব্রিটেনে জিয়া
১৯৮০ সালের ১৫ জুনে অফিসিয়াল ভিজিটে (সরকারি সফর) লন্ডন যান জিয়াউর রহমান। ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচারের সঙ্গে তিনি আফগানিস্তান, মধ্যপ্রাচ্য ও বিশ্ব সংকট নিয়ে আলোচনা করেন।
রয়টার্সের প্রতিবেদন বলছে, চারদিনের ওই সফরে ১০ নং ডাউনিং স্ট্রিটে তাদের মধ্যে আলাপ হয়েছে। সেই আলাপে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ব্রিটেন কীভাবে সহযোগিতা করতে পারে; মাইনিং ইন্ডাস্ট্রি, রুরাল ইলেকট্রিফিকেশনের উন্নয়নের প্রসঙ্গে গুরুত্বের সঙ্গে জায়গা পেয়েছে।
খালেদা জিয়াকে সঙ্গে নিয়ে যাওয়া জিয়ার ওই রাষ্ট্রীয় সফরে দুই দেশের মধ্যে ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল কো-অপারেশন অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট’ এগ্রিমেন্ট স্বাক্ষর হয়।
এই সফরের আগে ১৯৭৭ সালে কমনওয়েলথের সিলভার জুবিলি উৎসবে যোগ দিতে আটদিন লন্ডন সফরে ছিলেন জিয়াউর রহমান।

ব্রাসেলসে ‘ঋণের রাজনীতি’
ব্রিটিশপ্যাথের ওয়েবসাইটের তথ্য বলছে [১৬], ১৯৭৯ সালের ২৭ এপ্রিল বেলজিয়ামের ব্রাসেলসে পৌঁছান। সেখানে তিনি ইউরোপীয়ান ইকোনমিক কমিউনিটি হেডকোয়ার্টার্সে যান। সফরে জিয়াউর রহমান বেলজিয়ামের প্রধানমন্ত্রীসহ ইইসির কর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করেন।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে [১৭] বলা হয়, জিয়ার সফরের চূড়ান্ত পর্বে বাংলাদেশকে ২০০ মিলিয়ন ফ্রাঁ (৬.৭ মিলিয়ন ডলার) ঋণ দেওয়ার একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই বেলজিয়ান ঋণ বাংলাদেশকে চাল উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতার লক্ষ্যে কিছুটা সহায়তা করবে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে রয়টার্সের প্রতিবেদনে।
ব্রাসেলসে জিয়াউর রহমানের সফর তিনদিনের ছিল। সেই সফরের আগে তিনি সস্ত্রীক নেদারল্যান্ডস সফর করেন। ২৩ এপ্রিল ওই সফরে দেশটি জিয়াকে রাষ্ট্রীয় সম্মান জানায়।
জাপানে জিয়া
স্ত্রী খালেদা জিয়াকে নিয়ে জাপান সফর করেন জিয়া। ১৯৭৮ সালের এপ্রিলে তিনি জাপান যান। ৮ এপ্রিল তার সঙ্গে দেশটির সম্রাট হিরোহিতোর বৈঠক হয়।
৫-৯ এপ্রিল ৫ দিনের ওই সফরের পর ১৯৮০ সালের ৮ জুলাইতে জাপান সফর করেন রাষ্ট্রপতি জিয়া। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত, ওই সফর ছিল তৎকালীন জাপানের প্রধানমন্ত্রী মাসায়োশি ওহিরার শেষকৃত্যে অংশ নেওয়ার জন্য।
উত্তর কোরিয়ার সর্বোচ্চ খেতাবে ভূষিত
