Published : 22 Jul 2026, 03:39 PM
বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমিগুলোর একটি টাঙ্গুয়ার হাওর। শুধু দর্শনীয় স্থান হিসেবে নয়, একটি জীবন্ত বাস্তুতন্ত্র হিসেবেও এর গুরুত্ব অপরিসীম। টাঙ্গুয়ার হাওর হাজারও প্রজাতির মাছ, পরিযায়ী পাখি, জলজ উদ্ভিদ এবং হাওর পারের মানুষের জীবন ও জীবিকার অবিচ্ছেদ্য অংশ। আন্তর্জাতিকভাবে রামসার সাইট হিসেবে স্বীকৃত এই জলাভূমি বৈশ্বিক গুরুত্বসম্পন্ন একটি প্রাকৃতিক সম্পদ। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, আজ এই অমূল্য সম্পদের সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে উঠেছে মানুষ নিজেই। বিশেষ করে অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন, প্লাস্টিক বর্জ্য, উচ্চ শব্দে গান, হাউসবোটের অপরিকল্পিত ব্যবহার এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার চরম ব্যর্থতা টাঙ্গুয়ার হাওরের অস্তিত্বকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
পর্যটনকে সাধারণত উন্নয়নের অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে দেখা হয়। এতে স্থানীয় মানুষের আয় বাড়ে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় এবং একটি অঞ্চল জাতীয়ভাবে পরিচিতি লাভ করে। কিন্তু পৃথিবীর বহু দেশে এখন একটি নতুন ধারণা গুরুত্ব পাচ্ছে, যার নাম ‘ওভার ট্যুরিজম’। অর্থাৎ, যখন পর্যটকের সংখ্যা একটি এলাকার পরিবেশগত ধারণক্ষমতাকে অতিক্রম করে যায়, তখন পর্যটন আর উন্নয়নের মাধ্যম থাকে না; বরং ধ্বংসের কারণ হয়ে ওঠে। টাঙ্গুয়ার হাওরের বর্তমান বাস্তবতা ঠিক সেই সতর্কবার্তাই দিচ্ছে।
সাম্প্রতিক বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ বলছে, ভরা মৌসুমে প্রতিদিন হাজারও পর্যটকের আনাগোনায় হাওরে বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিক বর্জ্য জমা হচ্ছে। পানির বোতল, প্লাস্টিকের গ্লাস, প্লেট, পলিথিন, চিপসের মোড়ক কিংবা একবার ব্যবহারযোগ্য খাবারের প্যাকেট নির্বিচারে পানিতে ফেলে দেওয়া হচ্ছে। এসব অপচনশীল বর্জ্য বছরের পর বছর পানিতে ও মাটিতে থেকে যাচ্ছে। প্লাস্টিক ভেঙে ক্ষুদ্র কণিকায় পরিণত হয়ে মাছের শরীরে প্রবেশ করছে, খাদ্যশৃঙ্খলে ছড়িয়ে পড়ছে এবং শেষ পর্যন্ত মানুষের শরীরেও ফিরে আসছে। অর্থাৎ, টাঙ্গুয়ার হাওরের প্লাস্টিক দূষণ কেবল একটি স্থানীয় পরিবেশগত সমস্যা নয়; জনস্বাস্থ্য, খাদ্যনিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও একটি গভীর হুমকি।
কিন্তু প্লাস্টিকই একমাত্র বিপদ নয়। হাওরে চলাচলকারী অসংখ্য পর্যটকবাহী ট্রলার ও হাউসবোট থেকে নির্গত তেল, ডিজেল, রান্নাঘরের বর্জ্য এবং অপরিশোধিত পয়োনিষ্কাশন সরাসরি পানিতে মিশছে। অধিকাংশ নৌযানে বর্জ্য সংরক্ষণের কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেই। অনেক ক্ষেত্রেই নৌকার ভেতরের সমস্ত ময়লা, খাবারের উচ্ছিষ্ট এবং মানববর্জ্য সরাসরি হাওরের পানিতে ফেলে দেওয়া হয়। এতে পানির গুণগত মান নষ্ট হচ্ছে, দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ কমছে এবং জলজ প্রাণীর স্বাভাবিক জীবনচক্র ব্যাহত হচ্ছে।