Published : 18 Jul 2026, 09:37 PM
কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নেতারা যাতে নির্দলীয় প্রতীকের স্থানীয় সরকারের নির্বাচনেও অংশ নিতে না পারে, সেই বিধান করার প্রস্তাব নির্বাচন কমিশনে দিয়েছে জাতীয় সংসদের প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী।
দলটির প্রস্তাব হল, সরকার যেসব রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছে, সেসব দলের পদধারী বা সক্রিয় নেতা–কর্মীদের ‘নির্বাচনে অংশগ্রহণের অযোগ্য’ ঘোষণা করার বিধান স্থানীয় সরকারের সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদের প্রস্তাবিত নির্বাচনী আচরণ বিধিমালায় যুক্ত করত হবে।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আচরণ বিধিমালা হালনাগাদ করতে রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত চেয়ে গত ১০ জুন চিঠি পাঠিয়েছিল নির্বাচন কমিশন। সেই চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে জামায়াতের পক্ষ থেকে দলের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারের সই করা মতামত দেওয়া হয় ৩০ জুন।
সেখানে সাতটি সংশোধনী প্রস্তাব বিবেচনার জন্য ইসিকে অনুরোধ জানায় জামায়াত। পাশাপাশি দুটি বিশেষ প্রস্তাব দেওয়া হয় ইসিকে।
জানতে চাইলে মিয়া গোলাম পরওয়ার শনিবার সন্ধ্যায় বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “নির্বাচন কমিশন আমাদের কাছে মতামত চেয়েছে। স্থানীয় নির্বাচনের বিধিমালা করতে সব দলের কাছে মতামত চেয়েছে। আমরা তাদের চাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে মতামত দিয়েছি।”
আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ‘অযোগ্য ঘোষণার’ প্রস্তাবের বিষয়ে প্রশ্ন কলে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, “সরকার যেহেতু একটি আইনের ভিত্তিতে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছে, এখন সরকার যে আইন দ্বারা কোনো দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে, ওই কারণেই... তারমধ্যে তো নির্বাচনও একটি কার্যক্রম।
“ফলে ওই একই নির্দেশের কারণে নির্বাচনে আর যোগ্য থাকে না। আমরা ওইটাই বলেছি। যতক্ষণ তারা নিষিদ্ধ থাকবে, ততক্ষণ ইলেকশনের জন্য অযোগ্য থাকবে। এটা তো সরকারের দায়িত্ব।”
‘সুযোগ নেই’
জামায়াতের ওই প্রস্তাবের বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ শনিবার রাতে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, "কে কী মতামত দিয়েছে, সবার মতামত একীভূত করে ইসি সচিবালয় আমাদের কাছে উপস্থাপন করবে। যেগুলো গ্রহণযোগ্য, সেগুলো বিবেচনা করা হবে।"
তিনি বলেন, স্থানীয় নির্বাচন নির্দলীয়, সুতরাং যারা প্রার্থী হওয়ার যোগ্য বিবেচিত হবেন, তারাই নির্বাচন করবেন।
“দলীয় কোনো প্রার্থীর বিষয়ে আইন-বিধিতে কিছু যুক্ত করা হচ্ছে না।”
অন্যদিকে নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য, নির্বাচন বিশ্লেষক আব্দুল আলীম বলছেন, আওয়ামী লীগের বিষয়ে যে প্রস্তাব জামায়াত দিয়েছে, সেটা আচরণবিধির বিষয়ই নয়।
"প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতা অযোগ্যতার বিষয়টি আইনের সাথে সংশ্লিষ্ট। এটি আচরণবিধির বিষয় নয়। তাছাড়া এবার হচ্ছে নির্দলীয় স্থানীয় সরকার নির্বাচন, এখানে দলীয় কোনো প্রতীক পাওয়ার বিষয় নেই। সেক্ষেত্রে আইন অনুযায়ী যারা প্রার্থী হওয়ার যোগ্য, তারাই হবেন।"
আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞার কারণে নির্দলীয় স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কোনো প্রার্থীকে ‘অযোগ্য’ ঘোষণার সুযোগ নেই বলেও মনে করেন আলীম।
সরকার কী ভাবছে?
চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের সব ধরনের কার্যক্রমে ২০২৫ সালের মে মাসে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে তখনকার অন্তর্বর্তী সরকার।
অধ্যাদেশের মাধ্যমে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে সংশোধনী এনে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও তার নেতাদের বিচার কার্যসম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত দলটির যাবতীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়।
এর ধারাবাহিকতায় নির্বাচন কমিশন আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত করে। ফলে গত ফেব্রুয়ারিতে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি আওয়ামী লীগ।
কিন্তু স্থানীয় সরকার নির্বাচন হবে নির্দলীয় প্রতীকে। অর্থাৎ, দলের পক্ষ থেকে মনোনয়ন দেওয়ার কোনো বিষয় থাকবে না। ফলে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের এ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো আইনগত বাধা এখন নেই।
সরকার অক্টোবর ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে স্থানীয় সরকারের ভোটের পরিকল্পনা জানানোর পর যে প্রশ্নটি নতুন করে সামনে আসে, তা হল, আওয়ামী লীগ নেতারাও এ নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন কি না।
এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান গত ৯ জুন এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণ করলে আওয়ামী লীগসহ যে কোনো দলের যে কেউ স্থানীয় সরকারের ভোট করতে পারেন, এখানে কোনো বাধা তিনি দেখছেন না।
"কোনো রকম কোনো সমস্যা নেই। মানে একজন ব্যক্তি যদি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে চান, তিনি যদি আওয়ামী লীগের.... কারণ এটা নির্দলীয়, এখানে কেউই দলের কথা বলবেন না।
“একজন নির্দলীয় ব্যক্তি আসলেন কিন্তু তিনি তার ক্যাম্পেইনে আওয়ামী লীগ বা তাদের যা যা বলার সেগুলো বললেন–সেটা প্রবলেম হবে। এর বাইরে নির্দলীয় ব্যক্তি, তার যে ক্রাইটেরিয়া (শর্ত) আছে নির্বাচনটা করার জন্য, সেটা যদি তিনি ফুলফিল করতে পারেন, তিনি নির্বাচন করতে পারেন। নিশ্চয় পারেন।"
যদি নির্বাচনে আসা কারো আওয়ামী লীগের পদ-পদবি থাকে, তাহলে কী হবে?
