Published : 24 Jun 2026, 05:50 PM
গত শতকের আশির দশকে একটি গল্প বেশ প্রচলিত ছিল। বিশ্বকাপ ফুটবল শেষ হওয়ার পর এক শিক্ষক মৌখিক পরীক্ষায় একজন ছাত্রকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘সক্রেটিসের নাম শুনেছ?’ ছাত্র চটজলদি উত্তর দেয়, ‘জি স্যার।’ শিক্ষক তখন জানতে চাইলেন, ‘তিনি কেন বিখ্যাত ছিলেন?’ ছাত্র বলল, ‘স্যার, সক্রেটিস পেশায় একজন ডাক্তার এবং লিংকম্যান।’
শিক্ষক খানিকটা বিভ্রান্ত হয়ে আবার প্রশ্ন করলেন, ‘মানে কী?’ ছাত্র ব্যাখ্যা করল, ‘মানে হলো, সক্রেটিস ব্রাজিল দলে খেলতেন। ফুটবল খেলতেন। তার পজিশন ছিল লিংকম্যান, আর পেশায় ছিলেন ডাক্তার।’ ছাত্রের এই উত্তরে শিক্ষকের আক্কেলগুড়ুম হওয়ারই কথা। কিন্তু আজ ভাবলে মনে হয়, ওই ছেলেটি ভুল কিছু বলেনি। বরং সে সময়ের বাংলাদেশে সক্রেটিসকে চেনার সবচেয়ে সহজ উপায় ছিল এটাই—তিনি ছিলেন ডাক্তার, আর খেলতেন ব্রাজিল ফুটবল দলে।
আমার নিজের জীবনে প্রথম বিশ্বকাপ দেখা ১৯৮৬ সালে। সদ্য এসএসসি পাস করেছি। তখন এলাকায় হাতেগোনা কয়েকটি বাড়িতে টেলিভিশন ছিল। রাত জেগে বিশ্বকাপ দেখতে হলে দল বেঁধে ওই বাড়িগুলোর একটিতে হাজির হওয়া লাগত। সাদাকালো ২৪ ইঞ্চি টেলিভিশন। ছবির মান এমন যে কখনও কখনও বল আর খেলোয়াড়ের পার্থক্য বোঝাও কঠিন হয়ে যেত। তবু উত্তেজনার কোনো কমতি ছিল না।
ওই সময় ‘সাপ্তাহিক বিচিত্রা’ বিশ্বকাপ নিয়ে একটি বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করেছিল। সেটাই ছিল আমাদের ফুটবল বিশ্বকোষ। কারেকা, জিকো, প্লাতিনি, টিগানা, সক্রেটিস—সবাইকে প্রথম চিনেছিলাম ওই পত্রিকার পাতায়। তখন সমর্থন ছিল প্রায় একচেটিয়া ব্রাজিলের দিকে। তবে ম্যারাডোনার জাদুতে আর্জেন্টিনার সমর্থনও দ্রুত বাড়ছিল। আর আমরা কয়েক বন্ধু ছিলাম ফ্রান্সের সমর্থক। খেলা দেখে নয়, ‘বিচিত্রা’য় ফরাসি দলের বর্ণনা পড়ে তাদের প্রেমে পড়েছিলাম।
সেই বিশ্বকাপেই দেখেছিলাম জীবনের অন্যতম স্মরণীয় একটি ম্যাচ—ব্রাজিল বনাম ফ্রান্স। ১৯৮৬ সালের ২১ জুন, মেক্সিকো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল। আজও চোখ বন্ধ করলে ম্যাচটার অনেক দৃশ্য ভেসে ওঠে। স্বয়ং পেলে একে বলেছিলেন ‘শতাব্দীর সেরা ম্যাচ’। কথাটা মোটেও বাড়িয়ে বলা ছিল না।
শুরু থেকেই আক্রমণ আর পাল্টা আক্রমণে ম্যাচটি এমন এক উচ্চতায় পৌঁছেছিল, যা আজও ফুটবলপ্রেমীদের আলোচনায় ফিরে আসে। ১৬ মিনিটে কারেকার গোলে এগিয়ে যায় ব্রাজিল। মনে হয়েছিল সাম্বার ছন্দ যেন ঘাসের ওপর নেচে উঠছে। কিন্তু ফরাসিরাও হার মানার দল ছিল না। ৪১ মিনিটে মিশেল প্লাতিনির গোলে ম্যাচে সমতা ফেরে।
দ্বিতীয়ার্ধে উত্তেজনা আরও ঘনীভূত হয়। ৭১ মিনিটে কারেকার হেড পোস্টে লেগে ফিরে আসে। এরপর ৭৫ মিনিটে পেনাল্টি পায় ব্রাজিল। সারা বিশ্বের কোটি ব্রাজিল সমর্থকের হৃদস্পন্দন যেন এক মুহূর্তের জন্য থেমে যায়। জিকো শট নিলেন, কিন্তু জোয়েল বাটস তা ঠেকিয়ে দিলেন। ওই মুহূর্তে বুঝেছিলাম, ফুটবল কখনও কখনও অবিশ্বাস্য রকমের নিষ্ঠুর।
