Published : 22 Jul 2026, 08:21 AM
বাংলাদেশে রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠান নিয়ে বিতর্ক আবারও জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) সম্প্রতি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কয়েকটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে পুনর্বিনিয়োগ, যৌথ উদ্যোগ, দীর্ঘমেয়াদি ইজারা কিংবা কৌশলগত অংশীদারত্বের আওতায় আনার উদ্যোগ নিয়েছে। সরকারের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে অলাভজনক ও অচল হয়ে থাকা শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করা, নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং শিল্প উৎপাদনে গতি ফিরিয়ে আনাই এসব উদ্যোগের উদ্দেশ্য। অন্যদিকে ১৭টি বাম-প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল এই উদ্যোগকে রাষ্ট্রীয় সম্পদ দেশি-বিদেশি করপোরেট পুঁজির হাতে তুলে দেওয়ার প্রক্রিয়া হিসেবে আখ্যায়িত করে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
এই দুই অবস্থানের মধ্যেই মূল প্রশ্নটি নিহিত—রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পের সংকটের সমাধান কি কেবল বেসরকারিকরণ, নাকি রাষ্ট্রীয় খাতের আধুনিকায়ন, সুশাসন ও পুনর্গঠনের মধ্যেই রয়েছে টেকসই পথ? এই প্রশ্ন কেবল কয়েকটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মালিকানার নয়; এটি বাংলাদেশের শিল্পনীতি, অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব, কর্মসংস্থান এবং সংবিধানসম্মত উন্নয়ন দর্শনের প্রশ্ন।
বাংলাদেশে রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠান নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের শিল্পায়নের প্রধান ভিত্তি ছিল রাষ্ট্র। সে সময় বেসরকারি খাতের পুঁজি, প্রযুক্তি ও সাংগঠনিক সক্ষমতা সীমিত থাকায় রাষ্ট্রই শিল্প প্রতিষ্ঠা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং উৎপাদন ব্যবস্থার পুনর্গঠনের দায়িত্ব নেয়। পরবর্তীকালে আশির দশক থেকে বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাঠামোগত সংস্কার কর্মসূচির অংশ হিসেবে বেসরকারিকরণ, বাজারমুখীকরণ এবং রাষ্ট্রীয় খাত সংকোচনের নীতি অনুসরণ করা হয়। তখন এই ধারণা প্রচারিত হয়েছিল—বাজারই সবচেয়ে দক্ষ, আর রাষ্ট্রের ভূমিকা হবে কেবল নীতিনির্ধারণ ও নিয়ন্ত্রণ।
কিন্তু গত চার দশকের বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে যে, বাস্তবতা এতটা সরল নয়। যুক্তরাজ্যে মার্গারেট থ্যাচারের বেসরকারিকরণ কর্মসূচি কিছু ক্ষেত্রে দক্ষতা বাড়ালেও দীর্ঘমেয়াদে আঞ্চলিক বৈষম্য, কর্মসংস্থান হ্রাস এবং জনসেবার ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। লাতিন আমেরিকার অনেক দেশে রাষ্ট্রীয় সম্পদ বিক্রি হলেও কাঙ্ক্ষিত শিল্পায়ন বা অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জিত হয়নি। অন্যদিকে চীন, ভিয়েতনাম, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া এবং নরওয়ের মতো দেশ রাষ্ট্রীয় অংশগ্রহণকে সম্পূর্ণ পরিত্যাগ না করে আধুনিক করপোরেট সুশাসন, প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং জবাবদিহির মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বাড়িয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বলছে—সফল উন্নয়নের ক্ষেত্রে মালিকানার চেয়ে দক্ষ ব্যবস্থাপনাই অধিক গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের সংবিধানও এই ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গিকেই সমর্থন করে। সংবিধানের ১৩ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রীয়, সমবায়ী ও ব্যক্তিমালিকানাভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সহাবস্থানের কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় খাত, সমবায় এবং বেসরকারি উদ্যোগ—এই তিনটির সমন্বয়েই দেশের অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে ওঠার কথা। ফলে রাষ্ট্রীয় শিল্পকে সম্পূর্ণভাবে বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার নীতি যেমন সংবিধানের চেতনার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, তেমনি দীর্ঘদিন ধরে লোকসান, অদক্ষতা ও রাজনৈতিক প্রভাবের মধ্যে রাষ্ট্রীয় শিল্পকে অপরিবর্তিত রাখাও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
