Published : 15 Jul 2026, 08:33 PM
সাল ১৯১১—ফুটবলের সর্বকালীন মোহনবাঁশি বাজল বাঙালি হৃদয়ে। সেবারই প্রথম আইএফএ শিল্ড জিতল কোনো ভারতীয় ক্লাব। মোহনবাগান ২-১ গোলে পরাজিত করেছিল ব্রিটিশ সৈনিকদের নিয়ে গড়া শক্তিশালী দল ইস্ট ইয়র্কশায়ার রেজিমেন্টকে। এই জয়ের মাহাত্ম্য বেড়ে গিয়েছিল একাদশের দশজনই বুট ছাড়া খেলায়। আমির খান অভিনীত ‘লগন’ চলচ্চিত্রের কথা মনে করলেই বুঝবেন, প্রতিপক্ষের আভিজাত্যের তুলনায় কী জীর্ণশীর্ণ ছিল স্থানীয় দলের বেশভূষা! ফলে, মাহাত্ম্য তো বাড়বেই!
শুধু এটুকুর কারণেই এত কথা এ জয় নিয়ে? না। এই জয়ের রাজনৈতিক প্রভাব ছিল আরও বৃহত্তর ও সুদূরপ্রসারী। বঙ্গবঙ্গের রাজনীতি নিয়ে বৃহৎ বাংলা তখন উত্তাল। চলছে স্বদেশী আন্দোলন। ব্রিটিশ উপনিবেশের বিরুদ্ধে ১৮৫৭ সালের প্রথম ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের পরে ৫০ বছরের ব্যবধানে সবচেয়ে বড় জন-অবাধ্যতা (সিভিল ডিসঅবিডিয়েন্স) দানা বেঁধে গেছে। ঠিক সে মুহূর্তে মোহনবাগানের এই জয় উপনিবেশবিরোধী লড়াইয়ের বিশালকায় এক জাতীয়তাবাদী বারুদ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ফলে, হরিহর আত্মীয়তার মতো ফুটবল ঢুকে গেছে সরাসরি বাঙালির ধমনী-শিরা-মজ্জা-পাঁজরে।

অনেক বড় পর্যায়ে হয়তো যায়নি, কিন্তু মোহনবাগান, ইস্টবেঙ্গল, মোহামেডান, আবাহনী নামগুলোর সঙ্গে বাঙালির এক গাঁটছড়া বাঁধা আছে। ‘কলকাতা ডার্বি’ বলতে মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গল কিংবা ‘ঢাকা ডার্বি’ বলতে আবাহনী-মোহামেডান ম্যাচ নিয়ে আজ হয়তো উত্তুঙ্গ উন্মাদনা নেই, কিন্তু বিংশ শতাব্দীর নব্বই দশক পর্যন্ত দুই বাংলার প্রধান বিনোদনকেন্দ্র ছিল যে ফুটবল, তার প্রাণভ্রমরার নাম এই দুই ডার্বি। দুই বাংলার দুই ডার্বিকে কেন্দ্র করে আস্ত এক জনপদ দুই ভাগ হয়ে যেত যেন!
কেন্দ্রে যেমন ডার্বির যুদ্ধংদেহী আবহ ছিল, প্রান্তেও ঠিক বহু বিনোদনের সূতিকাগার ছিল স্থানীয় ফুটবল ময়দানগুলো। নারীদের ক্ষেত্রে ম্যাটিনি শো আর পুরুষদের ক্ষেত্রে বৈকালিক ফুটবল টুর্নামেন্টের ম্যাচগুলো ছিল নাওয়া-খাওয়ার মতোই গুরুত্বপূর্ণ। ফলে, বাঙালির অন্তরে ফুটবলের বুঝদারপনা জিনগত অভ্যস্ত চর্চা হিসেবে উপস্থিত ছিল বরাবরই। এই ধারাবাহিকতাতেই বিশ্বকাপের উন্মাদনায় গা ভাসিয়েছে এ অঞ্চলের ফুটবল অন্তঃপ্রাণ গ্রামীণ-শহুরে নিম্নবিত্ত-মধ্যবিত্ত-উচ্চবিত্ত। চার বছর অন্তর আসা একেকটি আসর তার কাছে হয়ে উঠেছে ‘পাগলামি’র মহামঞ্চ—বিনোদন এমন না হলে হয়!
