Published : 24 Jul 2026, 01:58 PM
কলি রায় (ছদ্মনাম) পেশায় একজন চিকিৎসক। ২০০৮ সালে দেশের এক খ্যাতিমান মেডিকেল কলেজ থেকে ডাক্তারি পাস করে চিকিৎসা পেশায় যোগ দেন। পেশায় চিকিৎসক এবং সুদর্শনা হওয়ায় ২০০৯ সালে এক উচ্চশিক্ষিত ও সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তানের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। সুজন শুভ্র (ছদ্মনাম) পেশায় একজন শিক্ষক। যেনতেন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক নন; দেশের অন্যতম সেরা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। এককথায়, স্বামী-স্ত্রী হলেন সোনায় সোহাগা; ধরে নেওয়া যায় একে অন্যের জন্য তৈরি।
বিয়ের কিছুদিন পরে মেয়েটি চলে গেলেন স্বামীর উচ্চশিক্ষা লাভের স্থানে, অর্থাৎ প্রবাসে। ছেলেটি সেখানে পিএইচডি করছিলেন। যা হোক, অল্প কিছুদিনের মধ্যেই ছেলেটির মোহভঙ্গ ঘটে। তিনি সদ্যবিবাহিতা বউকে বিদেশ-বিভুঁইয়ে অনিরাপদ অবস্থায় রেখে পরিবারের কাছে ফিরে আসেন এবং ঘোষণা দেন আর বিদেশে ফিরে যাবেন না। একপর্যায়ে কলি তার বাবার সাহায্য নিয়ে বিমানের টিকিট সংগ্রহ করে দেশে ফিরে আসেন। দেশে এসে কলি তার স্বামীর সঙ্গে যোগাযোগ করলে স্বামী তার সঙ্গে সংসার করবেন না বলে জানিয়ে দেন। একসময় প্রতিকারের আশায় কলি স্বামীর বিরুদ্ধে পরপর দুটি মামলা করেন। মামলা তুলে নিলে স্বামী সংসার করবেন বলে আশ্বাস দেন। এরপর কলি সংসার করার আশায় মামলা তুলে নেন। কিন্তু যে আশঙ্কা ছিল, তা-ই বাস্তব হলো। স্বামী হওয়ার একচ্ছত্র আধিপত্যের বোধ থেকে তিনি জানিয়ে দিলেন—তিনি সংসারও করবেন না, বিচ্ছেদেও যাবেন না। ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এই টানাহেঁচড়া চলতে থাকল। এই গল্পে কলি আর সুজনের ১৫ বছরের বিবাহিত জীবনে হয়তো কিছু সুখস্মৃতি আছে, কিন্তু সম্পর্কের তিক্ততায় সেই স্মৃতি আর মনের কোথাও অবশিষ্ট ছিল না। না, তাদের কোনো সন্তানও হয়নি। ১৫ বছরের বিবাহিত জীবনে কলি স্বামীর কাছ থেকে খুব একটা ভরণপোষণও পাননি। সব মিলিয়ে তাদের জীবন অসহনীয় হয়ে উঠেছিল।
এরই মধ্যে কলির বাবা মারা যান। কলি এবার অভিভাবকহীন হয়ে পড়েন। কলি তার বৃদ্ধা মাকে নিয়ে একাই বসবাস করতে লাগলেন। কলির তো আর বয়স থেমে নেই; তার প্রয়োজন একটা নির্ভরতার হাত, একটা শান্তির জায়গা। সে তো প্রতিষ্ঠিত একজন নারী; না, তার ভরণপোষণের প্রয়োজন নেই। তার প্রয়োজন একটু ভালোবাসা এবং নির্ভরতার আশ্রয়। সে এই ১৫ বছরের বিয়ে নামক গ্যাঁড়াকল থেকে এখন মুক্ত হতে চান।
এই গল্পে কে দোষী আর কে নির্দোষ, সেটা বড় কথা নয়; আসল কথা হচ্ছে—প্রাসঙ্গিক কলি মুক্তি চাইছেন। কিছুদিন আগেও তিনি সংসার করতে চেয়েছিলেন, সংসার ভাঙার সাহস তার ছিল না। কিন্তু সম্পর্কটি চরম তিক্ততার পর্যায়ে যাওয়ায় কলি এখন শুধু মুক্তি চান।
কিন্তু, কোথায় মুক্তি? এই ১৫ বছরের তিক্ততার গল্প শেষ করতে কলি অনেক জোড়া চপ্পল ক্ষয় করলেও এই অক্ষয় গ্যাঁড়াকল আর ক্ষয় হচ্ছে না। এ গল্পটি শুধু বাংলাদেশে বসবাসরত একজন হিন্দু নারীর গল্প নয়; এমন অনেক নারী অন্দরে গুমরে কাঁদেন। বাংলাদেশে বসবাসরত প্রত্যেক হিন্দু নারী এবং পুরুষ তাদের ব্যক্তিগত আইন (Personal Law) দ্বারা পরিচালিত। এক্ষেত্রে দুই ধরনের মতবাদ প্রচলিত থাকলেও বাংলাদেশের হিন্দুদের জন্য ‘দায়ভাগা’ মতবাদ প্রযোজ্য।
হিন্দু বিবাহিত নারীর পৃথক বসবাস এবং ভরণপোষণ অধিকার আইন-১৯৪৬ অনুসারে একজন হিন্দু নারী কিছু শর্ত সাপেক্ষে পৃথক বসবাস এবং ভরণপোষণ দাবি করে সংশ্লিষ্ট আদালতে মামলা করতে পারেন। কিন্তু এই আইনের কোথাও বিচ্ছেদ সংক্রান্ত সুস্পষ্ট কোনো বিধানের উল্লেখ নেই। অর্থাৎ, আইন একজন বিবাহিত হিন্দু নারীকে বিশেষ অবস্থায় পৃথক বসবাসের অধিকার দিলেও একেবারে বিচ্ছিন্ন হওয়ার অধিকার দেয়নি।
উল্লেখ্য যে, ২০১২ সালে বাংলাদেশে হিন্দু বিয়ে সংক্রান্ত একমাত্র আইন (ঐচ্ছিক আইন) হিন্দু বিবাহ নিবন্ধন আইন প্রণীত হয়। তবে ঐচ্ছিক হওয়ার কারণে এ আইনের বাস্তবিক প্রয়োগ অনেকটাই সীমিত।
আইন বিবাহ বিচ্ছেদের অধিকার না দিলেও বাস্তব পরিস্থিতি যখন একেবারেই প্রতিকূলে চলে যায় তখন মানুষ যেকোনভাবে মুক্তির পথ খুঁজে। আর এভাবেই কখনও পারস্পরিক সম্মতির মাধ্যমে দুজনে বিবাহ বিচ্ছেদের ঘোষণা দেয়। যা পরবর্তীতে আইনি সুরক্ষার একটা গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে উভয়ের জীবনে কাজ করে। কেউ পরে চাইলেও আর কোনো ধরনের অযাচিত হস্তক্ষেপ অন্যের জীবনে করতে পারে না।
আর একটা মাধ্যম হচ্ছে জুডিশিয়াল সেপারেশন। উল্লিখিত ১৯৪৬ সালের আইনের মাধ্যমে কিছু নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে একজন হিন্দু নারী স্বামীর কাছ থেকে পৃথক বসবাস বা ভরণপোষণের অধিকার দাবি করতে পারে। তবে এক্ষেত্রে কেউ যদি পুনরায় বিয়ে করে, তাহলে স্বামীর ভিন্ন উদ্দেশ্য থাকলে সে চাইলে অযাচিত জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। আর এই জটিলতা এড়াতেই চিকিৎসক কলি বারবার তার পতি দেবতার কাছে মিউচুয়াল ডিভোর্স চেয়েছিল। যা কলির স্বামী দিতে নারাজ ছিলেন। আবার সংসার করতেও তার সদিচ্ছার অভাব ছিল। মোট কথা, ঝুলিয়ে রাখাই তার মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল। এই ধরনের জটিল পরিস্থিতিতে একজন হিন্দু নারী কতটা অসহায় তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
বিচ্ছেদ কোন সুখকর বিষয় নয়। কেউ সাজানো সংসার সহজে ভাঙতে চায় না। কিন্তু পরিস্থিতি যখন একেবারেই প্রতিকূলে চলে যায়, তখন বিচ্ছেদই মঙ্গল। যদিও এই সমাজে একজন বিচ্ছেদপ্রাপ্ত নারীর সামাজিক অবস্থান খুব একটা সম্মানজনক বা সুখকর নয়।
একটা সম্পর্ক যখন বিচ্ছেদের মধ্যে মুক্তি খুঁজে পায় না, তখন পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করে। এর ফলে একজন নারী পুনরায় বিয়ের অধিকার থেকে বঞ্চিত হন। অথচ একজন হিন্দু স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করলেও বিধিবদ্ধ আইনের অভাবে একজন হিন্দু স্ত্রী শুধুমাত্র পৃথক বসবাস এবং ভরণপোষণের অধিকার দাবি করতে পারেন। এর নেতিবাচক প্রভাব স্বামী, স্ত্রী হয়ে সন্তান পর্যন্ত গড়ায়।
হিন্দু আইন মূলত অনেকটা প্রথাগত ধারণার ওপর প্রতিষ্ঠিত। হিন্দু আইনে বিয়ে একটা ধর্মীয় আচার (religious sacrament) যা একটা পবিত্র এবং অবিচ্ছেদ্য বন্ধন। মন্ত্রপাঠ এবং ধর্মীয় আচার পালনের মাধ্যমে হিন্দু বিয়ে সম্পন্ন হয়। এটি কোন চুক্তি নয়। অর্থাৎ ধরে নেওয়া হয় এটি সাত জন্মের একটা পবিত্র বন্ধন, যা দায়ভাগা মতবাত মতে, অনেকটাই ইহলৌকিক এবং পারলৌকিক উদ্দেশ্য সাধনের জন্য প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু মজার বিষয় হচ্ছে এজন্মেই যদি বিয়ে সুখের না হয়, তবে পরবর্তী প্রজন্মের ওপর কী প্রভাব পড়তে পারে, সে কথা বলাই বাহুল্য। অর্থাৎ বিধিবদ্ধ আইনের অভাবে এদেশে বহু হিন্দু নারী বিয়ে নামক একটা ভয়ঙ্কর যাঁতাকলে দলিত, মথিত ও নিষ্পেষিত হচ্ছে।
