২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৩ আশ্বিন ১৪৩৩

মদিনার মিষ্টান্ন, শ্রী ঘোষের দধি: সম্প্রীতির যে রেখা চোখে পড়ে না

পূজার আগে পাহারা আর নিরাপত্তার হাঁকডাকই কি শেষ কথা? রাজনীতির টানাপোড়েন এড়িয়ে সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের অদৃশ্য সামাজিক মেলবন্ধনের বার্তাটি হারিয়ে যাচ্ছে কেন?

মদিনার মিষ্টান্ন, শ্রী ঘোষের দধি: সম্প্রীতির যে রেখা চোখে পড়ে না

ঢাকেশ্বরী মন্দিরে শ্রাদ্ধানুষ্ঠানের শান্ত পরিবেশ; যেখানে ফুল ও নৈবেদ্যের পাশাপাশি স্থান করে নিয়েছে সম্প্রীতির এক অদেখা ছবি।

মুনতাসির মামুন মুনতাসির মামুন

Published : 28 Sep 2026, 05:42 PM

Updated : 28 Sep 2026, 05:42 PM

২০২১ সালের ডিসেম্বরে দেওয়া এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে প্রয়াত লেখক, গবেষক ও বাম রাজনীতিক বদরুদ্দীন উমরকে দেশের সাম্প্রদায়িকতা নিয়ে প্রশ্ন করা হয়েছিল। ষাটের দশকে যিনি ‘সাম্প্রদায়িকতা’ নামে আস্ত একটা বই লিখেছিলেন, তার উত্তর শুনে প্রথমে চমকে উঠতে হয়: দেশে আসলে সাম্প্রদায়িকতা বলে কিছু নেই, এর ভিত্তি ১৯৪৭ সালেই শেষ হয়ে গেছে। উমর যখন সাক্ষাৎকার দিচ্ছিলেন, তার মাত্র দুই মাস আগে পূজার সময় দেশের নানা জায়গায় মণ্ডপে হামলা হয়েছিল। কিন্তু উমর থামেননি। তিনি বলেছিলেন, আজ যা দেখা যাচ্ছে তা রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার। প্রশ্ন তুলেছিলেন, হামলাগুলো আসলে কারা করছে? তার মতে, ক্ষমতার আশপাশের কিছু গোষ্ঠী সম্পত্তি দখল করছে, আর তারা মুসলমানের সম্পত্তিও ছাড়ছে না। তার সব কথার সঙ্গে একমত হওয়ার দরকার নেই। কিন্তু প্রসঙ্গটা ফেলে দেওয়া যায় না।

তারপর পাঁচ বছর কেটে গেছে, এই সময়ের মধ্যে তিন-তিনবার সরকার পরিবর্তন হয়েছে। ২০২৪ সালে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দেশের নানা জায়গায় মন্দির, বাড়িঘর আর দোকানে হামলার খবর এসেছে। আবার সেই সময়েই বহু জায়গায় মুসলিম প্রতিবেশীরা মন্দির পাহারা দিয়েছেন। এবারও পূজা আসছে পাহারার ভেতর দিয়ে। জেলায় জেলায় প্রস্তুতি সভা হচ্ছে, মণ্ডপে মণ্ডপে পুলিশ-আনসার, সিসিটিভি, স্বেচ্ছাসেবক। সরকারের পক্ষ থেকে আশ্বাস দেওয়া হচ্ছে: সংখ্যালঘু-সংখ্যাগুরু নয়, আমরা সবাই বাংলাদেশি। আশ্বাস ভালো, পাহারাও দরকার। কিন্তু বছর বছর একই আশ্বাস আর একই পাহারার প্রয়োজন পড়াটাই বলে দেয়, সমস্যা মেটেনি। প্রশ্ন হলো, সমস্যাটা কোথায়? সাধারণ মানুষের মনে, নাকি অন্য কোথাও? সাধারণ মানুষের রোজকার জীবনে ভাগের রেখা যদি অস্পষ্টই হয়, তাহলে রেখাটা টানছে কারা?

দুর্গাপূজা দরজায় কড়া নাড়ছে। এদেশের অন্যতম বৃহত্তম উৎসবের শুরুটা হয় শোক আর কৃতজ্ঞতা দিয়ে, মহালয়ায় পূর্বপুরুষকে স্মরণ করে। এ বছর মহালয়ার কথা মনে পড়তেই আমার চোখে ভাসে কয়েক মাস আগের এক দুপুর, ঢাকেশ্বরী মন্দিরের একটি ঘটনা।

