Published : 18 Jul 2026, 11:38 AM
ভৌগোলিকভাবে পাকিস্তানের বৃহত্তম প্রদেশ হওয়া সত্ত্বেও দশকের পর দশক ধরে চলা রাষ্ট্রীয় অবহেলা, লুণ্ঠন আর নির্যাতনের কারণে আজ বিচ্ছিন্নতার আগুনে জ্বলছে বেলুচিস্তান।
দক্ষিণ এশিয়ার অনেক সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে যে, বেলুচিস্তানের মানুষ নিজেদের ভূখণ্ডের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছে। অবশ্য তাদের সবাই কিছু অসমর্থিত সূত্র থেকে প্রাপ্ত খবরের কথা বলেছে। ওই সব খবর অনুযায়ী, বালুচরা নিজস্ব জাতীয় সংগীত, পতাকা ও মুদ্রা ঘোষণা করে নিজেদের সার্বভৌমত্ব প্রকাশ করেছে। এই ঘোষণার পর স্বভাবতই প্রশ্ন এসেছে—পাকিস্তানের মতো পারমাণবিক শক্তিধর ‘পরাক্রমশালী’ আঞ্চলিক শক্তির কাছ থেকে বেলুচিস্তানের মানুষ স্বাধীনতা চায় কেন?
স্বাধীনতার ৫৫ বছর পর যেমন বাংলাদেশে এখনও অনেকে এমন প্রশ্ন করে থাকেন। বিগত সাড়ে পাঁচ দশকে পাকিস্তান তো অনেক শক্তিশালী রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে, তারপরেও কেন বেলুচিস্তানের মানুষ পাকিস্তান থেকে স্বাধীনতা চায়? এই প্রশ্নের উত্তরে লুকিয়ে আছে—বাংলার মানুষ কেন পাকিস্তান থেকে মুক্তি চেয়েছিল সেই প্রশ্নে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা কেন হয়েছিল বা এই স্বাধীনতা কতটা প্রয়োজন ছিল—নতুন প্রজন্মের কাছে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর অনেকটা ঝাপসা। চাক্ষুষ স্মৃতি না থাকায় নতুন প্রজন্মের মস্তিষ্কে স্বাধীনতা নিয়ে ষড়যন্ত্রের বীজ বপন করেছে অনেকে। কারো কারো মস্তিষ্কে রীতিমতো সেই বীজ থেকে বৃহৎ আগাছা গজিয়েছে; যা কালের বিবর্তনে মস্তিষ্কের দূরদর্শিতার ওপর কালো ছায়া ফেলেছে। এই অবিমৃষ্যকারী মস্তিষ্কের জন্য শক্তিশালী থেরাপি হতে পারে বর্তমানে বেলুচিস্তানের মানুষ কেন পাকিস্তান থেকে স্বাধীনতা চায়, সেই বাস্তবতাগুলো।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার ত্যাগ এখন অনেকের কাছে এক বিস্মৃত ইতিহাসের মতো আবেগ সৃষ্টিতে ব্যর্থ হচ্ছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের বিপক্ষে যারা ঐতিহাসিকভাবে ডিনায়েলিজম (ইতিহাস অস্বীকারের প্রবণতা) চর্চা করে, তাদের কথা ধর্তব্যে না আনলেও নতুন প্রজন্মের কাছে বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রেক্ষাপট এক অদেখা ইতিহাস। এই কারণেই বলছি, যে দেশের মানুষ তিরিশ লাখ সন্তানের আত্মোৎসর্গ এবং দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রম বিসর্জনের মাধ্যমে একটি স্বাধীন সার্বভৌম ভূখণ্ড এনে দিল, সেই ইতিহাস আজ অনেককেই বিচলিত করে না। অনেকে আত্মোৎসর্গের সংখ্যা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। এমনকি যারা এই স্বাধীনতার প্রেক্ষাপটকে চক্রান্ত বলে অপপ্রচার করে, তাদের পক্ষে দাঁড়ান এবং তাদের যুক্তিতে ঠোঁট মেলান। নিরাশাবাদী হলে বলতে পারেন, এটিই হয়তো কালের অমোঘ নিয়ম। কিন্তু ইতিহাস এমন এক স্মৃতি যা সত্যের পুনরাবৃত্তি ঘটায়; নতুন উদাহরণ তৈরির মাধ্যমে সত্যকে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে নিয়ে চলে এবং তাদের ইতিহাসের শিক্ষা দেয়।
