Published : 18 Jul 2026, 08:18 PM
সর্বকালের সেরা কি না, তা নিয়ে বিতর্ক থাকবেই। পরিসংখ্যান আপাতত থাকুক। কিন্তু, একটা জায়গায় তারা নিজেদের দুনিয়ায় হুবহু এক। খেলাটাই যদি তাদের ধর্ম হয়, তাহলে সেই ধর্মের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ তপস্বী তারা—শচীন টেন্ডুলকার ও লিওনেল মেসি!
প্রকৃতিদত্ত প্রতিভা কিন্তু খেলাটার জন্য চর্চা, অধ্যবসায়, আত্মনিমগ্নতা, প্রেম ও ভালোবাসা আকাশসম। আবার, মিতভাষী, প্রীতিময়, নম্র, ভদ্র, বিনয়ী ও লাজুক স্বভাবের কারণে আদর্শ ব্যক্তিত্বের ছাপ। লম্বা ক্যারিয়ার জুড়ে আশ্চর্য ধারাবাহিকতা, স্টারডমে বিহ্বল না হওয়া, বিপথ ও বিতর্ক এড়িয়ে চলা এবং অপ্রয়োজনীয় কথা না বলে নিজের কাজ করা। সতীর্থ ও প্রতিপক্ষদের কাছে সমান সম্মান, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা অর্জন। সতীর্থদের তাদের নায়কের জন্য আত্মনিবেদন। সর্বোপরি, বয়স ছাপিয়ে খেলাটাকে সন্তানসম জ্ঞান করা। ইতিহাসে এমন খেলোয়াড় নিজ নিজ খেলায় অতি বিরল! হয়তো আর কেউ আসবেনই না!
২.
টেন্ডুলকার তার জীবনের শেষ ম্যাচটা জিতেছিলেন৷ সেটা বিশ্বকাপের ম্যাচ ছিল না। বিশ্বকাপ জিতে অবসর নিতে পারতেন৷ বিস্ময়করভাবে নিলেন না! তার শেষ ম্যাচটা ছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে টেস্টে। সে ম্যাচে শুধু তার জন্য জয় চেয়েছিলেন ভারতকে সমর্থন না করা বহু মানুষও। অত বড় খেলোয়াড়, শেষটা অন্তত তার জয়ের মঞ্চ হোক।
মেসির গল্পটাও তেমনই যেন! বিশ্বকাপ জিতেই গতবার অবসর নিতে পারতেন। অমরত্ব তো নিশ্চিতই হয়ে গেছে। কিন্তু আশ্চর্যজনক হলেও সত্য, তিনি সবাইকে ভুল প্রমাণ করে আরেকটা বিশ্বকাপ খেলার সিদ্ধান্ত নিলেন!
৩.
এবারের বিশ্বকাপে নকআউটের প্রতিটি ম্যাচই ছিল তার শেষ ম্যাচ৷ দেখতে দেখতে তার শেষ ম্যাচটা চলে এলো! আধুনিক ফুটবলের মহারাজা চলে যাচ্ছেন তার রাজ্যপাট ছেড়ে!
ইতিমধ্যেই বহু আর্জেন্টিনা 'বিরোধী' পর্যন্ত মেসিকে কুর্নিশ জানিয়ে তার জয় কামনা করেছেন। তার প্রশ্নাতীত শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে এখন সরব সমস্ত ধরনের মিডিয়া। এটা কি কম বড় অর্জন? সমর্থক-অসমর্থক সকলেই মোহমুগ্ধ হয়ে যাচ্ছেন!
বিশ্বকাপ জেতা না জেতা নিয়ে তার আর কোনো চাপ নেই, কাউকে কিছু প্রমাণেরও নেই। বিশ্বকাপ জিততেই হবে—এখন আর সেই পুরোনো রবটিও নেই। তাছাড়া, একটা খেলা থেকে সম্ভাব্য যা যা পাওয়া সম্ভব সবই পেয়েছেন। জাতীয় দলেও পেয়েছেন, ক্লাব ফুটবলেও পেয়েছেন। জাতীয় দলের হয়ে ট্রফি ছয়টি। তিনটি ক্লাবে খেলে জিতেছেন ৪১টি ট্রফি, বার্সেলোনার হয়েই ৩৫টি।
ব্যক্তিগত ঝুলিতে আছে আটটি ব্যালন ডি'অর। ফিফা বর্ষসেরা তিনবার। বাকিগুলো বাদ থাকল৷ ২০১৪ ও ২০২২ বিশ্বকাপের পর তৃতীয়বারের মতো এবার জিততে চলেছেন বিশ্বকাপের সেরা ফুটবলারের পুরস্কার গোল্ডেন বল—এই রেকর্ড অমরত্ব পেয়ে যাচ্ছে খুব সম্ভবত৷ বাকি আছে শুধু গোল্ডেন বুট—ওটাও পেতে পারেন৷ না পেলেও কী যায় আসে!
