Published : 30 Jun 2026, 10:10 AM
ওয়ার্ল্ড ভ্যালুজ সার্ভে ২০১৭ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত বিশ্বের নানা প্রান্তের মোট ৫৪টি দেশের জনগণের কাছে বেশ কিছু প্রশ্ন করেছিল এবং ওইসব বিষয়ে তাদের মতামত জানতে চেয়েছিল। এর মধ্যে একটি প্রশ্ন ছিল এরকম: ‘আমার ধর্মই একমাত্র গ্রহণযোগ্য ধর্ম’—এ বিষয়ে জনগণের মতামত কী? সম্প্রতি তারা ওই জরিপের ফলাফল প্রকাশ করেছে এবং যে উত্তর এসেছে, তা যথেষ্ট চিন্তার উদ্রেক করে।
তার আগে খুব সংক্ষেপে ওয়ার্ল্ড ভ্যালুজ সার্ভের পরিচয় দেওয়া দরকার। পৃথিবীর খ্যাতনামা সামাজিক বিজ্ঞানীদের দ্বারা পরিচালিত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জরিপ সংস্থাগুলোর একটি এটি। ১৯৮১ সালে যাত্রা শুরু করা সংস্থাটি পৃথিবীর অন্তত ১২০টি দেশের মানুষের ধর্ম, পরিবার, রাজনীতি, নৈতিকতা, বিশ্বাস এবং অন্যদের প্রতি সহনশীলতাসহ নানা বিষয়ে তারা কী ভাবে, তা নিয়ে জরিপ করেছে। ওইসব জরিপে যে ধরনের তথ্য উঠে এসেছে, তা বেশ উৎসাহব্যঞ্জক। কারণ, এসব তথ্য থেকে কোনো একটি সমাজের মানুষ অন্য ধর্ম ও সংস্কৃতির মানুষকে কোন চোখে দেখে, সে সম্পর্কে সম্যক ধারণা পাওয়া যায়।
২০১৭ থেকে ২০২২ সালের জরিপে তারা যেসব প্রশ্ন করেছিল, তার একটি হলো, “আমার ধর্মই একমাত্র গ্রহণযোগ্য ধর্ম”। সেখানে চার ধরনের উত্তর দেওয়ার সুযোগ ছিল—সম্পূর্ণ একমত, একমত, সম্পূর্ণ দ্বিমত এবং দ্বিমত।

জরিপের ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশের ৯৮ শতাংশ মানুষ ‘একমত’ বা ‘সম্পূর্ণ একমত’ হয়ে এই তালিকার শীর্ষে আছে। পরের তিনটি দেশ হলো যথাক্রমে মিয়ানমার, জর্ডান ও পাকিস্তান। এসব দেশের অন্তত ৯০ শতাংশ মানুষ মনে করে, তাদের ধর্মই শ্রেষ্ঠ ধর্ম।
এর মানে হলো, এই বিপুলসংখ্যক মানুষ মনে করছে সমাজে থাকা অন্য ধর্মসমূহ তাদের চেয়ে অধস্তন। নিজের ধর্ম ছাড়া অন্য কোনো ধর্ম তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। এসব দেশে ধর্ম শুধু ব্যক্তিগত বিশ্বাসেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং সমাজের কাঠামো, পরিবার, রাষ্ট্র—সবকিছুর কেন্দ্রে পৌঁছে গেছে। ফলে নিজের ধর্মের বাইরে অন্য ধর্মকে ‘অন্য’ বা পর হিসেবে দেখার প্রবণতা তৈরি হয়েছে।
ভাবার কোনো কারণ নেই যে, এই প্রবণতা শুধু ইসলাম ধর্মের অনুসারীদের মধ্যেই দেখা যাচ্ছে। তালিকায় থাকা দ্বিতীয় দেশটি হলো মিয়ানমার; যেখানে প্রায় ৮৮ শতাংশ নাগরিক বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী এবং মাত্র ৪ শতাংশ মুসলিম। ওই দেশেরও ৯০ শতাংশের বেশি নাগরিক মনে করে, তাদের ধর্মই একমাত্র গ্রহণযোগ্য ধর্ম।
কিন্তু একই পৃথিবীর অন্য প্রান্তে গিয়ে দৃশ্যপট বদলে যায়। ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া বা নিউজিল্যান্ডের ৯০ ভাগ মানুষ এই ধারণার সঙ্গে একমত নন। এসব সমাজেও কিন্তু ধর্মের উপস্থিতি রয়েছে, তবে তা অনেক বেশি বহুমাত্রিক।
তার মানে হলো, রাস্তায় হাঁটলে একই দিনে আপনি ভিন্ন ভিন্ন বিশ্বাসের অসংখ্য মানুষকে দেখতে পান; ভিন্ন ধর্মের পরিবার একই ভবনে, এমনকি একই ঘরে পাশাপাশি বসবাস করে। আর রাষ্ট্রীয় কাঠামো এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যা ধর্মীয় বৈচিত্র্যকে স্বাভাবিক বলে ধরে নেয়। স্কুলের পাঠ্যবইয়ের মাধ্যমে শিশুরা সব ধর্ম, এমনকি যিনি ধর্মে বিশ্বাসী নন, তার প্রতিও সমান অনুভূতি নিয়ে বেড়ে ওঠে। শুধু ব্যক্তিগত বিশ্বাসই নয়, সেখানে এমন এক সামাজিক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়, যেখানে ধর্মীয় বিশ্বাসের ভিন্নতা দৈনন্দিন জীবনেরই অংশ। ফলে ‘শুধু আমার ধর্মই গ্রহণযোগ্য’—এই ধারণা সেখানে কোনো সামাজিক ভিত্তি পায় না।
