Published : 18 Jul 2026, 12:20 PM
মেঘ-রোদ্দুরের খেলার মাঝেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার বকুলতলায় ঢল নামে মানুষের। এই শহরের নানা বয়সের, নানা পেশার মানুষ জড়ো হয় বর্ষা উদযাপনে।
একুশে পদকপ্রাপ্ত নৃত্যশিল্পী ও কোরিওগ্রাফার অর্থী আহমেদের ড্যান্স একাডেমি ও চারুকলা অনুষদের আয়োজনে নৃত্যানুষ্ঠান ‘ঘনঘটা ২’ অনুষ্ঠিত হয়ে গেল শুক্রবার।
সেখানে কেউ আসেন বন্ধুকে নিয়ে, কেউ বা সপরিবারে; সাদা, সবুজ ও নীল রঙা শাড়ি আর পাঞ্জাবিতে বকুলতলা সেজে ওঠে বর্ষার আবহে।
যেখানে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ছিল শিশু ও প্রথমবারের মত মঞ্চে ওঠা নৃত্যশিল্পীরা; এছাড়া চিকিৎসক, প্রকৌশলী, শিক্ষক, সাংবাদিক, গবেষক ও গৃহিণীসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ।
৯০ মিনিটের বর্ণিল অনুষ্ঠানে ১৬টি নাচ পরিবেশন করা হয়। শুরু হয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘মেঘ বলেছে যাব যাব’ গানের সঙ্গে পরিবেশনা দিয়ে।
এছাড়া রবি ঠাকুরের ‘আজি ঝরো ঝরো মুখর বাদরদিনে’, ‘পাগলা হাওয়ার বাদল-দিনে’, ‘এসো শ্যামল সুন্দর’, ‘রুম্ ঝুম্’, ‘মোর ভাবনারে কী হাওয়ায় মাতালো’সহ কাজী নজরুল ইসলাম এবং বাংলার লোকজ ঐতিহ্য থেকে অনুপ্রাণিত এসব পরিবেশনায় অংশ নেন ৩ থেকে ৭০ বছর বয়সী প্রায় ৩০০ শিল্পী।
পরিবেশনা শেষ হয় ‘আমরা সবাই রাজা’ দিয়ে।
তবে আয়োজন কেবল বর্ষা উদযাপনের মধ্যেই আটকে থাকেনি। সেখানে সাম্প্রতিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সহায়তায় তহবিলও সংগ্রহ করা হয়।
আয়োজন নিয়ে অর্থী আহমেদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, "যখন আমি প্রথম এই আয়োজনটা করি, তখন আমার ইচ্ছা ছিল শহরের মানুষকে আসলে বর্ষাটাকে কীভাবে উদযাপন করা যায় তা দেখানো। কারণ শহরের মানুষের কাছে বর্ষাটা খুব বিরক্তিকর একটা ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্ষা মানে কাদামাটি, বর্ষা মানে জলাবদ্ধতা, বর্ষা মানে ট্রাফিক—সবকিছু। তো সেই জায়গা থেকে, বর্ষাকে কীভাবে খোলা আকাশের নিচে উদযাপন করা যায়, সেটাই ছিল আমার ইচ্ছা।"
তিনি আরও বলেন, "গত বছর আমরা যখন ‘ঘনঘটা ১’ করি, তখন শিল্পী সংখ্যা কম ছিল—১১০ জন শিল্পী ছিলেন। আমরা তখনও এত দর্শক প্রত্যাশা করিনি, কিন্তু তখনও প্রাঙ্গণ প্রায় ভরে গিয়েছিল। গত বছর বৃষ্টি হয়েছিল, এবার দুর্ভাগ্যবশত বৃষ্টি হয়নি। কিন্তু আমার ধারণা, শিল্পীরা তাদের পরিশ্রম এবং নাচের মাধ্যমে দর্শকদের মন ভিজিয়ে দিয়েছেন।"
তিনি জানিয়েছেন, গত বছরের প্রথম ‘ঘনঘটা’ অনুষ্ঠানের দারুণ সাড়াই এবার আরও বড় পরিসরে এই মানবিক ও সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনটি আয়োজন করতে অনুপ্রাণিত করেছে।
