Published : 25 Jun 2026, 11:33 PM
রাজনীতিবিদদের কাজ এখন শুধু নীতি প্রণয়ন আর ভাষণ দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। আধুনিক রাজনীতিতে কী করা হলো, তার চেয়ে কীভাবে সেটি মানুষের সামনে তুলে ধরা হলো–তা কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। ডিজিটাল যুগে একটি ছবি অথবা কয়েক সেকেন্ডের একটি ভিডিও ক্লিপ অনেক সময় দীর্ঘ বক্তৃতার চেয়েও বেশি বার্তা বহন করে। ইতিহাসে হয়তো লেখা থাকবে কোন বৈঠকে কী সিদ্ধান্ত হয়েছে, কোন সফরে কোন কোন চুক্তিতে কার কার স্বাক্ষর পড়েছে। কিন্তু সেই মুহূর্তের অনুভূতি, সেই সফরের রেশ নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে যে রেখা আঁকা থাকে, সেটি নির্মিত হয় ছবিতে, ভিডিওতে, শব্দে ও আলোছায়ার বুননে। এই বাস্তবতা বিশ্বের প্রায় সব বড় রাষ্ট্র এখন মেনে নিয়েছে।
আমরা এমন এক সময়ে বাস করি, যেখানে একটি সফল রাষ্ট্রীয় সফর কেবল কূটনৈতিক টেবিলে সম্পন্ন হয় না। সেই সফর সম্পূর্ণ হয় যখন কোটি মানুষের স্মার্টফোনের পর্দায় সেই মুহূর্তগুলো জীবন্ত হয়ে ওঠে। ফলে রাষ্ট্রীয় যোগাযোগ এখন শুধু তথ্য সরবরাহে সীমাবদ্ধ নয়, এটি রীতিমতন একটি শিল্পমাধ্যম এবং প্রচার কৌশলও বটে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বোঝাপড়া অনেক রাজনীতিবিদের চেয়ে বেশি। দীর্ঘ প্রবাসজীবনে দেশের মূলধারার সংবাদমাধ্যমে তার বক্তব্য প্রচারে আদালতের নিষেধাজ্ঞা ছিল, তখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমই ছিল তার একমাত্র ভরসা। পরিস্থিতি তারেক রহমানকে বাধ্য করেছিল বটে, কিন্তু সেই বাধ্যবাধকতা তাকে ডিজিটাল রাজনীতিতে এমন এক বিশেষ দক্ষতা এনে দিয়েছে, যা অন্য অনেক প্রতিষ্ঠিত নেতার নেই।
ফেইসবুক, ইউটিউবসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে তার দলের তৈরি কনটেন্টে পরিকল্পনা ও উপস্থাপনায় সেই ছাপ ছিল স্পষ্ট। আবেগ, সুনির্দিষ্ট বার্তা এবং দলীয় সমর্থকদের সঙ্গে আত্মিক টান মিলিয়ে তৈরি হয়েছিল শক্তিশালী ডিজিটাল পরিচিতি। দীর্ঘ অনুপস্থিতিতেও তার রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা টিকে ছিল মূলত এই ডিজিটাল উপস্থিতির জোরেই। সেই কারণেই অনেকে তাকে ডিজিটাল যোগাযোগে দক্ষ নেতা হিসেবে আলাদা মর্যাদা দেওয়া হয়।
একজন নতুন রাষ্ট্রপ্রধানের প্রথম বিদেশ সফর কূটনৈতিকভাবে সব সময়ই বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ, যা কেবল একটি ভ্রমণ নয়, যার মাধ্যমে সরকারের অগ্রাধিকার, পররাষ্ট্রনীতির দিকনির্দেশনা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বার্তা রচিত হয়।