এখানেই মূল প্রশ্নটি সামনে আসে—রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠান লোকসানে কেন? এটি কি কেবল রাষ্ট্রীয় মালিকানার ব্যর্থতা, নাকি রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, নিয়োগে অনিয়ম, দুর্নীতি, প্রযুক্তিগত পশ্চাৎপদতা, দুর্বল পরিকল্পনা, বাজার বিশ্লেষণের অভাব এবং অদক্ষ ব্যবস্থাপনার ফল? যদি দ্বিতীয় কারণগুলোই প্রকৃত সমস্যা হয়ে থাকে, তাহলে সমাধানও মালিকানা পরিবর্তনে নয়; বরং ব্যবস্থাপনা ও শাসনব্যবস্থার গভীর সংস্কারে নিহিত।
রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে শুধু লাভ-লোকসানের খাতায় বিচার করলে বড় ধরনের ভুল হবে। এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিপুল পরিমাণ জমি, অবকাঠামো, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ, পরিবহন সুবিধা এবং জনগণের দীর্ঘদিনের বিনিয়োগ। অনেক ক্ষেত্রে শিল্পের উৎপাদনমূল্যের চেয়ে জমির বাজারমূল্য অনেক বেশি। ফলে শিল্প পুনরুজ্জীবনের পরিবর্তে জমির বাণিজ্যিক ব্যবহারই যদি প্রধান উদ্দেশ্যে পরিণত হয়, তবে তা জাতীয় সম্পদের নীরব স্থানান্তরে রূপ নিতে পারে।
তবে একই সঙ্গে এটাও সত্য যে, একবিংশ শতাব্দীর শিল্পনীতি অতীতের কাঠামোয় পরিচালিত হতে পারে না। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবটিক্স, স্বয়ংক্রিয় উৎপাদন, ডিজিটাল সাপ্লাই চেইন এবং সবুজ শিল্পায়নের যুগে রাষ্ট্রীয় শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হলে প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন, গবেষণা ও উদ্ভাবন, দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক মানের করপোরেট সুশাসন নিশ্চিত করতেই হবে। শুধুমাত্র রাষ্ট্রীয় মালিকানা ধরে রাখলেই কোনো শিল্প টেকসই হবে না।
এ প্রেক্ষাপটে বাম-প্রগতিশীল দলগুলোর সাম্প্রতিক বিবৃতি রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তারা রাষ্ট্রীয় সম্পদ করপোরেট পুঁজির হাতে চলে যাওয়ার সম্ভাব্য ঝুঁকি তুলে ধরেছে এবং জাতীয় সম্পদের ওপর জনগণের মালিকানার প্রশ্ন সামনে এনেছে। এই উদ্বেগ গণতান্ত্রিক সমাজে অবশ্যই আলোচনার দাবি রাখে। কিন্তু একই সঙ্গে এটিও লক্ষণীয় যে, রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পকে কীভাবে আধুনিক, লাভজনক, প্রযুক্তিনির্ভর এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় সক্ষম করা যায়—সে বিষয়ে এখনো একটি সুস্পষ্ট বিকল্প কর্মপরিকল্পনা বা নীতিগত রূপরেখা তাদের পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে উপস্থাপিত হয়নি। কেবল বেসরকারিকরণের বিরোধিতা নয়; তার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় শিল্পের পুনর্গঠন, পেশাদার পরিচালনা, প্রযুক্তি হালনাগাদ, আর্থিক পুনর্বিন্যাস, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ এবং জবাবদিহিমূলক করপোরেট সুশাসনের একটি বাস্তবভিত্তিক মডেলও জনগণের সামনে তুলে ধরা প্রয়োজন।
সরকারের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। রাষ্ট্রীয় শিল্পের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে কেবল বিনিয়োগ আহ্বান বা কৌশলগত অংশীদারত্বের ঘোষণা যথেষ্ট নয়। কোন শিল্পপ্রতিষ্ঠান জাতীয় নিরাপত্তা, খাদ্য, জ্বালানি বা শিল্পনীতির জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কোনগুলো যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত হতে পারে এবং কোনগুলো বেসরকারি অংশীদারত্বের জন্য উপযুক্ত—এসব বিষয়ে একটি স্বচ্ছ ও স্বাধীন মূল্যায়ন অপরিহার্য। এই প্রক্রিয়ায় সংসদ, বিশেষজ্ঞ, শ্রমিক প্রতিনিধি এবং নাগরিক সমাজের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা উচিত।