নাচ শেখার ক্ষেত্রে বয়স ও সামাজিক জড়তা ভাঙার এই উদ্যোগ নিয়ে অর্থী আহমেদ বলেন, "এটি মূলত একটি পরীক্ষামূলক প্রজেক্ট ছিল। অনেকেই তার কাছে আক্ষেপ করে বলতেন যে, নাচ শেখার ইচ্ছা থাকলেও মানুষ ‘জাজ’ বা বিচার করবে—এই ভয়ে তারা কোনো ক্লাসে যেতে পারেন না।"
সেই ভাবনা থেকে একটি ব্যতিক্রমী কারিকুলাম তৈরির কথা উল্লেখ তুলে ধরে অর্থী আহমেদ বলেন, "আমি চেয়েছিলাম যেখানে বড়রা সুবিধাজনক উপায়ে নাচ শিখতে পারবে; যেখানে কেউ তাদের জাজ করবে না, ভুল করলে হাসাহাসি করবে না এবং কেউ বডি শেমিং করবে না। আমি একটি নন-জাজমেন্টাল কমিউনিটি চেয়েছিলাম। সেটার জন্যই আমরা করোনার মধ্যে ‘অ্যাডাল্ট বিগিনার্স’ শুরু করি।"
তিনি জানিয়েছেন, গত কয়েক বছরে ৩ থেকে ৭০ বছর বয়সী ১ হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থী তাদের এখানে যুক্ত হয়েছেন এবং বর্তমানে আরও প্রায় ৫ হাজার মানুষ ভর্তির জন্য অপেক্ষমাণ তালিকায় রয়েছেন।
তিনি বলেন, "তাহলে বোঝা যায় যে, বয়স বাড়লেও কত মানুষ আসলে সংস্কৃতি চর্চা করতে চায়। আমরা সেই উপযুক্ত সুযোগটা করে দিচ্ছি না। তবে আমি খুবই আনন্দিত যে, এখন আমাকে দেখে অনেকেই ‘অ্যাডাল্ট বিগিনার্স’ কোর্স শুরু করেছেন। এতে সবার শেখার সুযোগ অনেক বেড়েছে।"
বকুলতলার উপচে পড়া ভিড় নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করে এই নৃত্যশিল্পী বলেন, "আজকের প্রোগ্রামে এত দর্শক হবে এটা আমরা আসলে ভাবিনি। বৃষ্টির মধ্যে আসলে ছাতা বাসায় রেখে আসতে বলেছি, ড্রেস কোড করে দিয়েছি—মানে অনেক বিধিনিষেধ ছিল, তার মধ্যে তো এত মানুষের আসার কথা না। আমরা আসলে ২ থেকে ৩ হাজার মানুষের আয়োজন করেছিলাম, কিন্তু এখন সামনে তাকিয়ে দেখছি মানুষের সমুদ্র। আগামী বছর হয়তো একটু রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া রেখে এই ভিড় নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।"
অনুষ্ঠানটি দেখতে আসা দর্শকদের মধ্যেও ছিল দারুণ উৎসাহ। বকুলতলার উপচে পড়া ভিড়ে দাঁড়িয়ে পুরো অনুষ্ঠান উপভোগ করেন স্বপ্না।
তিনি বলেন, "শহরের যান্ত্রিক জীবনে আমরা আসলে বর্ষার রূপ দেখার সুযোগ পাই না। চারুকলার এই আয়োজনটা এক মুহূর্তের জন্য হলেও নাগরিক ক্লান্তি ভুলিয়ে দিয়েছে। সবচেয়ে ভালো লেগেছে, এখানে একদম ছোট বাচ্চা থেকে শুরু করে বয়স্ক মানুষ—সবাই কত স্বতঃস্ফূর্তভাবে নাচছেন। কোনো কৃত্রিমতা ছিল না পরিবেশনায়।"
আরেক দর্শক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফারিহা তাসনিম বলেন, "বন্যার্তদের সহায়তার জন্য ফান্ড সংগ্রহের যে মানবিক উদ্যোগটি এর সাথে যুক্ত করা হয়েছে, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। সংস্কৃতির সাথে মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার এই মেলবন্ধন আমাদের খুব অনুপ্রাণিত করে। বৃষ্টি না হলেও বকুলতলার পরিবেশটা পুরোপুরি মেঘলা দিনের আমেজ তৈরি করেছিল।"