Published : 18 Jul 2026, 05:23 PM
ইতিহাস সাক্ষী, যেকোনো অভ্যুত্থানের পর সমাজে নানামুখী সংস্কার আসে। তবে ২০২৪-এর জুলাই অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে আইনের জগতে যে অভূতপূর্ব ও অলৌকিক ‘প্যারানরমাল’ সংস্কার এসেছে, তা মানব ইতিহাসের যেকোনো সায়েন্স ফিকশনকেও হার মানাতে বাধ্য। আমাদের ফৌজদারি বিচারব্যবস্থা এখন এতটাই আধ্যাত্মিক স্তরে উন্নীত হয়েছে যে, এখানে মৃত ব্যক্তিরা কবর থেকে নয়, সরাসরি সৌদি আরব থেকে হোয়াটসঅ্যাপে ভয়েস মেসেজ পাঠিয়ে নিজেদের কুশল সংবাদ জানাচ্ছেন!
২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থান নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। মানুষ প্রাণ দিয়েছে, রক্ত ঝরেছে, পরিবার নিঃস্ব হয়েছে। কিন্তু সেই রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে যে নতুন ব্যবসা জন্ম নিল, তার নাম: ‘ফ্র্যাঞ্চাইজি মামলা লিমিটেড’। এখানে সত্যের দরকার নেই, দরকার শুধু একটি এজাহার, কয়েকটি বড় নাম, কিছু অজ্ঞাত আসামি এবং একটু কল্পনাশক্তি। এরপর বিচারব্যবস্থা নয়, পুরো দেশই হয়ে যায় এক রহস্যোপন্যাস।
পুলিশের সাম্প্রতিক চূড়ান্ত প্রতিবেদনগুলো বিশ্লেষণ করলে চোখ কপালে ওঠার জো নেই, কপাল সোজা চোখে নেমে আসার জোগাড় হয়। দেখা যাচ্ছে, যে অভ্যুত্থানের আগুনে স্বৈরাচারের পতন হলো, সেই পবিত্র আগুনের ছাই দিয়ে কেউ কেউ নিজেদের পারিবারিক শত্রুতার বারবিকিউ পার্টি জমিয়ে তুলেছেন। সম্প্রতি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে এ ব্যাপারে একাধিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। ওই প্রতিবেদনগুলো পাঠ করে তো পুরোই মাথা নষ্ট হওয়ার জোগাড়!
হাতিরঝিল থানার উলন সড়কের সেই ঐতিহাসিক মামলার কথাই ধরা যাক। এজাহারের রুদ্ধশ্বাস বর্ণনা অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই ৪৬ বছর বয়স্ক মো. বাবু পুলিশের গুলিতে ‘শহীদ’ হন। মামলার আসামি কে নন? সাবেক প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের পাতি নেতা, সবাই এই হত্যাকাণ্ডের মাস্টারমাইন্ড।
কিন্তু মামলার তদন্ত করতে গিয়ে হাতিরঝিল থানা পুলিশ যখন চাঁদের দেশে নয়, চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার বরুরকান্দি গ্রামে পৌঁছাল, তখন বিজ্ঞানের সব সূত্র ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। জানা গেল, ‘নিহত’ বাবুর আসল নাম মো. শাকিল। তিনি শুধু জীবিতই নন, বহাল তবিয়তে সৌদি আরবে বসে মরুর হাওয়া খাচ্ছেন এবং খেজুর পাড়ছেন। সাংবাদিকরা যখন তাকে হোয়াটসঅ্যাপে ধরলেন, তখন তিনি যে ঐতিহাসিক বাণী দিলেন, তা দেশের বিচারব্যবস্থার গালে এক প্রকাণ্ড চড়: ‘আমি তো মারা যাইনি ভাই। আমি মরলে সৌদি আরব আসলাম কীভাবে? এখন আমি সৌদি আরবে শ্রমিক হিসেবে কাজ করি।’
আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার তত্ত্ব ভুল হতে পারে, কিন্তু বাংলাদেশের মামলার এজাহার ভুল হতে পারে না! হয়তো এজাহারকারী ভেবেছিলেন, ‘শহীদ’ হওয়ার পর পুণ্যবান ব্যক্তিরা সরাসরি স্বর্গে যান; আর আধুনিক যুগে স্বর্গের সবচেয়ে কাছের ও সহজ রুট হলো সৌদি আরবের ওয়ার্ক পারমিট ভিসা!