আসলে আর কোনো কিছুতেই তার আর যায় আসে না৷ ফুটবলের কাছে তিনি আর কীইবা চাইতে পারেন! যদি ফুটবলের কিছু দেওয়ার থাকে তো ফুটবলই সেই ঋণ শোধ করুক। দায়টা বোধহয় ফুটবলেরই বেশি। এজন্যই হয়তো আবাল, বৃদ্ধ, বনিতা সবারই অদ্বিতীয় চাওয়া— মেসি তার শেষটায় বিজয়মাল্য আলিঙ্গন করুন, হাসুন জয়ের হাসি!
৪.
আমরা জীবনটাকে পলিটিক্যালি জটিল করেছি। সেজন্য কৃতজ্ঞতাবোধও কমেছে। এই যে স্যার গ্যারি সোবার্স মারা গেলেন। বাপ-দাদার আমলের ক্রিকেটার। বিগত শতাব্দীর পঞ্চাশের ও ষাটের দশকে খেলেছেন। খেলাই দেখিনি। তাহলে চিরবিদায়ে শ্রদ্ধা জানাব কেন?
জানাব কারণ প্রতিটি জীবেরই শৈশব-কৈশোর জেনেটিক্যালি ক্রীড়াময়। শিশুমন খেলার জন্যই উন্মুখ হয়ে থাকে। আমরা খেলাগুলো আপনাআপনি শিখি না। পরম্পরায় শিখি। এসব খেলায় যেসব গ্রেট জন্মান, তারা খেলাটাকে এগিয়ে দেন উচ্চধাপে। সেটাই আমাদের কাছে আসে নানা প্রক্রিয়ায়। কখনও গল্প হয়ে, কখনও ইথারে, কখনও স্যালুলয়েডে। দেখি, শিখি।
আমাদের অনেকেরই শৈশব রঙিন হয়েছে এই খেলাগুলো শিখে। শৈশব-কৈশোরের মানসিক ও শারীরিক বিকাশ ঘটেছে এই খেলাগুলোর জন্য। দেখেছি, শিখেছি, অমনভাবে খেলতে চেয়েছি। কখনও পেরেছি, সিংহভাগ সময়ই পারিনি। কিন্তু, জীবনের ওই বয়সে অমন হতে চাওয়ার আকাঙ্ক্ষাটা কাউকে না কাউকে একজন লিওনেল মেসি হিসেবে আবির্ভূত করেছে, কাউকে করেছে ভিরাট কোহলি। কেউ মারাদোনার গল্প শুনে মেসি হয়েছেন। কেউ টেন্ডুলকারের খেলা দেখে কোহলি হয়েছেন।
কেউ ডি স্টেফানোর গল্প শুনে দিয়েগো মারাদোনা হয়েছেন৷ কেউ পেলে ও গারিঞ্চার গল্প শুনে কিংবা জিকো ও সক্রেটিসের খেলা দেখে রোনালদো বা রিভালদো বা রোনালদিনহো হয়েছেন। কেউ রোনালদিনহোকে দেখে নেইমার হয়েছেন। কেউ জিনেদিন জিদানের মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে কিলিয়ান এমবাপ্পে হয়েছেন।
কেউ সুনীল গাভাস্কার ও ভিভ রিচার্ডসকে হিরো মেনে শচীন টেন্ডুলকার বা ব্রায়ান লারা হয়েছেন। কেউ গ্যারি সোবার্সকে দেখে ইমরান খান বা কপিল দেব বা ইয়ান বোথাম বা রিচার্ড হ্যাডলি হয়েছেন; কেউ গল্প শুনে হয়েছেন জ্যাক ক্যালিস। কেউ ওয়াসিম আকরামকে দেখে জহির খান বা মিচেল স্টার্ক হয়েছেন।
আবার কেউ বরিস বেকারকে দেখে পিট সাম্প্রাস ও আন্দ্রে আগাসি হয়েছেন। কেউ সাম্প্রাস-আগাসীকে দেখে হয়েছেন রজার ফেদেরার বা রাফায়েল নাদাল। কেউ স্টেফি গ্রাফ বা মার্টিনা নাভ্রাতিলোভাকে দেখে মার্টিনা হিঙ্গিস বা সেরেনা উইলিয়ামস হয়েছেন। কেউ হয়তো মোহাম্মদ আলীকে অনুপ্রেরণা মেনে হয়েছেন মাইক টাইসন।
