Published : 24 Jun 2026, 12:32 AM
পৃথিবীর অর্থনীতির ইতিহাস চর্চায় একটি বিতর্ক বহু দশক ধরে চলে আসছে—সর্বজনীন সম্পদ কি সর্বদা লুটপাট হওয়ার পথে থাকে? ১৯৬৮ সালে গ্যারেট হার্ডিন তার ‘ট্র্যাজেডি অব দ্য কমনস’ তত্ত্ব দিয়ে বলেছিলেন, সাধারণ মানুষ ব্যক্তিগত স্বার্থে সর্বজনীন সম্পদ অতিব্যবহার করে নষ্ট করে ফেলে। এর সমাধান কী? হয় রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ, নয়তো বেসরকারিকরণ।
কিন্তু নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ইলিনর অস্ট্রম এই বাইনারি ভেঙে নতুন তত্ত্ব আমাদের সামনে হাজির করেছিলেন। ২০০৯ সালে প্রথম নারী হিসেবে অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পান তিনি। তার মতে, সম্প্রদায়গুলো নিজেরাই জটিল সম্মিলিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সর্বজনীন সম্পদ সুচারুভাবে পরিচালনা করতে পারে; রাষ্ট্র বা বাজার—দুটোর কোনোটিই একমাত্র সমাধান নয়। এই তত্ত্বের আলোকে বাংলাদেশের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট পাঠ করলে আমরা একটি গভীর সংকটের চিত্রই দেখতে পাই।

অস্ট্রমের ‘ডিজাইন নীতিমালা’ ও বাংলাদেশের রাজস্ব-কাঠামো
অস্ট্রম বলেছিলেন, টেকসই সর্বজনীন সম্পদ ব্যবস্থাপনার জন্য আটটি ডিজাইন প্রিন্সিপাল বা ডিজাইন নীতিমালা থাকতে হবে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো: স্পষ্ট সীমানা নির্ধারণ (Clearly Defined Boundaries), সবার অংশগ্রহণে নিয়ম-প্রণয়ন (Collective Choice Arrangements) এবং কার্যকর পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা (Monitoring)।
বাংলাদেশের রাজস্ব ব্যবস্থাকে অস্ট্রমের কাঠামোয় বিশ্লেষণ করলে বাজেটের ঘাটতি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) মোট রাজস্বের ৮৫ শতাংশের বেশি সংগ্রহ করে; কিন্তু এই সংগ্রহ-প্রক্রিয়ায় করদাতাদের অর্থপূর্ণ অংশগ্রহণ নেই। নিয়ম তৈরি হয় কেন্দ্রীয়ভাবে, প্রয়োগ হয় কখনো স্বেচ্ছাচারীভাবে এবং জবাবদিহিতা প্রায় অনুপস্থিত। অস্ট্রমের মতে, ‘মনোসেন্ট্রিক’ ব্যর্থতার একটি ক্লাসিক উদাহরণ এটি।
বিকেন্দ্রীকরণের অসম্পূর্ণ প্রতিশ্রুতি
অস্ট্রমের ‘পলিসেন্ট্রিক গভর্ন্যান্স’ ধারণাটি বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার বিশ্লেষণে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। তিনি বলেছেন, একটি কেন্দ্রীয় সরকার যত ভালোই হোক না কেন, স্থানীয় তথ্য এবং স্থানীয় চাহিদা সে কখনো পূর্ণাঙ্গভাবে জানতে পারে না। তাই সম্পদ বরাদ্দ ও পরিষেবা প্রদানে স্থানীয় ক্ষমতায়ন অপরিহার্য।
বাংলাদেশের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে স্থানীয় সরকারের জন্য বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয়েছে মোট উন্নয়ন বাজেটের মাত্র ৭.৩ শতাংশ। উপজেলা পরিষদ থেকে শুরু করে সিটি করপোরেশন—সব স্তরেই সম্পদের তীব্র সংকট। ইউনিয়ন পরিষদগুলো কাগজে-কলমে বেশ কিছু ক্ষমতার অধিকারী হলেও আর্থিক স্বাধীনতা না থাকায় সেই ক্ষমতা অর্থহীন। অস্ট্রম যে ‘নেস্টেড এন্টারপ্রাইজ’ (Nested Enterprises) কাঠামোর কথা বলেছেন—যেখানে কেন্দ্র থেকে স্থানীয় স্তর পর্যন্ত ক্ষমতা ও দায়িত্বের সুসংবদ্ধ বিন্যাস থাকে—বাংলাদেশে তা অনুপস্থিত।
পানি সম্পদ: অস্ট্রমের পাঠশালায় একটি বাস্তব ব্যর্থতা
অস্ট্রম তার গবেষণার একটি বড় অংশ ব্যয় করেছেন সেচ ব্যবস্থা বিশ্লেষণে। স্পেন, ফিলিপাইন ও নেপালের মতো বিভিন্ন দেশে তিনি দেখেছেন কীভাবে কৃষকরা নিজেদের মধ্যে চুক্তি করে জটিল সেচ ব্যবস্থা পরিচালনা করেন। এই ব্যবস্থাগুলো অনেক সময় সরকার-নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার চেয়েও অধিক কার্যকর হয়।
বাংলাদেশে পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনার চিত্রটি ঠিক এর বিপরীত। হাওর এলাকায় বোরো ধান রক্ষা করার জন্য বাঁধ নির্মাণ থেকে শুরু করে ভূ-গর্ভস্থ পানির ব্যবহার পর্যন্ত—সর্বত্র একটি কেন্দ্রীভূত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু আছে, যা প্রায়ই স্থানীয় জ্ঞান ও চাহিদাকে উপেক্ষা করে পরিচালিত হয়। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের জন্য বাড়তি বরাদ্দের কথা বলা হয়েছে; কিন্তু সেই বরাদ্দ স্থানীয় কমিউনিটিভিত্তিক পানি ব্যবস্থাপনার দিকে যাচ্ছে না, যাচ্ছে কেন্দ্রীয় বড় বড় প্রকল্প প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে। এতে হাওরের মানুষের দুঃখ দূর হচ্ছে না এবং প্রতি বছরই ফসলহানির ঝুঁকি থেকে যাচ্ছে। আগামীতেও সেটি দূর হওয়ার কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। এর মূলে রয়েছে স্থানীয় জ্ঞানকে উপেক্ষা করে কেন্দ্রীয়ভাবে প্রকল্প গ্রহণ করা। এতে অর্থের অপচয় হলেও কোনো সুফল মিলবে না।
সামাজিক নিরাপত্তা: সম্মিলিত ব্যবস্থাপনার সম্ভাবনা
অস্ট্রমের তত্ত্বের সবচেয়ে মূল্যবান দিক হলো তার এই বিশ্বাস—মানুষ কেবলই স্বার্থপর নয়, তারা ‘সীমাবদ্ধ র্যাশনাল’ (Bounded Rational)। সঠিক পরিবেশ তৈরি করলে মানুষ একে অপরকে সহযোগিতা করে, চুক্তি মেনে চলে এবং সর্বজনীন স্বার্থ রক্ষা করে। আর পরিবেশ অনুকূল না হলে মানুষ বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ে। এই দৃষ্টিভঙ্গি বাংলাদেশের সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রমের পুনর্বিন্যাসে কাজে লাগানো যেতে পারে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে সামাজিক সুরক্ষা খাতে বরাদ্দ ৩.৬৮ লাখ কোটি টাকা রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে, যা মোট বাজেটের প্রায় ১৬ শতাংশ। এই বিশাল অর্থ যদি কেবল কেন্দ্রীয় তালিকা ধরে বিতরণ করা হয়, তবে লিকেজ ও অদক্ষতা অনিবার্য। কিন্তু যদি অস্ট্রমের পলিসেন্ট্রিক মডেলে স্থানীয় কমিউনিটি কর্তৃক যাচাই করে সুবিধাভোগী নির্ধারণ করা হয় এবং তাদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত থাকে, তাহলে একই বরাদ্দ অনেক বেশি কার্যকর হতে পারে।