কিন্তু নাটকের শেষ এখানেই নয়। মামলার বাদী বাবুর খালাতো ভাই ‘ইসমাঈল’। পুলিশ যখন তাকে ফরিদগঞ্জে গিয়ে খুঁজে বের করল, ইসমাঈল তো আকাশ থেকে পড়লেন। তিনি বললেন, ‘আরে ভাই, আমি তো এই জন্মে আদালত চত্বরই দেখিনি, মামলা করব কীভাবে?’ এমনকি এজাহারে দেওয়া নম্বরে ফোন করলে এক নারী রিসিভ করে বলেন, ‘ইসমাঈল নামে কাউকে চিনি না, রং নাম্বার!’ অর্থাৎ, যিনি নিহত তিনি বিদেশে কর্মরত, আর যিনি বাদী তিনি মহাবিশ্বে নিখোঁজ। মধ্যস্বত্বভোগী কোনো এক ‘মামলা-উদ্যোক্তা’ চক্র জাল মৃত্যুসনদ বানিয়ে পুরো হাতিরঝিল থানাকে একবিংশ শতাব্দীর সেরা এপ্রিল ফুল বানিয়ে দিয়েছে।
এবার আসি পল্টন থানার গল্পে। ২৪ বছরের পারভেজ আলী নাকি বক্স কালভার্ট রোডে গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে মারা গেছেন। আর বাদী ইয়াসিন আরাফাত নিজেও নাকি সেখানে গুলিবিদ্ধ! এজাহারের বর্ণনা শুনলে মনে হবে, ঢাকা দক্ষিণ সিটির প্রাক্তন মেয়র আর যুবলীগের সাবেক চেয়ারম্যান দুহাতে একে-৪৭ নিয়ে র্যাম্বো স্টাইলে গুলি বর্ষণ করছেন!
কিন্তু তদন্তে নেমে পিবিআই (পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন) দেখল, পারভেজ আলী নামের কোনো মানবসন্তানের অস্তিত্বই এই পৃথিবীতে নেই! তিনি সম্পূর্ণ একটি কাল্পনিক চরিত্র, যেন কোনো সস্তা উপন্যাসের খসড়া। আর আমাদের মহান বাদী ইয়াসিন আরাফাত? তার পায়ের যে ‘গুলিবিদ্ধ’ ক্ষতচিহ্ন দেখানো হয়েছিল, ডাক্তার ও তদন্ত কর্মকর্তারা ভালো করে পরীক্ষা করে দেখলেন, ওটা আসলে কোনো এক অতীতে দৌড়াতে গিয়ে বা হোঁচট খেয়ে পাওয়া মামুলি কাটাছেঁড়ার দাগ!
পায়ের পুরনো চটা চামড়াকে যারা বুলেটের ক্ষত বলে চালিয়ে দিতে পারেন, তাদের সৃজনশীলতাকে অস্কার দেওয়া উচিত। জানা গেছে, এই চতুর যুবকটি একসময় আওয়ামী লীগের মিছিলে ক্যামেরা ফোকাস করতেন, পরে কোটা সংস্কার আন্দোলন ও ছাত্র অধিকার ঘুরে এখন এক বেসরকারি টিভির ‘মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার’। শ্যামনগরের ইউপি চেয়ারম্যানের ভাষায়: ‘ছেলেটা চতুর, চালু আছে। ওর কোনো কিছুই বিশ্বাসযোগ্য নয়।’ অথচ এই ‘চতুর’ রিপোর্টারের স্ক্রিপ্টে সাবেক প্রধানমন্ত্রীসহ দেশের তাবড়-তাবড় রুই-কাতলারা আসামি হয়ে গেলেন। এমনকি তার নিজের বাবাও জানতেন না যে তার ছেলের পায়ে ‘বুলেট’ ঢুকে বসে আছে!
পল্টনের ওই একই মামলায় আসামি করা হয়েছে পাবনার আব্দুল মতিন ও নাজমুল হাসানকে। সম্পর্কে তারা চাচা-ভাতিজা এবং পেশায় ট্রাকচালক। জুলাইয়ের উত্তাল দিনগুলোতে যখন সারা দেশ স্তব্ধ, চাকা বন্ধ, পেটে ভাত নেই—তখন তারা পাবনায় বসে আলুর তরকারি দিয়ে ভাত খাচ্ছিলেন। অথচ মামলার এজাহারে তারা নাকি পল্টনে এসে ভিআইপিদের সঙ্গে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করছিলেন!