সেই বিনোদনেরই কেন্দ্রে গিয়ে নাড়া দিয়েছে লাতিন ফুটবল ও তার ফুটবল খেলার অমর সৌন্দর্য। ফুটবল যে শক্তির বদলে শৈলী দিয়েও খেলা যায়, তা বিশ্বকে দেখালো লাতিনরা। খেলাটা দুনিয়াতে ফেরি করেছিল ইউরোপিয়ান ঔপনিবেশিক পরাশক্তিরা। কিন্তু, ঔপনিবেশিক খেলাটাকে বদলে ফেলেছিল লাতিনরা। ইউরোপের শক্তির বিপরীতে লাতিনরা এমন এক নতুন এবং বলা যায় ‘বিঔপনিবেশিক ফুটবলে’র গল্পগাথা লিখেছিল, দর্শনগতভাবে যা লাতিন আমেরিকার কোথাও ‘জোগো বনিতো’ (সুন্দর ফুটবল), কোথাও আবার ‘লা নুয়েস্ত্রা’ (আমাদের শৈলী) হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।
এই ফুটবলীয় দর্শন মানুষকে আকৃষ্ট করেছে প্রভূত। বিশেষত, অন্য গোলার্ধের উপনিবেশিত জাতিসত্তাগুলো লাতিন ফুটবলের মধ্যে পেয়ে গিয়েছিল এমন এক আনন্দের ফল্গুধারা, যা ছিল তার উপনিবেশবিরোধী সংগ্রাম এবং শোষিত-বঞ্চিত হওয়ার যে ‘কালেক্টিভ মেমোরি’র তার সারবত্তা। এই ফুটবলের মধ্যে তারা পেয়েছিল ঔপনিবেশিক শক্তিগুলোকে পরাভূত করার শৈল্পিক প্রকৌশল।
২.

যদিবা ফুটবলের স্থানীয় উন্মাদনা আগে থেকেই ছিল, কিন্তু বিশ্ব ফুটবলের মহাযজ্ঞ দেখার প্রথম সুযোগ এই মুলুকে আসে ১৯৭৮ সালে। সেটাও শুধু ফাইনাল। জিতল আর্জেন্টিনা। ১৯৮২ সালে টিভিতে দেখা গেল শুধু নক আউটের ম্যাচগুলো। সেবার ব্রাজিলিয়ান ফুটবল নিয়ে ছিল চরম পর্যায়ের আলোচনা। জিকো-সক্রেটিস-ফালকাওদের সেই ব্রাজিল, পেলের উত্তরসূরিদের ব্রাজিল বিশ্বকাপ জিতবে, এটা ছিল অবশ্যম্ভাবী। কিন্তু, ব্রাজিল দ্বিতীয় পর্ব থেকে হেরে বিদায় নিল! দ্বিতীয় পর্বে তাদের সঙ্গে একই গ্রুপে ছিল চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আর্জেন্টিনা। তারাও বাদ।
এলো ১৯৮৬। মেক্সিকো। প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ ফুটবল প্রচারণায় ঘটল বিপ্লব। পুরো টুর্নামেন্ট টিভিতে সরাসরি সম্প্রচারিত হলো, ইতিহাসে সেই শুরু। ততদিনে এ অঞ্চলে রঙিন টেলিভিশনও চলে এসেছে। সোনায় সোহাগা ব্যাপার-স্যাপার আর কী!
