Published : 22 Jul 2026, 11:02 AM
শনিবার সকালে দিল্লির যন্তর মন্তরে অনশনরত সোনম ওয়াংচুককে জোর করে সরিয়ে দেয় পুলিশ এবং পরে সংসদমুখী বিক্ষোভকারীদের ওপর লাঠিচার্জ করা হয়। ভারতের দীর্ঘ, প্রায় বিস্মৃত প্রতিবাদের ইতিহাসে ঘটনাটিকে আরেকটি সাধারণ অধ্যায় বলেই উড়িয়ে দেওয়া যায়। কিন্তু একটু থেমে ভাবলেই প্রশ্ন আসে—গত কয়েক সপ্তাহ ধরে যন্তর মন্তরে জড়ো হওয়া মানুষগুলো আসলে কারা? বাইরে থেকে দেখলে মনে হয়, এরাই সেই রাজনীতি-বিমুখ জনতা, এতদিন যাদের ভূমিকা ছিল নীরব দর্শকের।
এক শতাব্দী আগে আন্তোনিও গ্রামশি বলে গিয়েছেন, প্রত্যেক মানুষই রাজনৈতিক সত্তা। সবাই এমন কিছু মূল্যবোধ ধারণ করে, লালন করে কিংবা এমনকিছুকে চ্যালেঞ্জ জানাতে ব্যর্থ হয়, যা চারপাশের পরিস্থিতি ও ক্ষমতার কাঠামো গড়ে তোলে। সেই অর্থে নিরপেক্ষতাও একটি রাজনৈতিক অবস্থান। কারণ নিরপেক্ষ থাকা মানে শেষ পর্যন্ত বিদ্যমান ক্ষমতার কাঠামোকেই নীরবে সমর্থন করা। নারীবাদী চিন্তাবিদ ক্যারল হ্যানিশও ‘ব্যক্তিগত সবকিছুই রাজনৈতিক’ উক্তির মাধ্যমে একই কথাই বলেন। ব্যক্তিগত সংকট, নারীর একান্ত অসন্তোষ কিংবা দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা—কোনোটিই বিচ্ছিন্ন নয়; সবই বৃহত্তর ক্ষমতা কাঠামোর ছাপ বহন করে। রাজনৈতিক পরিচয় গোপন করাও তাই এক ধরনের রাজনৈতিক অবস্থান।
ভারতে রাজনীতি-বিমুখতা দীর্ঘদিন ঝঞ্ঝাট থেকে দূরে থাকার সহজ পথ ছিল। সেই দূরত্বই এখন দ্রুত সংকুচিত হয়ে আসছে। ফলে নতুন বাস্তবতার দিকে চোখ ফেরানোর সময় এসেছে। মার্টিন নিমোলারের বিখ্যাত কবিতা ‘ফার্স্ট দে কেম ফর দ্য কমিউনিস্টস’ অন্যায়ের মুখে নীরব থাকার বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করে। ভারতীয় প্রেক্ষাপটে কবিতাটি আরেকটি সত্যও মনে করায়, রাষ্ট্র যখন জবাবদিহির ঊর্ধ্বে চলে যায়, তখন দমন-পীড়ন শুধু প্রান্তিক মানুষের মধ্যে আটকে থাকে না; একসময় সবার দরজায় গিয়ে কড়া নাড়ে। তাই রাজনীতি-বিমুখ ভারতীয়দের অনেকেই বুঝতে শুরু করেছেন, রাজনীতি থেকে দূরে থাকলেই তার প্রভাব থেকে মুক্ত থাকা যায় না। যে মানুষ রাজনীতি নিয়ে মাথা ঘামাতে চান না, শেষমেশ রাজনীতিই তার ঘরে ঢুকে পড়ে।
