Published : 23 Jun 2026, 06:25 PM
একসময় কর্মজীবনে সফল হওয়া মানেই ছিল পরিশ্রম, দীর্ঘ কর্ম ঘণ্টা, পদোন্নতির দৌড় এবং নিজের যোগ্যতা প্রতিনিয়ত প্রমাণ করে চলা।
বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে এই চাপ ছিল আরও বেশি। কর্মক্ষেত্রে নিজের অবস্থান তৈরি করতে গিয়ে অনেকেই মানসিক চাপ, ক্লান্তি এবং ব্যক্তিগত জীবনের সঙ্গে ভারসাম্য হারানোর অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েও যেতে বাধ্য হন।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে সেই ধারণায় অনেকটাই পরিবর্তন এসেছে। এখন অনেকেই সাফল্যকে শুধু পদ বা আয়ের মাধ্যমে নয় বরং মানসিক শান্তি, ব্যক্তিগত সময় এবং সুস্থ জীবনযাপনের দৃষ্টি থেকেও মূল্যায়ন করছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কর্মজীবনে এই পরিবর্তন কোনো সাময়িক প্রবণতা নয়। বরং এটি মানুষের জীবনবোধ, মানসিক স্বাস্থ্য এবং আত্মসম্মান নিয়ে নতুন করে ভাবারও অধ্যায়।
সাফল্যের জন্য নিজেকে হারিয়ে ফেলা কি প্রয়োজন?
মার্কিন লেখক এবং কর্মক্ষেত্রে লিঙ্গবিষয়ক বিশেষজ্ঞ জেসিকা ডয়েল মেকেস রিয়েলসিম্পল ডটকম’য়ে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলেন, “কর্মজীবনে একটি ধারণা প্রচলিত- যত বেশি পরিশ্রম, তত বেশি সাফল্য। সেই কারণে অনেক কর্মী, বিশেষ করে নারীরা, নিজেদের দায়িত্বের বাইরে গিয়েও কাজ করেন। অতিরিক্ত দায়িত্ব নেওয়া, অফিস শেষে কাজ চালিয়ে যাওয়া কিংবা অন্যায্য আচরণও নীরবে মেনে নেওয়া কর্মজীবনের অংশ মনে করেন কর্মীরা।”
“আবার কর্মক্ষেত্রে প্রতিবাদ করলে সুযোগ হারাতে হবে সেই চাপও রয়েছে। তাই নিজের প্রয়োজনের চেয়ে প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। তবে অল্প হলেও এমন চিন্তাভাবনার বাইরেও অনেকে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন”, বলেন তিনি।
মানসিক শান্তিও সাফল্যের অংশ
জেসিকা বলেন, “কর্মক্ষেত্রে নিজেকে প্রমাণ করার চাপ থেকে বেরিয়ে, অবিরাম প্রতিযোগিতার বদলে অনেক নারী শান্তিপূর্ণ জীবনকেই বেশি গুরুত্ব দেন।”
তার মতে, “এখনকার প্রজন্ম প্রয়োজন হলে স্পষ্টভাবে ‘না’ বলতে পারেন। আবার অন্যায্য দায়িত্ব বা অযৌক্তিক প্রত্যাশা মেনে নেওয়ার পরিবর্তে নিজের সীমারেখা নির্ধারণ করাও জরুরি। কারণ এটি কর্মজীবনে আত্মসম্মান রক্ষার গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন।”
তিনি আরও বলেন, “তবে নারীরা উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছেড়ে দিচ্ছেন না। বরং তারা নিজেদের শর্তে সাফল্যের নতুন সংজ্ঞা তৈরি করছেন।”
কর্মজীবনে সীমারেখা নির্ধারণ যে কারণে জরুরি
এই বিশেষজ্ঞের মতে, “ভালো কর্মী হওয়ার অর্থ, সব কাজের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেওয়া নয়। বরং নিজের দায়িত্ব সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা রাখা এবং প্রয়োজন হলে অতিরিক্ত চাপের বিষয়ে কথা বলা জরুরি।”
আগে অনেকেই মনে করতেন, সব অনুরোধ মেনে চলাই পেশাদারিত্বের পরিচয়।
তবে কর্মক্ষেত্রে সীমারেখা নির্ধারণকে সুস্থ কর্মসংস্কৃতির অংশ। ফলে কর্মীরা কম মানসিক চাপে থাকেন এবং দীর্ঘমেয়াদে আরও ভালোভাবে কাজের আগ্রহ পান।
কাজের বাইরে নিজের পরিচয়ও
নিজের পরিচয়কে পুরোপুরি পেশার সঙ্গে যুক্ত করে দেখা, কে কত বড় প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন বা কত উচ্চ পদে আছেন- সমাজে এটিকেই সাফল্যের মানদণ্ড হিসেবে দেখা হয়।
তবে পরিবার, বন্ধু, শখ, ভ্রমণ, সৃজনশীলতা কিংবা নিজের জন্য সময় বের করাও জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই একজনের পরিচয় শুধু তার পেশা দিয়ে নির্ধারিত হয় না।
ব্যক্তিগত জীবন, মূল্যবোধ এবং মানসিক সুস্থতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
পরিবর্তন কি স্থায়ী হবে?
সাইপ্রাসের ক্লিনিক্যাল মনোবিজ্ঞানী ডা. এলেনি নিকোলাউ বলেন, “দৃষ্টিভঙ্গি সময়ের সঙ্গে বদলাতে থাকে। কখনও মানুষ বেশি প্রতিযোগিতামুখী হয়, আবার কখনও ব্যক্তিগত শান্তিকে বেশি গুরুত্ব দেয়।”
তিনি আরও বলেন, “শান্ত ও ভারসাম্যপূর্ণ জীবনযাপনের প্রতি আগ্রহও সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে। কারণ সমাজের চিন্তাভাবনা সব সময় একই জায়গায় স্থির থাকে না। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট যে, সাফল্যের একটিমাত্র সংজ্ঞা নেই।”
উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও শান্তি কি একসঙ্গে সম্ভব?
অনেকের ধারণা, উচ্চাকাঙ্ক্ষী হলে শান্ত জীবন সম্ভব নয়। আবার শান্ত জীবন বেছে নিলে, কর্মজীবনে বড় সাফল্য পাওয়া যায় না।
তবে ডা. নিকোলাউ বলেন, “লক্ষ্য অর্জনের জন্য পরিশ্রম করে, একই সঙ্গে নিজের মানসিক সুস্থতা, পরিবার এবং ব্যক্তিগত সময়কেও গুরুত্ব দেওয়া সম্ভব। এই ভারসাম্যই দীর্ঘমেয়াদে সাফল্য ধরে রাখতে সহায়তা করে।”
আরও পড়ুন