Published : 16 Jun 2026, 08:15 PM
অনেক স্বামী আছেন, যাদের স্ত্রী বাড়িতে থাকলে বন্ধুদের খোঁজও নেন না, এমনকি স্ত্রীর পছন্দের মানুষদের বেশি সময় দেন।
তবে স্ত্রী যখনই কয়েক দিনের জন্য বাপের বাড়ি বা কাজের সূত্রে দূরে যান, তখনই সেই স্বামী হুট করে পুরানো বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা জমানোর জন্য মরিয়া হয়ে ওঠেন।
আপাতদৃষ্টিতে একে ‘দ্বিমুখী আচরণ’ বা ফাঁকিবাজি মনে হতে পারে। তবে মনোবিজ্ঞানী এবং বিভিন্ন সমাজতাত্ত্বিক গবেষণায়, এর পেছনে গভীর কিছু মনস্তাত্ত্বিক কারণ ও বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা উঠে এসেছে।
কেন এমন আচরণ করেন স্বামীরা?
সম্পর্ক ও সমাজবিজ্ঞানীরা এই আচরণের পেছনে থাকা মনস্তাত্ত্বিক কারণগুলোকে সুনির্দিষ্ট কিছু ‘থিওরি’ বা গবেষণার সূত্র দিয়ে ব্যাখ্যা করেছেন।
ভূমিকা পরিবর্তন ও 'গ্রিডি ম্যারেজ থিওরি’: সমাজবিজ্ঞানে বিবাহিত দম্পতিদের একটি আচরণকে ‘গ্রিডি ম্যারেজ’ বা ‘লোভী বিবাহ সূত্র’ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘বেলর ইউনিভার্সিটি’ এবং ‘ইউটা স্টেট ইউনিভার্সিটি’-র গবেষকদের করা একটি সমাজতাত্ত্বিক গবেষণায় দেখা গেছে, বিয়ের পর দম্পতিরা অবচেতনভাবেই একে অপরের প্রতি এতটাই মগ্ন হয়ে পড়েন যে, তারা তাদের চারপাশের বন্ধুবান্ধব বা সমাজ থেকে নিজেদের গুটিয়ে নেন। একেই বলা হয় ‘গ্রিডি ম্যারেজ’।
স্ত্রী যখন পাশে থাকেন, তখন স্বামী এই সামাজিক নিয়মের অদৃশ্য চাপে ‘সংসারি ও আদর্শ স্বামী’র ভূমিকা পালন করেন এবং স্ত্রীর পছন্দকে অগ্রাধিকার দেন। তবে স্ত্রী দূরে গেলেই সেই ‘লোভী প্রাতিষ্ঠানিক’ চাপ সাময়িকভাবে উবে যায় এবং তারা দ্রুত নিজেদের পুরানো মুক্ত ভূমিকায় ফিরে যান।
মানসিক শক্তি ও সামাজিক সংযোগের সংকোচন: মনস্তাত্ত্বিক-বিষয়ক ওয়েবসাইট ‘সাইকোলজি টুডে’-তে প্রকাশিত এক গবেষণামূলক নিবন্ধে বলা হয়েছে, অবিবাহিতদের তুলনায় বিবাহিত ব্যক্তিরা, তাদের বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ বা সামাজিক মেলবন্ধন প্রায় ৪০ শতাংশ কমিয়ে দেন।
সারাক্ষণ বৈবাহিক সম্পর্কের ভেতর সামাজিক ও পারিবারিক নিয়ম মেনে চলতে চলতে পুরুষদের মনে এক ধরনের ‘আবেগীয় ক্লান্তি’ বা ‘এনার্জি ড্রেইন’ তৈরি হয়।
স্ত্রী যখন কয়েক দিনের জন্য দূরে যান, তখন তারা এই সামাজিক শূন্যতা পূরণ করতে এবং নিজেদের মানসিক শক্তি ফিরে পেতে বন্ধুদের আড্ডাকে একটি নিরাপদ মাধ্যম হিসেবে বেছে নেন।
বন্ধুদের হারানোর ভয় বা ‘পিয়ার রিজেকশন’: গবেষণায় দেখা গেছে, পুরুষদের মনে বন্ধুদের সামাজিক বৃত্ত থেকে ছিটকে যাওয়ার একটি তীব্র সুপ্ত ভয় কাজ করে। যখন স্ত্রী বাড়িতে থাকেন না, তখন সেই সময়টিকে স্বামীরা বন্ধুদের সঙ্গে নষ্ট হতে যাওয়া সম্পর্ক ঝালাই করার একটি ‘সোনালি সুযোগ’ হিসেবে দেখেন। যাতে বন্ধুরা তাকে পর ভেবে দূরে ঠেলে না দেয়।
যে ধরনের মানুষেরা এই কাজ বেশি করেন
গবেষণা এবং সম্পর্ক-বিজ্ঞানীদের মতে, সব পুরুষ এমন করেন না। মূলত নির্দিষ্ট কিছু বৈশিষ্ট্যের মানুষেরা এই আচরণ বেশি দেখান।
যারা সবাইকে খুশি করতে চান: ‘সাইকোলজি টুডে’-র অন্য একটি নিবন্ধে বলা হয়েছে, যারা নিজেদের আসল ইচ্ছা প্রকাশ করতে পারেন না এবং সবাইকে খুশি রাখতে চান, তারা এই আচরণ বেশি করেন। স্ত্রী সামনে থাকলে তাকে খুশি রাখতে বন্ধুদের ত্যাগ করেন, আবার স্ত্রী দূরে গেলে বন্ধুদের খুশি করতে আড্ডায় মাতেন।