ভারতের জনপ্রিয় ভ্লগার সৌরভ যোশি অভিযোগ করেন, ইথানল-মিশ্রিত পেট্রল ব্যবহারের পর তার মার্সিডিজের মাইলেজ কমে গেছে। জবাবে মার্সিডিজ-বেঞ্জ কর্তৃপক্ষ জানায়, তাদের গাড়ি এ ধরনের জ্বালানিতেও চলার উপযোগী। প্রযুক্তিগতভাবে কে ঠিক, সেই বিতর্ক এখানে মুখ্য নয়। আসল বিষয় অন্যত্র, বিতর্ক এড়িয়ে চলার জন্য পরিচিত এক ভ্লগারও রাষ্ট্রীয় নীতির প্রভাব নিয়ে প্রকাশ্যে ক্ষোভ জানাতে বাধ্য হচ্ছেন। ছোট্ট এই ঘটনাটিই বুঝিয়ে দেয়—রাজনীতি আজ রাজনীতি-বিমুখ মানুষের গাড়ির ট্যাংকেও পৌঁছে গেছে।
একই পরিবর্তনের আরও সূক্ষ্ম লক্ষণ জাতীয় পরীক্ষাগুলোর প্রশ্নফাঁস। নিট কিংবা সিবিএসই পরীক্ষার কেলেঙ্কারি উচ্চ-মধ্যবিত্ত পরিবারের দরজাতে পৌঁছে গেছে। এতদিন যাকে মেধাভিত্তিক ব্যবস্থার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সিঁড়ি মনে করা হতো, সেটিই এখন টলমল করছে।
রাস্তার কুকুর নিয়ে দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত ক্ষোভ এমন সব আবাসিক সমিতিকে সংগঠিত করেছে, যারা আগে নিজেদের কোনো রাজনৈতিক শক্তি বলেই ভাবত না।
এই আবহেই সামনে এসেছে ককরোচ জনতা পার্টি, ইনস্টাগ্রামের একটি ব্যঙ্গাত্মক পোস্ট থেকে প্রায় আচমকাই জন্ম নেওয়া উদ্যোগটি এখন সত্যিকারের রাজপথের আন্দোলন। সবচেয়ে চোখে পড়ে এর ভঙ্গি; হাতে ফুল, শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখার চেষ্টা, দিল্লি পুলিশকে প্রকাশ্যে ধন্যবাদ, বারবার এই বার্তা—অংশগ্রহণকারীরা শুধুই সাধারণ শিক্ষার্থী।
সবচেয়ে মজার জায়গাটি এখানেই, যে শ্রেণি এতদিন রাজনীতি থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখেছিল, রাস্তায় নেমেও সেই স্বভাব পুরোপুরি বদলায়নি। প্রতিবাদও যেন ভদ্র হতে হবে, পরিপাটি হতে হবে, মর্যাদার ছাপ রাখতে হবে। তাই আন্দোলনটি এখনও নিজের ভাষা, ভঙ্গি আর পরিচয় খুঁজছে। সংগঠনের মুখপাত্ররাও সেটি স্বীকার করেছেন। নিয়মিত সংবাদ সম্মেলন করছেন, প্রশ্ন এড়িয়ে যাচ্ছেন না, স্পষ্ট জবাব দিচ্ছেন। জনসমক্ষে এমন খোলামেলা জবাবদিহির অভ্যাস এই শ্রেণির কাছে নতুন অভিজ্ঞতা।
তবে দিল্লির এই রাজনৈতিক জাগরণকে অতিরঞ্জিত করারও সুযোগ নেই। এই জনসমাগম কোনো র্যাডিক্যাল আন্দোলনের ফল নয়। আবার এটিও প্রমাণ করে না যে রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়া মধ্যবিত্ত হঠাৎ দরিদ্র মানুষের গভীর সহমর্মী হয়ে উঠেছে। দলিত পয়ঃনিষ্কাশন কর্মীরা এখনো নর্দমা আর সেপটিক ট্যাঙ্কে প্রাণ হারাচ্ছেন। স্বাধীন পর্যবেক্ষকদের হিসাবে, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে জুনের মধ্যেই মারা গেছেন ৫৫ জন। বহু