Published : 24 Jun 2026, 02:23 PM
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইসরায়েলের ‘চিরন্তন বন্ধুত্ব’ কি তবে বড় ধরনের ঝড়ের মুখে পড়তে যাচ্ছে? ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সমঝোতা চুক্তি এ প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে—যা কয়েক মাস আগেও কল্পনা করা কঠিন ছিল। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্পর্ককে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী ও কৌশলগত অংশীদারিত্বগুলোর একটি হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু ২০২৬ সালের ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতা, লেবানন সংকট এবং ট্রাম্প প্রশাসনের প্রকাশ্য ইসরায়েল-বিরোধী সমালোচনা ওই ধারণাকে নতুনভাবে মূল্যায়নের সুযোগ করে দিয়েছে। দুই দেশের সম্পর্কে সত্যিকারের চিড় ধরলে পুরো পশ্চিম এশিয়ার রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ ঘটবে, যা বিশ্বের জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক শক্তির ভারসাম্যের সঙ্গে জড়িত।
ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চার মাসব্যাপী রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর এই চুক্তি যখন দৃশ্যপটে আসে, তখন এর সবচেয়ে বড় অভিঘাতটি লাগে ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের মধ্যকার প্রায় পৌনে এক শতাব্দী প্রাচীন সম্পর্কে। ইসরায়েলকে পুরোপুরি আড়ালে রেখে যুক্তরাষ্ট্রের এই আকস্মিক কূটনীতি এবং এর জবাবে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর আক্রমণাত্মক অবস্থান একটা বিষয় পরিষ্কার করে দিয়েছে—দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর কালের চেনা দুনিয়ার ক্ষমতার চাকা এবার সত্যিই ঘুরতে শুরু করেছে।
এই পরিবর্তনের গভীরতা বুঝতে হলে আমাদের মার্কিন-ইসরায়েল সম্পর্কের ঐতিহাসিক সূত্রপাতের দিকে একটু নজর দিতে হবে। ১৯৪৮ সালের ১৪ মে ইহুদি রাষ্ট্র হিসেবে ইসরায়েলের জন্মের মাত্র ১১ মিনিটের মাথায় তৎকালীন ডেমোক্র্যাট মার্কিন প্রেসিডেন্ট হ্যারি এস. ট্রুম্যান স্বীকৃতি দেন সদ্য ভূমিষ্ঠ দেশটিকে। ইউরোপে হলোকাস্ট-পরবর্তী মানবিক সহানুভূতি এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ইহুদিদের ওপর নাৎসি নির্যাতনের পর পশ্চিমা বিশ্বে ইহুদিদের জন্য নিরাপদ একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রতি ব্যাপক সমর্থন তৈরি হয়েছিল। পরে শীতল যুদ্ধের ভূ-রাজনীতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক নিবিড় থেকে নিবিড়তর করে তোলে। ১৯৫০ ও ১৯৬০-এর দশকে সোভিয়েত ইউনিয়ন যখন মিশর, সিরিয়া ও ইরাকের মতো আরব রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়াচ্ছিল, তখন ইসরায়েল ধীরে ধীরে ওয়াশিংটনের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য আঞ্চলিক অংশীদারে পরিণত হয়। এরপর আবার ১৯৬৭ সালের ‘ছয় দিনের যুদ্ধ’ এবং ১৯৭৩ সালের ‘ইয়োম কিপ্পুর যুদ্ধ’ ছিল এই সম্পর্কের মোড় ঘোরানো মুহূর্ত। যুদ্ধগুলো প্রমাণ করে যে, আরব বিশ্বে একমাত্র ইসরায়েলই হতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি কার্যকর সামরিক ও গোয়েন্দা অংশীদার।
