Published : 18 Jul 2026, 03:25 PM
একটি গল্প দিয়ে শুরু করি।
দুই বন্ধু আরিফ ও শ্রেয় মরুভূমি পেরিয়ে হাঁটছিল। পথ চলতে চলতে একটি বিষয় নিয়ে তাদের মধ্যে তর্ক বাধে। একপর্যায়ে রাগের বশে আরিফ শ্রেয়কে চড় মারে। অপমানিত হলেও শ্রেয় প্রতিবাদ করল না। সে শুধু মরুভূমির বালুর ওপর লিখল, “আজ আমার প্রিয় বন্ধুর হাতে চড় খেলাম।”
কিছু দূর এগিয়ে তারা একটি মরুদ্যানে পৌঁছাল। গোসল করতে নেমে হঠাৎ শ্রেয় ডুবে যেতে লাগল। আরিফ মুহূর্তের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ে তাকে উদ্ধার করল। প্রাণে বেঁচে উঠে শ্রেয় এবার একটি পাথরের ওপর লিখল, “আজ আমার প্রিয় বন্ধু আমার জীবন বাঁচিয়েছে।”
আরিফ বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করল, “চড় খাওয়ার কথা বালুতে লিখলে, আর প্রাণ বাঁচানোর কথা পাথরে কেন?” উত্তরে শ্রেয় বলল, “মানুষের দেওয়া আঘাতের কথা বালুতে লিখতে হয়, যাতে ক্ষমার বাতাসে তা মুছে যায়। কিন্তু মানুষের করা কল্যাণের কথা পাথরে খোদাই করতে হয়, যাতে সময়ও তাকে মুছে দিতে না পারে।”
গল্পটি কেবল দুই বন্ধুর নয়; এটি ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র—সব ক্ষেত্রের জন্য এক গভীর নৈতিক শিক্ষা। একটি জাতি যদি তার সাময়িক ক্ষোভকে পাথরে আর তার সবচেয়ে বড় অর্জনকে বালুতে লিখে রাখে, তবে সে শেষ পর্যন্ত নিজের ইতিহাসকেই দুর্বল করে।
বাংলাদেশের জন্য জুলাই তেমনই এক পাথরে খোদাই করার মতো অধ্যায়।
জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান কোনো একক ব্যক্তি, দল বা মতাদর্শের বিজয়ের ইতিহাস নয়; এটি ছিল নাগরিক সাহস, গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা এবং রাষ্ট্রকে নতুনভাবে কল্পনা করার এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। নারী-পুরুষ, শিক্ষার্থী, শিক্ষক, শ্রমিক, পেশাজীবী—বিভিন্ন শ্রেণি ও মতের মানুষ একটি অভিন্ন জাতীয় আকাঙ্ক্ষায় একত্রিত হয়েছিলেন। অনেকে জীবন দিয়েছেন, অনেকে চিরস্থায়ী শারীরিক ও মানসিক ক্ষত বহন করছেন। তাদের আত্মত্যাগের মূল্য কেবল রাজনৈতিক পরিবর্তনে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি অধিকতর ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র নির্মাণের প্রত্যাশা।
আজ জুলাই নিয়ে নানা বিতর্ক হচ্ছে। কে বেশি অবদান রেখেছে, কে রাজনৈতিকভাবে লাভবান হয়েছে কিংবা কে জুলাইয়ের ভাষা ব্যবহার করে নিজস্ব অবস্থান শক্তিশালী করেছে—এসব প্রশ্ন জনপরিসরে থাকতেই পারে। গণতন্ত্রে বিতর্ক অস্বাভাবিক নয়; বরং তা গণতন্ত্রেরই অংশ। কিন্তু বিতর্কের আড়ালে যদি আমরা জুলাইয়ের মৌলিক শিক্ষা ভুলে যাই, তবে সেটিই হবে সবচেয়ে বড় ক্ষতি।
একটি সত্য অস্বীকার করার উপায় নেই, জুলাই আন্দোলনে রাষ্ট্রের সংকটময় মুহূর্তে যে নাগরিক ঐক্য সৃষ্টি হয়েছিল, তা বাংলাদেশের সামনে একটি নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছিল। ওই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়া ছিল আমাদের রাজনৈতিক ও নৈতিক দায়িত্ব; যে দায়িত্ব আজও শেষ হয়নি।
ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন কাজ কোনো অর্জন নয়; অর্জনকে রক্ষা করা। আন্দোলনের সময় মানুষকে একত্র করে আদর্শ, কিন্তু আন্দোলনের পরে তাদের বিচ্ছিন্ন করে ক্ষমতা, প্রতিযোগিতা এবং প্রাপ্তির হিসাব। ইতিহাসে প্রায় সব বড় গণআন্দোলনই এই কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে। বাংলাদেশও আজ ওই পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে ‘ক্লাব-৯৯’-এর গল্পটি স্মরণীয়। একজন সুখী মালির দরজায় এক রাতে একটি ব্যাগে ৯৯টি সোনার মুদ্রা রেখে দেওয়া হলো। মুদ্রা গুনে সে ভাবল, নিশ্চয়ই একটি কম আছে। ওই একটি মুদ্রার সন্ধানেই শুরু হলো তার অস্থিরতা। যে মানুষ অল্পে সুখী ছিল, সে ক্রমে উদ্বিগ্ন, অসন্তুষ্ট ও ক্লান্ত হয়ে উঠল। তার আনন্দ হারিয়ে গেল, কারণ তার দৃষ্টি যা আছে তার দিকে নয়, যা নেই তার দিকেই স্থির হয়ে রইল।
রাজনীতির ক্ষেত্রেও এই গল্পের শিক্ষা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। যখন ক্ষমতা দায়িত্বের পরিবর্তে প্রাপ্তির প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়, তখন নীতি ধীরে ধীরে সরে যায়। বৃহত্তর জনস্বার্থের জায়গা দখল করে ব্যক্তিগত কিংবা দলীয় হিসেব। তখন রাজনীতি জনগণের আস্থা অর্জনের পরিবর্তে ক্ষমতা ধরে রাখার কৌশলে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।
জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই ঝুঁকির লক্ষণ উপেক্ষা করা কঠিন। যে ঐক্য মানুষকে রাস্তায় নামিয়েছিল, তার জায়গায় অনেক ক্ষেত্রে অবিশ্বাস, বিভাজন ও পারস্পরিক সন্দেহ স্থান করে নিচ্ছে। মতপার্থক্য গণতন্ত্রের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য; কিন্তু মতভিন্নতা কখনো শত্রুতার সমার্থক নয়। রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা যদি নৈতিক সংযম হারায়, তবে তা শেষ পর্যন্ত গণতন্ত্রকেই দুর্বল করে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের একটি মৌলিক শিক্ষা হলো কোনো রাষ্ট্র কেবল সংবিধান, আইন কিংবা প্রতিষ্ঠানের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না; টিকে থাকে রাজনৈতিক আস্থা, নৈতিক বৈধতা এবং সামাজিক সংহতির ওপর। আইন রাষ্ট্রের কাঠামো নির্মাণ করে, কিন্তু ওই কাঠামোয় প্রাণ সঞ্চার করে নাগরিকদের পারস্পরিক বিশ্বাস। বিশ্বাস ক্ষয়ে গেলে প্রতিষ্ঠানও ক্রমশ অকার্যকর হয়ে পড়ে। তাই রাষ্ট্র নির্মাণের প্রশ্নে নৈতিকতার কোনো বিকল্প নেই।
ইতিহাসও একই শিক্ষা দেয়। বহু বিপ্লব ও স্বাধীনতা আন্দোলন বাইরের শক্তির কাছে নয়, নিজেদের অভ্যন্তরীণ বিভক্তির কারণেই দুর্বল হয়েছে। যে ঐক্য আন্দোলনের শক্তি ছিল, ওই ঐক্য হারিয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়েই অনেক স্বপ্ন ভেঙে গেছে। এই অভিজ্ঞতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় শত্রু শুধু স্বৈরতন্ত্র নয়; রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, অসহিষ্ণুতা এবং সীমাহীন ক্ষমতালিপ্সাও গণতন্ত্রের জন্য সমান বিপজ্জনক।
জুলাইয়ের সবচেয়ে বড় অর্জন সরকার পরিবর্তন নয়; বরং মানুষের মধ্যে গড়ে ওঠা এক বিরল নাগরিক ঐক্য। ভিন্ন রাজনৈতিক মত, ধর্মীয় পরিচয় ও সামাজিক অবস্থানের মানুষ একটি বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থে এক কাতারে দাঁড়িয়েছিলেন। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় এটিই একটি কার্যকর ন্যূনতম জাতীয় ঐকমত্য—যেখানে সব বিষয়ে একমত হওয়া জরুরি নয়, কিন্তু রাষ্ট্রের মৌলিক মূল্যবোধের প্রশ্নে একটি অভিন্ন অবস্থান গড়ে ওঠে। এই ঐকমত্যই একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার ভিত্তি।
আজ সবচেয়ে বড় দায়িত্ব ওই আস্থা ও ঐক্যকে ধরে রাখা। কারণ একটি জাতির ভবিষ্যৎ কেবল তার রাজনৈতিক সাফল্যে নির্ধারিত হয় না; নির্ধারিত হয় ওই সাফল্যের নৈতিক ভিত্তি কতটা দৃঢ় থাকে, তার ওপর।
দার্শনিক ক্ষিতিমোহন সেন লিখেছিলেন, “অন্তি সন্তং ন জহাতি, অন্তি সন্তং ন পশ্যতি” অর্থাৎ, যা আমাদের খুব কাছে থাকে, তার প্রকৃত মূল্য আমরা অনেক সময় বুঝতে পারি না; হারিয়ে যাওয়ার পরই উপলব্ধি করি।
জুলাইয়ের ঐক্যও আজ তেমনই এক মূল্যবান সম্পদ। আন্দোলনের উত্তাপে সেটি ছিল স্বাভাবিক বাস্তবতা; সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিভাজন বাড়তে থাকায় আমরা তার প্রকৃত গুরুত্ব আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করছি। তাই প্রয়োজন পারস্পরিক আস্থা পুনর্গঠন, সংলাপের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা এবং রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার মধ্যেও নৈতিক সংযম বজায় রাখা।
মরুভূমির ওই গল্পে শ্রেয় আঘাতের কথা লিখেছিল বালুর ওপর, আর ভালোবাসার কথা লিখেছিল পাথরে। আমাদেরও তাই করা উচিত। সাময়িক তিক্ততা, রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা কিংবা ব্যক্তিগত অভিমান সময়ের বালুতেই ছেড়ে দেওয়া প্রয়োজন। কিন্তু যে ঐক্য, আত্মত্যাগ এবং নৈতিক সাহস বাংলাদেশের সামনে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছিল, তাকে খোদাই করতে হবে ইতিহাসের পাথরে।
কারণ একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় সে কী ভুলে যায়, তা দিয়ে নয়; বরং সে কী মনে রাখে, কীভাবে মনে রাখে এবং ওই স্মৃতি থেকে কী শিক্ষা গ্রহণ করে তা দিয়েই।
শুভ কিবরিয়া সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। ই-মেইল: [email protected]