একই জরিপে উল্লেখিত দেশগুলোর মাঝখানে এমন কিছু দেশের নাম এসেছে, যেগুলো সামাজিকভাবে বেশ বৈচিত্র্যপূর্ণ। একই সমাজের ভেতরেই দুটি বিপরীত প্রবণতা পাশাপাশি বাস করছে। একদিকে একটি অংশ গভীরভাবে বিশ্বাস করে যে ধর্ম একটিই এবং সেটি তাদের নিজের ধর্ম; অন্যদিকে আরেকটি অংশ মনে করে, ভিন্ন ধর্মের মানুষেরও একই সামাজিক মর্যাদা ও গ্রহণযোগ্যতা আছে। যেমন ফিলিপাইন থেকে কাজাখস্তান কিংবা লেবানন, যেখানে অর্ধেক মানুষ একমত হলেও বাকি অর্ধেক কিন্তু একমত নয়। ইরানের মতো শরিয়াহভিত্তিক দেশেরও ৩৮ শতাংশ জনগোষ্ঠী তাদের নিজের ধর্মকে একমাত্র গ্রহণযোগ্য ধর্ম মনে করে না।
সকলকে গুরুত্বের চোখে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি এমনি এমনি তৈরি হয় না; এর পেছনে দেশ বা অঞ্চলের ইতিহাস, রাজনীতি, শিক্ষাব্যবস্থা ও সামাজিক চর্চা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এর প্রমাণ হলো লাতিন আমেরিকার অনেক দেশ, যেমন ব্রাজিল, পেরু বা কলম্বিয়া। সেখানকার গোটা সমাজ খুবই ধর্মপ্রাণ হওয়া সত্ত্বেও মানুষ তুলনামূলকভাবে বেশি সহনশীল। ধর্ম মানুষের জীবনের গভীরে থাকলেও অন্য ধর্মের অস্তিত্বকে অস্বীকার করার প্রবণতা সেখানে অনেক কম।
ওই গবেষণা থেকে উঠে আসা নানামুখী বৈপরীত্য সমাজবিজ্ঞানীদের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হাজির করেছে—গভীর ধর্মবিশ্বাস কি মানুষকে অসহিষ্ণু করে তোলে?
আবার ওপরের সবকটি উদাহরণকে একসঙ্গে মেলালে দেখা যাচ্ছে, ধর্মীয় বিশ্বাস আর অন্যকে গ্রহণ করার মানসিকতা এক জিনিস নয়। কেউ খুব গভীরভাবে ধার্মিক হয়েও বহুত্ববাদী হতে পারে (যেমন লাতিন আমেরিকার জনগণ), আবার কেউ তুলনামূলকভাবে কম ধর্মচর্চা করেও পরিচয়ের সীমারেখা খুব কঠোরভাবে টেনে দিতে পারে (যেমন বাংলাদেশ, পাকিস্তান, মিয়ানমারের জনগণ)।
এই মুহূর্তে আলোচনায় থাকা গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে ৮১ ফুট উচ্চতার রাম মূর্তি নির্মাণকে কেন্দ্র করে যা হচ্ছে, সেদিকে তাকালেই বিষয়টি আরও ভালোভাবে বোঝা যায়। রামের প্রতিকৃতি বানানো যখন দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে, তখনই ইসলামপন্থীদের নানা দল ও উপদল মাঠে নেমে মানববন্ধন থেকে শুরু করে মিছিল-সমাবেশ করেছে। ‘পলাশবাড়ী ইমাম-ওলামা পরিষদ’ নামের এক সংগঠন ওই মূর্তি অপসারণের দাবি জানিয়েই শুধু থেমে থাকেনি, এই মূর্তি নির্মাণের প্রকৃত কারণ উদঘাটনেরও দাবি জানিয়েছে।
সরকারি হিসেবেই এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে অন্তত ৮ শতাংশ নাগরিক হিন্দু। রাম হিন্দুদের দেবতাদের একজন এবং হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে অত্যন্ত পূজনীয়। ভারতে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতায় থাকা ভারতীয় জনতা পার্টিও (বিজেপি) রামকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করছে, তাদের স্লোগান ‘জয় শ্রীরাম’। কিন্তু তা সত্ত্বেও, হিন্দুরা কেন তাদের দেবতার মূর্তি নির্মাণ করতে পারবে না?