এই প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, "আওয়ামী লীগের পোস্ট পজিশন... আসলে যেটা হয় আরকি, সংগঠনের কর্মসূচি যেহেতু নিষিদ্ধ আছে, এই পোস্ট পজিশন তিনি তো আসলে ব্যবহার করছেন না, তিনি করতে পারেন না।
“ব্যক্তি হিসেবে যে কেউ যদি ক্রাইটেরিয়া ফুলফিল করতে পারেন, তিনি যদি মনে করেন নির্বাচন করবেন, তিনি নির্বাচন করতে পারেন। সরকারের দিক থেকে বাধা দেওয়ার কোনো কারণ নেই এই ব্যাপারে।"
আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে যাদের বিরুদ্ধে মামলা আছে, তারা কি নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন?
এ প্রশ্নে জাহেদ উর রহমান বলেন, "আপনাকে এটা জানতে হবে, মামলা থাকলেও তো জাতীয় সংসদ নির্বাচন করা যায়। আমি আবারও বলছি, স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোর যে ক্রাইটেরিয়া আছে… আমি আরেকটু সহজ করে দিই, ধরুন এই পার্লামেন্ট ইলেকশনে আওয়ামী লীগের কোনো এককালের নেতা চাইলেন যে তিনি নির্বাচন করবেন, তিনি নির্বাচন করতে পারতেন। এমনকি মামলায় থাকা, জেলে থাকার পরও।
“কারণ সংসদ নির্বাচনে বলছে, আপনি দুই বছরের দণ্ডপ্রাপ্ত হতে হবে নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধে, এর আগ পর্যন্ত আপনি তো নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারেন। সো এই সুযোগগুলো তখনও ছিল, এখনও আছে।"
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা গত ১৫ জুন জাতীয় সংসদেও এ প্রশ্ন তুলেছিলেন।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রীর উদ্দেশে তিনি বলেছিলেন, “স্থানীয় সরকার নির্বাচন কবে হবে, সে নির্বাচনে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ অংশ নিতে পারবে কি না, সে বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন কথা শোনা যাচ্ছে।”
“কেউ বলছেন, আওয়ামী লীগ অংশ নিতে পারবে; কেউ বলছেন পারবে না। আবার কেউ বলছেন, দলীয় প্রতীকে নির্বাচন না হলে যাদের ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা আছে, তারা অংশ নিতে পারবেন। বিষয়গুলো যদি স্থানীয় সরকার মন্ত্রী স্পষ্ট করতেন, তাহলে সবার বুঝতে সুবিধা হত।”
জবাবে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর মূল প্রশ্নটি এড়িয়ে গিয়ে শুধু বলেন, “স্থানীয় সরকার নির্বাচন যথাসময়ে অনুষ্ঠিত হবে।”
আরো যা যা প্রস্তাব জামায়াতের
জামায়াতের পক্ষ থেকে নির্বাচনী ক্যাম্প/অফিসে টেলিভিশন বা ভিসিআর ব্যবহার নিষিদ্ধ করার কথা বলা হলেও ডিজিটাল উপকরণ যেমন- এলইডি ডিসপ্লে, প্রজেক্টর, ল্যাপটপ ইত্যাদি ব্যবহারের বিষয়ে সুস্পষ্ট বিধান সংযোজনের দাবি করা হয়েছে।
স্থানীয় সরকারের ভোটের প্রচারে মন্ত্রী ও এমপিদের অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ করার বিধান সংযোজন করার প্রস্তাব দিয়েছে বিরোধী দলে থাকা দলটি।
এছাড়া সকল নির্বাচনেই ভোটকেন্দ্রে সংবাদকর্মীদের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ করে একটি স্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন; প্রার্থিতা বাতিলের ক্ষমতা কমিশনের হাতে রাখার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর আপিল করার সুযোগও বিধিমালায় অন্তর্ভুক্ত করার মতামত দিয়েছে তারা।
স্থানীয় সরকারের প্রশাসনিক পদে নিযুক্ত কোনো প্রশাসক বা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের পদে নিযুক্ত ব্যক্তিকে সংশ্লিষ্ট নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ‘অযোগ্য’ যোষণা করে বিধান তৈরির দাবি জানিয়েছে জামায়াত।
তাদের দুটি বিশেষ প্রস্তাব হল: ইউনিয়ন পরিষদে সংরক্ষিত নারী সদস্য নির্বাচনের নিয়ম বাতিল করে প্রতিটি ওয়ার্ডে নারী সদস্যদের সরাসরি নির্বাচন করার বিধান করা এবং জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদের নির্বাচনে কারা ভোটার হবেন, সে বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা।