ঝগড়ার পর যা করা যাবে না

সঙ্গীর সঙ্গে ঝগড়ার পর সেই কারণটা উপেক্ষা করা কিংবা কিছুই হয়নি এরকম ভান করা কোনো সমাধান বয়ে আনে না।

লাইফস্টাইল ডেস্কবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 6 March 2020, 07:14 AM
Updated : 6 March 2020, 07:14 AM

যুক্তরাষ্ট্রের ‘ম্যারেজ কনসালটেন্ট’ লেসলি এম. ডাব্লিউ. দোয়ারেস বলেন, “কলহের পর বিষয়টি ধামাচাপা দিলে সঙ্গীর ধারণা হবে ঝগড়ার ফলাফল আপনি মেনে নিয়েছেন। তবে মেনে নেন আর না নেন, তা ঠাণ্ডা মাথায় আলোচনার মাধ্যমেই সেই ফলাফল ভবিষ্যতে সুফল বয়ে আনবে। আর কলহের মধ্য থেকে আপনারা কী শিক্ষা পেলেন তা নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে পূরণ নিতে পারবেন কলহের কারণে সম্পর্কের ক্ষতিটুকু।”

সংসারে কলহের কারণটা সমাধান না হলে সাময়িক মীমাংসা কোনো সুফল বয়ে আনবে না। বরং তা সময়ের সঙ্গে আরও গভীর হয়ে পুনরায় কলহের জন্ম দেবে। আবার ঝগড়া শুরু করার আগেও ভেবে নিতে হবে ঝগড়ার বিষয়বস্তুটা কি আদৌ তর্ক যোগ্য।

সম্পর্কবিষয়ক একটি ওয়েবসাইটে প্রকাশিত প্রতিবেদনের আলোকে তুলে ধরা হল দাম্পত্য কলহ নিয়ে এমনই কিছু বিষয়। 

ঘরের গল্প বাইরে ছড়ানো: সঙ্গীর সঙ্গে ঝগড়া বেঁধেছে। কারণ আপনার যুক্তি আপনার সঙ্গী মেনে নেয়নি। তাই আপনার চাই পরিবার, বন্ধু কিংবা অন্য কোনো পরিচিত ব্যক্তির কাছ থেকে আপনার যুক্তির স্বীকৃতি। এজন্য ঘরের কলহের গল্প তাকে জানাতে হবে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই নিয়ে স্ট্যাটাস দিয়ে দিলেন। কিংবা বাইরের কারও সঙ্গে আলাপ করলেন- এখানেই বাঁধল বিপত্তি।

ফ্লোরিডার মনোবিজ্ঞানী মারনি ফিউয়ারম্যান বলেন, “স্বামী-স্ত্রী মধ্যকার বিশ্বাসকে অনেকটাই নড়বড়ে করে দিতে পারে এই সামান্য কাজ। আর একবার ঘরের খবর বাইরে বেরোলে তা থামানোর উপায়। মানুষ আপনাদের সম্পর্ক নিয়ে কথা বলবে, দোষগুণ বিচার করবে। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার যে সম্পর্ক তা তো বাইরের মানুষের সঙ্গে নেই, বাইরের মানুষের কাছে আছে শুধু আপনার দেওয়া ঘটনার বর্ণনা। ফলে তারা ভুলত্রুটিগুলোকে ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখতে পারেনা।”

“তাই আলাপ যদি করতেই হয় তবে এমন একজন ব্যক্তির সঙ্গে করা উচিত যার প্রতি দুজনারই আস্থা আছে এবং যে নিরপেক্ষভাবে পরামর্শ দিতে পারবে।”

সময় নেওয়া ঠিক না: আরেক মনোবিজ্ঞানী ও সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ অ্যানটোনিয়ো হল বলেন, “রাগ ও মানসিক আঘাতের কারণ সমাধান করা না হলে তা ক্রমেই ভেতরে বড় হতে থাকে। ফলে ঝগড়ার পর মীমাংসায় আসতে যত বেশি সময় নেওয়া হবে, মীমাংসা ততই কঠিন হতে থাকবে। আর এই সময় দুজনেই কষ্ট পাবেন। আরও বেশি সময় পার করে দিলে এসময় ঝগড়ার খুঁটিনাটি বিষয়গুলো ভুলে যেতে থাকবেন, যা মীমাংসা আসাকে আরও কঠিন করে তুলবে। তাই ঝগড়ার পর কিছুটা সময় ঠাণ্ডা মাথায় ব্যাপারটি ভেবে পরক্ষণেই সমস্যা নিয়ে শান্ত আলোচনার মাধ্যমে সমাধানে আসা উচিত।”

যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ মাইক গোল্ডস্টেইন বলেন, “মীমাংসায় আসতে কালক্ষেপণ পুরুষদের জন্য উপকারী। কারণ পুরুষরা ঝগড়া পর মাথা ঠাণ্ডা করে ভাবতে পারে পুরো পরিস্থিতিটা নিয়ে এবং আগের চাইতে আরও খোলামন ও ভালোবাসা নিয়ে মীমাংসায় আসার উপায় বের করতে পারে।”

