Published : 16 Jul 2026, 01:06 AM
যুক্তরাষ্ট্রের উটাহ রাজ্যের একটি শপিং মলে ধর্মীয় বিদ্বেষের কারণে এক ভারতীয় মুসলিম কর্মীকে ১৫ বার ছুরিকাঘাত করেছে এক ব্যক্তি। তাকে আটক করেছে পুলিশ। আদালতের নথি অনুযায়ী, তার নাম পিটার মাইকেল লারসেন।
তদন্তকারীদের কাছে ৪৮ বছর বয়সী লারসেন স্বীকার করেছেন যে, মুসলিম হওয়ার কারণেই ওই যুবককে তিনি টার্গেট করেছিলেন এবং তার উদ্দেশ্যই হল মুসলিমদের হত্যা করা।
পুলিশ লারসেনের বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টা এবং বিপজ্জনক অস্ত্র বহনের অভিযোগ এনে তাকে সল্টলেক কাউন্টি জেলে পাঠিয়েছে।
সোমবার ওয়েস্ট ভ্যালি সিটির ‘ভ্যালি ফেয়ার মল’-এ ঘটে যাওয়া ওই বর্বরোচিত ঘটনায় ভুক্তভোগী যুবকের অবস্থা এখন আশঙ্কাজনক।
তার নাম সোহেল, তিনি মলের একটি কিয়স্কে (ছোট দোকান) কাজ করতেন। পাশের একটি জুয়েলারি দোকানের কর্মী লুনা নুনেস ঘটনার বিবরণ দিয়ে জানান, লারসেন প্রথমে সোহেলের কাছে গিয়ে তার পরিচয় জানতে চান।
লুনা বলেন, "লারসেন প্রথমে জিজ্ঞেস করেন যে, ‘আপনি কোথা থেকে এসেছেন?’ সোহেল উত্তর দেন, ‘আমি ভারত থেকে এসেছি, আমার নাম সোহেল।’ এরপর লারসেন জিজ্ঞেস করে, ‘আপনি কি মুসলিম?’
সোহেল ‘হ্যাঁ’ বলতেই লারসেন ছুরি বের করে একের পর এক আঘাত করতে শুরু করেন।"
উটাহ ইসলামিক সেন্টারের ইমাম জানান, লারসেন হামলা চালানোর ঠিক আগে সোহেলের কাছে এক বোতল পানি চেয়েছিলেন। সোহেল যখন পানি আনার জন্য ঘোরেন, তখনই তার ওপর এই হামলা চালানো হয়।
লুনা নুনেস জানান, হামলাকারী লারসেন অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে সোহেলকে অন্তত ১৫ বার ছুরিকাঘাত করেন। তবে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই মলে উপস্থিত বেশ কয়েকজন সাহসী ক্রেতা ও প্রত্যক্ষদর্শী লারসেনকে জাপটে ধরে মাটিতে ফেলে দেন এবং আটকে রাখেন।
তা না হলে এই হামলা আরও বড় রূপ নিতে পারত। লোকজন লারসেনকে কাবু করার সময় তিনি নিজেও কিছুটা আহত হন। পরে লারসেনকে চিকিৎসা দিয়ে হেফাজতে নেয় পুলিশ।
তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, লারসেনের মতাদর্শ এবং পূর্বপরিকল্পিত বড় ধরনের সহিংসতার ছকের কারণে তিনি সমাজের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক।
তার ছুরি হামলায় আহত সোহেল একাধিক জটিল অস্ত্রোপচারের পর হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন।
সোহেলের চিকিৎসার খরচ মেটাতে লুনা নুনেস একটি ‘গো ফান্ড মি’ ক্যাম্পেইন শুরু করেছেন। সোহেলের বন্ধুরা জানান, তিনি অত্যন্ত পরিশ্রমী এবং পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি।
লুনা বলেন, "তার কোনও হেলথ ইন্স্যুরেন্স (স্বাস্থ্য বীমা) নেই। পরিবারে একমাত্র তিনিই কাজ করতেন। ঘরে তার স্ত্রী ও দুটি ছোট সন্তান রয়েছে।"
সোহেলের ম্যানেজার আদনান মোহাম্মদ এই বিদ্বেষমূলক হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, "এটি সম্পূর্ণ উন্মাদনা। ঘৃণা ছড়ানোর কোনও জায়গা এখানে হতে পারে না।"
সোহেলের কাজের প্রশংসা করে আদনান বলেন, "ও সবসময় হাসিখুশি থাকত, কঠোর পরিশ্রম করত। কাজের দক্ষতার কারণে আমিই ওকে সব দেখাশোনার দায়িত্ব দিয়ে ম্যানেজার হিসেবে পদোন্নতি দিয়েছিলাম।"
আবেগঘন কণ্ঠে তিনি আরও বলেন, "যখন আপনি একজন মানুষকে হত্যা করার চেষ্টা করেন, তখন কিন্তু শুধু ওই একজনকেই মারেন না; বরং তার পুরো পরিবারকে ধ্বংস করে দেন।"
ওদিকে, জুয়েলারি দোকানের কর্মী লুনা নুনেস জানান, ঘটনার ঠিক আগে লারসেন মলের অন্যান্য কর্মীদেরও তাদের ধর্ম নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছিলেন।
মানবাধিকার কর্মীরা সতর্ক করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইসলামোফোবিয়া বা মুসলিম বিদ্বেষী হামলার ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে।
তাদের মতে, অভিবাসনবিরোধী রাজনৈতিক বক্তব্য, শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদ এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের কারণেই দেশটিতে এই বিদ্বেষ ও সহিংসতা ছড়াচ্ছে।
সূত্র: এনডিটিভি