পাবনার ট্রাকচালকের সঙ্গে সাতক্ষীরার টিভির রিপোর্টারের সম্পর্ক কী? রহস্য ফাঁস করলেন খোদ আব্দুল মতিন: ‘পাশের বাড়ির কাশেম মুন্সির সঙ্গে আমাদের জমিজমা নিয়ে বিরোধ আছে। তার ভাতিজা রনি ঢাকায় ক্যামেরাম্যানের চাকরি করে। শুনেছি, বাদী আর রনি দুজনে বন্ধু।’
বাহ! কী চমৎকার সমীকরণ! গ্রামীণ দলাদলি আর শরিকানা জমির আইল ঠেলাঠেলির শোধ নেওয়ার এর চেয়ে মোক্ষম সুযোগ আর কী হতে পারে? ঢাকা শহরের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানকে নিজের বাড়ির সীমানা প্রাচীর উদ্ধারের হাতিয়ার বানিয়ে ফেলা, এই মেধার তারিফ না করে উপায় নেই। পুলিশ যখন আসামিদের ফোনের সিডিআর (কল ডিটেইলস রেকর্ড) চেক করল, দেখল ঘটনার সময় তারা ঘটনাস্থল থেকে শত শত কিলোমিটার দূরে নাক ডেকে ঘুমাচ্ছিলেন।
আদাবর থানার গল্পটাও একই সুতোয় গাঁথা। ১৯ জুলাই আলী মিয়া নামের এক ব্যক্তি মারা গেলেন, বাদী হলেন তোহা খান। পুলিশ তদন্তে গিয়ে দেখল, তোহা খানের এজাহারে দেওয়া ফোন নম্বরটি বন্ধ। ঠিকানায় গিয়ে জানা গেল, এই নামে কোনো ভাড়াটিয়া বা বাড়ির মালিকের অস্তিত্বই নেই। উল্টো ওই বাড়ির বাসিন্দারা পুলিশ দেখে খেপে গিয়ে বললেন, "তোহা তোহা করে মাথা খারাপ করবেন না, ও এখানে থাকে না।" আলী মিয়ার লাশের হদিস নেই, তোহা খানেরও হদিস নেই—মাঝখান থেকে মামলা রেকর্ড হয়ে ফাইল ভারী।
এই যে রাজধানীর ৫০টি থানায় ৭০৭টি মামলা হলো, ৫ হাজারেরও বেশি নামীয় আর লাখো অজ্ঞাত আসামি করা হলো; এর পেছনের মূল খেলাটা কিন্তু ‘বিপ্লব’ ছিল না, ছিল ‘বাণিজ্য’। থানার আশেপাশে, আদালতের বারান্দায় একদল ‘মামলা-দালাল’ সিন্ডিকেট তৈরি হয়েছে। তালিকায় নাম তুলতে টাকা লাগে, নাম কাটতে আরও বেশি টাকা লাগে!
এর ফলে কী হচ্ছে? যারা সত্যিই জুলাইয়ের তপ্ত রোদে বুক পেতে দিয়ে বুলেটবিদ্ধ হয়ে মারা গেলেন, সেই প্রকৃত শহীদদের রক্ত এই ভুয়া মামলার সাগরে হারিয়ে যাচ্ছে। যখন একটি আদালতের বিচারক দেখবেন যে একের পর এক মামলায় ‘মৃত ব্যক্তি’ সৌদি আরব থেকে ফোন ধরছেন, তখন তিনি প্রকৃত খুনিদের বিচার করার সময়ও সন্দেহের চোখে তাকাবেন। স্বৈরাচারের বিচার অলরেডি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে শুরু হয়েছে, মৃত্যুদণ্ডের রায়ও আসছে; কিন্তু এই ভুয়া মামলার কারবারিরা পুরো প্রক্রিয়াটিকে বিশ্বমঞ্চে তামাশার পাত্র বানিয়ে তুলছে।
ডিএমপির প্রসিকিউশন বিভাগের তথ্য বলছে, ইতোমধ্যে ১৯টি মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে তিনটি সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং বাকি ১৬টিতে রয়েছে তথ্য জালিয়াতি। সরকার হয়তো জুলাইয়ের সেন্টিমেন্টের কারণে এই ভুয়া বাদীদের বিরুদ্ধে এখনই কঠোর হচ্ছে না। তবে এভাবে চলতে থাকলে আগামী দিনে যেকোনো ক্রাইম থ্রিলার উপন্যাসের শুরুতে হয়তো লেখা থাকবে, “এই উপন্যাসের চরিত্র ও ঘটনাবলি সম্পূর্ণ কাল্পনিক, ঠিক জুলাইয়ের হাতিরঝিল থানার মামলার মতো!”
এভাবে চলতে থাকলে খুব শিগগিরই বিজ্ঞাপন দেখা যাবে, ‘জুলাই স্পেশাল অফার! তিনজন আসামি দিলে একজন অজ্ঞাত আসামি ফ্রি! নাম কাটাতে চাইলে ইএমআই সুবিধা!’
বাংলাদেশে এখন মামলা শুধু আইনি নথি নয়; এটি একটি বাজারজাত পণ্য। শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন একটাই। যে জুলাইয়ের আন্দোলন গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও জবাবদিহির দাবিতে হয়েছিল, সেই আন্দোলনের নাম ব্যবহার করে যদি ভূত, প্রেত, ডিজিটাল লাশ, অদৃশ্য বাদী আর ব্যক্তিগত প্রতিশোধের কারখানা চালানো হয়, তাহলে সবচেয়ে বড় ক্ষতি কার?
কোনো রাজনৈতিক দলের নয়। রাষ্ট্রেরও নয়। ক্ষতি হয় বিচারব্যবস্থার। আর বিচারব্যবস্থা যখন একবার মানুষের হাসির খোরাকে পরিণত হয়, তখন আদালতের কাঠগড়ায় শুধু আসামি দাঁড়ায় না, সত্যও দাঁড়িয়ে যায় অভিযুক্তের আসনে।
চিররঞ্জন সরকার লেখক ও কলামনিস্
জুলাইয়ে হত্যা: 'শহীদ' এখন সৌদি আরবে, মামলার বাদী ভুয়া