পড়াশোনার ক্ষেত্রেও তা-ই। যাঁদের লেখা ও জীবন পড়ে আমরা বড় হই, তারা বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ ও ভাষাগত দক্ষতা বৃদ্ধিতে বন্ধুর মতো সাহায্য করেছেন। একজন মাইকেল মধুসূদন দত্ত না জন্মালে একজন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলামকে পেতে হয়তো বহু বছর অপেক্ষা করতে হতো। সক্রেটিস না এলে প্লেটো কবে আসতেন, প্লেটো না এলে অ্যারিস্টটল কবে আসতেন, কে জানে! উইলিয়াম শেক্সপিয়ার ও ক্রিস্টোফার মার্লো না জন্মালে অস্কার অয়াইল্ড বা জর্জ বার্নার্ড শ সহজে আসেন না। নিকোলাই গুগল, ফিওদর দস্তয়ভস্কি বা লিও তলস্তয় না এলে হয়তো একজন ম্যাক্সিম গোর্কী বা আন্তন চেকভের উঠে আসতে অনেক সময় লাগত।
এমন উদাহরণ অনিঃশেষ। এই ব্যাটনগুলো সাধারন ঘরেও অজান্তে রিলে রেসের মতো পাস হয়। তাই এই পরোক্ষ অবদানের কথা বলে শেষ করা যাবে না। আমাদের যাপিত জগতটা এই চক্রে ঘুরছে। ঘুরতেই থাকবে৷ সেজন্যই যাবতীয় অসূয়া ছুঁড়ে ফেলে তাদের উদযাপন ও উপভোগ করাটা জরুরি, যারা আমাদের জীবনটাকে উপভোগ্য করে রেখেছেন। জরুরি কারণ নইলে জীবনটা যান্ত্রিক হয়ে যেত। আনন্দ খোঁজাই জীবনের প্রবৃত্তি, যন্ত্র হওয়া না। আনন্দের কোনো উপসংহার হয় না, তাই ঋণও শেষ হয় না।
৫.
মেসি চলে যাচ্ছেন। সমস্ত লেগ্যাসি রেখে চলে যাচ্ছেন। বিশ্বজুড়ে আর্জেন্টাইন ফুটবলের ভক্তদের জন্য তিনি এক যুগবদলের মহানায়ক। আর্জেন্টাইন ফুটবলকে তিনি 'এইজ অব ইমোশন' থেকে 'এইজ অব রিজনিংয়ে'র যুগে উত্তীর্ণ করে গেলেন। ২০২২ সালের আগে আবেগটা ছিল ৩৬ বছরের অপ্রাপ্তির। ২০২৬ সালে এমন সব প্রত্যাবর্তনের গল্প লেখার পর আবেগ মুছে যাবে। নতুন যুগে তারা পদার্পণ করবে আত্মবিশ্বাস ও যুক্তিবুদ্ধিতে ভর করে—হারার আগে হারব না। এটা কি জীবনেরই গল্প নয়? জীবনেরই শিক্ষা নয়?
প্রিয় আকাশি-সাদা জার্সিতে যে আনন্দ ও বিনোদন তিনি দিয়েছেন গত ২০ বছরে, মন ভেঙেছেন, মান রেখেছেন—এগুলো তো মানব জীবনের ওপর, মন ও মানসিকতার ওপর প্রভাব ফেলে। বিশেষত, কত শিশু, কত কিশোরের জীবন তিনি রাঙিয়ে দিয়ে গেলেন, উজ্জীবিত করলেন। বড় হওয়ার পথে এই বিমলানন্দ নিশ্চিত এই বাচ্চাদের পাথেয় হবে। শ্রদ্ধা তাই মন থেকেই আসবে। আসতেই হবে। ওটা মানবিক মনের এক জেনেটিক্যাল ও অর্গানিক প্রবৃত্তি। পলিটিক্যাল তথা যাবতীয় বাইনারির ফাঁদে পড়ে আমরা যা করি, তা কৃত্রিম বা আর্টিফিশিয়াল। এই জটিলতা আমরা পরিহার করতে পারলে প্রপাগান্ডা, হিংসা, বিদ্বেষ ও অমানবিকতা থেকেও মুক্ত হতে পারব।
অতএব, দল-মত-ধর্ম-বর্ণ-জাতি-দেশের উর্ধ্বে গিয়ে তাকে, সেই মহাজনীন বিনোদনদাতাকে, শেষবারের মতো বিশ্ব আসরে উপভোগ ও উদ্যাপন করতে পারলে সেটাও বিশেষ স্মৃতির ক্যানভাস হয়ে থাকবে আজীবন।
লিওনেল আন্দ্রেস মেসি, সত্যই তিনি আর খেলবেন না! তিনি চলে যাচ্ছেন!