বাংলাদেশ যখন সরকারি ব্যবস্থাপনায় ৫৬০টি মডেল মসজিদ নির্মাণ করেছে, তখন কি কেউ ওই উদ্যোগে বাধা দিয়েছে? তাহলে হিন্দুদের রাম মূর্তি নির্মাণে বাধা আসছে কেন? একই ঘটনা ঘটছে মুসলিমদের নিজেদের মধ্যেও। আহমদিয়া সম্প্রদায়কে রীতিমতো আতঙ্কের মধ্যে কাটাতে হয়। দেশের উত্তরাঞ্চলে আদিবাসীদের ক্ষেত্রে আমরা দেখি উচ্ছেদের নির্মমতা। পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়িদের সংখ্যালঘুতে পরিণত করার রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ বহুদিনের এবং সেটা এখন সফল হতে চলেছে। এটিই হলো সমাজে একই ধরনের (হোমোজেনাস) মানুষ বসবাস করার বিপদ। চারদিকে নিজ ধর্মের মানুষ দেখতে দেখতে ভিন্ন ধর্ম, সংস্কৃতি ও বিশ্বাসের প্রতি সহনশীলতা কমে যায়।
সম্প্রতি ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ঈদের নামাজকে কেন্দ্র করে ঠিক একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে। বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর ১১৭ বছরের কলকাতার ঐতিহ্যবাহী রেড রোডে ঈদের নামাজ পড়া বন্ধ করা হয়েছে; তার পরিবর্তে ব্রিগেডে নামাজ পড়ার জন্য বলা হয়েছে। কিন্তু ঠিক তার এক মাস পরে যখন কলকাতায় যোগব্যায়ামের সমাবেশ হলো এবং সেখানে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী অংশ নিলেন, তখন একই রেড রোড এক সপ্তাহের জন্য বন্ধ রাখা হয়। যে রেড রোড বহু বছর ধরে বড় সরকারি অনুষ্ঠান, কুচকাওয়াজ এবং ভিড়ভাট্টার জাতীয় পর্যায়ের ইভেন্টের জন্য বিখ্যাত, সেখানে শুধু ঈদের নামাজটাই বন্ধ করতে হলো। স্বাভাবিকভাবেই কলকাতার মুসলমানরা প্রশ্ন তুলেছেন, এক বেলার নামাজে মানুষের খুব কষ্ট হলে, এখন এক সপ্তাহের বন্ধে কি সমস্যা হচ্ছে না? এটিই হলো রাষ্ট্রে বা ক্ষমতাসীনদের হাতে ধর্ম ছেড়ে দেওয়ার বিপদ। কোনো একটি ধর্ম বা সংস্কৃতি যখন চালকের আসনে বসে যায়, তখন বাকি ধর্ম, সংস্কৃতি ও বিশ্বাসকে অবদমন করার প্রবণতা তৈরি হয়।
ঠিক এই কথাটিই সংসদে দাঁড়িয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমান বলেছেন। তিনি বলেছেন, “হিন্দুরা ১০০ না ৩০০ মূর্তি বানাক, এতে আমার কিছু আসে যায় না। আমি মুসলমান, আমি ওটার দিকে তাকাই না। আমি প্রয়োজনে ২৫ তলা মসজিদ করব, অসুবিধা কী? সে তার মন্দিরে পূজা করবে, আমি আমার মসজিদে নামাজ পড়ব—অসুবিধা নেই তো। আমরা কি ভবিষ্যতে একসঙ্গে থাকতে পারব না?”
আমার ধারণা এই প্রশ্নটি এখন বহু মানুষের।
রাজু নূরুল উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ ও লেখক। বর্তমানে সোমালিয়া সরকারের অর্থ, পরিকল্পনা ও বিনিয়োগ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র অ্যাডভাইজার হিসেবে কর্মরত। যোগাযোগ: [email protected]