১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

প্রতিভায় বহুমুখী, অঙ্গীকারে অবিচল

বদিউর রহমান ছিলেন সমাজ-পরিবর্তনে অঙ্গীকারাবদ্ধ। সমাজের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কটা সেবকের ছিল না, ছিল না সংস্কারকেরও, সেটি ছিল বিদ্যমান সমাজে বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটানোর; পরিষ্কার অর্থে সামাজিক বিপ্লবের।

প্রতিভায় বহুমুখী, অঙ্গীকারে অবিচল
কর্মই ছিল তাঁর জীবন, এবং কর্মেই তাঁর পরিচয়। তবে নিজের কাজ জাহির করার স্বভাব বদিউর রহমানের কখনোই ছিল না।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

Published : 17 Jul 2026, 10:12 AM

Updated : 11 Sep 2026, 03:40 PM

বদিউর রহমানকে মনে হবে নিভৃতচারী একজন মানুষ। এক অর্থে সেটা তিনি ছিলেন বৈকি। কাজের মানুষ ছিলেন, অনেক কাজ এবং বহুধরনের কাজ করেছেন, কিন্তু নিজেকে জাহির করেননি কখনোই। কাজের ভেতরেই থাকতে চেয়েছেন এবং ছিলেনও; কাজই ছিল সামনে, কাজের মানুষটি কাজের অভ্যন্তরেই থাকতে ভালোবাসতেন। কর্মই ছিল তাঁর জীবন, এবং কর্মেই তাঁর পরিচয়। কিন্তু তাঁর সকল কাজের ভেতরেই একটি ঐক্য ছিল, ছিল একটি লক্ষ্যও। বদিউর রহমান ছিলেন সমাজ-পরিবর্তনে অঙ্গীকারাবদ্ধ। সমাজের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কটা সেবকের ছিল না, ছিল না সংস্কারকেরও, সেটি ছিল বিদ্যমান সমাজে বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটানোর; পরিষ্কার অর্থে সামাজিক বিপ্লবের। ওদিকে শাসকশ্রেণির স্বার্থের পাহারাদার রাষ্ট্র যেহেতু ছিল শোষণ-ভিত্তিক বিদ্যমান সমাজব্যবস্থার সংরক্ষক, কর্মজীবনের প্রারম্ভেই তাই তাঁকে পড়তে হয় রাষ্ট্রর বৈরী দৃষ্টিতে।

এমএ পাস করার পরপরই তিনি শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন, নিজের শহর বরিশালেই। তাঁর প্রথম নিযুক্তি সৈয়দ হাতেম আলী কলেজে। সেটি ১৯৬৮ সালের ঘটনা। সময়টা ছিল সামরিক শাসনবিরোধী উনসত্তরের অভূতপূর্ব গণ-অভ্যুত্থানের। ছাত্রজীবনেই তিনি যুক্ত ছিলেন বাম ধারার সঙ্গে, পরে সরাসরি যোগ দেন কমিউনিস্ট পার্টিতে। সরকারের গোয়েন্দাবাহিনীর কাছে তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় অজানা ছিল না। সে-কারণে অচিরেই তিনি চাকরিচ্যুত হন। একাত্তরে তিনি যে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেবেন সেটা ছিল খুবই স্বাভাবিক, এবং অবধারিত। এবং সেই কাজটিই তিনি করেছেন। দেশের ভেতরে থেকেই ছিলেন; সক্রিয় ছিলেন গেরিলা বাহিনী গড়ে তোলায়। স্বাধীনতার পর পুনর্নিয়োগ পান আগের কলেজে, সেখান থেকে যান সরকারি ব্রজমোহন কলেজে। কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়টি তো তাঁর সঙ্গেই ছিল, যে জন্য দেখি ২০০১ সালে সরকারি সমর্থনে-পুষ্ট ছাত্র সংগঠনের ছেলেরা অস্বাভাবিক একটি ঘটনা ঘটায়, কলেজের অধ্যাপক বদিউর রহমানকে তারা ‘অবাঞ্ছিত’ ঘোষণা করে; এবং সাত দিনের মধ্যেই তাঁকে বদলি করা হয় খুলনার ব্রজলাল কলেজে। সেখান থেকেই তিনি অবসরে যান।

অন্য কোনো কাজ না করে শুধু শিক্ষকতাতেই যদি নিয়োজিত থাকতেন তাহলেও একজন সফল ও প্রভাবশালী অধ্যাপক হিসেবে তাঁর সুনামের অভাব ঘটতো না, এবং নিজের জীবনকে চরিতার্থ বোধ করতেও অসুবিধা হতো না। কিন্তু বদিউর রহমান তো কেবল একজন শিক্ষক হিসেবে জীবন কাটাবার জন্য জন্মগ্রহণ করেননি। তাঁর দায়িত্ব ও কর্তব্য ছিল বহুধাবিস্তৃত। সে জন্য অধ্যাপনার পাশাপাশি তিনি সাহিত্যচর্চা এবং সাংস্কৃতিক কার্যক্রমেও সমানতালে অংশ গ্রহণ করেছেন। যুক্ত ছিলেন এমনকি সাংবাদিকতাতেও। সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রে বদিউর রহমান এমন কিছু কাজ করেছেন যেগুলো ছিল একাধারে দুরূহ ও প্রয়োজনীয়। এর মধ্যে রয়েছে অনুবাদ এবং সম্পাদনা। মৌলিক রচনাতো আছেই।