বাংলাদেশের প্রয়োজন একটি আধুনিক জাতীয় শিল্পনীতি, যেখানে রাষ্ট্র, সমবায় ও বেসরকারি খাত পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; পরিপূরক শক্তি হিসেবে কাজ করবে। রাষ্ট্র কৌশলগত শিল্প, প্রযুক্তি, গবেষণা ও অবকাঠামোতে নেতৃত্ব দেবে; বেসরকারি খাত উদ্ভাবন ও বিনিয়োগে ভূমিকা রাখবে; আর সমবায় খাত কৃষি, ক্ষুদ্র শিল্প ও স্থানীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করবে। সংবিধানের ১৩ অনুচ্ছেদের সমন্বিত অর্থনৈতিক দর্শন বাস্তবায়নের এটিই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর পথ।
রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প নিয়ে বর্তমান বিতর্কের একটি ইতিবাচক দিক হলো—এটি আমাদের নতুন করে শিল্পনীতি নিয়ে ভাবতে বাধ্য করছে। এই বিতর্ককে রাজনৈতিক স্লোগানে সীমাবদ্ধ না রেখে জাতীয় ঐকমত্যে রূপ দেওয়া প্রয়োজন। সে লক্ষ্যে কয়েকটি নীতিগত পদক্ষেপ বিবেচনা করা যেতে পারে:
প্রথমত, রাষ্ট্রায়ত্ত সব শিল্পপ্রতিষ্ঠানের স্বাধীন আর্থিক, কারিগরি ও সামাজিক নিরীক্ষা (Independent Audit) পরিচালনা করে কোন প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনযোগ্য, কোনটি কৌশলগতভাবে অপরিহার্য এবং কোনটির বিকল্প ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন—তা নির্ধারণ করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, কৌশলগত রাষ্ট্রীয় শিল্পে পেশাদার পরিচালনা পর্ষদ, আন্তর্জাতিক মানের করপোরেট সুশাসন, ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপমুক্ত প্রশাসন নিশ্চিত করতে হবে।
তৃতীয়ত, বেসরকারি অংশীদারত্ব বা যৌথ উদ্যোগ গ্রহণের ক্ষেত্রে উন্মুক্ত দরপত্র, সম্পদের প্রকৃত মূল্যায়ন, সংসদীয় তদারকি এবং জনগণের জানার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে, যাতে রাষ্ট্রীয় সম্পদের অবমূল্যায়ন বা অপব্যবহারের সুযোগ না থাকে।
চতুর্থত, প্রযুক্তি আধুনিকায়ন, গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D), দক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টি এবং সবুজ শিল্পায়নের জন্য পৃথক শিল্প পুনর্গঠন তহবিল গঠন করা প্রয়োজন, যাতে রাষ্ট্রীয় শিল্প ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারে।
পঞ্চমত, সংবিধানের ১৩ অনুচ্ছেদের আলোকে রাষ্ট্র, সমবায় ও বেসরকারি খাতের মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ অংশীদারত্বের ভিত্তিতে একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় শিল্পনীতি প্রণয়ন করতে হবে, যা পরিবর্তনশীল সরকারের পরিবর্তে জাতীয় স্বার্থের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করবে। তিস্তা সমন্বিত উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ‘তিস্তা বাঁচাও নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদ’ তাদের ৬ দফা কর্মসূচিতে সেই ভারসাম্যমূলক অংশীদারত্বের কথাই তুলে ধরেছে।
রাষ্ট্রীয় সম্পদ বিক্রি করা সহজ, কিন্তু একবার কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ হারালে তা পুনরুদ্ধার করা অত্যন্ত কঠিন। আবার শুধুমাত্র বেসরকারিকরণের বিরোধিতা করেও রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়, যদি তার আধুনিকায়ন ও পুনর্গঠনের বাস্তবসম্মত রূপরেখা না থাকে। আজ বাংলাদেশের প্রয়োজন মতাদর্শের সংঘাত নয়; প্রয়োজন তথ্যনির্ভর, বিজ্ঞানভিত্তিক এবং জাতীয় স্বার্থসম্মত একটি শিল্পনীতি। কারণ রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের মধ্য দিয়েই নির্ধারিত হবে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, শিল্পায়নের গতি এবং উন্নয়নের চরিত্র।
নজরুল ইসলাম হক্কানী শিক্ষাবিদ, প্রাবন্ধিক ও নদী আন্দোলনের সংগঠক। ই-মেইল: [email protected]