১৯৭৮ সালের ৮ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রীয় আমন্ত্রণে উত্তর কোরিয়া সফর করেন জিয়াউর রহমান। তিনদিনের সফরে তিনি দেশটির সর্বোচ্চ খেতাবে ভূষিত হন। দেশটির ৩০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপনে প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দিতে ৮-১০ সেপ্টেম্বর পিয়ংইয়ং সফর করেন তিনি।
সেখানে জিয়াকে অত্যন্ত উষ্ণ অভ্যর্থনা জানানো হয় এবং তিনি কোরিয়ার নেতা কিম ইল সাং-এর সঙ্গে পারস্পরিক প্রশংসা, বন্ধুত্ব ও সহযোগিতার আশ্বাস বিনিময় করেন। দুই নেতা অর্থনৈতিক ও কারিগরি সহযোগিতার বিষয়েও আলোচনা করেন।
অস্বাভাবিকভাবে কম সময়ের নোটিশে হওয়া এই সফরে জিয়াকে বিমানবন্দর থেকে রাষ্ট্রীয় মোটরশোভাযাত্রা করে নেওয়া হয়। তার সম্মানে একটি ভোজসভা, বিভিন্ন কারখানা ও কমিউন (যৌথ খামার) পরিদর্শন এবং উত্তর কোরিয়ার সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ‘স্টেট ব্যানার-ফার্স্ট ক্লাস’ (রাষ্ট্রীয় নিশান-প্রথম শ্রেণী) প্রদান করা হয়।
তবে উত্তর কোরিয়া সফর করায় দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের আরও গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতাকে ক্ষুণ্ণ না করতে বাংলাদেশে তখন দক্ষিণ কোরিয়ার বিনিয়োগ প্রকল্পগুলো নিয়ে আলোচনা ছিল। সরকারের শিল্পমন্ত্রী সিউল সফরও করেছিলেন ওই সময়ই।
রাষ্ট্রীয় সফরে আরও যত দেশে
১৯৭৯ সালের ৮ এপ্রিল থাইল্যান্ডে যান জিয়াউর রহমান। সফরে ‘ইন্দো-চায়না সিচুয়েশন’, ‘যৌথ মৎস্য আহরণ’ সহ তৎকালীন বিশ্ব পরিস্থিতি ও পাকিস্তানের অবস্থাও উঠে আসে দুই দেশের শীর্ষনেতার মধ্যে। ওই সফরে জিয়া থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ক্রিয়াংসাকের সঙ্গে আড়াই ঘণ্টার বেশি সময় বৈঠক করেন। আলোচনায় উভয় নেতা কাম্পুচিয়া থেকে ভিয়েতনামকে ও ভিয়েতনাম থেকে চীনের সৈন্যদের সরিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানান।

তিনদিনের রাষ্ট্রীয় সফর শেষে স্ত্রীকে নিয়ে ব্যাংকক থেকে ১১ এপ্রিল মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে যান জিয়াউর রহমান।
১৯৭৯ সালের ১১ নভেম্বর নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকার ২১ নম্বর পেজে প্রকাশিত প্রতিবেদনে [১৮] বলা হয়, ওই সপ্তাহে জিয়াউর রহমান শ্রীলঙ্কার সঙ্গে অর্থনৈতিক ও টেকনিক্যাল কো-অপারেশন নিয়ে চুক্তি করেন।
সফরশেষে সাংবাদিকদের সামনে জিয়াউর রহমান বলেছিলেন, ‘আমাদের সফর নিয়ে আমরা খুব সন্তুষ্ট। আমরা উভয়ই উভয়ের জন্য আন্তরিক।’ (“We are very satisfied with our visit. We have opened our hearts to each other.”)
