Published : 16 Jul 2026, 09:26 PM
ঢাকার কিছু কাঁচাবাজারে আলাদাভাবে বিক্রি হয় মাছের ডিম, যার চাহিদা ও দাম দিন দিন বৃদ্ধি পাওয়ার কথা বলেছেন ক্রেতা-বিক্রেতারা।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, মাসের ব্যবধানে বিভিন্ন মাছের ডিমের দাম কেজিতে ১০০ থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। আর বাড়ার কারণ হিসেবে বরাবরের মতোই সরবরাহ কমে যাওয়ার যুক্তি শুনিয়েছেন তারা।
কারওয়ান বাজারের মাছের আড়তে প্রধান ফটকের মুখেই রয়েছে জমির আহমদের মাছের আড়ত। তিনি ইলিশের আড়তদার। বিভিন্ন আকারের ইলিশ মাছ পাওয়া যায় তার দোকানে। বৃহস্পতিবার সকাল ৯টায় ওখানে কথা হয় তার সঙ্গে।
এ মাছ ব্যবসায়ী বলেন, তার আড়তে ইলিশের চেয়ে ইলিশের ডিমের চাহিদা বেশি।
“এই বাজারে ইলিশের ডিম আমিই সাপ্লাই দিই। কেউ নিতে চাইলে আমার কাছেই আসতে হবে। প্রতিদিন প্রায় ১০০ একশ কেজি ডিম লাগে; এত দিতেও পারি না। চট্টগ্রামের হালিশহর থেকে ডিমওয়ালা ইলিশ কিনে এনে মাছ আর ডিম আলাদা করে বেচি।”
ইলিশ মাছের ডিমের দাম জানতে চাইলে জমির বলেন, “পাইকারিতে আমরা প্রতি কেজি বিক্রি করি ৫ হাজার টাকা। অনলাইন ব্যবসায়ী ও হোটেল আগে থেকেই আর্ডার দিয়ে রাখে। কাষ্টমাররা নিতে চাইলে ভোরেই আসতে হবে।
“ডিমের চেয়ে ইলিশের দাম অনেক কম। ৬০০ থেকে ৭০০ গ্রাম ইলিশ ১৮০০ টাকা, ৮০০ থেকে ৯০০ গ্রামেরটা ২০০০ টাকা। এক কেজির উপরে গেলেই ২৬০০ টাকা। কিন্তু ডিমের দাম ৫ হাজার। এখন সাগরে মাছ নেই। এগুলো সব নদীর।”
কারওয়ান বাজারের পাইকারি মৎস্য ব্যবসায়ী জয়নাল আবেদীন বলেন, "বন্যা আর টানা বৃষ্টির কারণে জেলেরা নদীতে ঠিকমতো নামতে পারছেন না, ফলে বড় নদীর মাছ কম আসছে। তাই ডিমের দাম বাড়তি।”

কারওয়ান বাজারে পাঙ্গাশ, রুই ও কাতলা মাছের ডিমও পাওয়া যায়। এসব ডিমের দাম নিয়েও নাখোশ ক্রেতারা।
বুধবার সকাল ৮টার দিকে কারওয়ান বাজারে ডিম কিনতে আসা গৃহিণী রোকেয়া বেগম বলেন, “গত মাসেও রুই মাছের ডিম ৩০০ টকা টাকা কেজি কিনেছি, আজ নিচ্ছে ৪৫০ টাকা। বাচ্চারা মাছের ডিম পছন্দ করে বলে বাধ্য হয়ে ২৫০ গ্রাম নিলাম।"
পাঙ্গাশ মাছের ডিমের দাম তুলনামূলক কম। এদিন কারওয়ান বাজারে পাঙ্গাশের এক কেজি ডিমের দাম ২৫০ টাকা হাঁকাচ্ছিলেন বিক্রেতারা। তবে মাস খানেক আগেও দাম ১৫০ টাকা ছিল বলে দাবি ক্রেতাদের।
‘ছোটমাছ’, ‘রিভার ফিস‘, ‘হেরিটেইজ বিডি’সহ বেশ কয়েকটি অনলাইন প্ল্যাটফর্মে মাছের ডিম বিক্রি হয়।
যাত্রাবাড়ীর কাজলায় মূল সড়কের পাশেই রয়েছে ‘ছোটমাছ’ এর বিক্রয়কেন্দ্র। বিভিন্ন আড়ত থেকে মাছের ডিম সংগ্রহ করে অনলাইন ও অফলাইন, দুভাবেই ডিম বিক্রি করছে তারা।
‘ছোটমাছের’ অনলাইন পেইজে গিয়ে দেখা যায়, তারা চার ধরনের মাছের ডিম বিক্রি করে। ইলিশের এক কেজি ডিমের দাম লেখা রয়েছে ৬৭০০ টাকা। এছাড়া পাঙ্গাশের এক কেজি ডিম ৫৮০ টাকা, শিং ডিম ১৩৫০ টাকা ও রুই মাছের ডিমের কেজি ৬৫০ টাকা লেখা রয়েছে।
‘ছোটমাছের’ কর্মকর্তা কৌশিক আহমেদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “অনলাইন-অফলাইন দুইভাবেই বিক্রি করছি। এত চাহিদা থাকে, সরবরাহ করতে পারি না।
“বিভিন্ন আড়ত থেকে কিনে আনি। আবার যখন একসঙ্গে অনেক মাছ কিনি, তখন মাছের ডিমও আলাদা করি। পরে কাটা মাছ বিক্রি করি।”

কোথা থেকে আসে ডিম?
কারওয়ান বাজারের আড়তদাররা মাছের ডিমের একাধিক উৎসের কথা জানিয়েছেন।
ময়মনসিংহ, যশোর, খুলনা ও চাঁদপুর থেকে মাছ ঢাকায় আসার আগেই বড় ব্যবসায়ীরা মাছের পেট কেটে ডিম আলাদা করে ফেলেন। ডিমবিহীন মাছগুলো কম দামে বিক্রি করা হয়। আর ডিমগুলো আলাদা বরফ দিয়ে ঢাকায় পাঠানো হয়।
আরেকটি উৎস হিসেবে জানা যায়, ট্রাকে করে মাছ আনার সময় বরফ কম হওয়া বা অতিরিক্ত চাপে যেসব মাছের পেট ফেটে যায় বা নরম হয়ে যায়, আড়তদাররা সেই মাছগুলো কেটে ডিম বের করে নেন।
আড়তদার জমির আহমদ বলেন, “দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে প্লাস্টিকের কনটেইনারে করে ডিম আসে। আবার কিছু আছে, গাড়ির ঝাকুনিতে পেট ফেটে যায়। এগুলোর ডিমও আলাদ করে বিক্রি হচ্ছে।”
আরেকটি উৎসের কথা শোনা গেছে, তবে সেটা এসেছে ক্রেতাদের তরফে।
বুধবার সকাল সাড়ে ৮টায় কারওয়ান বাজার মাছের আড়তে মাছের ডিম কিনছিলেন আসাদ গেইটের ইকবাল রোডের বাসিন্দা এনজিও কর্মী আহমেদ শাফি।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, "আপনি যখন আস্ত ৫ কেজির একটি রুই মাছ কিনবেন, কাটার সময় ভেতরের ডিমের পুরোটা আপনাকে দেওয়া হয় না।
“তারা অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ডিমের একটা বড় অংশ ক্রেতার অসতর্কতার সুযোগ নিয়ে নিচের গামলায় বা পাশে সরিয়ে রাখে। পরে এগুলোকে একত্রিত করে আলাদা বক্সে কেজি দরে বিক্রি করে। এটা এক ধরনের ওপেন সিক্রেট চুরি।"
কারওয়ান বাজারের মাছ কাটার কাজ করেন সুব্রত দাস। তিনি এই অভিযোগ আংশিক স্বীকার করে বলেন, "সবাই চুরি করে না। তবে অনেক কাস্টমার ডিম পরিষ্কার করার ঝামেলার কারণে ফেলে যায়। আমরা সেগুলোই জমিয়ে রাখি। তবে হেল্পাররা মাঝেমধ্যে একটু-আধটু সরিয়ে রাখে।”
কারওয়ান বাজারে মাছ কাটার কাজ করা আরেক শ্রমিক মো. খলিল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডকমককে বলেন, "অনেকে ভাবেন আমরা মাছ কাটার সময় ডিম সরাইয়া রাখি। এটা ভুল ধারণা। আমরা ক্রেতার সামনেই মাছ কাটি, চুরি করার সুযোগ নাই।”
"তবে অনেক ক্রেতা মাছের ডিম খেতে চান না বা পরিষ্কারের ঝামেলার কারণে আমাদের কাছে ফেলে যান। আমরা সেইসব ফেলে দেওয়া ডিম জমিয়ে দিন শেষে কম দামে বিক্রি করি।"