মৎস্য সম্পদ ও বনায়ন: সম্মিলিত ব্যর্থতার দুই গল্প
বাংলাদেশের উপকূলীয় মৎস্য সম্পদ এবং পার্বত্য বনভূমি—দুটোই অস্ট্রমের ‘কমন পুল রিসোর্স’-এর জ্যান্ত উদাহরণ। উভয় ক্ষেত্রেই কেন্দ্রীয় সরকার ব্যর্থতার একটি চক্রে পড়েছে: নিয়ম আছে কিন্তু প্রয়োগ নেই; সংস্থা আছে কিন্তু সক্ষমতা নেই; বরাদ্দ আছে অথচ জবাবদিহিতা নেই।
মৎস্য মন্ত্রণালয়ের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বরাদ্দে অবকাঠামো উন্নয়নের কথা বলা হলেও মৎস্যজীবী সমিতিগুলোকে সত্যিকারের ব্যবস্থাপনা ক্ষমতা দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা নেই। অস্ট্রম জাপানের জামাউ (Gyoson) ব্যবস্থার কথা উল্লেখ করেছেন—যেখানে মৎস্যজীবী সমিতিগুলো সরকারের সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে সমুদ্রের নির্দিষ্ট অংশের দেখভাল করে এবং দীর্ঘমেয়াদী সুরক্ষার উদ্যোগ নেয়। ফলে সেখানে সম্পদের সুষম ব্যবহার হচ্ছে। মৎস্যজীবীরা সরকারের কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ ছাড়াই নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ হয়ে সম্পদ রক্ষা ও তার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করছে। বাংলাদেশে এই মডেল পরীক্ষা করার কোনো উদ্যোগ এই বাজেটে নেই।
শহরের সর্বজনীন পরিষেবা: অস্ট্রমের শহুরে প্রয়োগ
অস্ট্রম তার গবেষণায় শহরের পুলিশিং, পরিবহন এবং স্বাস্থ্যসেবার মতো নাগরিক পরিষেবায় পলিসেন্ট্রিক ব্যবস্থার সুবিধার বিষয়টি তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন, মেট্রোপলিটন এলাকায় বহু ছোট ছোট পরিষেবা সংস্থা একটি বিশাল কেন্দ্রীয় সংস্থার চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর এবং উদ্ভাবনী হতে পারে।
ঢাকা শহরের পরিবহন সংকট, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিশৃঙ্খলা এবং পানি সরবরাহের অসমতা—এই তিনটি সমস্যাই বাজেটে গুরুত্ব পাচ্ছে। কিন্তু সমাধানের পথটি সবসময়ই কেন্দ্রমুখী। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে ঢাকার জন্য বরাদ্দ বাড়ছে; কিন্তু ওয়ার্ড কমিশনার স্তরে বা মহল্লা কমিটি স্তরে পরিষেবা ব্যবস্থাপনার ক্ষমতা হস্তান্তরের কোনো পরিকল্পনা নেই। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এখনো রাজনৈতিক দুর্বৃত্তদের হাতে বন্দি। টয়লেট সুবিধা অপর্যাপ্ত, আর যেগুলো আছে সেগুলোও আবার গুটি কয়েক সিন্ডিকেটের হাতে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে সেগুলোর ইজারাদার বদল হলেও পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয় না।
ঢাকার একটি পাবলিক টয়লেট থেকে নাকি দিনে ৫০ হাজার টাকারও বেশি আয় করেন সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার! অঙ্ক দেখে মাথা নষ্ট হওয়ার জোগাড়। কিন্তু প্রকৃত ঘটনা হলো, আয় এর চেয়েও অনেক বেশি। ২৪ ঘণ্টা ব্যবহার হওয়া এই টয়লেটগুলো কি শুধু টয়লেট হিসেবেই ব্যবহার হয়? না, এটি মাদক বিক্রি, রাতে জুয়াসহ নানা অবৈধ কর্মকাণ্ডের নিরাপদ ঠিকানা। অবৈধ অনেক জিনিস এখানে কেনাবেচা ও গুদামজাত করা হয়। ঢাকা শহরের মতো জায়গায় এমন একটি বহুমুখী স্পট পাওয়া সত্যিই ভার। গল্পটা এ কারণেই বলা, যেন এখান থেকে আমরা শিক্ষা নিতে পারি।
বাজেট-প্রক্রিয়া ও অস্ট্রমের ‘কালেক্টিভ চয়েস’
অস্ট্রমের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ডিজাইন নীতিগুলোর একটি হলো ‘Collective Choice Arrangements’। যে নিয়মগুলো দ্বারা সম্পদ পরিচালিত হবে, সেগুলো তৈরিতে সংশ্লিষ্ট মানুষের সরাসরি অংশগ্রহণ থাকতে হবে। বাজেট প্রক্রিয়াকে যদি এই চোখে দেখি, তাহলে বাংলাদেশে একটি মৌলিক গণতান্ত্রিক ঘাটতি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
জাতীয় বাজেট মূলত অর্থ মন্ত্রণালয়, জাতীয় সংসদ এবং প্রধান মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যকার একটি আলোচনার ফসল। নাগরিক সমাজ, স্থানীয় সরকার এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কণ্ঠস্বর এই প্রক্রিয়ায় কার্যত অনুপস্থিত। যদিও ব্যবসায়ী ও কিছু অর্থনীতিবিদদের সঙ্গে প্রাক-বাজেট আলোচনা হয়, তবে তাদের দেওয়া অধিকাংশ পরামর্শই গ্রহণ করা হয় না। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের প্রণয়ন প্রক্রিয়াও এর ব্যতিক্রম নয়।
অস্ট্রমের উত্তরাধিকার: বাংলাদেশের জন্য একটি নতুন পাঠ
ইলিনর অস্ট্রম মারা গেছেন ২০১২ সালে, কিন্তু তার তত্ত্ব আজ আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। জলবায়ু পরিবর্তন, জীববৈচিত্র্য ধ্বংস এবং ডিজিটাল সম্পদের যুগে ‘সর্বজনীন সম্পদের সম্মিলিত ব্যবস্থাপনা’র প্রশ্নটি বৈশ্বিক অর্থনীতির কেন্দ্রে চলে এসেছে।
বাংলাদেশের জন্য তার সবচেয়ে বড় পাঠটি হলো: সরকার ও বাজার—এই দুটি প্রতিষ্ঠানের মাঝখানে একটি বিশাল সামাজিক স্থান আছে। সেই স্থানে বাস করে কোটি কোটি মানুষের রোজকার সম্মিলিত জীবন—জলের ভাগ, জমির বন্দোবস্ত, মহল্লার নিরাপত্তা কিংবা হাটের নিয়মকানুন। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে সেই সামাজিক স্থানকে শক্তিশালী করার কোনো দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের সামনে আবির্ভূত হয়নি।
হয়তো সময় এসেছে বাংলাদেশের বাজেট-নির্মাতারা অস্ট্রমের সেই বিখ্যাত উপদেশটি গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করবেন—‘কখনো বিদ্যমান স্থানীয় প্রতিষ্ঠান এবং জ্ঞানকে উপেক্ষা করবেন না। সেগুলো শতাব্দীর অভিজ্ঞতার ফসল।’ প্রতিটি নদীর পাড়ে, প্রতিটি হাওরের তীরে, প্রতিটি শহরের গলিতে মানুষের সম্মিলিত বুদ্ধিমত্তা জমে আছে। সেই বুদ্ধিমত্তাকে বাজেটের সঙ্গে যুক্ত করার কাজটিই হবে প্রকৃত উন্নয়নের পথে যাত্রা।
এম এম মুসা উন্নয়নকর্মী ও গবেষক। ই-মেইল: [email protected]