যদিও ১৯৫৬ সালের সুয়েজ সংকটের সময় প্রেসিডেন্ট ডুইট ডি. আইজেনহাওয়ার ইসরায়েল, ব্রিটেন ও ফ্রান্সের সিনাই আক্রমণের তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন। এমনকি ইসরায়েলকে সেনা প্রত্যাহারে বাধ্য করতে মার্কিন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের হুমকিও দেওয়া হয়েছিল। তখন ওয়াশিংটনের মূল লক্ষ্য ছিল পশ্চিম এশিয়ায় সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রভাব ঠেকানো এবং আরব দেশগুলোকে চটানো থেকে বিরত থাকা। তবে ১৯৬৭ সালে ছয় দিনের যুদ্ধের পর মার্কিন নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টিভঙ্গিতে আমূল পরিবর্তন আসে। ইসরায়েল যখন সোভিয়েত-পৃষ্ঠপোষকতা পুষ্ট মিশর, সিরিয়া ও জর্ডানের বাহিনীকে মাত্র ছয় দিনে পরাস্ত করে, তখন ওয়াশিংটন নিশ্চিত হয়—মধ্যপ্রাচ্যে সোভিয়েত প্রভাব রুখতে ইসরায়েলই তাদের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য এবং কার্যকর ‘আঞ্চলিক রক্ষাকবচ’।
তখন থেকেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সম্পর্কের গাঁথুনি দৃঢ় হতে শুরু করে। ১৯৭৩ সালে ইয়ম কিপুর সংকটের সময় প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন ও হেনরি কিসিঞ্জার ‘অপারেশন নিকেল গ্রাস’-এর মাধ্যমে ইসরায়েলকে জরুরি সামরিক সহায়তা পাঠায়, যা ইসরায়েলকে পরাজয়ের মুখ থেকে বাঁচিয়ে আনে। এরপর থেকেই ইসরায়েল আমেরিকার চোখে কেবল একটি বন্ধু রাষ্ট্র নয়, রীতিমতো কৌশলগত সম্পদে পরিণত হয়। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বব্যবস্থার একক পরাশক্তি হয়ে ওঠে। এই সময় থেকেই যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্ক অভূতপূর্ব ঘনিষ্ঠতা লাভ করে। ওয়াশিংটনের কাছে ইসরায়েল হয়ে ওঠে পশ্চিম এশিয়ায় পশ্চিমা বিশ্বের স্বার্থের প্রধান রক্ষক, উন্নত সামরিক প্রযুক্তির পরীক্ষাগার, তথাকথিত সন্ত্রাসবাদবিরোধী অভিযানের অংশীদার এবং আঞ্চলিক গোয়েন্দা তথ্যের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। বিনিময়ে ইসরায়েলও যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে পায় বিপুল সামরিক সহায়তা, উন্নত অস্ত্র প্রযুক্তি, কূটনৈতিক সুরক্ষা এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে রাজনৈতিক সমর্থন।
স্নায়ুযুদ্ধের পর থেকে ইসরায়েল আমেরিকার কাছ থেকে বার্ষিক প্রায় ৩৮০ কোটি ডলারের সামরিক সহায়তা পেয়ে আসছে। ওবামা প্রশাসনের সময় স্বাক্ষরিত ১০ বছর মেয়াদি (২০১৯-২০২৮) সমঝোতা চুক্তির অধীনে এই সহায়তা নিশ্চিত করা হয়। এর ফলে ইসরায়েলকে গুণগত সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখতে সাহায্য করা যুক্তরাষ্ট্রের আইনি বাধ্যবাধকতায় পরিণত হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এই অভিন্ন স্বার্থের দেয়ালে প্রথম বড় ফাটলটিও ধরে ওবামার শাসন আমলে ২০১৫ সালে, যখন ওবামা প্রশাসন ইসরায়েলের তীব্র আপত্তি অগ্রাহ্য করে ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তি স্বাক্ষর করে। নেতানিয়াহু সরাসরি মার্কিন কংগ্রেসে এসে ওবামার নীতির বিরুদ্ধে ভাষণ দেন, যা ছিল মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এক নজিরবিহীন হস্তক্ষেপ। ২০১৮ সালে ডনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে জেরুজালেমে মার্কিন দূতাবাস স্থানান্তর এবং আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের মাধ্যমে সম্পর্ক সাময়িক সুবর্ণ সময়ে ফিরলেও, ২০২৬ সালের ইরান যুদ্ধ সেই সম্পর্কের সমীকরণকে আমূল বদলে দিয়েছে।
১৪ জুনের সমঝোতা স্মারকের খসড়া ইসরায়েলকে না দেখানো ওয়াশিংটন-তেল আবিব সম্পর্কের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক ধাক্কা। জি-৭ সম্মেলনে ট্রাম্পের প্রকাশ্য বক্তব্য—“নেতানিয়াহু পাগল, আমি না থাকলে ইসরায়েল থাকত না”—এবং লেবাননে ইসরায়েলি আগ্রাসন নিয়ে মার্কিন প্রশাসনের তীব্র অসন্তোষ স্পষ্ট করে যে, ওয়াশিংটন এখন ইসরায়েলের সামরিক একগুঁয়েমিকে নিজেদের বৈশ্বিক স্বার্থের জন্য দায় মনে করছে। পিউ রিসার্চের ২০২৬ সালের সাম্প্রতিক জরিপ উদ্বেগজনক একটা বার্তা দিচ্ছে—যুক্তরাষ্ট্রের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ এখন ইসরায়েলের প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করছে। গাজা ও লেবাননে দীর্ঘস্থায়ী মানবিক বিপর্যয় মার্কিন তরুণ ও সাধারণ ভোটারদের মধ্যে ইসরায়েলের ‘অন্যায় সুবিধাভোগী’ ভাবমূর্তি তৈরি করেছে, যা ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান উভয় শিবিরের রাজনৈতিক হিসাবনিকাশ বদলে দিচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এই দূরত্বের কারণে পশ্চিম এশিয়ায় তো বটেই, বিশ্ব রাজনীতিতেও নতুন নতুন সমীকরণ তৈরি হতে যাচ্ছে। নেতানিয়াহু দশকের পর দশক ধরে সামরিক শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস ও শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের যে নীতি চালিয়েছিলেন, তা ২০২৬ সালে এসে ব্যর্থ প্রমাণিত হলো; যার মাধ্যমে তেহরান অর্জন করছে কৌশলগত বিজয় ও আঞ্চলিক স্বীকৃতি। হরমুজ প্রণালি ও বাব এল-মান্দেবের ওপর তেহরানের কার্যকর নিয়ন্ত্রণই যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের সঙ্গে বসতে বাধ্য করেছে। পারমাণবিক কর্মসূচির অধিকার এবং ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের আংশিক স্বীকৃতি পাওয়ার মাধ্যমে ইরান এখন আন্তর্জাতিক মূলধারায় ফিরে আসার বাস্তব সুযোগ পাচ্ছে, যা তাদের আঞ্চলিক ‘প্রক্সি নেটওয়ার্ক’ (হিজবুল্লাহ, হুথি)-কে আরও শক্তিশালী করবে।
এর ফলে ‘গ্রেটার ইসরায়েল’ ধারণার অবসান ঘটতে যাচ্ছে ও ইসরায়েলের একাকীত্ব এখন এক নতুন বাস্তবতা হয়ে দেখা দিচ্ছে। জর্ডান নদী থেকে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত ইসরায়েলি ভূখণ্ড সম্প্রসারণের যে দক্ষিণপন্থী আদর্শিক এজেন্ডা নেতানিয়াহু সরকার বাস্তবায়ন করতে চেয়েছিল, তা এখন ইসরায়েলকে সুরক্ষিত করার বদলে বৈশ্বিক ও আঞ্চলিকভাবে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে যাচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে নিজের বৈশ্বিক মোড়লের ভাবমূর্তি রক্ষা এবং মধ্যপ্রাচ্যের অন্তহীন যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার জন্য এই চুক্তিকে একটি ‘প্রস্থান কৌশল’ হিসেবে ব্যবহার করতে হচ্ছে।
নেতানিয়াহুর জন্য এই যুদ্ধ ট্রাম্পের চেয়েও বেশি বিপর্যয়কর প্রমাণিত হয়েছে। এক বছর আগে তিনি দাবি করতে পারতেন, ইরানের শক্তিকে তিনি গুরুতরভাবে আঘাত করেছেন—পরমাণু স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, হিজবুল্লাহ ও হামাস উভয়ই দুর্বল হয়েছে। কিন্তু এই অহংকারই তার পতনের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই যুদ্ধ ইরানের নেতৃত্বকে দুর্বল না করে শক্তিশালী করেছে—এখন ইরানের আর পরমাণু প্রতিরোধকের প্রয়োজনই নেই, কারণ হরমুজ প্রণালি তো বটেই, বাব এল-মান্দেব প্রণালির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণই যুক্তরাষ্ট্রের জন্য যথেষ্ট প্রতিরোধক হয়ে উঠেছে। ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ জনমতও এই বাস্তবতা স্বীকার করছে—টাইমস অব ইসরায়েলের সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, ৯২ শতাংশ ইসরায়েলি মনে করেন এই যুদ্ধে ইরানই জয়ী হয়েছে এবং প্রায় সমান সংখ্যক মানুষ মনে করেন ইসরায়েলের ঘোষিত লক্ষ্য অর্জিত হয়নি। অক্টোবরের মধ্যে অনুষ্ঠেয় নির্বাচনের আগে এমন জরিপ বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জন্য রাজনৈতিক সর্বনাশের ঘণ্টা বাজিয়ে দিয়েছে বলে অত্যুক্তি হবে না।
যুদ্ধ থামাতে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে নতুন এক অক্ষের উত্থান দেখতে পাচ্ছি আমরা। এই চুক্তিতে পাকিস্তান, কাতার ও সুইজারল্যান্ডের ভূমিকা প্রমাণ করে যে, বিশ্ব এখন আর একক পরাশক্তি-নির্ভর কূটনীতিতে বিশ্বাসী নয়। বিশেষ করে একটি পারমাণবিক শক্তিধর মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তান এবং অর্থনৈতিকভাবে প্রভাবশালী উপসাগরীয় রাষ্ট্র কাতারের যৌথ মধ্যস্থতা ভবিষ্যতে দক্ষিণ ও পশ্চিম এশিয়ার কূটনৈতিক সমীকরণে নতুন মেরুকরণ ঘটাবে বলে ধারণা করা যেতে পারে।
তবে ফিলিস্তিন যে তিমিরে ছিল সেই তিমিরেই রয়ে গিয়েছে। বলা চলা ফিলিস্তিন প্রশ্নে অন্ধকার আরও ঘনীভূত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে, যা একটি ট্র্যাজিক স্ববিরোধিতা। আরব নিউজে ‘কাউন্সিল ফর আরব-ব্রিটিশ আন্ডারস্ট্যান্ডিং’-এর পরিচালক ক্রিস ডয়েলের একটি বিশ্লেষণে যে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে, তা এই নতুন ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতার সবচেয়ে অন্ধকার দিক। ডনাল্ড ট্রাম্প যদি লেবানন ও ইরান ফ্রন্টে যুদ্ধ থামাতে নেতানিয়াহুকে বাধ্য করেন, তবে মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ভারসাম্য, বিশেষ করে কট্টরপন্থী ইভাঞ্জেলিক্যাল ও ইহুদি লবির সমর্থন ধরে রাখতে, তিনি ফিলিস্তিন প্রশ্নে চোখ বন্ধ করে রাখতে পারেন। ফলে, লেবানন থেকে সেনা প্রত্যাহারের বিনিময়ে নেতানিয়াহু গাজায় সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ, আল-আকসা মসজিদের স্থিতাবস্থা পরিবর্তন এবং জেরুজালেমের বিতর্কিত ই-ওয়ান (East 1) বসতি সম্প্রসারণের সবুজ সংকেত চেয়ে নিতে পারেন। পূর্ব জেরুজালেমের ১২ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে অবস্থিত এই কৌশলগত ই-ওয়ান অঞ্চলে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারিত হলে পশ্চিম তীরের উত্তরাঞ্চল ও দক্ষিণাঞ্চল একে অপর থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। এটি একদিকে যেমন ফিলিস্তিনিদের জন্য পূর্ব জেরুজালেমে প্রবেশের একমাত্র সংযোগ পথটি অবরুদ্ধ করে দেবে, অন্যদিকে ভবিষ্যতে একটি স্বাধীন ও অখণ্ড ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের ভৌগোলিক সম্ভাবনাকেও চিরতরে সমাহিত করবে। অর্থাৎ, লেবানন বা ইরান ফ্রন্টের সাময়িক আঞ্চলিক শান্তির চড়া মূল্য শেষ পর্যন্ত শোধ করতে হতে পারে ফিলিস্তিনিদেরই—নিজেদের রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন বিসর্জন দেওয়ার মাধ্যমে।
২০২৬ সালের ২২ জুনের বাস্তবতা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, যুদ্ধ দিয়ে নিরাপত্তা অর্জনের ইসরায়েলি দর্শন চরম দেউলিয়াত্বের মুখোমুখি। ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের মধ্যকার ফাটল কোনো সাময়িক ভুল বোঝাবুঝি নয়; আসলে মার্কিন কৌশলগত স্বার্থের এক ঐতিহাসিক মোড় বদল। আমেরিকা বুঝতে পেরেছে, ইসরায়েলের আঞ্চলিক আগ্রাসনের দায় বহন করা তার নিজের বৈশ্বিক প্রাধান্যের জন্য আত্মঘাতী হবে। তবে এই পরিবর্তন তখনই বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা আনতে পারে, যখন তা একটি সামগ্রিক ও ন্যায়সঙ্গত ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দিকে এগিয়ে যাবে। নয়তো ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের এই ভঙ্গুর সমঝোতা যদি কেবল একটি ফ্রন্টের আগুন নেভাতে গিয়ে অন্য ফ্রন্ট ফিলিস্তিনে নতুন মানবিক বিপর্যয় ঘটানোর লাইসেন্স দিয়ে দেয়, তবে তা মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্রকে আরও দীর্ঘস্থায়ী এবং ভয়াবহ সংকটের দিকেই ঠেলে দেবে।
শিপ্রা বিশ্বাস কবি ও কলামলেখক। ই-মেইল: [email protected]