Published : 18 Jul 2026, 11:06 PM
“আমার স্বামীর কবরটাও নদীতে চলে গেছে। এখন মানুষ মরলে কোথায় কবর দেব, সেই চিন্তায় থাকতে হয়।”
কথাগুলো বলতে বলতে চোখের পানি মুছছিলেন ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলার কুলকাঠি ইউনিয়নের সরই গ্রামের বাসিন্দা ৭০ বছর বয়সী মাকসুদা বেগম। তার জীবনের সবচেয়ে বড় কষ্ট শুধু বসতভিটা হারানো নয়; স্বামীর কবর নদীর গর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়ার ঘটনাও।
মাকসুদা বেগম বলেন, একসময় নদীর ধারে ছিল তাদের বাড়ি। ভাঙনে সেটি হারিয়ে গেলে একটু দূরে নতুন করে ঘর তুলেছিলেন ছেলেরা। কিন্তু সেই বাড়িটিও রক্ষা পায়নি। ভিটেমাটি, গাছপালা সবই চলে গেছে সুগন্ধা নদীর গর্ভে। এখন অন্যের জমিতে ছোট্ট একটি ঘর তুলে কোনোরকমে বসবাস করছেন।
তার অভিযোগ, এত বড় ক্ষতির পরও সরকারের কেউ তাদের খোঁজ নিতে আসেননি।

সুগন্ধা নদীর ভয়াল ভাঙনের কারণে নলছিটি উপজেলার অন্তত ১০টি গ্রামের শত শত পরিবার নিঃস্ব হওয়ার পথে। বর্ষা এলেই নতুন করে আতঙ্ক বাড়ে তাদের।
স্থানীয়দের ভাষ্য, বারইকরন, সরই, তিমিরকাঠি, দরিরচর, খোজাখালী, মল্লিকপুর, সিকদারপাড়া, বহরমপুর, ষাটপাকিয়া, কাঠিপাড়া, অনুরাগসহ ১০টিরও বেশি গ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকা নদীতে বিলীন হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বারইকরন, সরই, খোজাখালী, দরিরচর, তিমিরকাঠি ও সিকদারপাড়া।
সরই গ্রামের বাসিন্দা রশিদ মোল্লা বলেন, প্রায় ৫০ বছর ধরে এই ভাঙন চলছে। কিন্তু স্থায়ীভাবে ভাঙন রোধে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এ সময়ে শত শত পরিবার বসতভিটা, পানের বরজ, গাছপালা ও কোটি কোটি টাকার সম্পদ হারিয়েছেন।
হ্যাপি বেগমের ঘর এখন নদীর একেবারে কিনারায়। তিনি বলেন, “প্রতিদিন মনে হয়, এই বুঝি ঘরটা নদীতে চলে গেল। ছেলে-মেয়েদের নিয়ে কোথায় যাব, কী করব কিছুই বুঝতে পারছি না।”
মগড় ইউনিয়নের কাঠিপাড়া গ্রামের ইউসুফ হাওলাদার বলেন, তাদের এলাকায় আগে ২০ থেকে ৩০টি পরিবার ছিল। এখন মাত্র দু-তিনটি পরিবার টিকে আছে।
তার ভাষায়, “আমরা কোনো সাহায্য চাই না। শুধু নদীভাঙনটা বন্ধ করে দেওয়া হোক।”
সরই গ্রামের জামাল ফকির বলেন, তার বাপ-দাদার ভিটা এখন সুগন্ধা নদীর মাঝখানে। কষ্ট করে নতুন বাড়ি করলেও সেটি নিরাপদ নয়।
তিনি বলেন, বছরের পর বছর ধরে ভাঙন চললেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ চোখে পড়েনি।

অবসরপ্রাপ্ত তহসিলদার হাজী আব্দুল হক তালুকদার বলেন, যে জায়গায় একসময় অসংখ্য বসতঘর ছিল, এখন সেখানে লঞ্চ চলাচল করে। নদী ধীরে ধীরে তার বাড়ির দিকেও এগিয়ে আসছে। ভবিষ্যতে নিজ ভিটায় থাকতে পারবেন কি-না, সেই শঙ্কায় আছেন তিনি।
সরই গ্রামের ইউপি সদস্য বেল্লাল হোসেন মোল্লা বলেন, নদীভাঙনে তার অনেক স্বজন বাপ-দাদার ভিটার শেষ চিহ্নটুকুও হারিয়েছেন। ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে একাধিকবার পানি উন্নয়ন বোর্ডকে বিষয়টি জানানো হলেও এখনো স্থায়ী কোনো সমাধান হয়নি।
এ বিষয়ে ঝালকাঠি পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী এ কে এম নিলয় পাশা বলেন, ঝালকাঠি ও নলছিটির নদীভাঙন এলাকায় একটি উন্নয়ন প্রকল্প চলমান রয়েছে। অন্যান্য ভাঙনপ্রবণ স্থানেও প্রাথমিক জরিপ সম্পন্ন হয়েছে। প্রকল্প অনুমোদন পেলে প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।