Published : 29 Jun 2026, 08:12 AM
ভূগোল কোনো দেশের ভাগ্য নির্ধারণ করে না; বরং ওই ভূগোলকে কতটা দূরদর্শিতার সঙ্গে কাজে লাগানো যায়, সেটিই একটি জাতির অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে। সিঙ্গাপুর, সংযুক্ত আরব আমিরাত কিংবা নেদারল্যান্ডসের মতো দেশগুলো তাদের ভৌগোলিক অবস্থানকে বাণিজ্য, যোগাযোগ ও লজিস্টিকসের শক্তিতে রূপান্তর করেছে। বাংলাদেশের সামনেও তেমনই একটি ঐতিহাসিক সুযোগ রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থান করেও দেশটি এখনো তার পূর্বমুখী সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারেনি। একবিংশ শতাব্দীর পরিবর্তিত ভূরাজনীতি ও বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে ওই সম্ভাবনাকে নতুনভাবে মূল্যায়নের সময় এসেছে।
বাংলাদেশ বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতি। দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) আকার ৫০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি এবং বৈদেশিক বাণিজ্য ধারাবাহিকভাবে সম্প্রসারিত হচ্ছে। কিন্তু এই বাণিজ্যের বড় অংশ এখনো সমুদ্রপথনির্ভর। আঞ্চলিক স্থলভিত্তিক যোগাযোগ তুলনামূলকভাবে সীমিত থাকায় বাংলাদেশের ভৌগোলিক সুবিধার পূর্ণ অর্থনৈতিক সম্ভাবনা কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি। ফলে সংযোগনির্ভর নতুন অর্থনীতিতে দেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা আরও বাড়ানোর সুযোগ রয়ে গেছে।
বাংলাদেশের স্থলসীমা মাত্র দুটি দেশের সঙ্গে; ভারত ও মিয়ানমার। স্বাধীনতার পর থেকে ভারতের সঙ্গে সড়ক, রেল, নৌপথ, বিদ্যুৎ, জ্বালানি, সীমান্ত বাণিজ্য ও বন্দর ব্যবহারে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। এই সহযোগিতা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং ভবিষ্যতেও তা আরও সম্প্রসারিত হওয়া উচিত। তবে একই সঙ্গে একটি বাস্তব প্রশ্নও সামনে আসে, বাংলাদেশের দ্বিতীয় প্রতিবেশী মিয়ানমারের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ কেন এখনো সীমিত? কেন পূর্ব সীমান্ত অর্থনৈতিক করিডোরে পরিণত না হয়ে প্রায় অচল অবস্থায় রয়েছে?
আজকের বিশ্বে অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা শুধু উৎপাদনের ওপর নির্ভর করে না; নির্ভর করে সংযোগের ওপর। যে দেশের যত বেশি বন্দর, করিডোর, সড়ক, রেলপথ ও বিকল্প পরিবহন ব্যবস্থা থাকবে, ওই দেশ তত বেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করবে, দ্রুত পণ্য পরিবহন করতে পারবে এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠবে। তাই যোগাযোগ এখন শুধু অবকাঠামোর বিষয় নয়; এটি অর্থনীতি, শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান, পররাষ্ট্রনীতি এবং জাতীয় নিরাপত্তারও একটি কৌশলগত প্রশ্ন।
বিশ্বের যেসব দেশের মাত্র দুটি স্থল প্রতিবেশী রয়েছে, তাদের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হতে পারে। ইউরোপের ক্ষুদ্র দেশ লিচেনস্টাইন সুইজারল্যান্ড ও অস্ট্রিয়ার সঙ্গে সড়ক ও রেলপথে সংযুক্ত থেকে ইউরোপীয় অর্থনীতির কার্যকর অংশে পরিণত হয়েছে। রোমানিয়া ও ইউক্রেইন উভয় দেশের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রেখে বিকল্প বাণিজ্যপথ নিশ্চিত করেছে মলদোভা। ভারত ও চীনের সঙ্গে সমান্তরালভাবে যোগাযোগ সম্প্রসারণের চেষ্টা করছে নেপাল। অন্যদিকে অ্যান্ডোরার রেলপথ না থাকায় আন্তর্জাতিক যোগাযোগে সীমাবদ্ধতা রয়েছে এবং ভুটান কার্যত একমাত্র ভারতের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় বিকল্প করিডোরের সুযোগ সীমিত। এসব উদাহরণ দেখায়, একটি দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্বার্থে একাধিক কার্যকর যোগাযোগপথ থাকা কতটা জরুরি। এটি কোনো প্রতিবেশীর বিকল্প তৈরি করার বিষয় নয়, বরং জাতীয় সক্ষমতা ও স্থিতিশীলতা বাড়ানোর কৌশল।
এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক উদ্যোগগুলো বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। সরকার গঠনের পর প্রথম বিদেশ সফরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া ও চীনে যাওয়াটা আমাদের অর্থনৈতিক কূটনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। মালয়েশিয়ার সঙ্গে শ্রমবাজার, বিনিয়োগ, দক্ষ জনশক্তি উন্নয়ন এবং মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়েছে। একই সঙ্গে বন্ধ শ্রমবাজার আবার খোলা, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনা এবং অনিয়মিত কর্মীদের বৈধ করার বিষয়েও অগ্রগতির চেষ্টা চলছে। আমাদের অন্যতম প্রধান শ্রমবাজার হিসেবে মালয়েশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার হলে কর্মসংস্থান, রেমিট্যান্স ও বিনিয়োগ—তিন ক্ষেত্রেই ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
চীন সফরের কৌশলগত গুরুত্ব আরও ব্যাপক। দুই দেশের শীর্ষ নেতাদের বৈঠকে অবকাঠামো, শিল্পায়ন, জ্বালানি, তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা, অর্থনৈতিক অঞ্চল, মাল্টিমোডাল পরিবহন, প্রযুক্তিগত সহযোগিতা ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির বিষয়গুলো প্রাধান্য পেয়েছে। পাশাপাশি ১৩টি সমঝোতা স্মারক, ৪টি অতিরিক্ত চুক্তি এবং একটি দীর্ঘমেয়াদি যৌথ কর্মপরিকল্পনার ঘোষণা দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও মজবুত ভিত্তি দিতে পারে।
তবে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় ছিল বাংলাদেশ–মিয়ানমার–চীন অর্থনৈতিক করিডোরের সম্ভাবনা। বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে সরাসরি কোনো স্থলসীমান্ত নেই; মিয়ানমারই এখানে দুই দেশের যোগাযোগের সেতু। ভবিষ্যতে যদি মিয়ানমারের ভেতর দিয়ে নিরাপদ ও কার্যকর সড়ক ও রেল যোগাযোগ গড়ে তোলা যায়, তবে বাংলাদেশ শুধু চীনের সঙ্গেই নয়, পুরো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হতে পারবে। এটি আমাদের ভৌগোলিক অবস্থানকে নতুন এক অর্থনৈতিক ভিত্তি দেবে।
এই প্রেক্ষাপটে বাণিজ্য ভারসাম্যের বিষয়টিও মাথায় রাখা জরুরি। ভারত আমাদের অন্যতম বড় বাণিজ্য অংশীদার হলেও ২০২৪–২৫ অর্থবছরে আমরা ভারত থেকে প্রায় ৯.৬২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের পণ্য আমদানি করেছি, যার বিপরীতে রপ্তানি করেছি মাত্র ১.৭৬ বিলিয়ন ডলারের পণ্য। একইভাবে চীন আমাদের একক বৃহত্তম আমদানি উৎস। একই অর্থবছরে চীন থেকে আমদানি হয়েছে প্রায় ১৮.৫৬ বিলিয়ন ডলারের পণ্য, অথচ রপ্তানি হয়েছে মাত্র ৬৯৪ মিলিয়ন ডলার। ফলে দুই দেশের সঙ্গেই আমাদের বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে। তাই শুধু যোগাযোগ বাড়ালেই হবে না, ওই যোগাযোগকে রপ্তানি বৃদ্ধি, নতুন বাজার খোঁজা এবং শিল্পায়নের কাজে লাগাতে হবে।
সাম্প্রতিক আলোচনায় কৃষিপণ্য, ওষুধ, চামড়াজাত পণ্য ও জলজ সম্পদসহ সম্ভাবনাময় পণ্যের জন্য চীনা বাজারে আরও বেশি প্রবেশাধিকার চেয়েছে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে চীনের শিল্প এ দেশে স্থানান্তর, উন্নত উৎপাদন প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সবুজ প্রযুক্তি এবং উচ্চমূল্য সংযোজনভিত্তিক শিল্পে সহযোগিতার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, লক্ষ্য শুধু রাস্তা বা অবকাঠামো তৈরি নয়; লক্ষ্য হলো উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানো ও প্রযুক্তির রূপান্তর ঘটানো।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিশাল বাজার বাংলাদেশের পূর্বমুখী যোগাযোগের গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে দেয়। আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর সম্মিলিত অর্থনীতির আকার ৪ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি এবং এর জনসংখ্যা প্রায় ৭০ কোটি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীন ও আসিয়ানের বার্ষিক দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ১ ট্রিলিয়ন ডলারের মাইলফলক পার করেছে। মিয়ানমারের মধ্য দিয়ে এই বিশাল অর্থনৈতিক অঞ্চলের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ তৈরি করতে পারলে বাংলাদেশ নতুন বাজার ও বিদেশি বিনিয়োগ পাওয়ার পাশাপাশি বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে পারবে।