ক্ষমা করা: “পুরুষ যদি প্রকৃত অর্থেই ক্ষমা চায় তবে স্ত্রীদের উচিত হবে রাগ ধরে না রেখে ক্ষমা করা। অন্যথায় বিনা প্রয়োজনে নিজের মনে ক্রোধ পুষে রাখা হবে” বলেন ফিউয়ারম্যান।

“মনে রাখতে হবে কোনো মানুষই ত্রুটিমুক্ত নয়। আর লম্বা সংসার জীবনে ক্ষমা করার মন-মানসিকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”

ঝগড়ার হার-জিত নিয়ে সম্পর্ক নয়, আপনারা দুজনেই একই দলে। তাই তাকে ক্ষমা করে নেতিবাচক বিষয়গুলোর ঊর্ধ্বে গিয়ে সুখী হতে পারাটাই সম্পর্কের মূলমন্ত্র। সঙ্গীর ভুলত্রুটি বিবেচনার পাশাপাশি নিজের ভুলত্রুটিও বিবেচনায় আনতে হবে।

পুরনো ঘটনা আবার তুলে আনা: স্বামী-স্ত্রী যদি তাদের ঝগড়ার সময় পুরানো ঝগড়া আবার তুলে আনেন তবে ঝগড়া শেষ হবে না কোনও দিন। আর মতে অমিল যদি সমাধান হয়েই যায় তবে তা আবার আলোচনা আনা যেন খাল কেটে কুমির আনার মতোই।

পুরনো কলহের দায় সঙ্গীর ঘাড়ে চাপানোর চেষ্টা করলে কখনই সুখী সংসার পাওয়া সম্ভব নয়। কারণ পুরানো প্রসঙ্গ তুলে আনার মাধ্যমে আপনি সেই পুরানো ঝগড়ার বোঝাপড়াকে বাতিল করে দিয়ে ঝগড়া নতুন করে শুরু করছেন। আর এবার পুরানো ঝগড়া থেকে জন্ম নেবে নতুন ঝগড়া।

সমস্যায় মনোযোগ: ঝগড়া সময় স্বভাবতই দুপক্ষের মেজাজ থাকে তুঙ্গে। এই মেজাজ নিয়ে একে-অপরের দোষ নিয়ে কাদা ছোড়াছুড়ি করলে কলহের ইতি টানা সম্ভব হবে না। তাই সমস্যায় মনোযোগ আটকে না রেখে সমাধানে মনযোগী হতে হবে। সঙ্গীকে তার সমস্যা শুধরানোর উপায় বের করতে সাহায্য করতে হবে। সঙ্গী যদি কিছু ভুলে যায় তবে তাকেই প্রশ্ন করতে পারেন কি করে তাকে মনে করিয়ে দেওয়া যায়।

কথা বন্ধ: ঝগড়ার পর কিছুটা একা সময় কাটানো অত্যন্ত জরুরি। তবে লম্বা সময় কথা না বলা, তাকে এড়িয়ে চলা, উপেক্ষা করা পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করবে। কারণ এই কাজগুলো মানুষটার ওপর মানসিক অত্যাচার করা। রাগ করে থাকা মানেই যে কথা বলা বন্ধ করতে হবে এমন নয়। বরং তাকে বুঝিয়ে বলতে পারেন আপনার কিছুটা সময় দরকার মাথা ঠাণ্ডা করার জন্য এবং তারপর আলোচনার মাধ্যমে মীমাংসা করতে হবে।

নিজেকে কষ্ট দেওয়া: কলহ দেখা দিয়েছে বলেই নিজেকে কষ্ট দেওয়ার উচিত নয়। এতে নিজেই নিজের আত্মসম্মান, আত্মনির্ভরশীলতাকে ভেঙে দিচ্ছেন। দুজন মানুষ কখনই সবক্ষেত্রে পুরোপুরি একমত হবে না, এটাই স্বাভাবিক। বরং পরস্পরের দৃষ্টিভঙ্গি জানার মাধ্যমে আপনাদের সম্পর্ক আরও গভীর হবে, আর সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। তবে ঝগড়ার পর নিজেকে দোষারোপ করতে থাকলে দিনশেষে ক্ষতিটা আপনার নিজেরই।

অপমানজনক কথা বলা: মতের অমিল হওয়া মানেই যে অন্যজন ভুল করছে- এমন নাও হতে পারে। সবারই ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ থাকে যা দুজনের ভিন্ন হলেও হয়ত কোনোটাই ভুল নয়। সেক্ষেত্রে মতের অমিলকে মেনে নিয়ে পরস্পরের ব্যক্তিগত পছন্দকে সম্মান করাই উচিত হবে। তবে আপনার মতের সঙ্গে মেলেনি বলে সঙ্গীকে অপমান করা, মনের আঘাত দিয়ে কথা বলা, দুর্ব্যবহার করা মোটেও উচিত কাজ হবে না।

আরও পড়ুন

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক