Published : 16 Jul 2026, 10:06 PM
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ডলারের দাম ক্রমাগত বাড়ছে; আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারে তিন সপ্তাহে দর বেড়েছে ৬৩ পয়সা বা দশমিক ৫১ শতাংশ।
সপ্তাহের শেষ দিন বৃহস্পতিবার আন্তঃব্যাংক লেনদেনে ডলারের সর্বোচ্চ দাম ছিল ১২৩ টাকা ৫৫ পয়সা; সর্বনিম্ন ১২৩ টাকা। গড় দাম ছিল ১২৩ টাকা ৩৮ পয়সা।
কয়েকটি ব্যাংক ১২৪ টাকা ৫০ পয়সা দরে নগদ ডলার বিক্রি করছে। পণ্য আমদানিতে এলসি (ঋণপত্র) খোলার ক্ষেত্রে দাম রাখা হয়েছে ১২৪ টাকার বেশি। আর খোলা বাজারে ডলারের দর ১২৬ টাকা ৬০ পয়সায় উঠেছে।
বুধবার আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারে ডলারের গড় দাম ছিল ১২৩ টাকা। সপ্তাহের প্রথম দিন রোববার ছিল ১২২ টাকা ৯৭ পয়সা। আর তিন সপ্তাহ আগে ২৪ জুন গড় দাম ছিল ১২২ টাকা ৭৫ পয়সা।
এক বছর আগে, ২০২৫ সালের ৯ জুলাই আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারে ডলারের গড় দর ছিল ১২২ টাকা ১ পয়সা।
এ হিসাবে দেখা যাচ্ছে, বছরের ব্যবধানে বাংলাদেশি মুদ্রা টাকার বিপরীতে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত মুদ্রা মার্কিন ডলারের দাম বেড়েছে ১ টাকা ৫৪ পয়সা বা ১ দশমিক ২৬ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলছেন, চাহিদা বাড়ায় ডলারের দাম বাড়ছে। তবে ব্যাংক খাতের কেউ কেউ বলছেন, সফররত আইএমএফ প্রতিনিধিদলকে ‘খুশি করতে’ ডলারের দর বাড়ানো হচ্ছে।
আইএমএফ বরাবরই টাকা-ডলারের বিনিময় হার পুরোপুরি বাজারের উপর ছেড়ে দেওয়ার পরামর্শ দিয়ে আসছে।
আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারে ডলারের দর বাড়ায় ব্যাংকগুলোর পাশাপাশি খোলা বাজারেও (কার্ব মার্কেট) বাড়ছে দাম।
রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ও জনতা ব্যাংক বৃহস্পতিবার ১২৪ টাকা দরে নগদ ডলার বিক্রি করেছে; কিনেছে ১২৩ টাকায়।
বেসরকারি ইস্টার্ন ব্যাংক ১২৪ টাকা ৫০ পয়সা দরে ডলার বিক্রি করেছে; কিনেছে ১২৩ টাকা ৫০ পয়সা দরে।
সিটি ব্যাংকও ১২৪ টাকা ৫০ পয়সা দরে ডলার বিক্রি করেছে; কিনেছে ১২৩ টাকা ৫০ পয়সা দরে।
বৃহস্পতিবার খোলা বাজারে ১২৬ টাকা ৬০ পয়সা দরে ডলার বিক্রি হয়েছে; ক্রয় মূল্য ছিল ১২৬ টাকা ৩০ পয়সা।
গত সপ্তাহের শেষ দিন বৃহস্পতিবার ১২৫ টাকা ৫০ পয়সায় বিক্রি হয়; কেনা হয় ১২৫ টাকা ২০ পয়সায়।
মতিঝিলের এক ডলার ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “হঠাৎ করেই ডলারের চাহিদা বেড়ে গেছে; সে তুলনায় সরবরাহ নেই। সে কারণেই দাম বাড়ছে।”
একই কথা বলেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “সরকারি কয়েকটি পেমেন্ট ছিল। সে কারণে ডলারের চাহিদা বাড়ায় ডলারের দাম বেড়েছে। প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্সের ঊর্ধ্বমুখী ধারা অব্যাহত থাকলে ডলারের দর আর বাড়বে না।”
তিনি বলেন, বাজারে চাহিদা বাড়ায় কিছুদিন ধরে ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে ডলার কিনছে না কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার জন্য আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) একটি প্রতিনিধি দল ঢাকা সফর করছে। প্রতিনিধি দলের সদস্যরা ইতোমধ্যে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাসহ অর্থ মন্ত্রণালয় ও অন্যান্য মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন।
আইএমএফ প্রতিনিধি দলের সফরের সঙ্গে ডলারের দাম বাড়ার কোনো সম্পর্ক আছে কি না—এ প্রশ্নের উত্তরে আরিফ খান বলেন, “আইএমএফ প্রতিনিধি দলের সফর বা তাদের শর্তের সঙ্গে ডলারের দাম বাড়ার কোনো সম্পর্ক নেই। মূলত চাহিদা বাড়ার কারণেই বেড়েছে।”
তবে একটি বেসরকারি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেছেন, “আইএমএফ বহুদিন ধরেই টাকা-ডলারের বিনিময় হার পুরোপুরি বাজারের উপর ছেড়ে দিতে বলছে। সংস্থাটির সঙ্গে নতুন সরকারের নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ঋণ পাওয়ার পথ সহজ করতে আইএমএফকে খুশি করতে ডলারের দাম বাড়ানো হতে পারে।”
আইএমএফ যা বলছে
এদিকে বৃহস্পতিবার বিকালে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে সচিবালয়ে বৈঠক করেন সফররত আইএমএফের প্রতিনিধিরা। এই বৈঠকের মধ্য দিয়ে প্রতিনিধি দলটি তাদের এবারের বৈঠক শেষ করেছে।
১২ জুলাই থেকে এই প্রতিনিধিদল ঢাকা সফর করছে। অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পর আইএমএফ একটি বিবৃতি দিয়েছে, তাতে মুদ্রা বিনিময় বিষয়ে বলা হয়েছে, মূল্যস্ফীতি কমানো এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পুনর্গঠনের জন্য কঠোর মুদ্রানীতি বজায় রাখার পাশাপাশি বাংলাদেশকে ফলপ্রসূ রাজস্বনীতি অব্যাহত রাখতে হবে।
সংস্থাটি বলেছে, ২০২৫ সালে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার ব্যবস্থায় যে ‘ক্রলিং পেগ’ চালু করেছিল বাংলাদেশ, তা ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়ন করা হলে বিনিময় হার আরও নমনীয় হবে এবং বৈদেশিক খাতের স্থিতিশীলতাও সুরক্ষিত থাকবে।
ক্রলিং পেগ হচ্ছে এমন একটি বিনিময় হার ব্যবস্থা, যেখানে একটি দেশের মুদ্রার বিনিময় হারকে একবারে পুরোপুরি বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয় না, আবার পুরোপুরি স্থিরও রাখা হয় না। কেন্দ্রীয় ব্যাংক নির্দিষ্ট নিয়মে ধীরে ধীরে বিনিময় হার সমন্বয় করে। ডলারের বিপরীতে টাকার দাম এক দিনে বড় পরিবর্তন না করে ধাপে ধাপে বৃদ্ধি বা কমানোই হচ্ছে ক্রলিং পেগ।