Published : 16 Jul 2026, 06:39 PM
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আবারও সংঘাত শুরু হওয়ায় বিশ্বজুড়ে মানুষের দৃষ্টি ফের এই সংঘাতের তাৎক্ষণিক ঝুঁকির দিকে নিবদ্ধ হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে অসংখ্য পরিবার ভয়, অনিশ্চয়তা ও সহিংসতার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। অনেক সম্প্রদায়ের স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হয়েছে, মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে এবং যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ তাদের জীবনে গভীর ক্ষত তৈরি করেছে। এই মুহূর্তে মানুষের জীবন রক্ষা করাই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।
তবে আগামী কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহে যা-ই ঘটুক না কেন, এই সংকট থেকে পাওয়া প্রধানতম শিক্ষাটি একই থাকবে। এই সংঘাত বৈশ্বিক অর্থনীতির একটি কাঠামোগত দুর্বলতাকে স্পষ্ট করে দিয়েছে। যতদিন বিশ্বের দেশগুলো জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল থাকবে, ততদিন পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তে তৈরি হওয়া অস্থিতিশীলতা সারা বিশ্বের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
পাশাপাশি আরেকটি বিষয়ও স্পষ্ট হয়েছে। বিকেন্দ্রীকৃত নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবস্থায় রূপান্তর এখন আর শুধু পরিবেশগত প্রয়োজন নয়, বরং এটি ক্রমেই অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা গড়ে তোলার একটি অপরিহার্য ভিত্তি হয়ে উঠছে।
গ্রিনপিস ইন্টারন্যাশনালের নির্বাহী পরিচালক হিসেবে আমি নিয়মিত আমাদের বৈশ্বিক নেটওয়ার্কে কর্মরত সহকর্মীদের সঙ্গে কথা বলি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানবিরোধী যুদ্ধের প্রভাব কীভাবে বিশ্বের নানা প্রান্তে অনুভূত হচ্ছে, তা তাদের বর্ণনায় উঠে এসেছে।
পূর্ব এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জ্বালানির দাম বেড়েছে। আমদানি করা তেল ও গ্যাসের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল দেশগুলোতে এর ফলে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে এবং পরিবারের দৈনন্দিন ব্যয়ের ওপর চাপ আরও তীব্র হয়েছে। আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকাজুড়ে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এমন সব জনগোষ্ঠীর ওপর অতিরিক্ত বোঝা চাপিয়েছে, যারা আগে থেকেই দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করছে। অন্যদিকে ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা এবং অস্ট্রেলিয়ায় জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি, পরিবহন খরচ, বিদ্যুৎ বিল এবং শেষ পর্যন্ত নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও বাড়িয়ে দিয়েছে।
জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ফলে যে মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি হয়, তাকে ‘ফসিলফ্লেশন’ বলা হয়।
কোনো দেশের অর্থনীতি যত বেশি জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল হবে, তার নিজস্ব সীমানার বাইরে ঘটে যাওয়া অস্থিরতা ও সংকটের প্রভাবে সেটি তত বেশি ঝুঁকির মুখে পড়বে। এর বিপরীতটিও সমানভাবে সত্য। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার যত বাড়বে, আন্তর্জাতিক সংকট ও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন ব্যয়ের মধ্যে থাকা সেই নির্ভরতার সম্পর্ক তত দুর্বল হবে। ফলে দেশ আরও সহনশীল, জ্বালানি-নিরাপদ এবং জ্বালানি ক্ষেত্রে আরও স্বনির্ভর হয়ে উঠবে।
অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কোঅপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (OECD) সতর্ক করে বলেছে, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি বাড়াচ্ছে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে দুর্বল করে দিচ্ছে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পরিবহন ব্যয়, বিদ্যুৎ বিল এবং ভোক্তা পর্যায়ের পণ্যের দামেও পড়ছে। সংস্থাটি আরও জানিয়েছে, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির চাপ থেকে পরিবার ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে সুরক্ষা দিতে অন্তত ৪৬টি দেশের সরকার ইতোমধ্যেই জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল, বিশ্ব ব্যাংক এবং বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি সতর্ক করেছে যে তেল, গ্যাস ও সারের মূল্যবৃদ্ধির কারণে বিশ্বজুড়ে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা আরও বাড়ছে।
পৃথক এক মূল্যায়নে জানা গেছে, এই পরিস্থিতির কারণে অতিরিক্ত ৪ কোটি ৫০ লাখ (৪৫ মিলিয়ন) মানুষ তীব্র খাদ্যসংকট বা তীব্র ক্ষুধার মুখে পড়তে পারে। একে প্রায়শই ভূরাজনীতির একটি দুর্ভাগ্যজনক পরিণতি হিসেবে তুলে ধরা হলেও, বাস্তবে তা জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক ব্যবস্থারই একটি অন্তর্নিহিত বৈশিষ্ট্য। সংঘাত এবং জ্বালানি সংকটের পরিস্থিতিকে নিজেদের অনুকূলে কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে এই শিল্প অত্যন্ত দক্ষ হয়ে উঠেছে।
বারবার দেখা গেছে, অস্থিতিশীলতা এবং দামের অস্বাভাবিক ওঠানামা (প্রাইস ভোলাটিলিটি) জীবাশ্ম জ্বালানি কোম্পানিগুলোর জন্য বিপুল অপ্রত্যাশিত মুনাফা (উইন্ডফল প্রফিট) বয়ে এনেছে। ‘রিস্টাড এনার্জি’র তথ্যভিত্তিক এক বিশ্লেষণে দেখা যায়, যুদ্ধ শুরুর প্রথম মাসেই বিশ্বের শীর্ষ ১০০টি তেল ও গ্যাস কোম্পানি প্রতি ঘণ্টায় ৩ কোটি ডলারেরও বেশি উইন্ডফল প্রফিট অর্জন করেছে।
সংকট যখন এই ব্যবস্থার ভঙ্গুরতা স্পষ্ট করে তোলে, তখন শিল্পখাতের প্রতিক্রিয়া প্রায় সব সময়ই একই রকম হয়। তারা আরও বেশি তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন (ড্রিলিং), আরও পাইপলাইন নির্মাণ, দ্রুত অনুমোদন, বেশি সরকারি ভর্তুকি এবং পরিবেশ সুরক্ষার নিয়মকানুন শিথিল করার দাবি তোলে।
যে সংকটগুলো জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীলতার মূল্য ও ঝুঁকি স্পষ্ট করে তোলে, ওই সংকটগুলোকেই আবার এই নির্ভরশীলতা আরও বাড়ানোর যৌক্তিকতা হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এটাই জীবাশ্ম জ্বালানি শিল্পের প্লেবুক: প্রথমে অস্থিরতা ও সংকটকে মুনাফায় পরিণত করা, তারপর ওই অস্থিরতাকেই অজুহাত বানিয়ে এমন একটি ব্যবস্থাকে আরও বিস্তৃত করার দাবি তোলা, যা শুরু থেকেই এই ভঙ্গুরতা ও ঝুঁকির সৃষ্টি করেছে।
ফলাফল হলো এমন একটি চক্র, যা সমাজকে বারবার অর্থনৈতিক ধাক্কার মুখে ফেলে। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, যে শক্তিগুলো সমাজকে অস্থিতিশীল করে তুলছে, শেষ পর্যন্ত ওই শক্তিগুলোকেই জনগণের অর্থ দিয়ে ভর্তুকি দেওয়া হয়।
এই নির্দিষ্ট সংঘাতের অবসান হলেও, হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত থাকলেও এবং জ্বালানি বাজার স্থিতিশীল হয়ে গেলেও মূল ঝুঁকি থেকেই যাবে। পরবর্তী সংকটের উৎস হতে পারে অন্য কোনো সংঘাত, নতুন কোনো ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, সরবরাহে নতুন সীমাবদ্ধতা কিংবা কোনো চরম আবহাওয়াজনিত ঘটনা। যতদিন অর্থনীতি এমন জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল থাকবে যা ঝুঁকিপূর্ণ বৈশ্বিক বাজারের মাধ্যমে কেনাবেচা হয়, ততদিন সাধারণ মানুষ ও পরিবারগুলোর জীবন তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা নানা শক্তির প্রভাবের মুখে অরক্ষিতই থেকে যাবে।