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো উচ্চ শব্দে গান বাজানো। টাঙ্গুয়ার হাওরে বেড়াতে গেলে এখন অনেক পর্যটক ট্রলার কিংবা হাউসবোটকে ভাসমান ডিজে পার্টিতে পরিণত করেন। শক্তিশালী সাউন্ড বক্সে ঘণ্টার পর ঘণ্টা উচ্চ শব্দে গান বাজানো হয়। অথচ টাঙ্গুয়ার হাওর একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল পাখির আবাসস্থল। শীত মৌসুমে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চল থেকে শত শত প্রজাতির পরিযায়ী পাখি এখানে আসে। উচ্চ শব্দ তাদের প্রজনন, খাদ্য সংগ্রহ এবং বিশ্রামের স্বাভাবিক পরিবেশকে ব্যাহত করে। শুধু পাখিই নয়, শব্দদূষণের প্রভাব পড়ে মাছসহ অন্যান্য জলজ প্রাণীর আচরণ ও প্রজননের ওপরও। প্রকৃতির নীরবতাকে বিনোদনের নামে ধ্বংস করার অধিকার কোনো মানুষের নেই।
অনেকে যুক্তি দেন, পর্যটন বন্ধ করা হলে স্থানীয় মানুষের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এই যুক্তির বাস্তবতা অবশ্যই আছে। কিন্তু একটি প্রশ্ন আমাদের করতেই হবে, যে পর্যটন কয়েক বছরের মধ্যে একটি আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমিকে ধ্বংস করে দেবে, ওই পর্যটন আদৌ দীর্ঘমেয়াদে স্থানীয় অর্থনীতির জন্য লাভজনক কি? প্রকৃতি ধ্বংস হয়ে গেলে পর্যটকও থাকবে না, আয়ও থাকবে না। অর্থাৎ, স্বল্পমেয়াদি অর্থনৈতিক লাভের জন্য আমরা দীর্ঘমেয়াদি সম্পদ বিসর্জন দিচ্ছি।
বিশ্বের বহু দেশ ইতোমধ্যেই পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল এলাকায় পর্যটন কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করেছে। কোথাও প্রতিদিন নির্দিষ্ট সংখ্যক পর্যটক প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়, কোথাও আগাম নিবন্ধন বাধ্যতামূলক, কোথাও একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ, আবার কোথাও উচ্চ শব্দে গান বাজানোর ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। কারণ তারা বুঝেছে, প্রকৃতির ধারণক্ষমতার বাইরে গিয়ে পর্যটন চালানো মানে নিজের সম্পদ নিজেই ধ্বংস করা।
বাংলাদেশেও এখন একই ধরনের কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এসেছে। টাঙ্গুয়ার হাওরে প্রতিদিন কতজন পর্যটক প্রবেশ করতে পারবেন, তার একটি বৈজ্ঞানিক সীমা নির্ধারণ করতে হবে। নিবন্ধন ছাড়া পর্যটন পরিচালনা বন্ধ করতে হবে। প্রতিটি নৌযানে বাধ্যতামূলকভাবে বর্জ্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা রাখতে হবে এবং ফিরে আসার সময় সেই বর্জ্য নির্দিষ্ট স্থানে জমা দেওয়া নিশ্চিত করতে হবে। যে নৌযান বা পর্যটক পানিতে বর্জ্য ফেলবে, তার বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক জরিমানা ও আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।
