Published : 20 Jul 2026, 05:26 PM
পৃথিবীতে এমন ঘটনা বিরল যে, সরকার পতনের সঙ্গে সঙ্গে একটি দেশের জাতীয় মসজিদের ইমাম পালিয়ে গেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা পালিয়ে গেছেন। তারপর তারা হত্যা মামলার আসামি হয়ে জেলে গেছেন, না হয় তাদের সন্তানতুল্য শিক্ষার্থীদের হাতেই নাজেহাল হয়েছেন। অথচ সরকার পরিবর্তনের মতো একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে মসজিদের ইমাম বা শিক্ষকদের পালিয়ে যাওয়া কিংবা নিগৃহীত হওয়ার কোনো সম্পর্ক থাকার কথা নয়। কিন্তু চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের পতনের পরে বাংলাদেশে এই বিরল ঘটনাগুলো ঘটেছে। তার পেছনে কারণ যাই থাক না কেন, এর মধ্য দিয়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা। বিশেষ করে ওই ঘটনা ছাত্র-শিক্ষকের মধ্যে যে দূরত্ব সৃষ্টি করেছে—তা গত দুই বছরেও ঘুচানো সম্ভব হয়নি।
১৬ জুলাই সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে দেখা যায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আইনুল ইসলামকে ছাত্রদল ও জাতীয় ছাত্রশক্তির কিছু নেতাকর্মী শাসাচ্ছেন।
পরদিন সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়, ১৬ জুলাই বেলা দেড়টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে নিজের কক্ষে ছিলেন অধ্যাপক আইনুল ইসলাম। এ সময় ছাত্রদল ও ছাত্রশক্তির নেতাকর্মীরা গিয়ে তার বিরুদ্ধে নানা স্লোগান দিয়ে নিজের কক্ষ থেকে তাকে চলে যেতে বলেন। ‘জুলাই অভ্যুত্থানবিরোধী’ হিসেবে উল্লেখ করে তাকে কেন সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তা নিয়ে বিক্ষোভ করেন দুই ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মীরা। উদ্ভুত পরিস্থিতিতে একপর্যায়ে সেখান থেকে চলে যান অধ্যাপক আইনুল ইসলাম। শুধু কক্ষ থেকে বের হওয়াই নয়, অধ্যাপক আইনুল ইসলামকে ক্যাম্পাস ছেড়েও চলে যেতে হয়। এই ঘটনার পরে তিনি আর ক্যাম্পাসে তার বিভাগে গিয়েছেন কি না জানা যায়নি। তবে ছাত্রদল ও ছাত্রশক্তির বিক্ষোভের তিন দিন পর পদত্যাগ করে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিনের পদ ছেড়েছেন বলে খবর দেখতে পেয়েছি।
প্রশ্ন হলো, একজন অধ্যাপককে তার সন্তানতুল্য শিক্ষার্থীরা মব সৃষ্টি করে, স্লোগান দিয়ে, ভয়-ভীতি দেখিয়ে রুম থেকে এমনকি ক্যাম্পাস থেকে যে বের করে দিল বা দিতে পারল—এই পরিস্থিতি কে তৈরি করল, কেন তৈরি হলো? দলাদলি আর নানা রঙের রাজনীতিতে যুক্ত শিক্ষকরা কি এর দায় এড়াতে পারেন? সব আমলেই কিছু শিক্ষক সরাসরি যে ক্ষমতাসীন দলের কর্মীতে পরিণত হয়ে যান, অন্যদিকে কিছু শিক্ষক সরকারবিরোধিতার নামে দলীয় কর্মীর মতো আচরণ করেন—এরকম বিভাজিত শিক্ষকসমাজ একটি জাতি ও দেশকে কী করে এগিয়ে নেবে?
বিশ্ববিদ্যালয় আইনে শিক্ষকদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়ার ব্যাপারে তেমন কোনো বিধিনিষেধ না থাকলেও নীতি-নৈতিকতা বলে একটা জিনিস আছে—যা সকলকে মেনে চলতে হয়। কিন্তু দলীয় লেজুড়বৃত্তি করতে গিয়ে শিক্ষকদের একটি বিরাট অংশ যেভাবে নীতি-নৈতিকতা লঙ্ঘন করেছেন, সেটিও খুব স্বাভাবিক ঘটনা নয়। কিন্তু তারপরও চব্বিশের ৫ অগাস্টের পরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেসব ঘটনা ঘটেছে, সেগুলো কি কোনো যুক্তিতেই গ্রহণযোগ্য? যেসব শিক্ষকের ওপর মব হয়েছে, ক্যাম্পাস থেকে অপমান করে যাদেরকে বের করে দেওয়া হয়েছে, যাদেরকে নাজেহাল করা হয়েছে—তাদের সবাই কি অপরাধী বা জুলাই অভ্যুত্থানে তারা কি রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন ও হত্যাযজ্ঞের সমর্থক ছিলেন? নাকি আওয়ামী লীগের সমর্থক কিংবা আওয়ামী সমর্থিত প্যানেলের শিক্ষক—শুধু এই পরিচয়ের কারণেই তার ওপর মব সৃষ্টি করা বা তাকে ক্যাম্পাস থেকে বের করে দেওয়াকে বৈধতা দেওয়া যায়?