বেলুচিস্তানের চলমান স্বাধীনতার যৌক্তিকতা বাংলাদেশের ইতিহাস-বিস্মৃত জনগোষ্ঠীর জন্য সেই ইতিহাসের জীবন্ত পুনরাবৃত্তি হতে পারে। বেলুচিস্তানের মানুষের এই স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা যেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার সত্যের পুনর্মঞ্চায়ন। বাংলাদেশ কেন পাকিস্তান নামক ‘সোনার’ দেশের করাল গ্রাস থেকে স্বাধীন হতে চেয়েছিল, ৫৫ বছর পর বেলুচিস্তানের মানুষ সেই প্রশ্নের সমসাময়িক উত্তর দিচ্ছে।
যদি বেলুচদের প্রশ্ন করা হয়—পাকিস্তানের মতো পারমাণবিক শক্তিধর আঞ্চলিক শক্তির কাছ থেকে স্বাধীনতা চাও কেন? বেলুচিস্তানের মানুষ হয়তো বলবে, বেশি অতীত নয়, গত কয়েকদিন বেলুচিস্তানে পাকিস্তানের হিংস্র সেনাবাহিনী ‘শাবান’ নামে যে অভিযান চালিয়েছে, ইতোমধ্যে এই হিংস্রতার শিকার হয়েছে কয়েক ডজন বেলুচ; যাদের বাবা-মায়েরা জানেন না তাদের সন্তানদের কেন হত্যা করা হয়েছে, তাদের সন্তানরা জানে না কেন তাদের বাবাকে হত্যা করা হয়েছে। একই প্রশ্ন বেলুচিস্তানের একজন মানবাধিকার কর্মীকে জিজ্ঞেস করলে সে হয়তো বলবে, ‘পাকিস্তানের রক্তপিপাসু বাহিনী ২০২৬ সালের এপ্রিলে ১২৪ জনকে গুম ও ৫৩ জনকে বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যা করেছে; ২০২৬ সালের মার্চ মাসে এই সংখ্যা ছিল ৬৫ ও ৫০; ফেব্রুয়ারিতে ২৩৪ জনকে গুম ও ৮৭ জনকে হত্যা; এবং জানুয়ারি মাসে ১০৭টি গুম ও ৭৮টি হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে।’ হিউম্যান রাইটস কাউন্সিল অব বেলুচিস্তান (এইচআরসিবি)-এর তথ্যমতে, এ বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ২৬৮ জন বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন; অর্থাৎ মাসে গড়ে ৬৭ জনকে হত্যা করা হয়েছে। এই চার মাসে মোট ৫৩০ জন গুমের শিকার হয়েছেন; অর্থাৎ গড়ে প্রায় ১৩৩ জন। ২০২৫ সালে এই বিচারবহির্ভূত হত্যার সংখ্যা ছিল ৩৬৫ এবং গুমের শিকার হয়েছিল ৮১৪ জন। এইচআরসিবি-এর পরিসংখ্যান দিয়ে বিচার করলে বেলুচিস্তান এক মৃত্যু উপত্যকা। এভাবে দশকের পর দশক শত শত বেলুচ গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়ে আসছে। কয়েক যুগ ধরে পাকিস্তানের নিরাপত্তারক্ষীরা স্বাধীনতাকামী বেলুচদের হত্যা করে চলেছে, যা মানব ইতিহাসে অন্যতম ঘৃণ্য রাষ্ট্রীয় 'সিরিয়াল কিলিং'। ১৯৪৭ সালের পর থেকে বাঙালির সঙ্গেও পাকিস্তান একই নির্যাতন ও নিপীড়ন চালিয়েছিল। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্মের পর থেকে প্রতিটি আন্দোলনে বাঙালি তার সন্তানদের হারিয়েছে। পাকিস্তান শাসকদের নির্যাতন ও নিপীড়নের প্রতিবাদ করায় সীমাহীন অত্যাচার নেমে এসেছিল তৎকালীন বাংলার জনগণের উপর; যেমনটি চলছে বেলুচিস্তানের মানুষের ওপর।
এবার একই প্রশ্ন যদি বেলুচিস্তানের একজন সাংস্কৃতিক কর্মীকে করেন, তিনি হয়তো বলবেন, “বেলুচি-ভাষী জনগোষ্ঠীর ওপর উর্দু নামক একটি এলিয়েন ভাষা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। নিজেদের ভাষা থাকা সত্ত্বেও আমাদের উর্দু চর্চা করতে বাধ্য করা হয়েছে।” কারণ পাকিস্তান সরকার, দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদী শাসনামলের মতো, বেলুচিস্তানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে উর্দুকে পাঠদানের বাধ্যতামূলক ভাষা করেছে; ঠিক ৫৫ বছর আগে পাকিস্তানি শাসকরা পূর্ববাংলায় যেটি করতে চেয়েছিল।
“উর্দু এবং একমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা”—১৯৪৮ সালে কার্জন হলে জিন্নাহর এই ঘোষণার বিরুদ্ধে গণআন্দোলন গড়ে তুলেছিল বাংলার জনগণ। ১৯৫২ সালে বাংলার সাহসী সন্তানেরা জীবন দিয়ে তাদের ভাষার অধিকার ছিনিয়ে নেয়; যা আজ পৃথিবীর ইতিহাসে এক অনন্য উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত। বিশ্লেষকরা মনে করেন, সাংস্কৃতিক আধিপত্য বিস্তারের মাধ্যমে ঐতিহ্যগতভাবে অপেক্ষাকৃত ধর্মনিরপেক্ষ বেলুচ জাতির সংস্কৃতিতে ধর্মীয় গোড়ামি গ্রথিত করেছে পাকিস্তান। অভিযোগ রয়েছে, এই উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে পাকিস্তান সরকার বিপুল সংখ্যক ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অর্থায়ন করেছে। বেলুচিস্তানে পাকিস্তান একধরনের সাংস্কৃতিক নিধন চালাচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। অতীতে পূর্ববঙ্গে পাকিস্তান সেই একই ধর্মীয় কার্ড ব্যবহার করেছিল। সংস্কৃতির প্রশ্ন আসলেই পাকিস্তান ধর্মের নামে তাদের ওপর নিপীড়ন চালাত। বর্তমান বাংলাদেশে পাকিস্তানের ভূমিকা সেই একই দোষে দুষ্ট বললেও অত্যুক্তি হবে না; অর্থাৎ সাংস্কৃতিক নিপীড়ন পাকিস্তান রাষ্ট্রের ‘ডিএনএ’তে রয়েছে।
এবার ‘বেলুচিস্তানের মানুষ কেন স্বাধীনতা চায়’—এই প্রশ্ন একজন অর্থনীতিবিদকে করলে তিনি হয়তো বলবেন, পাকিস্তানের শোষণের কারণে সেখানে দারিদ্র্যের হার উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে ৪৭ শতাংশে পৌঁছেছে; যা শুধু পাকিস্তানের মধ্যে সর্বোচ্চ নয়, বেলুচিস্তানের দারিদ্র্যের হার পাকিস্তানের জাতীয় গড়ের (২৮.৯ শতাংশ) প্রায় দ্বিগুণ। অভিযোগ করা হয়, দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক অবহেলা এবং রাষ্ট্রের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত উদাসীনতা এই ভয়াবহ অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের কারণ। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, তামা, সোনা ও গ্যাসের মতো প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও বেলুচিস্তানের মানুষ পাকিস্তানের সবচেয়ে গরিব মানুষ। বেলুচিস্তানের পরিস্থিতি স্বাধীনতাপূর্ব বাংলাদেশে পাকিস্তানের অর্থনৈতিক শোষণকে প্রতিফলিত করে। গবেষণায় দেখা যায় যে, তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানে যেসব শিল্পকারখানার যন্ত্রপাতি ও ভোগ্যপণ্য আমদানি করা হতো, তার ব্যয়ভার মূলত পূর্ব পাকিস্তানকেই বহন করতে হতো।
২০১৫ সালে খোদ পাকিস্তানের ‘পাঞ্জাব ইউনিভার্সিটি হিস্টোরিক্যাল সোসাইটির জার্নালে’ প্রকাশিত একটি গবেষণায় আরও উল্লেখ করা হয়—বিদেশ থেকে প্রাপ্ত সহায়তার অর্থ বণ্টন করার সময়ও বাংলার প্রতি বৈষম্য করা হয়েছিল। পাকিস্তান ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন, পাকিস্তান ইন্ডাস্ট্রিয়াল ক্রেডিট অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট কর্পোরেশন এবং ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের মাধ্যমে প্রাপ্ত বৈদেশিক সম্পদের ৭৭ শতাংশই পশ্চিম পাকিস্তানে ব্যয় করা হয়, যেখানে পূর্ব পাকিস্তানকে দেওয়া হয়েছিল বাকি মাত্র ২৩ শতাংশ। এছাড়াও, কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে আসা বৈদেশিক সহায়তার সিংহভাগই প্রকৃতপক্ষে পশ্চিম পাকিস্তানে ব্যয় করা হতো। ওই গবেষণায় আরও উল্লেখ করা হয়, ১৯৫৪-১৯৬৫ সালের মধ্যে প্রাপ্ত প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার মূল্যের মার্কিন সামরিক সহায়তা অধিকাংশ পশ্চিম পাকিস্তানের কল্যাণে ব্যয় করা হয়। এই বৈষম্যের প্রেক্ষাপটে স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ দাবি জানায় যে, পশ্চিম পাকিস্তানে সংরক্ষিত ৪ বিলিয়ন ডলারের ব্যাংক ঋণ, স্বাধীনতা-পূর্বকালীন বৈদেশিক মুদ্রা এবং অস্থাবর সম্পদের একটি অংশের ওপর তাদের অধিকার রয়েছে; কারণ বাংলার ৫৫ শতাংশ মানুষের পরিশ্রমের একটা বড় অংশ সেখানে মজুত ছিল।
সর্বোপরি বলা যায়, বেলুচিস্তান এখন রাষ্ট্রীয় হত্যা, নির্যাতন, গুমসহ বহু অত্যাচার ও অনাচারের রক্তাক্ত ভূমি। ঠিক সাড়ে পাঁচ দশক আগে বাংলাদেশ ছিল তেমনই এক রক্তাক্ত ভূখণ্ড। আজ অর্ধশতাব্দী পরে আজও অনেককে প্রশ্ন করতে শোনা যায়, ‘পাকিস্তান থেকে আমরা কেন স্বাধীন হলাম?’ এই স্বাধীনতা ভুল ছিল বলেও অনেকে আক্ষেপ করে থাকেন। সাড়ে পাঁচ দশক আগে সংঘটিত এই রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ যেহেতু পুনঃপ্রচার করে দেখানো সম্ভব নয়, তাই বেলুচিস্তান হতে পারে বাঙালির মুক্তিযুদ্ধের জীবন্ত উদাহরণ। কারণ, বেলুচিস্তানের মানুষের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্ক্ষাকে প্রতিফলিত করে। বেলুচদের বিরুদ্ধে পরিচালিত এই সামরিক অভিযান, নিয়মিত গুম ও হত্যা ৫৫ বছর আগের বাংলাদেশকে চিত্রায়িত করে। ভৌগোলিক অবস্থান ছাড়া বেলুচদের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের এই শোষণের কৌশল ও হাতিয়ার একই। দখলদার পাকিস্তান সরকার বেলুচিস্তানের মানুষের সঙ্গে যা করে চলেছে, ৫৫ বছর আগে পাকিস্তান বাংলার মানুষের সঙ্গে একই আচরণ করেছিল। তাই হলফ করে বলা যায়, বাংলার মানুষ স্বাধীনতা অর্জন করতে ব্যর্থ হলে এই নির্মমতা একইরূপে আমাদের ওপর আজও বিরাজমান থাকত। রক্তাক্ত স্বাধীনতার স্মৃতিবিস্মৃত জনগোষ্ঠীর জন্য এর চেয়ে জীবন্ত উদাহরণ আর হতে পারে না।
এম. টি. ইসলাম শিক্ষক ও গবেষক। ই-মেইল: [email protected]