উদীচীর সম্মেলনে বক্তব্য রাখছেন বদিউর রহমান।

উদীচীর সম্মেলনে বক্তব্য রাখছেন বদিউর রহমান।

সাহিত্যের অধ্যাপনা এবং সাহিত্যের তত্ত্ব শিক্ষার্থী এবং সাহিত্যপাঠকের জন্য পরিষ্কার ভাবে উপস্থাপন এক জিনিস নয়। দ্বিতীয় কাজটি কঠিনতর। বদিউর রহমান ওই কাজটিও করেছেন। তাঁর লেখা সাহিত্য স্বরূপ গ্রন্থটি যে একটি উপকারী রচনা তার প্রমাণ রয়েছে পরপর পাঁচটি সংস্করণ প্রকাশে। তাঁর সংগৃহীত ও সম্পাদিত সাহিত্য সংজ্ঞা অভিধানটি তৃতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয়ে গেছে ২০১৬ সালেই। প্লেটো, এ্যারিস্টটল, হোরেস, লঙ্গিনাস থেকে শুরু করে ই এম ফর্স্টারের সাহিত্য বিষয়ক রচনা তিনি অনুবাদ করেছেন। রালফ ফক্সের লেখা উপন্যাস ও জনগণ গ্রন্থটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় এবং দুষ্প্রাপ্য একটি রচনা; বদিউর রহমান সেটি সংগ্রহ করেছেন এবং অনুবাদ করে পাঠকদের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। গ্রন্থটির দ্বিতীয় সংস্করণ দ্রুতই প্রকাশিত হয়েছে।

অনুবাদের কাজটাকে বাইরে থেকে মনে হয় সহজ, কিন্তু আসলে সেটা অত্যন্ত পরিশ্রম সাপেক্ষ। বদিউর রহমান কেবল সাহিত্যতত্ত্বের গ্রন্থ নয়, বিজ্ঞান এবং দর্শনের গ্রন্থও অনুবাদ করেছেন ঈষণীয় দক্ষতায়। একক উদ্যোগে ভেদার্থ শব্দযথা এবং বাংলা বিপরীতার্থক শব্দকোষ ধরনের গ্রন্থরচনার চিন্তা অন্যকেউ করেননি, বদিউর রহমান করেছেন; এবং কাজটি অভিনিবেশ ও যত্নের সঙ্গে সম্পন্ন করা হয়েছে। নয় খণ্ডে সত্যেন সেন রচনাবলী এবং সাত খণ্ডে প্রমথ চৌধুরী রচনাবলী সম্পাদনার কাজ দু’টিও নিশ্চয়ই সহজ ছিল না; সে-কাজও তিনি করে গেছেন।

যেটা বিশেষভাবে লক্ষণীয় তা হলো এমন অনেক রচনা তিনি সংগ্রহ ও সম্পাদনা করেছেন যেগুলো তিনি না করলে অন্যকেউ হয়তো করতো না; রচনাগুলো অনুপস্থিত থাকতো এবং অনেকাংশ হয়তো হারিয়েই যেত। যেমন, মুকুন্দ দাসের এবং অশ্বিনীকুমার দত্তের রচনাবলী, রণেশ দাসগুপ্তের অনুবাদ কবিতা এবং অগ্রন্থিত রচনা, সত্যেন সেনের ইতিহাস ও বিজ্ঞান বিষয়ক রচনাবলী এবং তাঁর অগ্রন্থিত উপন্যাস ‘নাগিনীরা চারিদিকে’। কে জানে ‘মনোরমা মাসিমা’র পূর্ণ জীবনী রচিত হতো কি না, বদিউর রহমান এগিয়ে না এলে।

সর্বডানে বদিউর রহমান।

সর্বডানে বদিউর রহমান।

সংগঠক হিসেবেও বদিউর রহমান ছিলেন অসাধারণ। বরিশাল শহরে বিভিন্ন ধারায় বহু সাংস্কৃতিক গঠনের সঙ্গে তিনি যুক্ত ছিলেন; কোনো কোনোটির তিনি প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, অন্য অনেক ক’টির সভাপতি, সম্পাদক, নির্বাহী সদস্য। মোট কথা, তাঁর সময়ে বরিশাল শহরের সাংস্কৃতিক জীবনের কথা মনে হয় ভাবাই যেত না বদিউর রহমানকে বাদ দিয়ে। সেই সঙ্গে সক্রিয়ভাবে তিনি যুক্ত ছিলেন জাতীয় পর্যায়ে সাংস্কৃতিক আন্দোলনের প্রগতিশীল ধারার উল্লেখযোগ্য কয়েকটি সংগঠনের সঙ্গে। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি ছিলেন উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি।

যোগ ছিল তাঁর সাংবাদিকতার সঙ্গেও। একাধিক জাতীয় সংবাদপত্রের এবং সংবাদ-সংস্থায় স্থানীয় ও আঞ্চলিক প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেছেন। উপ-সম্পাদকীয় লিখেছেন। এবং শিক্ষকতা থেকে অবসর গ্রহণের পর ঢাকায় এসে একটি দৈনিক পত্রিকার যুগ্ম-সম্পাদকের এবং পরবর্তীতে অপর একটি দৈনিকের নির্বাহী সম্পাদকের দায়িত্ব নিয়েছিলেন।

ব্যক্তিগত পর্যায়ে তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয় ঢাকা শহরেই, এবং যখন থেকে তিনি এখানে থাকা ও কাজ শুরু করেন তখন থেকেই। আমি মুগ্ধ হয়েছি তাঁর বহুমুখিতা এবং শ্রমশীলতা দেখে। কাজ থেকে তিনি কখনোই অবসর নেননি, কিন্তু কাজ তাঁকে যে পরিশ্রান্ত করবে এমনটাও ঘটেনি। অক্লান্ত ছিলেন, কিন্তু কাজের ভার বহন করতেন খুব সহজে। রুচির স্নিগ্ধতার ক্ষেত্রেও তিনি ছিলেন বিরল এক দৃষ্টান্ত।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।