এ তো আর বিশ্বকাপ ছিল না। ছিল এক রূপকথার মতো। লাতিন ফুটবলের কথা মানুষ পত্রিকায় কিংবা বইয়ে হয়তো পড়েছে। এই প্রথম দেখল। দেখালেন একজন। দিয়েগো আরমান্ডো মারাদোনা। আগের আসরে ছিলেন, কিন্তু তখন তো দেখা যায়নি। এবার দেখালেন। মানুষ দেখল। না, শুধু দেখানো বললে ভুল হবে। মারাদোনার মধ্যে মানুষ নিশ্চয়ই এমন কাউকে আবিষ্কার করেছিল, যিনি হাত দিয়ে গোল করেও দিব্যি ঘরের পোস্টার বয় হয়ে ওঠেন! কিন্তু, তিনিই কি সেই মানুষটি নন, যিনি চার মিনিট পর আবার এমন এক গোল করেন, যা মানুষকে মুহূর্তের মধ্যে হতভম্ব করে দেয়?
একই ব্যক্তি—ভালো-মন্দের এক আশ্চর্য সমন্বয় যার মধ্যে। মানুষ যেন দেখল, তার সমস্ত আচরণের ভরকেন্দ্র গিয়ে ঠেকেছে একজন বেটে-খাটো ফুটবলারের বাঁ পায়ে। মানুষ তাকে প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির নায়কের আসনে অধিষ্ঠিত করল। যিনি ঘোষণা দিলেন ফকল্যান্ড যুদ্ধের প্রতিশোধ নেবেন। ‘নাথিং ইজ আনফেয়ার ইন লাভ এন্ড ওয়ার’—মারাদোনা করে দেখালেন। মানুষ তবুও তাকে আত্মার আত্মীয়তায় বরণ করে নিল। এই যে ক্যারিশমা, খুব সম্ভবত এটা মারাদোনার চেয়ে নিপুণভাবে আর কেউ করে দেখাতে পারেননি আগে কিংবা পরে।

ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতা নিয়ে দুনিয়ার সমস্ত অঞ্চলেই মানুষের মধ্যে প্রজন্মান্তরে উপনিবেশিত-নির্যাতিত-নিষ্পেষিত-বঞ্চিত-লাঞ্ছিত হবার ‘কালেক্টিভ মেমোরি’ বা ‘সমন্বিতস্মৃতি’ ভয়ানক। আর ওই সময়ে আর্জেন্টিনার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে ফকল্যান্ড দ্বীপ দখলের নিমিত্তে যুদ্ধ। দুনিয়াব্যাপী তা নিয়ে তুমুল আলোচনা তৈরি করে দিলেন মারাদোনা। দেশে দেশে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী প্রতিরোধের স্মৃতি আরও উজ্জ্বল হচ্ছে। এর মধ্যেই বিশ্বকে তার সম্মোহন দিয়ে চুম্বকের মতো কাছে টেনে নিলেন মারাদোনা। মানুষও তাকে ঘরের সেই ছেলেটি মনে করল, যার সুখে তারা সুখী। দুঃখে দুখী।
সেই দুঃখের প্রাবল্যে করুণভাবে নাম লেখালো ১৯৯০ সালের বিশ্বকাপ। যাচ্ছেতাইভাবে মারাদোনাকে ফাউল করা হচ্ছে। সবাই দেখছে, শুধু দেখতে পাচ্ছেন না রেফারি! শেষ মুহূর্তের এক বিতর্কিত পেনাল্টিতে জার্মানির কাছে ফাইনালে হেরে গেল আর্জেন্টিনা। মারাদোনা কাঁদলেন, অনলবর্ষী সে কান্নাও মানুষের পিঞ্জরে বিঁধল কাঁটার মতো। ছিয়াশির মারাদোনার বিশ্বজয়ী ছবি আর নব্বইয়ের মারাদোনার সেই কান্নার স্মৃতি বয়ে চলল দুয়ারে দুয়ারে। ট্র্যাজিডির নায়কের প্রতি বিহ্বলতা আবেগপ্রবণ মানুষের হরহামেশা থাকে। মারাদোনা হয়ে উঠলেন সেই বিহ্বলতার করুণ মুখচ্ছবি!