বছর ধরে অধিকারকর্মী বেজওয়াড়া উইলসন অভিযোগ করে আসছেন, সরকার সংসদে এসব মৃত্যুর প্রকৃত সংখ্যা তুলে ধরে না। অথচ এসব মৃত্যু কোনো দুর্ঘটনা নয়; বর্ণপ্রথা ও কাঠামোগত বৈষম্যের নির্মম ফল, যা পুরোপুরি ঠেকানো সম্ভব। তবু ককরোচ জনতা পার্টির আন্দোলনের কয়েক মাস আগেই যখন দলিত পয়ঃনিষ্কাশন কর্মীরা যন্তর মন্তরে আন্দোলনে বসেছিলেন, তখন সংবাদমাধ্যমের আলো কিংবা জনসমর্থন—কোনোটিই তাদের ভাগ্যে জোটেনি।
তাই আন্দোলনটিকে অতিরিক্ত রোমান্টিক করে দেখার কারণ নেই। এত দিন নীরব থাকা একদল মানুষ রাস্তায় নেমেছেন বলেই সরকার নীতি বদলে ফেলবে, এমন ভাবারও সুযোগ নেই। রাজনাথ সিংয়ের পুরোনো কথাটাই এখনো সত্য—বিজেপি এমন সরকার নয়, যে সহজে নতি স্বীকার করবে। তার ওপর সদ্য জন্ম নেওয়া, মিম-নির্ভর একটি আন্দোলন একাই সেই বাস্তবতা বদলে দেবে, এমন বিশ্বাসেরও ভিত্তি দুর্বল।
তারপরও আন্দোলনটিকে হালকাভাবে নেওয়ার উপায় নেই। সোনম ওয়াংচুক ও আইসার শিক্ষার্থীরা সর্বস্ব দিয়ে লড়ছেন। তাই দূরে দাঁড়িয়ে শুধু দর্শক হয়ে থাকাটাই বরং প্রশ্নের মুখে পড়ে। এখনই প্রয়োজন স্বীকৃতি, সংহতি ও অংশগ্রহণ।
শেষ পর্যন্ত এটি শুধু রাজনীতির প্রশ্ন নয়, মানবিকতারও প্রশ্ন। ব্যক্তিগত স্বার্থ আর তাৎক্ষণিক ক্ষোভের গণ্ডি পেরিয়ে সেই অস্বস্তি কি আরও বড় মানবিক বোধে রূপ নিতে পারে?
শ্রমজীবী মানুষ বহুদিন ধরেই অসহনীয় বাস্তবতার মধ্যে বেঁচে আছে। রাষ্ট্রের ব্যর্থতা যে কোনো বিমূর্ত ধারণা নয়, তা বোঝার জন্য একটি মার্সিডিজের মাইলেজ কমার গল্পের দরকার ছিল না। কিন্তু যদি সেই ঘটনাই মানুষের ঘুম ভাঙায়, তাতে আপত্তি কী? শুধু এরপর যেন মনে থাকে, এই দেশের আরও বহু মানুষ অনেক আগে থেকেই একই রাষ্ট্রীয় অবহেলার ভার বহন করছে।
আন্দোলনটি দীর্ঘস্থায়ী হবে, নাকি কয়েকদিন রমরমা আলোচনার পর মিলিয়ে যাবে—তা দিয়ে এর গুরুত্ব মাপা যাবে না। আসল প্রশ্ন অন্যত্র, পুরোনো বন্দোবস্তের বদলে জাতীয় সংহতির বোধ গড়ে তোলা, আর দীর্ঘদিনের সুবিধাবাদী নীরবতা কিংবা রাজনীতি-বিমুখতাকে নিরপেক্ষতার মুখোশ পরিয়ে চালিয়ে দেওয়ার প্রবণতা প্রত্যাখ্যান করাই এই আন্দোলনের বড় তাৎপর্য।
লেখাটি ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’ থেকে অনূদিত; এর লেখক সিয়া দুলারি চৌধুরী একজন অধিকারকর্মী। ভারতের প্রান্তিক ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার নিয়ে নিয়মিত লেখালেখি করেন।