৬.
খেয়াল করেছেন নিশ্চয়ই, পিটার দ্রুরি এবার আর্জেন্টিনার একটা ম্যাচেও ধারাভাষ্য দেননি। ফাইনালে তিনি থাকবেন৷ গতবারের অমন মহাকাব্য গাথার পর মেসিকে নিয়ে আর নতুন কথা কী বলবেন হৃদয়গ্রাহী এই ধারাভাষ্যকার, শোনার অপেক্ষায় থাকব আমরা।
"HE, for the one last time has shaken hands with his ultimate love in the ultimate game!" —এমন কিছু কি?
আমরা সত্যই লিওনেল মেসির সময়ে জন্মেছিলাম বলে নিজের পিঠ চাপড়াতে পারি। আমাদের প্রজন্মের শ্রেষ্ঠতম গ্লোবাল জিনিয়াস চলে যাচ্ছেন। চলে যাচ্ছেন হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা। তার সুমধুর বাঁশি আর বাজবে না। তাতে আমাদেরও খেলা সাঙ্গ হলো হয়তো!
এল পিবে, সর্বকালীন চরিত্র হিসেবে প্রতিটি প্রজন্মের কাছেই হয়তো সমবয়সী থেকে যাবেন। প্রতিটি প্রজন্ম জন্মাবে আর তার গল্প শুনবে। তাদের কাছে রূপকথা মনে হবে! যেমন রূপকথার নায়ক হয়ে আছেন পেলে ও মারাদোনা, প্রজন্মান্তরে। ইহজাগতিক এক জীব হিসেবে জগতকে এর চেয়ে বেশি আর কীইবা দিতে পারেন একজন মানুষ! এই আনন্দ অলোকসামান্য, এই আনন্দ জগতপ্লাবন সুরের মাতন!
তিনি এসেছিলেন, রাঙিয়েছিলেন আমাদের। কোন কৃতজ্ঞতায় আমরা তা আর শোধ করতে পারি! শুধু বিদায়বেলায় একটি জয়ের অমলিন হাসির অপূর্ব আকাঙ্ক্ষা ছাড়া!
সেই আকাঙ্ক্ষার গ্রাসে কি ধরা পড়বে না তার স্প্যানিশ শিষ্যকূল! কারও জন্য প্রথম, কারও জন্য শেষবারের মতো ময়দানে দেবতাদর্শন। সেই মোহ কি গোলকধাঁধায় ফেলবে না লামিন ইয়ামালদের? মেসির কোলে শিশু ইয়ামালের বিখ্যাত সেই স্নানচিত্র কি উঁকি দেবে না মনের কোঠায়? আর নেতার বিদায়মঞ্চ রাঙাতে কি জানবাজি রাখবেন না তার আর্জেন্টাইন শিষ্য-সতীর্থকূল?
দেখবেন, হয়তো এসবই হবে। একটা ম্যাচে জয়-পরাজয়ের চেয়ে বড় হয়ে উঠবেন তিনি। সমস্ত পেশাদারিত্ব কোথায় যেন যুক্তিবুদ্ধির কাছে হার মানবে। বিশ্বকাপের ফাইনাল আসবে, যাবে। কিন্তু অমন মোহনমন্ত্রওয়ালা জাদুকরকে আর কোথায় পাওয়া যাবে! কেননা, 'এ পৃথিবী একবার পায় তারে, পায় নাকো আর'!
সৌমিত জয়দ্বীপ সহকারী অধ্যাপক, স্কুল অব জেনারেল এডুকেশন, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়। ই-মেইল: sowmit.joydip@gmail.