এর পর এলো আরও বড় ট্র্যাজেডি। চুরানব্বইতে মারাদোনা নিষিদ্ধ হলেন বিশ্বকাপ থেকে। অভিযোগ নিষিদ্ধ ড্রাগ সেবন। নব্বই বিশ্বকাপের পর থেকেই বিপথে চলে গিয়েছিলেন মারাদোনা। দেড় বছরের মতো নিষিদ্ধও ছিলেন। সেই খড়গ আবারও নেমে আসল। তাও আবার বিশ্বকাপে! মারাদোনা বললেন, সবই তার বিরুদ্ধে ফিফার পুরোনো ষড়যন্ত্র। ফিফার বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ উগড়ে উঠল। আজও তা নিয়ে বিতর্ক। অকাল মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মারাদোনা ফিফার বিরুদ্ধে লড়ে গেছেন। কখনও তিনি নিন্দিত হয়েছেন, কখনও নন্দিত; কিন্তু, মানুষ তাকে খেলা ছাড়ার পরও ভুলেনি; মৃত্যুর পরও না।
আশ্চর্যই বটে! মারাদোনাকে নিষ্কলুষ অবশ্যই ছিলেন না—‘হ্যান্ড অব গড’ই তার প্রমাণ। তবুও তিনি মণিকোঠায় জায়গা পান ঠিক কোন মানবিক মনস্ত্বত্ত্বের কারণে? কেন তাকে ভুলতে পারে না মানুষ? এই প্রশ্নে তখন পাল্টা প্রশ্ন আসে। কেন ভুলবে! দূর গোলার্ধের যে মানুষটি লাঞ্ছিত-বঞ্চিত জনতার স্বপ্নসারথী হয়ে উঠেছিলেন, ছিলেন সন্তানসম প্রিয়—তাকে ‘ডেমিগড’ হিসেবেই বরণ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেছে মানুষ।
মারাদোনা আসলে ছাইভস্ম থেকে উঠে আসা সেই ফিনিক্স পাখি, যিনি কাঁপিয়ে দিয়েছেন ক্ষমতাধরের আরস। তিনিই সেই প্রমিথিউস, যিনি সদাসর্বদা বিদ্রোহী ও প্রতিষ্ঠানবিরোধী। বিদ্রোহ তার মজ্জায়। ফলে, একদার উপনিবেশিত মানুষের ঘরে যার ছিল একচ্ছত্র প্রবেশাধিকার, তিনিই একবেমাদ্বিতীয়ম মহানায়ক দিয়েগো মারাদোনা।
৩.