আমার এক বড় বোন ও বন্ধুর বাবার মৃত্যুতে শ্রাদ্ধের আয়োজন হলো ঢাকেশ্বরী মন্দিরে, দাওয়াত পেলাম আমিও। লোকে আমাকে বিয়েশাদিতে খুব একটা ডাকে না বটে, তবে এমন আন্তরিক, ঘরোয়া আয়োজনে ডাক পাওয়া আমার জন্য নতুন নয়। এসব নিমন্ত্রণ আমার ভালো লাগে। বিয়েতে মানুষ ডাকে আনন্দ ভাগ করে নিতে। শোকের দিনে ডাকে কেবল তাদের, যাদের পাশে বসতে দিতে মনে কোনো দ্বিধা নেই। কারো শোকের দিনে পাশে বসার অনুমতি পাওয়া তাই এক ধরনের সম্মান।

ঢাকেশ্বরী এ শহরের সবচেয়ে পুরোনো মন্দিরগুলোর একটি। প্রচলিত আছে, ঢাকা নামটাই এসেছে দেবী ঢাকেশ্বরীর নাম থেকে। কয়েক দিন পর এখানেই বসবে কেন্দ্রীয় পূজামণ্ডপ। ঢাকের বাদ্যে, ভিড়ে, আলোয় গমগম করবে চত্বর, টেলিভিশন ক্যামেরা ঘুরবে, মন্ত্রী-নেতারা আসবেন শুভেচ্ছা জানাতে। কিন্তু সেদিন দুপুরে মন্দির ছিল শান্ত। জালির ফাঁক দিয়ে আলো এসে পড়ছিল মেঝেতে, বাতাসে ধূপের গন্ধ, দেয়ালের ওপারে প্রবহমান ঢাকা।

পুরোহিতের পাশে বসে আপা মন্ত্র পাঠ করছিলেন। সামনে কালো পটভূমিতে কালো ফ্রেমে বাঁধানো তার বাবার সাদাকালো ছবি। চোখে চশমা, গায়ে সাদা শার্ট, মুখে চওড়া হাসি, যেন এইমাত্র কেউ মজার কোনো কথা বলেছে। ছবির গলায় রজনীগন্ধার মালা। পুরো ছবিটা ঘিরে সাদা গোলাপের বিশাল তোরণ। নিচে মেঝেতে বেগুনি আসনের ওপর ছড়ানো গাঁদার পাপড়ি, লাল কাপড়ে ঢাকা ছোট একটা উঁচু আসন, ভাঁজ করা নতুন গামছা, কাঁসার গ্লাস। একটা থালায় কলা আর আপেল, পাশে লিলি আর রজনীগন্ধার তোড়া। আর একটা লাল ট্রেতে থরে থরে সাজানো মিষ্টি।

সেই মিষ্টির পাশে দাঁড় করানো সাদা একটা বাক্সে আমার চোখ আটকে গেল। বেগুনি লতাপাতার নকশার নিচে ইংরেজি হরফে বড় করে লেখা Madina, তার নিচে ছোট করে Mistanna Bhander & Bakery।

আর কারো কাছে ব্যাপারটা অদ্ভুত ঠেকল না, কিন্তু আমার চোখে লাগল। বাংলার মিষ্টির ইতিহাস লিখতে গেলে ময়রা আর ঘোষদের কথা আসবেই। সন্দেশ, রসগোল্লা, দই, এসবের বড় অংশ গড়ে উঠেছে হিন্দু কারিগরদের হাতে, বংশপরম্পরায়। আবার ঢাকায় এমন জনপ্রিয় দোকানেরও অভাব নেই, যাদের নামে ধর্মের লেশমাত্র নেই: বিক্রমপুর, বস, প্রিমিয়াম, মিনা। তবু বাবার শ্রাদ্ধে, মন্দিরের ভেতরে, ‘মদিনা’ নামটা আমাকে খানিক থমকে দিল।

পূজা শেষ হলো, আমরা শ্রাদ্ধের খাবার খেলাম। তারপর আর কৌতূহল চেপে রাখতে পারলাম না। আপাকে বললাম, “খেয়াল করেছেন, মদিনা মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের মিষ্টি দিয়ে বাবার শ্রাদ্ধ করেছেন?”

তিনি বেশ অবাক হয়ে তাকালেন, “তাতে কী আসে যায়?”

আমি বললাম, “মিষ্টিটা কি আপনি নিজে আনেননি?”

“আমি কেন আনতে যাব?”

আমি আর কিছু জিজ্ঞেস করতে পারলাম না।

খাবারের আয়োজনের দায়িত্বে ছিলেন মন্দিরেরই স্থানীয় এক ভদ্রলোক। তাকে আড়ালে ডেকে জানতে চাইলাম, "ভাই, আশেপাশে আর মিষ্টির দোকান নেই? মদিনা থেকেই কেন?"

তিনিও একই রকম অবাক, "কেন? ওদের মিষ্টি তো ভালো!"