একই সঙ্গে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা জরুরি। পানির বোতল, প্লাস্টিকের গ্লাস কিংবা প্লেটের পরিবর্তে পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপকরণ ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। হাউসবোট পরিচালনার জন্য পরিবেশগত লাইসেন্স প্রবর্তন করা প্রয়োজন, যেখানে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, শব্দ নিয়ন্ত্রণ এবং জ্বালানি ব্যবহারের নির্দিষ্ট মানদণ্ড পূরণ না করলে কোনো নৌযান চলাচলের অনুমতি পাবে না। উচ্চ শব্দে গান বাজানোর বিষয়েও শূন্য সহনশীলতার নীতি গ্রহণ করতে হবে। টাঙ্গুয়ার হাওর কোনো বিনোদন পার্ক নয়; এটি একটি জীবন্ত বাস্তুতন্ত্র। এখানে মানুষের আনন্দের চেয়ে পাখির নিরাপত্তা, মাছের প্রজনন এবং প্রকৃতির স্বাভাবিক ছন্দ অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। প্রকৃতিকে উপভোগ করতে হলে প্রকৃতির ভাষাই শুনতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো স্থানীয় জনগণকে এই সংরক্ষণ কার্যক্রমের অংশীদার করা। হাওরের প্রকৃত অভিভাবক তারাই। নৌকার মাঝি, ট্রলার মালিক, জেলে, কৃষক এবং স্থানীয় তরুণদের সম্পৃক্ত করে একটি কমিউনিটি মনিটরিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে। তারাই সবচেয়ে দ্রুত পরিবেশবিধি লঙ্ঘনের ঘটনা শনাক্ত করতে পারবেন এবং প্রশাসনকে সহযোগিতা করতে পারবেন। একই সঙ্গে পর্যটকদের জন্য আচরণবিধি প্রণয়ন ও তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, টাঙ্গুয়ার হাওর শুধু সুনামগঞ্জের নয়, সমগ্র বাংলাদেশের এবং বৈশ্বিক প্রাকৃতিক ঐতিহ্যের অংশ। একটি রামসার সাইট ধ্বংস হওয়া মানে কেবল একটি জলাভূমির ক্ষতি নয়; একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশের পরিবেশ সংরক্ষণের অঙ্গীকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে।
আমরা যদি সত্যিই টাঙ্গুয়ার হাওরকে ভালোবাসি, তাহলে শুধু ভ্রমণের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। প্রকৃত ভালোবাসার অর্থ হলো সংযম, দায়িত্ববোধ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এই জলাভূমিকে অক্ষত রেখে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি। প্রশ্নটি এখন আর পর্যটন থাকবে কি থাকবে না, সেটি নয়। প্রশ্ন হলো, আমরা কী ধরনের পর্যটন চাই। এমন পর্যটন, যা কয়েক বছরের মধ্যেই হাওরকে প্লাস্টিক, শব্দ ও বর্জ্যের স্তূপে পরিণত করবে, নাকি এমন পর্যটন, যা প্রকৃতিকে সম্মান করবে এবং তার ধারণক্ষমতার সীমার মধ্যে থেকে পরিচালিত হবে?
এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এখনই। কারণ প্রকৃতি অপেক্ষা করে না। টাঙ্গুয়ার হাওরের জীববৈচিত্র্য একবার হারিয়ে গেলে, শত কোটি টাকা ব্যয় করেও তা আর ফিরিয়ে আনা যাবে না। তাই অনিয়ন্ত্রিত পর্যটনের লাগাম টেনে ধরা, প্লাস্টিকমুক্ত হাওর গড়ে তোলা, উচ্চ শব্দের সংস্কৃতি বন্ধ করা এবং পরিবেশবান্ধব পর্যটন নীতি প্রয়োগ করা এখন কোনো বিলাসিতা নয়; এটি টাঙ্গুয়ার হাওরের অস্তিত্ব রক্ষার অপরিহার্য শর্ত।
শাহেদ কায়েস কবি ও মানবাধিকার কর্মী। ই-মেইল: [email protected]