Published : 23 Jun 2026, 04:47 PM
বিয়ের বাজারে বা ‘ডেইটিং প্রোফাইলে’ পাত্র-পাত্রীর যোগ্যতা মাপার মাপকাঠিগুলো খুব চেনা— উচ্চতা, গায়ের রং, আকর্ষণীয় চেহারা, ব্যাংকে জমানো টাকা কিংবা বড় কর্পোরেট চাকরি।
অনেকেই মনে করেন, যদি তারা আরও একটু বেশি সুন্দর ও ধনী হতেন কিংবা সমাজে আরও একটু প্রতিষ্ঠিত থাকতেন, তবে তারা হয়ত জীবনে সত্যিকারের ভালোবাসা খুঁজে পেতেন।
তবে সিএনএন ডটকম-এ প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে উঠে এসেছে সম্পূর্ণ উল্টো সত্য।
বিজ্ঞান ও মনোস্তত্ত্ব বলছে- টাকা, রূপ বা সামাজিক মর্যাদা দিয়ে ‘ডেইটিং অ্যাপে’ হয়ত সাময়িক আকর্ষণ পাওয়া যায়, তবে কখনও দীর্ঘমেয়াদী এবং টেকসই ভালোবাসার জন্ম দিতে পারে না।
সুখী সম্পর্কের আসল রহস্য লুকিয়ে আছে সম্পূর্ণ ভিন্ন কিছু মনস্তাত্ত্বিক অভ্যাসের মাঝে।
কথোপকথন বদলানো
ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের হ্যাপিনেস বা সুখ বিষয়ক গবেষক ডা. সোনজা লিউবোমিরস্কি এবং রচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পর্ক বিষয়ক গবেষক হ্যারী রেইস তাদের যৌথভাবে লেখা নতুন বই ‘হাউ টু ফিল লাভড’-এ চমৎকার একটি তথ্য দিয়েছেন।
তাদের মতে, “ভালোবাসার মানুষ খুঁজে পেতে বা সম্পর্কে নিজেকে ভালোবাসার যোগ্য করে তুলতে, নিজের চেহারা বা ব্যক্তিত্ব জোর করে বদলে ফেলার কোনো প্রয়োজন নেই। বরং পরিবর্তন আনতে হবে, কথা বলার এবং শোনার অভ্যাসে।”
প্রথম দেখায় বা পারিবারিক আলাপে মানুষ নিজের ভালো দিকগুলো জাহির করতে ব্যস্ত থাকে। তবে এই গবেষকেরা বলছেন, “কাউকে গভীরভাবে বুঝতে হলে নিজের গুণগান গাওয়ার চেয়ে সঙ্গীর কথা গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনতে হবে এবং নিজের দুর্বলতা বা আবেগকে সাহসের সঙ্গে জানাতে হবে, যাকে বলে ‘ভালনারেবল শেয়ারিং’।
‘ইমোশনাল বিড’ এবং ইতিবাচক সাড়া
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘হার্ভার্ড স্টাডি অফ অ্যাডাল্ট ডেভেলপমেন্ট’ গবেষণায় দেখা গেছে, যারা ৫০ বছর বয়সে এসে নিজেদের সম্পর্কে সুখী ছিলেন, তারা ৮০ বছর বয়সে গিয়েও মানসিকভাবে সবচেয়ে সুস্থ জীবন পার করেছেন।
আর এই দীর্ঘস্থায়ী সুখের রহস্য উন্মোচন করতে গিয়ে মনোবিজ্ঞানীরা ব্যাখ্যা দিয়েছেন, এর মূল ভিত্তি হল ‘ইমোশনাল বিড’ বা সঙ্গীর ছোট ছোট আবেগের ইশারায় ইতিবাচক সাড়া দেওয়া।
যেমন, বৃষ্টির দিনে সঙ্গী যখন জানালা দিয়ে তাকিয়ে বলে, ‘দেখো, বৃষ্টিটা কী সুন্দর!’— তখন সে আসলে আপনার মনোযোগ চাইছে। তখন আপনি যদি মোবাইল থেকে চোখ না তুলে হু-হা করেন, তবে সম্পর্কে দূরত্ব তৈরি হয়।
আর আপনি যদি তার পাশে গিয়ে দাঁড়ান বা তার অনুভূতিকে ভাগ করে নেন, তবেই তৈরি হয় প্রকৃত সংযোগ।
এই ব্যাখ্যা দিয়ে ডা. সোনজা লিউবোমিরস্কি বলেন, “ছোট ছোট মুহূর্তগুলোর সঠিক মূল্যায়নই এক দশক পরে একটি মজবুত সম্পর্কের রূপ নেয়।”
নতুন এবং ভিন্নধর্মী প্রশ্ন করার জাদু
সিএনএন-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘আমরা যখন কারও সঙ্গে পরিচিত হই, তখন গৎবাঁধা কিছু প্রশ্ন করি, যেমন ‘কী করেন?’, ‘কোথায় থাকেন?’ ইত্যাদি।
তবে এই গবেষকদের মতে, “অর্থপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করতে হলে আলাপে নতুনত্ব আনতে হবে।”
জিজ্ঞেস করা যেতে পারে, ‘ কোন স্মৃতিটা সবচেয়ে বেশি হাসায়?’ বা ‘এমন কোনো স্বপ্ন আছে যা এখনও পূরণ হয়নি?’
এই ধরনের নতুন প্রশ্ন মানুষের মস্তিষ্কে ইতিবাচক উদ্দীপনা তৈরি করে। আর অপর মানুষটির মনে, একটি বিশেষ যত্নশীল জায়গা তৈরি হয়।
প্রশংসার শক্তি ও সামাজিক চাপের দেয়াল
সমাজে একে অপরের প্রশংসা করার সংস্কৃতি বেশ কম।
তবে এই লেখকদ্বয়ের মন্তব্য হল, সঙ্গীর কোনো ছোট কাজের জন্য দেওয়া একটি ‘আন্তরিক এবং খাঁটি প্রশংসা’ শরীরে অক্সিজেনের প্রবাহ এবং আনন্দের হরমোন বাড়িয়ে দেয়, যা সরাসরি স্বাস্থ্যের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
বাঙালি সংস্কৃতিতে অনেক সময় পরিবার বা চারপাশের মানুষের চাপে পড়ে অনেকেই তাড়াহুড়ো করে রূপ বা টাকা দেখে ভুল জীবনসঙ্গী নির্বাচন করে ফেলেন। তবে সিএনএন-এর এই প্রতিবেদনটি মনে করিয়ে দেয়, বাইরের চাকচিক্য বা স্ট্যাটাস কখনই একটি ভাঙা মনকে জোড়া লাগাতে পারে না।
দীর্ঘমেয়াদী সুখের জন্য দরকার এমন একজন মানুষ, যে সঙ্গীর নীরবতা বুঝতে পারবে এবং যার কাছে নিজের সমস্ত ক্লান্তি ভুলে নিশ্চিন্তে মাথা রাখা যাবে।
আরও পড়ুন
বউ থাকলে এক, দূরে থাকলে আরেক: স্বামীদের এই আচরণের আসল রহস্য কী?