দ্বিতীয়বার একই রকম উত্তর শুনে বুঝলাম, প্রশ্নটা ভুল জায়গায় করছি। অস্বাভাবিক কিছু যদি থেকে থাকে, সেটা মদিনা মিষ্টান্ন ভাণ্ডারে নয়, আমার চোখে। নামের গায়ে ধর্ম খোঁজার অভ্যাসটা তাদের নেই, আমার আছে। তাদের কাছে মিষ্টির পরিচয় একটাই: ভালো, না খারাপ।

কিন্তু এই চোখ আমার কোথা থেকে এল? ভাবতে গিয়ে মনে হলো, হয়তো খবরের কাগজ থেকে, টেলিভিশনের পর্দা থেকে। প্রতি বছর পূজার আগে মণ্ডপের নিরাপত্তা নিয়ে সংবাদ সম্মেলন হয়, টক শোতে সম্প্রীতি নিয়ে আলোচনা হয়, কোথাও কোনো অঘটন ঘটলে তা নিয়ে তর্ক চলে সপ্তাহের পর সপ্তাহ। এসব দেখতে দেখতে আমরা অনেকে হয়তো অজান্তেই শিখে ফেলেছি সবকিছুতে একটা ভাগের রেখা খুঁজতে। অথচ যাদের নিয়ে এত কথা, তারা নিজেরা সেই রেখা দেখতেই পান না।

সেদিন রাতে বাড়ি ফিরলাম। আমাদের বাড়ি বগুড়া, দইয়ের জন্য যার খ্যাতি দেশজোড়া। দই আমাদের ঘরে প্রায় রোজকার খাবার। এই দই নিয়ে আমাদের রুচির খুঁতখুঁতানিও কম নয়। আগারগাঁওয়ের দই, ছোট ঘোষের দই, নানান পদের দই। বগুড়ার দইয়ের গল্প বলতে গেলেও ঘোষ পরিবারগুলোর কথা আসে, যাদের হাতে যুগের পর যুগ ধরে এই দই আজকের স্বাদ পেয়েছে। রাতের খাওয়া শেষে আম্মা দই নিয়ে এলেন। আম্মা সবে এশার নামাজ শেষ করেছেন, মাথায় তখনো ঘোমটা। মাটির সরাটা আমার সামনে রাখলেন। মুখে রঙিন কাগজের ঢাকনা তখনো আঁটা। তাতে বড় বড় অক্ষরে লেখা ‘পূর্ণ দধি ভাণ্ডার’, নিচে মালিকের নাম: শ্রী শ্যামল কুমার ঘোষ। ঠিকানা বাগবাড়ী বাজার, গাবতলী, বগুড়া। হাঁসোখালীর দই। ওই যে বললাম রুচির খুঁতখুঁতানি? বগুড়ার লোকের কাছেও এই দইয়ের কদর আলাদা।

একই দিনে দুটো দৃশ্য। দুপুরে মন্দিরে, এক হিন্দু বাবার শ্রাদ্ধে সাজানো হয়েছে মদিনার মিষ্টি। রাতে ঘরে, নামাজ শেষ করা এক মুসলমান মা ছেলের পাতে তুলে দিচ্ছেন শ্রী ঘোষের দধি। কোনোটাতেই কারো ভ্রূ কোঁচকায়নি। কেউ একে বড় করে দেখেনি, কেউ এ নিয়ে কথাও তোলেনি।

হয়তো সৌন্দর্যটা ঠিক ওখানেই, বড় করে না দেখায়। সম্প্রীতি নিয়ে আমরা সভা করি, ব্যানার টাঙাই, বক্তৃতা দিই। অথচ আসল সম্প্রীতি বোধহয় সেই অবস্থা, যেখানে ব্যাপারটা চোখেই পড়ে না। যেখানে দোকানের নাম কেবল দোকানের নাম, দইয়ের পরিচয় কেবল তার স্বাদ। আমরা হয়তো এভাবেই বেড়ে উঠেছি। কে কোন ধর্মের, কে কোন জাতের, এই হিসাব আলাদা করে কষতে আমাদের কেউ শেখায়নি। এটুকুই আমাদের রোজকার জীবনের পাথেয়।

এবারের পূজায় মণ্ডপে মণ্ডপে ঘোরার সময় নিজের বাবার শ্রাদ্ধের সময় আপা যে প্রশ্নটা করেছিলেন, আমার কানে আবার তা বাজবে: “তাতে কী আসে যায়?”

সত্যিই, কিছুই আসে যায় না। এই ‘কিছু না আসা-যাওয়া’টুকু টিকে থাক প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।

মুনতাসির মামুন: লেখক, গবেষক ও পরিবেশকর্মী। ইমেইল: muntasir@gmail.com