হিন্দু বিবাহ সংক্রান্ত উচ্চ আদালতের সিদ্ধান্তসমূহ:
Ø ২০২৩ সালে আইনগত অধিকার নিশ্চিত করতে নয়টি মানবাধিকার ও আইন সহায়তা প্রদানকারী সংস্থা হিন্দু নারীদের আইনগত অধিকার নিশ্চিত করতে এবং হিন্দু বিবাহ আইনের অসঙ্গতি দূরীকরণে একটি নীতিমালা প্রণয়নের নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করে (রিট পিটিশন- 5256/2023)। ২০২৩ সালের ১৪ মে হিন্দু নারীদের বিবাহ বিচ্ছেদ, বিয়ে নিবন্ধন, অভিভাবকত্ব ও পৈতৃক সম্পত্তিতে উত্তরাধিকার প্রদানে কর্তৃপক্ষের নিষ্ক্রিয়তাকে কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না—তা জানতে চেয়ে হাই কোর্ট থেকে রুল জারি করা হয়।
Ø অর্পিতা দাস এবং অন্য বনাম বাংলাদেশ বনাম অন্যান্য (রিট পিটিশন – ৫১১/২০১৫)- অর্পিতার সঙ্গে অর্ণবের হিন্দু রীতি মতে বিয়ে হলেও স্বামী কর্তৃক যৌতুকের দাবিতে নির্যাতনের একপর্যায়ে বিচ্ছেদের জন্য অর্পিতা অন্য একটি সংগঠনের সহায়তায় উল্লিখিত রিট দায়ের করলেও হাই কোর্ট বিভাগ হিন্দু বিবাহ বিচ্ছেদ সংক্রান্ত কোন আলোচনায় না গিয়ে মামলাটি সংক্ষেপে নিষ্পত্তি করে দেয়।
উপমহাদেশে এ সংক্রান্ত আইনের ব্যবহার
ভারতে, হিন্দু বিবাহ আইন: ১৯৫৫-এর মাধ্যমে হিন্দু নারীরা আইনগতভাবে ডিভোর্সের অধিকার লাভ করেছেন। নেপালে, দেওয়ানি আইন-২০৭৪ (২০১৭)-এর অধীনে হিন্দু নারীদের ডিভোর্সের আইনগত অধিকার রয়েছে এবং এই আইন সকল ধর্মের জন্য সমভাবে প্রযোজ্য।
শ্রীলঙ্কায়, ম্যারেজ রেজিস্ট্রেশন অধ্যাদেশ এবং দেওয়ানি আইন অনুসারে হিন্দু নারীদের ডিভোর্স দেওয়ার আইনগত অধিকার রয়েছে এবং এই আইনও সকল ধর্মের জন্য সমভাবে প্রযোজ্য।
নারী অধিকার আলাদা কোনো বিষয় নয়; এটি মানবাধিকারের অংশ। নারীর ক্ষমতায়নে বাংলাদেশ বিশ্বে রোল মডেল হলেও শুধুমাত্র বিধিবদ্ধ আইনের অভাবে হিন্দু নারীরা চরম বৈষম্যের শিকার। যে কারণে বিয়ের ক্ষেত্রে তাদের মানবাধিকার সুরক্ষিত নয়। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান, মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্র, নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপ সনদে নারীর সম অধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়ার দীর্ঘ সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পরেও বাংলাদেশের হিন্দু নারীরা ধর্মীয় সংস্কারের বেড়াজালে বিয়ে নামক যাঁতাকলে পিষ্ট।
স্বাধীনতার পর ২০১২ সালে হিন্দু বিবাহ নিবন্ধন আইন প্রণয়ন করা হলেও একটি পূর্ণাঙ্গ এবং বিধিবদ্ধ হিন্দু বিবাহ আইন প্রণয়নে রাষ্ট্র কর্তৃক তেমন কোন উদ্যোগ পরিলক্ষিত হয়নি। অথচ, হিন্দু অধ্যুষিত এবং হিন্দু রাষ্ট্র হয়েও পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রগুলোতে ঠিকই বিধিবদ্ধ আইন রয়েছে। কেন হয়নি? কোথায় প্রতিবন্ধকতা? কেন ২০১২ সালের হিন্দু বিবাহ নিবন্ধন আইনটিকে ঐচ্ছিক রাখা হলো? আশা করি মৌলিক মানবাধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে একটি পূর্ণাঙ্গ এবং বিধিবদ্ধ হিন্দু বিবাহ আইন প্রণয়নে রাষ্ট্র সচেষ্ট হবে। যার মধ্য দিয়ে নারীর জীবন, আত্মমর্যাদা ও ব্যক্তি স্বাধীনতা সুরক্ষিত হবে ।
সুস্মিতা পাইক উপপরিচালক, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন। ই-মেইল: [email protected]