প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফর ছিল তেমনই একটি উপলক্ষ। প্রবাসী বাংলাদেশিদের একটি বড় অংশের কর্মস্থল মালয়েশিয়া, দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশের শ্রমবাজার ও বিনিয়োগ সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। ফলে এই সফরের দ্বিপক্ষীয় ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব ছিল অনস্বীকার্য। কিন্তু একটি সফর প্রায়ই তার ফলাফলের চেয়ে অনেক সময় বেশি মনে থাকে তার উপস্থাপনার জন্য, যদি সেই উপস্থাপনা সঠিকভাবে হয়।
সফর চলাকালে প্রধানমন্ত্রীর অফিসিয়াল ফেইসবুক পেইজে যা প্রকাশিত হয়েছে, তা নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে যে আলোচনা শুরু হয়েছে, তার বড় অংশই উপস্থাপনার মান নিয়ে।
মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে সফর উপলক্ষে যে কনটেন্ট প্রকাশিত হয়েছে, তাতে গল্প বলার স্পষ্ট চেষ্টা ছিল। দৃশ্য নির্বাচন, সম্পাদনা, আবহসঙ্গীত, সবকিছু মিলিয়ে সফরটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ অ্যাখ্যানে রূপ দেওয়া হয়েছে। বাংলা গান ব্যবহার করে তৈরি একটি ভিডিও ব্যাপক প্রশংসা পেয়েছে সামাজিক মাধ্যমে। সেখানে শুধু ঘটনা রেকর্ড করা হয়নি, দুই দেশের সম্পর্কের একটি উষ্ণ ছবি আঁকার চেষ্টা ছিল। দর্শক শুধু তথ্য পাননি, একটি অনুভূতির অংশ হয়েছেন।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে প্রচারিত অনেক কনটেন্টে সেই প্রস্তুতির ছাপ ছিল না। কিছু ছবিতে ফ্রেম ও অ্যাঙ্গেল নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত ঠিকমতো ধরা পড়েনি। একটি ছবিতে প্রধানমন্ত্রীর উপস্থাপনা নিয়ে এমন আলোচনা হয়েছে, যা এড়ানো যেত।
এখানে প্রশ্নটি ব্যক্তিকে নিয়ে নয়, প্রশ্নটি প্রেসটিমের নীতিগত সিদ্ধান্তের। ছবিগুলো প্রকাশের আগে কি যথেষ্ট বাছাই হয়েছিল? কোন ছবি প্রকাশ পাবে আর কোনটি পাবে না–এই সিদ্ধান্ত কি প্রয়োজনীয় গুরুত্ব পেয়েছিল? প্রকাশের আগে কি কোনো দক্ষ চোখ পরীক্ষা করেছে? রাষ্ট্রীয় যোগাযোগে এই বিবেচনাটুকু অপরিহার্য, কারণ একটি রুচিশীল ছবি ব্যক্তি ও রাষ্ট্র উভয়ের সম্মানই বাড়ায়। একটি অপ্রস্তুত ছবি উল্টোটা করে।
ভলোদিমির জেলেনস্কি যুদ্ধের মাঝেও প্রতিদিন ভিডিও বার্তা দেন; কখনো রণক্ষেত্রের পটভূমিতে, কখনো কিইভের অন্ধকার রাস্তায়। সেই ভিডিওগুলো কেবল নিজের জনগণের জন্য নয়, সমগ্র বিশ্বের জন্য। এমানুয়েল মাক্রোঁর দলে পেশাদার ফটোগ্রাফার, ভিডিওগ্রাফার ও সোশ্যাল মিডিয়া এক্সপার্ট আছেন, যারা রাষ্ট্রীয় মুহূর্তগুলোকে যত্নের সঙ্গে ফ্রেমবন্দি করেন। নরেন্দ্র মোদীর বিদেশ সফরের প্রতিটি মুহূর্ত পরিকল্পিতভাবে উপস্থাপিত হয়, বৈঠকের ছবি থেকে শুরু করে প্রবাসী ভারতীয়দের সভায় তার প্রবেশ–সবই একটি সুসংহত বর্ণনার অংশ।
বাংলাদেশও এ বাস্তবতার বাইরে নেই। বরং বলা যায়, বাংলাদেশের মতো একটি দেশের জন্য ডিজিটাল কূটনীতি আরও বেশি জরুরি। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস টিমে যারা কাজ করছেন, তারা তারেক রহমানের রাজনৈতিক যাত্রার সঙ্গে পরিচিত। দলীয় সংগঠনের ভাষা, রাজনৈতিক প্রতীকের অর্থ এবং সমর্থকদের প্রত্যাশা তারা খুব ভালোভাবে বোঝেন। কিন্তু দলীয় রাজনীতির যোগাযোগ এবং রাষ্ট্রীয় কূটনৈতিক যোগাযোগ দুটি আলাদা বিষয়।