অবশ্য এই সম্ভাবনার মূল ভিত্তি হবে আমাদের শক্তিশালী অবকাঠামো। চট্টগ্রাম বন্দর ইতোমধ্যে আমাদের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার। দেশের বেশিরভাগ আমদানি-রপ্তানি এই বন্দর দিয়েই হয়। চট্টগ্রামকে আঞ্চলিক ট্রানজিট ও লজিস্টিকস হাবে রূপান্তরের পরিকল্পনা তাই শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, পুরো দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জন্যই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ব ব্যাংকের সহায়তায় তৈরি হওয়া বে-টার্মিনাল ভবিষ্যতে দেশের কনটেইনার পরিবহনের একটি বড় অংশ সামলাতে পারবে। বড় জাহাজ ভেড়ানো, পরিবহন খরচ কমানো এবং রপ্তানি সক্ষমতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে এটি বড় ভূমিকা রাখবে।
এর সঙ্গে মোংলা বন্দর, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, পদ্মা সেতু, কর্ণফুলী টানেল এবং দেশের বিস্তৃত মহাসড়ক ও রেল নেটওয়ার্ক যুক্ত হলে আমাদের লজিস্টিকস ক্ষমতা আরও শক্তিশালী হবে। বিশেষ করে মাল্টিমোডাল পরিবহন ব্যবস্থা; যেখানে সড়ক, রেল, নৌ ও সমুদ্রপথ একে অপরের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করবে—তা পণ্যের পরিবহন খরচ কমাবে, সময় বাঁচাবে এবং সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও স্থিতিশীল করবে।
তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি বাস্তব কিছু চ্যালেঞ্জও আছে। মিয়ানমারের বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিরতা, সীমান্ত নিরাপত্তা ও রোহিঙ্গা সংকট সমাধান না করে কোনো করিডোর বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। যে কোনো যোগাযোগের উদ্যোগকে আন্তর্জাতিক আইন, নিরাপত্তা, পারস্পরিক আস্থা ও মানবিক দায়বদ্ধতার ওপর ভিত্তি করেই এগিয়ে নিতে হবে। নিরাপদ পরিবেশ ছাড়া টেকসই অর্থনৈতিক যোগাযোগ কখনোই সম্ভব নয়।
একই সঙ্গে আমাদের এটিও পরিষ্কার বোঝা দরকার যে, পূর্বমুখী যোগাযোগের অর্থ ভারতের গুরুত্ব কমিয়ে দেওয়া নয়। বরং ভারতের সঙ্গে বিদ্যমান সফল সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি মিয়ানমার, চীন, মালয়েশিয়া, আসিয়ানসহ অন্যান্য আঞ্চলিক অর্থনীতির সঙ্গে সম্পর্ক বাড়িয়ে বাংলাদেশের জন্য বিকল্প পথ তৈরি করাই আসল লক্ষ্য। আজকের বিশ্বে কোনো সফল রাষ্ট্র শুধু একটি বাজার, একটি করিডোর বা একটি সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে চলে না। বহুমুখীকরণই হলো অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার মূল ভিত্তি।
বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো একটি ভারসাম্যপূর্ণ অর্থনৈতিক কূটনীতি বজায় রাখা। আমরা যদি একাধিক বন্দর, করিডোর, বাজার ও সরবরাহ শৃঙ্খলার সঙ্গে কার্যকরভাবে যুক্ত হতে পারি, তবে বৈশ্বিক যে কোনো অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও আমাদের অর্থনীতি আরও স্থিতিশীল, প্রতিযোগিতামূলক এবং বিনিয়োগবান্ধব থাকবে।
ইতিহাসের প্রতিটি সন্ধিক্ষণে কিছু সিদ্ধান্ত একটি দেশের ভবিষ্যৎ বদলে দেয়। বাংলাদেশের জন্য পূর্বমুখী সংযোগের বিষয়টি তেমনই এক কৌশলগত সিদ্ধান্ত। এটি কেবল একটি সড়ক বা রেলপথ নির্মাণের বিষয় নয়; এটি আমাদের ভবিষ্যতের অর্থনীতি, শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান, রপ্তানি, বিনিয়োগ এবং আঞ্চলিক নেতৃত্বের প্রশ্ন। ভৌগোলিক অবস্থান আমাদের একটি প্রাকৃতিক সম্পদ। এখন প্রয়োজন দূরদর্শী কূটনীতি, বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং প্রতিবেশীদের সঙ্গে পারস্পরিক আস্থার ভিত্তিতে ওই সম্পদকে অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করা। কারণ একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বে যোগাযোগই শক্তি, আর বহুমুখী যোগাযোগই টেকসই সমৃদ্ধির মূল ভিত্তি।
খালিদুর রহমান শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের অধ্যাপক। ই-মেইল: [email protected]