অতিরিক্ত সময়েও কোনো গোল হলো না। খেলা গড়াল টাইব্রেকারে। সেখানে সক্রেটিস মিস করলেন। হুলিও সিজার মিস করলেন। প্লাতিনির মতো তারকাও মিস করলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ফ্রান্স জিতল। লুইস ফার্নান্দেজের শটে ফরাসিরা সেমিফাইনালে উঠল। সেদিন শিখেছিলাম, হারলেও একটি দল মানুষের হৃদয়ে চিরদিনের জন্য জায়গা করে নিতে পারে।
এরপর বিশ্বকাপ দেখা আর মিস হয়নি। ১৯৯০-এর কান্না, ১৯৯৪-এর উত্তেজনা, ১৯৯৮-এর বিস্ময় সবকিছু মিলিয়ে ফুটবল যেন জীবনের দিনপঞ্জির অংশ হয়ে গেল। ১৯৯৪ সালের ব্রাজিল-ইতালি ফাইনাল, রবার্তো বাজ্জোর আকাশে উড়ে যাওয়া শট, ১৯৯৮ সালে জিদানের ফ্রান্সের হাতে ব্রাজিলের পরাজয়—সবকিছু যেন এখনও স্মৃতির অ্যালবামে টাটকা।
আহারে, আমার নব্বইয়ের দশক! কী অসাধারণ এক সময় ছিল সেটা। ম্যারাডোনা ছিলেন একাধারে নন্দিত ও নিন্দিত। আমাদের পাড়ায় জার্সির রং ছিল মূলত হলুদ আর আকাশি-সাদা। অনেককে দেখেছি ম্যারাডোনাকে ভালোবাসে, কিন্তু সমর্থন করে ব্রাজিলকে। তখনও ফুটবল ছিল ভালোবাসার জায়গা, যুদ্ধের নয়।
তারপর সময় বদলাতে শুরু করল। ম্যারাডোনা ধীরে ধীরে বিতর্কের মানুষ হয়ে উঠলেন। অন্যদিকে ব্রাজিল যেন প্রতিভা উৎপাদনের কারখানা। রোমারিও, রোনালদো, রিভালদো, রোনালদিনহো, কাকা, কাফু, রবার্তো কার্লোস—একটি নাম শেষ না হতেই আরেকটি নাম এসে হাজির। আমরা তখন শিখেছিলাম, প্রতিপক্ষকে হারাতে হবে, কিন্তু অপমান করতে হবে না। ফুটবল মানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা, বিদ্বেষ নয়।
ততদিনে সাদাকালো টিভির জায়গা নিয়েছে রঙিন টিভি। আমি তখন গুলিত আর ভ্যান বাস্তেনের ভক্ত। এরপর বেকহ্যাম রিয়াল মাদ্রিদে গেলেন। লা লিগা জনপ্রিয় হয়ে উঠল। আর ঠিক তখনই এক ঝাঁকড়া চুলের, মিষ্টি হাসির, লাজুক চেহারার এক কিশোর বাংলাদেশের ফুটবল-মানচিত্রে নতুন রং ছড়িয়ে দিল—লিওনেল মেসি।
একসময় ব্রাজিলভক্তরা বিশ্বাস করত, ‘ব্রাজিল যদি বলে চৌকো বল দিয়ে খেলা হবে, তাহলেও তাই হবে।’ ওই আত্মবিশ্বাস ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যেতে লাগল। ইতালি বিশ্বকাপ জিতল, স্পেন বিশ্বকাপ জিতল, ফ্রান্স বিশ্বকাপ জিতল, জার্মানি বিশ্বকাপ জিতল। কিন্তু বাংলাদেশে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার জনপ্রিয়তার ধারেকাছেও কেউ পৌঁছাতে পারল না।
তারপর এল সেই ভয়ংকর রাত, সাত গোল। একটি পরাজয় নয়, একটি প্রজন্মের স্মৃতিতে গেঁথে থাকা ক্ষত। আজও অনেক ব্রাজিল সমর্থক ওই রাতের কথা মনে করলে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। নেইমার এসেছিলেন নতুন আশার প্রতীক হয়ে। কিন্তু পেলে কিংবা রোনালদোর উত্তরসূরি হওয়ার যে বিশাল ভার, সেটি হয়তো তার কাঁধে খুব বেশি ভারী হয়ে গিয়েছিল।
কয়েকদিন আগে এক পুরনো ব্রাজিলভক্ত বন্ধুর ফেইসবুক পোস্ট দেখলাম। সে লিখেছে, ‘আমি ম্যারাডোনা, আমি আর্জেন্টিনা, আমি মেসি।’ তারপর নিচে লিখেছে, ‘সরি বাবা, তোমার পক্ষ ধরে থাকতে পারলাম না।’ অনেকেই তাকে ‘গুপ্ত সমর্থক’ বলে গাল দিয়েছে। কিন্তু আমি হাসলাম। কারণ বয়স বাড়লে মানুষ দল নয়, গল্প ভালোবাসতে শেখে। নাম নয়, যাত্রা ভালোবাসতে শেখে।