দলীয় কনটেন্টের লক্ষ্য থাকে কর্মীদের উজ্জীবিত রাখা, প্রতিপক্ষের সমালোচনার জবাব দেওয়া এবং নিজের ভোটারদের কাছে পৌঁছানো। রাষ্ট্রীয় কূটনৈতিক কনটেন্টের লক্ষ্য থাকে বহুমাত্রিক–দেশের ভেতরে মানুষকে আশ্বস্ত করা, বিদেশে অংশীদারদের আগ্রহী করা, আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে ইতিবাচক উপস্থিতি তৈরি করা এবং ভবিষ্যতের জন্য একটি নথি রেখে যাওয়া।
এই পার্থক্যটি শুধু লক্ষ্যের নয়, দক্ষতারও। আধুনিক রাষ্ট্রীয় যোগাযোগের জন্য প্রয়োজন প্রশিক্ষিত ফটোসাংবাদিক, চলচ্চিত্রনির্মাতা, সম্পাদক এবং সোশ্যাল মিডিয়া এক্সপার্ট, যারা শুধু ক্যামেরা চালান না, গল্প বলতে জানেন। এজন্য প্রয়োজনে নতুন ও দক্ষ কনটেন্ট নির্মাতাদের দলে যুক্ত করা যেতে পারে, সেটা পেশাদারত্বের খাতিরেই।
মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর দল বাংলা গান বেছে নিয়েছিল তাদের ভিডিওর জন্য, এটি কেবল একটি সৌজন্য ছিল না, এটি ছিল একটি রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বার্তা। বাংলাদেশের মানুষ সেই ভিডিওটি দেখে আপ্লুত হয়েছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করেছেন। এটিই ডিজিটাল কূটনীতির শক্তি, যা আনুষ্ঠানিক চুক্তির চেয়ে অনেক বেশি মানুষের কাছে পৌঁছায় এবং দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব রাখে।
বাংলাদেশের পক্ষে প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফরকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যথাযথভাবে উপস্থাপন করতে না পারা নিয়ে যে সমালোচনা হয়েছে, তা রাজনৈতিক বিরোধিতার চোখে দেখলে ভুল হবে। কারণ এর বড় অংশই এসেছে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে, যারা দেশের প্রধানমন্ত্রীকে আরও মর্যাদার সঙ্গে উপস্থাপিত হতে দেখতে চান। এই সমালোচনার ভেতরে একটি প্রত্যাশা আছে, আমরা চাই আমাদের দেশ ও আমাদের নেতার ছবি যেন গর্বের সঙ্গে উপস্থাপিত হয়।
তাই এ সমালোচনাগুলোকে বিরোধিতা হিসেবে নয়, উন্নতির রসদ হিসেবে নেওয়াই হবে বুদ্ধিমানের কাজ। ভবিষ্যতের যে কোনো সফরের জন্য তো বটেই, দেশের প্রতিটি রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম উপস্থাপনের জন্য একটি পেশাদার, প্রশিক্ষিত ও দূরদর্শী ডিজিটাল যোগাযোগ দল গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। তাহলেই মালয়েশিয়া সফরের গল্পটা অন্য রকম হতে পারত। ভালো ক্যামেরা থাকলেই ভালো কনটেন্ট তৈরি হয় না, কোন ফ্রেমটি কথা বলছে, কোন দৃশ্যটি জনমনে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে, তা বুঝতে পারার মতো দূরদর্শী চোখ ক্যামেরার পেছনে থাকতে হয়।