মারাদোনার উত্থানের আগেই মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছিলেন লাতিন ফুটবলের সবচেয়ে আশ্চর্য হীরকখণ্ডদের একজন—এডসন আরান্তেস দো নাসিমেন্তো। তিনিই পেলে—ফুটবলের কালো মানিক, ফুটবলের প্রথম গ্লোবাল সুপারস্টার। গল্পে কাহিনিতে যার কথা ফিরে ফিরে এসেছে দুনিয়ার সর্বত্র। ১৯৫৮ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত চারটি বিশ্বকাপ খেলে তিনটি বিশ্বকাপ জিতেছেন। সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছেন। পেলে ছিলেন আসলে রূপকথার নায়কের মতো। দেখা হয়নি তাকে, কিন্তু রূপকথার নায়করা যেমন অবিশ্বাস্য ঘটনা ঘটান, পেলেও তা-ই ছিলেন মানুষের কাছে।

কালো মানুষদের সাফল্যের গল্প তো পৃথিবীতে প্রচারিত হয়নি তেমন একটা। ক্রিকেটের হাত ধরে তখন ক্যারিবিয়ানদের বীরত্বগাথা মানুষ জানতে শুরু করেছে। মাঠে গিয়ে দেখেছেও ষাট-সত্তর-আশির দশকে। আর ওদিকে ফুটবলে তখনই রাজত্ব করছেন এক অমিত প্রতিভাবান কৃষ্ণাঙ্গ সন্তান, নাম তার পেলে। ‘অসভ্য’ কালো ও বাদামিদের বিরুদ্ধে ইউরোপিয়ান ‘সভ্য’ শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদের যে আধিপত্য, তা তো মানুষের সেই ‘কালেক্টিভ মেমোরি’তে রয়ে গেছে। রাজনীতির এই সমীকরণ মানুষের মন থেকে মুছে যায়নি কখনই। ফলে, পেলেকে মানুষ তার ঘরের সন্তানই মনে করেছে।
সেই মহিমাতেই, শুধু তার তিনটি বিশ্বকাপ জেতার সাফল্যের কারণেই নয়, তিনি এদেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠ্যপুস্তকের বিষয় হয়ে উঠেছিলেন। প্রজন্মান্তরে তাকে আমরা পাঠ করেছি। জেনেছি। পেলে কত বড় ছিলেন আসলে! সময়ের চেয়েও বড়! মহাকালীন! তার নামেই পৃথিবীর উপনিবেশিত দেশগুলোর ঘরে ঘরে জন্ম হয়েছে অসংখ্য ব্রাজিল সমর্থকদের।
পেলের খেলা টিভিতে দেখার সুযোগ হয়নি মানুষের। বিরাশির সেই ‘অতিপ্রাকৃত’ ব্রাজিলকে দেখার সুযোগও বঞ্চিত হয়েছে তারা। ততদিনে ব্রাজিলিয়ানদের বৈশ্বিক দুর্গে হানা দিয়েছে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আর্জেন্টিনা ও তার নেতা দিয়েগো মারাদোনা। পেলে-উত্তর ব্রাজিলের বিশ্বকাপ সাফল্য বলতে রোমারিও, বেবেতো ও দুঙ্গাদের ১৯৯৪ এবং কাফু, কার্লোস, রোনালদো ও রিভালদোদের ২০০২ সালের বিশ্বজয়। কিন্তু, তবুও মানুষ ব্রাজিলের সমর্থন ছাড়েনি।
সেই ব্রাজিল নেই, সত্য। ২৪ বছর ধরে সাফল্য নেই, সত্য। কিন্তু, বংশ পরম্পরার উত্তরাধিকার সূত্রে ব্রাজিলের সমর্থকগোষ্ঠী এখনও টিকে আছে। আশায়। আকাঙ্ক্ষায়। হেক্সা একদিন আসবেই। লোকে বলে ব্রাজিল একদিন ক্যারিবিয়ান ক্রিকেটের মতোই শুধু পুরোনো ‘লিগ্যাসি’ নিয়ে টিকে থাকবে। কিন্তু, ব্রাজিল হেক্সা জিতবেই, এমন আশাবাদী হওয়ার মতো মানুষও কম নয়। রক্তে যাদের ‘জোগো বনিতো’, তাদের না জাগার কারণ আছে?
৪.