জুলাই অভ্যুত্থানে অনেক শিক্ষক রাস্তায় নেমেছিলেন। তারা চেয়েছিলেন আন্দোলনকারীদের ওপর রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন বন্ধ হোক। কিন্তু আন্দোলন যখন তুঙ্গে উঠল, তখন সরকার পতনের এক দফার ঘোষণা সর্বপ্রথম অধ্যাপক আনু মুহাম্মদের মুখ থেকেই বেরিয়েছিল। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, সরকার পতন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আওয়ামী সমর্থিত কিংবা যারা আন্দোলনের সময় রাস্তায় নামেননি, তাদের সবাইকে ক্যাম্পাস থেকে বের করে দিতে হবে বা তাদেরকে হত্যা মামলার আসামি করতে হবে।
বাস্তবতা হলো, যে অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ প্রথম সরকার পতনের এক দফা ঘোষণা করেছিলেন, অভ্যুত্থানের পরে তিনিই মব সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন। অন্তর্বর্তী সরকারের নানা কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করেছেন। তার মানে একজন প্রকৃত শিক্ষক, প্রকৃত দেশপ্রেমিকের যে আচরণ, অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ তাই করেছেন। অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের পতনের পরে তিনি কোনো রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা নেননি বা নেওয়ার চেষ্টা করেছেন বলেও শোনা যায়নি। যদিও অনেকেই অভ্যুত্থানের পরে নানারকম রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা নিয়েছেন। কেউ কেউ রং পাল্টেছেন। কেউ কেউ মুখোশ ছেড়ে স্বরূপে আবির্ভুত হয়েছেন।
সব আমলেই কিছু মানুষ নানা কায়দা-কানুন করে রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা নেন। কেউ কেউ নানা কৌশল অবলম্বন করেন। আবার অধ্যাপক আনু মুহাম্মদের মতো মানুষও আছেন যারা সব আমলেই সত্য কথা বলেন। যে কারণে কোনো আমলেই কোনো সরকার তাদের পছন্দ করে না। বস্তুত এই ‘সংখ্যালঘু’ মানুষগুলোই একটি সমাজ ও রাষ্ট্রের শক্তি ও সৌন্দর্য।
২.
অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের পতনের পর থেকে অন্তর্বর্তী সরকারের পুরো দেড় বছরে দেশের নানা প্রান্তে, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক স্কুল পর্যন্ত যেসব মব সন্ত্রাসের ঘটনা ঘটেছে; যেসব শিক্ষককে নাজেহাল করা হয়েছে, তার সবগুলো ঘটনার পেছনেই যে রাজনৈতিক কারণ ছিল, সেটি ভাববার কোনো কারণ নেই। নির্মোহ অনুসন্ধান করলে দেখা যাবে, অনেক ঘটনার পেছনেই রয়েছে ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক বিরোধ। যে বিরোধকে কাজে লাগিয়ে মব সৃষ্টি করা হয়েছে। কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় নিপীড়নে সমর্থন কিংবা ফৌজদারি অপরাধের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে তার বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে এবং বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনেই বিচার হওয়া সম্ভব। কিন্তু সেই পথে না নিয়ে শিক্ষার্থীদের একটি অংশ তাদের পিতৃতুল্য শিক্ষকদের ওপর রাজনৈতিক বিবেচনায় যে নিপীড়ন চালিয়েছে বা চালাচ্ছে, সেটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। অন্তত একটি নির্বাচিত সরকারের আমলে তো নয়ই।
জগন্নাথের অধ্যাপক আইনুল ইসলামের বিরুদ্ধে অভিযোগ তিনি ‘জুলাই অভ্যুত্থানবিরোধী’। প্রশ্ন হলো, কোন মানদণ্ডে তাকে ‘অভ্যুত্থানবিরোধী’ হিসেবে চিহ্নিত করা হলো? সুনির্দিষ্টভাবে তার অপরাধ কী? তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ কি দেশের প্রচলিত আইনে ফৌজদারি অপরাধ? তিনি কি কোনো শিক্ষার্থীকে হত্যায় উসকানি দিয়েছিলেন বা তার কথায় পুলিশ কাউকে গুলি করেছে? তার মতো আরও যেসব শিক্ষক ৫ অগাস্টের পর থেকে ক্যাম্পাসে অবাঞ্ছিত হয়ে আছেন বা ক্লাসে ফিরতে পারছেন না, তাদের সবাই কি খুনি বা খুনের মদদদাতা? নাকি শুধুমাত্র রাজনৈতিক পরিচয় তথা একটি নির্দিষ্ট দলের সমর্থক হওয়ার কারণে তারা ভিকটিম হচ্ছেন?