এ কারণেই আলোচনা শুধু যুদ্ধবিরতি, নৌপথ সচল রাখা বা স্বল্পমেয়াদি দামের ওঠানামার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়; একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা গড়ে তোলার প্রশ্নটিকেও আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসতে হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে প্রায়শই শুধু জলবায়ু সংকটের সমাধান হিসেবে দেখা হয়। অথচ এখন তা অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অন্যতম কার্যকর পথ হিসেবেও ক্রমশ প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে।
প্রতিটি রুফটপ সোলার সিস্টেম, ব্যাটারি, ইলেকট্রিক বাস এবং জ্বালানি সাশ্রয়ী ভবন ভূরাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও পরিবারের ব্যয় বৃদ্ধির মধ্যকার সম্পর্ককে আরও দুর্বল করে। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত নবায়নযোগ্য জ্বালানি কোনো অবরোধ, নিষেধাজ্ঞা কিংবা আন্তর্জাতিক সংঘাতের ক্রসফায়ারের শিকার হতে পারে না। এটি অস্থির জ্বালানি বাজারের ওপর নির্ভরশীলতা কমায় এবং জ্বালানি খাতে আত্মনির্ভরশীলতা আরও শক্তিশালী করে।
যেসব দেশ দ্রুত বিকেন্দ্রীকৃত নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবস্থায় রূপান্তর ঘটাতে পারবে, তারা ভবিষ্যতের জীবাশ্ম জ্বালানিজনিত ধাক্কা থেকে অনেকটাই সুরক্ষিত থাকবে। আর যেসব দেশ জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীলই থেকে যাবে, তাদের বারবার ফসিলফ্লেশন (জীবাশ্ম জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিজনিত মূল্যস্ফীতি)-এর পুনরাবৃত্ত চক্রের মুখোমুখি হতে হবে।
ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ থেকে সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীলতা যে অর্থনৈতিক অনিরাপত্তা তৈরি করে, সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম থেকে যুদ্ধের খবর সরে যাওয়ার অনেক পরও ওই অনিরাপত্তা রয়ে যাবে।
আরও শান্তিপূর্ণ, নিরাপদ এবং স্থিতিশীল ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে শুধু একেকটি সংঘাতের অবসান ঘটালেই হবে না। এর জন্য এমন একটি জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যা বিশ্বের এক অঞ্চলের সংকটের আর্থিক বোঝা অন্য প্রান্তের সাধারণ মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার সুযোগ আর তৈরি করবে না।
লেখাটি আল জাজিরা থেকে অনূদিত; এর লেখক ম্যাডস ফ্লারুপ ক্রিস্টেনসেন বর্তমানে গ্রিনপিস ইন্টারন্যাশনালের অন্তর্বর্তীকালীন (ইন্টারিম) এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর। এর আগে তিনি ২০১৫ থেকে ২০১৬ সালেও একই দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯২ সালে যুব স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে গ্রিনপিসে যোগ দিয়ে তিনি সংস্থাটির বৈশ্বিক নেটওয়ার্কে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। গ্রিনপিস নর্ডিকের এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর হিসেবে ১৫ বছর কাজ করেছেন এবং ‘আর্কটিক ৩০’ অভিযানে গ্রেপ্তার হওয়া কর্মী ও স্বেচ্ছাসেবকদের মুক্ত করার উদ্যোগে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তিনি আমাজন ও গ্রিনল্যান্ডে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সঙ্গে কাজ করেছেন, তরুণ জলবায়ু নেতাদের সহায়তা করেছেন এবং ডেনমার্কের সামাজিক পরিবর্তন ও সবুজ রূপান্তর নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংস্থার পরিচালনা পর্ষদের সদস্য ছিলেন।