ঠিক যেমন উইম্বলডনের সেই ফাইনালে ফেদেরারের জন্য বুক কেঁপেছিল। নাদালের বিষাক্ত ফোরহ্যান্ডের সামনে ফেদেরার লড়াই করে যাচ্ছেন। মনে হয়েছিল, তিনি ফিরবেন। কিন্তু সব ম্যাচ থেকে ফিরে আসা যায় না। সব গল্পের সমাপ্তি নিজের মতো করে লেখা যায় না।
এই জায়গাটায় এসে বাবার কথা মনে পড়ে। মৃত্যুর আগে বাবা খুব কষ্ট পাচ্ছিলেন। আমরা কপালে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলাম, হাতপাখা দিয়ে বাতাস করছিলাম। মনে হয়েছিল, আর একটু পরেই হয়তো সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু বাবা জানতেন। তিনি জানতেন, দৌড় কোথায় থেমে যায়। ফুটবলের মতো জীবনেও একসময় বাঁশি বাজে। নব্বই মিনিটের বেশি খেলার সুযোগ সবাই পায় না।
২০১৪ বিশ্বকাপে আমার এক আর্জেন্টিনাভক্ত বন্ধু সারাক্ষণ বলত, ‘মেসি কাপ ধরবে।’ নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে সেমিফাইনাল চলছিল আর চলছিল। আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। হঠাৎ ফোন। বন্ধু চিৎকার করছে, ‘উঠ! মেসি ফাইনালে!’ কিন্তু শেষ পর্যন্ত মারিও গোটজে। একটি গোল। একটি স্বপ্নভঙ্গ। আরেকটি দীর্ঘশ্বাস। এরপর ২০১৮। তখন মনে হয়েছিল, মেসির বিশ্বকাপ জয় হয়তো দূরাগত মাদলের শব্দের মতো—শোনা যায়, কিন্তু ধরা যায় না।
তারপর এল ২০২২। আমি একা খেলা দেখছিলাম। ফ্রান্সের সমর্থক হিসেবে মনে হয়েছিল, জয় শুধু সময়ের অপেক্ষা। এমবাপ্পে যেন বিদ্যুৎগতির এক চিতা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কাপ উঠল মেসির হাতে। আশ্চর্যের বিষয়, আমার খারাপ লাগেনি। কারণ মেসি কেবল একজন খেলোয়াড় নন। তিনি অপেক্ষার নাম। ধৈর্যের নাম। বারবার ব্যর্থ হয়েও আবার উঠে দাঁড়ানোর নাম। যারা কেবল খেলোয়াড় নন, তার চেয়েও বেশি কিছু।
প্রতি চার বছর পর পৃথিবীতে এক অদ্ভুত সময় আসে। নিজের দেশ নয়, অন্য দেশের জন্য মানুষ কাঁদে, চিৎকার করে, প্রার্থনা করে, পতাকা ওড়ায়। কিন্তু কেউ তাকে দেশদ্রোহী বলে না। আমার এক বন্ধু একদিন বলেছিল, ‘বাংলাদেশ বিশ্বকাপ খেললেও আমি ব্রাজিল।’ তখন হেসেছিলাম। আজ আর হাসি না। কারণ বুঝি, ফুটবল আসলে দেশের নয়, স্বপ্নের খেলা। জার্সির রং আলাদা হতে পারে, কিন্তু স্বপ্নের রং প্রায় একই।
আজ এমবাপ্পে আছে, হালান্ড আছে, ইয়ামাল আসছে। নতুন নক্ষত্র উঠছে আকাশে। রোনালদো এখনও লড়ছেন। মেসিও আছেন। কিন্তু সময় কারও জন্য অপেক্ষা করে না। আমার বাবা যেমন নেই, একদিন মেসিও থাকবেন না। রোনালদোও না। আমরাও না।
তবু খেলা থাকবে। নতুন কোনো শিশু প্রথম বিশ্বকাপ দেখবে। নতুন কোনো মেসি জন্ম নেবে, নতুন কোনো ম্যারাডোনা, নতুন কোনো সক্রেটিস। তাই আপনার জার্সির রং যদি আমার চেয়ে আলাদা হয়, তবুও আপনার সঙ্গে আমার কোনো বৈরিতা নেই। কারণ শেষ পর্যন্ত আমরা সবাই একই দলের সমর্থক। আমরা স্বপ্নের সমর্থক। আমরা বিস্ময়ের সমর্থক। আমরা ওই আনন্দের সমর্থক, যা চার বছর পরপর এসে আমাদের ক্লান্ত জীবনের ধূসর দেওয়ালে একটু রং ছিটিয়ে দেয়।
বেঁচে থাক ফুটবল। বেঁচে থাক আমাদের নায়করা। আর বেঁচে থাক ওই শিশুসুলভ বিশ্বাস—পরের বিশ্বকাপে হয়তো আবার নতুন কোনো গল্প জন্ম নেবে।
চিররঞ্জন সরকার লেখক ও কলামনিস্ট। ই-মেইল: [email protected]