অধ্যাপক আইনুলের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে তার বিরুদ্ধে মামলা হতে পারত। কিন্তু সেই পথে না গিয়ে কেন দুটি ছাত্র সংগঠনের নেতারা তার কক্ষে গিয়ে তাকে শাসাবেন এবং রুম থেকে বের করে দেবেন? একজন শিক্ষকের সঙ্গে এইধরনের আচরণই কি বরং শাস্তিযোগ্য অপরাধ নয়? বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কি এই শিক্ষার্থী তথা ছাত্রনেতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে বা নিতে পারবে? যদি না পারে তাহলে বুঝতে হবে, জনগণের পয়সায় পরিচালিত একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও মব সন্ত্রাস প্রতিরোধ এবং একজন শিক্ষকের নিরাপত্তা ও সম্মান রক্ষায় ব্যর্থ—যা একটি নির্বাচিত সরকারের আমলেই কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়, কাম্য নয়। অভ্যুত্থানের পরে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে যেসব মব সহিংসতা হয়েছে, সেগুলোকে অভ্যুত্থান-পরবর্তী তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে অনেকে যুক্তি দেখালেও একটি নির্বাচিত সরকারের আমলে সেই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে না। কারণ একটি নির্বাচিত সরকারের দায় ও দায়িত্ব অনির্বাচিত সরকারের চেয়ে অনেক বেশি।
গত এপ্রিলের শেষদিকে একটি জাতীয় দৈনিকের খবরে বলা হয়, গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের প্রথম তিন মাসেই নজিরবিহীন মব সন্ত্রাসের শিকার হয়ে শারীরিক ও মানসিক আঘাতে অন্তত ছয়জন শিক্ষকের মৃত্যু হয়েছে। আরও পাঁচ শতাধিক শিক্ষক আহত ও অসুস্থ হয়ে দুর্বিষহ জীবনযাপন করছেন। এই সময়ে দেশজুড়ে প্রায় আড়াই হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সাড়ে তিন হাজার শিক্ষক হেনস্তার শিকার হয়েছেন বলেও ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। পৃথিবীর যেকোনো দেশের রাজনীতি ও শিক্ষাব্যবস্থায় এটি একটি বিরল ঘটনা। প্রকৃত ঘটনার সংখ্যা যদি প্রতিবেদনে উল্লিখিত সংখ্যার চেয়ে অনেক কমও হয়, তারপরও এটি পৃথিবীর যেকোনো দেশের রাজনীতি, বিশেষ করে শিক্ষাব্যবস্থার জন্য লজ্জাজনক উদাহরণ হয়ে থাকবে।
সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়, ২০২৩ সালে ঢাকার ধামরাই উপজেলার শ্রেষ্ঠ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্বাচিত হয় সূয়াপুর নান্নার স্কুল অ্যান্ড কলেজ। একই বছর উপজেলার শ্রেষ্ঠ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানপ্রধান নির্বাচিত হন ওই কলেজের অধ্যক্ষ আনোয়ারুল ইসলাম তালুকদার। অথচ ২০২৪ সালের ৫ অগাস্টের পরই এই অধ্যক্ষকে জোর করে পদত্যাগ করানো হয়। জানা যায়, ক্লাসরুমে কড়াকড়ির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের তিনি কোচিংয়ে নিরুৎসাহিত করেছেন। নিম্নমানের পাঠ্যবই বাদ দিয়েছেন। বিভিন্ন দিবস ও অনুষ্ঠানের নামে অযাচিত বিল ও সম্মানি নেওয়া বাদ দিয়েছেন। এতে কয়েকজন সিনিয়র শিক্ষক তার ওপর ক্ষুব্ধ ছিলেন। সরকার পতনের পর কয়েকজন শিক্ষক তার বিরুদ্ধে ছাত্রদের উসকে দেন।
অভ্যুত্থানের পরে বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং স্কুল-কলেজের যেসব শিক্ষককে পদচ্যুত ও নাজেহাল করা হয়েছে; যাদেরকে মামলার আসামি করা হয়েছে—তার সবগুলো ঘটনার পেছনে রাজনীতি নয়, বরং ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক বিরোধ যে বড় ভূমিকা পালন করেছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। সরকারের উচিত প্রত্যেকটি ঘটনার নির্মোহ অনুসন্ধান করে প্রকৃত অপরাধীদের চিহ্নিত করে তাদের বিচারের মুখোমুখি করা। ‘জুলাইবিরোধী’ কিংবা ‘ফ্যাসিস্টের দোসর’ ট্যাগ দিয়ে ভিন্ন কোনো উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার মধ্য দিয়ে দেশের শিক্ষাব্যবস্থার যে সমূহ ক্ষতি এরই মধ্যে করা হয়েছে, সেটি দ্রুত বন্ধ করা না গেলে এবং অবিচারের শিকার শিক্ষকদের মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়া না গেলে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা এগোবে না। শিক্ষাব্যবস্থা না এগোলে দেশও এগোবে না। বরং যে তিমিরে ছিল, সেই তিমিরেই খাবি খাবে।
আমীন আল রশীদ সাংবাদিক ও লেখক। ই-মেইল: [email protected]
ছাত্রদল ও ছাত্রশক্তির বিক্ষোভের মুখে ক্যাম্পাস ছাড়লেন জবি অধ্যাপক
ছাত্রদল ও ছাত্রশক্তির বিক্ষোভ: তিন দিন পর ডিনের পদ ছাড়লেন জবি অধ্যাপক আইনুল