১৯৭৯ সালের ৫-৭ নভেম্বরের ওই সফরটিও ছিল রাষ্ট্রীয় সফর।
জিয়াউর রহমানের মালদ্বীপ সফরের কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে উভয় দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন হয় ১৯৭৮-এ তার ক্ষমতাকালেই। পাশাপাশি ১৯৯৮ সালে উভয় দেশ হাইকমিশন খোলে।
১৯৮১ সালের ৫ এপ্রিল পশ্চিম জার্মানি সফরে ছিলেন জিয়াউর রহমান। গ্যেটে ইমেজের ওয়েবসাইটে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, সফরে পশ্চিম জার্মানির রাষ্ট্রপতি কার্ল কার্স্টেন্সের সঙ্গে বৈঠক করেন।
যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশকে গঠনে জাতীয় জীবনের উন্নয়ন এবং বিশ্ব দরবারে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশকে সামনে আনার চেষ্টা ছিল জিয়াউর রহমানের। ১৯৭৯ সালের অক্টোবরে ফার ইস্টার্ন ইকোনমিক রিভিউর প্রতিনিধি রডনি টাস্কারকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তার ভাষ্য, “আমাদের পররাষ্ট্রনীতির লক্ষ্য হলো মৈত্রীর বিস্তার এবং এই অঞ্চলে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা। দেশে স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য আমরা এই অঞ্চলে স্থিতিশীলতা চাই।”
তবে জিয়াউর রহমানের সমালোচকদের কাছে তার সফরগুলো নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ১৯৭৫ সালের পটপরিবর্তন ও সামরিক অভ্যুত্থানের পর ক্ষমতায় আসায় তার সরকার প্রাথমিকভাবে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বৈধতার সংকটে ছিল। এই সংকট কাটাতে তিনি ঘন ঘন বিভিন্ন দেশ সফর করেন এবং বহুপাক্ষিক ফোরামগুলোকে ব্যবহার করেন।
সমালোচকদের দৃষ্টিতে, তার এই অতি-সক্রিয় আন্তর্জাতিক কূটনীতি এবং মুসলিম বিশ্ব ও পশ্চিমা দেশগুলোর দিকে অতিরিক্ত ঝুঁকে পড়ার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল নিজের সামরিক শাসনের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করা, যা আদর্শিক নীতির চেয়ে বেশি ‘লেনদেনভিত্তিক’ ছিল।
তার শাসনামলে দেশে চলমান সামরিক আদালত এবং রাজনৈতিক বিরোধী দমনের বিষয়টি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর নজরে ছিল। ১৯৭৯ সালে তার নেদারল্যান্ডস (হল্যান্ড) সফরের সময়ও প্রতিবাদ হয়েছিল আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে। তবে জিয়াউর রহমানের সমর্থকেরা তার এই নীতিকে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ কূটনীতি হিসেবে প্রচার করেন।
তথ্যসূত্র:
১ : https://www.britishpathe.com/asset/159953/
২. জিয়া কেন জনপ্রিয়, এ. কে. এ. ফিরোজ নুন সম্পাদিত, প্রথম প্রকাশ ১৯৯১, ৩০ মে, পৃষ্ঠা ৫০-৬০
৩. https://www.thedailystar.net/news-detail-38950
৪. https://indianexpress.com/article/opinion/editorials/china-unrest-us-state-department-human-rights-major-general-ziaur-rahman-tulsi-giri-4456234/
৫. জিয়া কেন জনপ্রিয়, কাজী রিজিয়া খাতুন, এ. কে. এম. ফিরোজ নুন সম্পাদিত, প্রথম প্রকাশ ১৯৯১, ৩০ মে, পৃষ্ঠা ১৭৯
৬. আমাদের পররাষ্ট্রনীতি, পৃষ্ঠা ৪৬, আমার রাজনীতির রূপরেখা, লেখক জিয়াউর রহমান, সম্পাদনা এ. কে. এ. ফিরোজ নুন
৭. জিয়া কেন জনপ্রিয়, কাজী রিজিয়া খাতুন, এ. কে. এম. ফিরোজ নুন সম্পাদিত, প্রথম প্রকাশ ১৯৯১, ৩০ মে, পৃষ্ঠা ১৭৯
৮. https://www.britishpathe.com/asset/182836/
৯. জিয়া কেন জনপ্রিয়, কাজী রিজিয়া খাতুন, এ. কে. এম. ফিরোজ নুন সম্পাদিত, প্রথম প্রকাশ ১৯৯১, ৩০ মে, পৃষ্ঠা ১৭৯
১০. https://www.britishpathe.com/asset/135247/
১১. https://www.britishpathe.com/asset/159953/
১২: https://www.britishpathe.com/asset/179299/
১৩. ড. সেলিম মাহমুদ, ‘বাংলাদেশ ভারত সম্পর্ক: ১৯৭১-১৯৮১’, ভূমিকা
১৪: ড. সেলিম মাহমুদ, ‘বাংলাদেশ ভারত সম্পর্ক: ১৯৭১-১৯৮১’, ২১৯ পৃষ্ঠা
১৫. https://history.state.gov/departmenthistory/visits/bangladesh
১৬. https://www.britishpathe.com/asset/240069/
১৭: https://www.britishpathe.com/asset/240069/
১৮. https://www.nytimes.com/1979/11/11/archives/sri-lanka-and-bangladesh-reach-accords-during-visit-by-rahman.html