ফুটবল খেলাটা আজ অনেক বদলে গেছে। সেই বদলে যাওয়া সময়ের সবচেয়ে বড় অ্যাম্বাসেডর লিওনেল আন্দ্রেস মেসি। ২০২২ সালে ৩৬ বছর পর মারাদোনা-উত্তর আর্জেন্টিনা যে বিশ্বকাপ জিতেছে, তিনি তার মহানায়ক। মারাদোনার সৃষ্টি করা ফ্যানবেইজ যিনি সবচেয়ে সার্থকতার সঙ্গে এগিয়ে নিয়ে গেছেন, তিনিই লিওনেল মেসি, তর্কযোগ্যভাবে যাকে এখন বোদ্ধারা সর্বকালের সেরা ফুটবলার স্বীকৃতি দিচ্ছেন।
মারাদোনার যে অধিষ্ঠান, সেটা হয়তো মেসির পক্ষে ছাপিয়ে যাওয়া কঠিন, তা যত সাফল্যই তিনি পান। কিন্তু, দেশে দেশে যে আর্জেন্টিনার সমর্থকসংখ্যা ব্রাজিলসহ অন্যান্য সকল দেশের তুলনায় উত্তরোত্তর বেড়েই চলেছে, তার কারণ মেসির মতো একজন অতিমানবিক ফুটবল শিল্পী। সেই শিল্পীসত্তা দিয়েই তিনি দুনিয়াকে মারাদোনার মতোই মোহিত করেছেন।
২৪ বছরের অপেক্ষা শেষে ২০১৪ সালে আর্জেন্টিনাকে ফাইনালেও তুলেছিলেন। কিন্তু, আবারও জার্মানির কাছেই হারতে হয়েছে আর্জেন্টিনাকে। সেখানেও বিতর্ক পিছু ছাড়েনি। যেন নব্বইয়ের সেই মারাদোনার গল্পই ফিরে এসেছিল মেসির জীবনে! কিন্তু, ২০২২ সেই দুঃখমোচন করেছে। তবে, শুধু একটা বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন আর আরেকটিতে রানার্সআপ হওয়া নয়, পরিসংখ্যান বলবে, দুটি কোপা আমেরিকা (২০২১ ও ২০২৪), একটি ফিনালসেমিয়াসহ সকল ধরনের টুর্নামেন্টের সাফল্যের নিক্তিতে আসলে গত ২০ বছরে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ দলটির নাম আর্জেন্টিনা। এটাই তো ‘মেসিয়াহ’র স্বর্ণসময়!
আবার, গত দেড় দশকের শ্রেষ্ঠত্বের দাবিদার আর্জেন্টিনা হলেও, তাকে প্রবল চ্যালেঞ্জ করছে স্পেন ও ফ্রান্স। তিকিতাকা ফুটবল ঘরানার জন্ম দিয়ে স্পেন ২০০৮ সালে ইউরো, ২০১০ সালে বিশ্বকাপ ও ২০২৪ আবার ইউরো জিতেছে। এবার ফ্রান্সকে হারিয়ে উঠে গেল ফাইনালে। অন্যদিকে ফ্রান্সের এ সময়টা কিলিয়ান এমবাপের রাজত্বের যুগ। এই সময়েই তিনটি বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল খেলেছে ফ্রান্স। একটিতে চ্যাম্পিয়ন (২০১৮), একটিতে রানার্সআপ (২০২২)। তার আগে ইউরোতে রানার্সআপ (২০১৬)। সর্বশেষ এবারের বিশ্বকাপে খেলতে হচ্ছে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচ। কম বড় কথা নয়। তবুও কি স্পেন ও ফ্রান্সের সমর্থক বাড়ল?
ইউরোপের অর্থবিত্ত আছে। আছে শক্তিশালী ক্লাব ফুটবল। সেই ফুটবল এখন অনেক সহজলভ্য দেখার জন্য। মানুষ রেয়াল মাদ্রিদ-বার্সা-ম্যানইউ-লিভারপুল-ম্যানসিটি-আর্সেনাল-জুভেন্টাস-পিএসজি বলতে পাগল। তবুও, বিশ্বকাপ এলেই এ জনপদে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার সঙ্গে পাল্লা চলে না। কেন?
৫.