তারা কোনো পক্ষকেই ‘না’ বলতে পারেন না।
অনিরাপদ সম্পর্কের মানসিকতা: যাদের মানসিকতায় এক ধরনের ভয় কাজ করে যে, স্ত্রীকে পুরো সময় না দিলে সম্পর্কে দূরত্ব তৈরি হবে, তারা স্ত্রী থাকা অবস্থায় বন্ধুদের পুরোপুরি ভুলে যান।
যোগাযোগে দুর্বল ব্যক্তি: যারা স্ত্রীর সঙ্গে খোলামেলা কথা বলতে পারেন না যে, ‘আমার বন্ধুদের সঙ্গে একটু আড্ডা দেওয়া দরকার’, তারাই স্ত্রীর আড়ালে এই তোড়জোড় বেশি করেন।
গবেষণা
এই আচরণ নিয়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা ও মতামত প্রকাশিত হয়েছে।
সোশ্যাল সাইকোলজি অ্যান্ড পারসোনালিটি সায়েন্স (এসপিপিএস), এই আন্তর্জাতিক সাময়িকীতে ‘ইউনিভার্সিটি অফ জর্জিয়া’ ও ‘ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া’র করা প্রকাশিত গবেষণায় দেখা গেছে, পুরুষেরা বিয়ের প্রাথমিক বছরগুলোতে তাদের বন্ধুদের চেয়ে স্ত্রীর সামাজিক বৃত্তকে বেশি গুরুত্ব দেন। কারণ তারা নতুন সম্পর্কে নিজেদের সেরাটা দিতে চান।
তবে একই গবেষণায় দেখা যায়, স্ত্রী সাময়িকভাবে অনুপস্থিত থাকলে পুরুষদের মাঝে পুরানো সামাজিক দলে ফিরে যাওয়ার প্রবণতা নারীদের চেয়ে অনেক দ্রুত কাজ করে।
বিশেষজ্ঞের মতামত
আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়ার পারিবারিক ও সম্পর্ক-বিষয়ক থেরাপিস্ট এবং ‘লাভ অ্যান্ড লাইফ ইনস্টিটিউট’-এর প্রতিষ্ঠাতা ডা. ক্যাটলিন মিলার, তার বই ‘দ্য হিডেন পার্টনারশিপ: নেভিগেটিং মডার্ন রিলেশনশিপস’-এ এই আচরণগত মনস্তত্ত্ব নিয়ে একটি বিশেষ বিশ্লেষণ প্রকাশ করেছেন।
এছাড়া স্বাস্থ্য সাময়িকী ‘সাইকোলজি টুডে’-তে প্রকাশিত, তার একটি কলামেও তিনি বিষয়টি উল্লেখ করেন।
তার মতে, “বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেওয়া বা সময় কাটানোটা, বিবাহিত পুরুষদের কোনো অপরাধ বা অন্যায় নয়। তবে সমস্যাটা অন্য জায়গায়।”
তিনি ব্যাখ্যা করেন, “স্ত্রী বাড়িতে থাকা অবস্থায় বন্ধুদের পুরোপুরি ভুলে যাওয়া এবং স্ত্রী চোখের আড়াল হলেই বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডার জন্য অতি-উৎসাহী বা মরিয়া হয়ে ওঠা— সম্পর্কের ভেতরে একটি লুকানো ‘যোগাযোগের অভাব’ বা ‘কমিউনিকেইশন গ্যাপ’ নির্দেশ করে।”
ডা. মিলার আরও বলেন, “এটি মূলত ইঙ্গিত দেয় যে, ওই স্বামী- তার বৈবাহিক সম্পর্কের ভেতর নিজের ব্যক্তিগত চাহিদা বা ‘মি-টাইম’ নিয়ে স্ত্রীর সঙ্গে খোলামেলা কথা বলতে ভয় পান। ফলে তিনি, স্ত্রীর সামনে এক ধরনের কৃত্রিম সংসারিক সত্তা বজায় রাখেন, আর স্ত্রী দূরে গেলেই সেই চেপে রাখা ইচ্ছা পূরণ করতে বন্ধুদের কাছে ছুটে যান। একটি সুস্থ সম্পর্কের জন্য এই আচরণের আকস্মিক পরিবর্তন মোটেও ভালো লক্ষণ নয়।”
মোটা দাগে যা বোঝায়
এটি কোনো অস্বাভাবিক বিষয় নয়, বরং মানুষের স্বাভাবিক মনস্তত্ত্ব। তবে স্বামী-স্ত্রী দুজনেরই উচিত, একে অপরকে সম্পর্কের ভেতরেই কিছুটা ‘ব্যক্তিগত স্বাধীনতা’ বা ‘মি-টাইম’ দেওয়া।
তাহলে স্ত্রী বাড়িতে থাকা অবস্থাতেই, স্বামী বন্ধুদের সঙ্গে সুস্থ আড্ডা দিতে পারবেন। আর স্ত্রী দূরে গেলেও তাকে লুকিয়ে বা হুট করে বন্ধুদের কাছে ছুটোছুটি করতে হবে না।
আরও পড়ুন