লাতিন ফুটবলের যে ‘অরা’, পেলে-মারাদোনা-জিকো-সক্রেটিস, রোনালদো-রিভালদো-কার্লোস, বাতিস্তুতা-ভেরন-ওর্তেগা, রোনালদিনহো-রেকুয়েলমে, মেসি-নেইমার-ফোরলান-সুয়ারেজ তাদের বিপরীতে ইউরোপিয়ান ফুটবলের কিংবদন্তির সংখ্যা ও সংখ্যা নেহাতই কম নয়। যখন টিভি আসেনি, তখনও হাঙ্গেরির ফ্যারেঙ্ক পুসকাস, জার্মানির ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ার, পর্তুগালের ইউসেবিও, ফ্রান্সের মিশেল প্লাতিনি, নেদারল্যান্ডসের ইউহান ক্রুয়েফ প্রমুখের নামও মানুষের মুখে মুখে ফিরেছে। টিভিতে দেখা মহাতারকাদের মধ্যে এক জিনেদিন জিদানের জাদু নিয়েই তো কত কথা বলা যায়। আছেন ডেভিড বেকহাম, লুইস ফিগো, মিশেল বালাক, পাওলো মালদিনি, ফেবিও ক্যানাভারো, আন্দ্রেয়া পিরলো, কান-বুফন-ক্যাসিয়াস, জাভি-ইনিয়েস্তা প্রমুখের মতো মহাতারকা।
আর আছেন আরেক আশ্চর্য ফুটবলার ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, বিশ্বকাপ না জিতলেও বহু মানুষের হৃদয়ে তার স্থান। কিন্তু, সেটা ব্যক্তি পর্যায়েই রয়ে গেছে। ম্যারাদোনীয় হয়নি, ব্যক্তির প্রতি সমর্থন যেভাবে তিনি একচ্ছত্র দলীয় সমর্থনে রূপান্তরিত করেছিলেন, রোনালদো ও তার পূর্বসূরী ও বর্তমান ইউরোপিয়ান ফুটবলররা কেউই তা পারেননি।
বিশ্বকাপে সার্বিক সাফল্যের বিচারেও ইউরোপ এগিয়ে। ইউরোপের ১২ বারের বিপরীতে লাতিন আমেরিকার ১০ বার জয়। তার মধ্যে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা মিলেই আটবার, বাকি দুইবার উরুগুয়ে। ইউরোপের ক্ষেত্রে যেমন জার্মানি-ইতালির আটবার। ফ্রান্স দুইবার। ইংল্যান্ড-স্পেন একবার করে। কিন্তু, মাত্র ৪০ বছরের ব্যবধানে, মারাদোনা-মেসির মধ্যবর্তীকালে সাফল্য-ব্যর্থতার সংযোগ থাকার পরও আর্জেন্টিনার যে সমর্থকসংখ্যা, সম্ভবত সময়ের অনুপাতে কেউই তা ছাপিয়ে যেতে পারেনি।
৬.
এই বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে তিনটি ইউরোপিয়ান দলের বিপরীতে একমাত্র লাতিন প্রতিনিধি আর্জেন্টিনা। ফ্রান্স, স্পেন, ইংল্যান্ড—পৃথিবীর তিন ‘মহান’ প্রাক্তন ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে উপনিবেশিত জনগোষ্ঠীর একক প্রতিনিধি আর্জেন্টিনা। তবুও, কেন আজও উপনিবেশিত লাতিন আমেরিকা ও তার ফুটবলের সঙ্গেই গণমানুষের আত্মীয়তা?
এর উত্তর বোধহয় এই নয় যে, মানুষ শুধুই সাফল্যের পূজারি। মানুষ সুন্দর ও শৈলীরও পূজারি। মানুষ প্রতিরোধেরও সন্তান। দুনিয়ার প্রান্তে প্রান্তে মানুষের হৃদয়ে যে প্রতিরোধের আগুন, তারও একটা পরম্পরা তারা বহন করে চলেছেন আজও। হয়তো বংশ পরম্পরার আবেগীয় আতিশয্যেই! তাই হয়তো লাতিন ফুটবলের প্রতি তার এত দুর্বলতা!
সৌমিত জয়দ্বীপ সহকারী অধ্যাপক, স্কুল অব জেনারেল এডুকেশন, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়। ই-মেইল: [email protected]