Published : 23 Jul 2026, 10:39 AM
গত সপ্তাহে আবারও যখন পাকিস্তানের বেলুচিস্তানের স্বাধীনতার দাবিতে চলমান আন্দোলন বিশ্বজুড়ে নতুন করে আলোচনায় উঠে আসে, তখন আমি ব্রাসেলস থেকে নাইরোবি যাওয়ার পথে ছিলাম।
ব্রাসেলস এয়ারপোর্টে বসে ও রকম কয়েকটা ভিডিও দেখছিলাম আমি। নেটে ঢুকে মাহরাং বালুচের সুন্দর একটা ছবি খুঁজে বের করে পোস্ট দিলাম যে, “দেশমাতৃকার স্বাধীনতার জন্য লড়াই করা নারী সুন্দর।” এরপর ১২ ঘণ্টার দীর্ঘ বিমান ভ্রমণ শেষে নাইরোবিতে পৌঁছালাম মধ্যরাতে।
পরদিন সকালে সোশ্যাল মিডিয়ায় ঢুকে দেখি, মাহরাং বালুচকে নিয়ে আমার আগের পোস্টের প্রতিক্রিয়া হিসেবে ওখানকার এক এনজিও প্রধান ইনস্টাগ্রামে টেক্সট পাঠিয়েছেন। সঙ্গে পাঠিয়েছেন ছয় মিনিটের একটি অডিও বার্তা। সঙ্গত কারণেই আমি তার নাম উল্লেখ করছি না, কিন্তু বিগত ১৬ বছর ধরে এই নারীর সঙ্গে আমি সোশ্যাল মিডিয়ায় যুক্ত। ২০১০ সালে লাহোরে ‘রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ’ বিষয়ক এক কনফারেন্সে যোগ দিতে গিয়ে তার সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল।
আমার সোশ্যাল মিডিয়ার পোস্ট তার চোখে পড়েছে এবং সেটি তাকে ব্যথিত করেছে। তার মতে, মাহরাং মূলত বিদেশি মাফিয়া গোষ্ঠির এজেন্ট; বহু টাকা-পয়সার বিনিময়ে তারা পাকিস্তানকে অস্থিতিশীল করার জন্য এসব করছে।
আমি একটু নড়েচড়ে বসলাম। একটু সময় নিয়ে বেলুচিস্তান বিষয়ক পড়াশোনা করার চেষ্টা করলাম। মাহরাং বালুচ সম্পর্কে জানা ছিল, তবুও নতুন করে বিভিন্ন নিরপেক্ষ উৎস থেকে বেশ কিছু নিবন্ধ পড়লাম।
২.
দেখলাম বেলুচিস্তান নিয়ে আলোচনায় পেশায় চিকিৎসক ও মানবাধিকারকর্মী মাহরাং বালুচের নাম বারবারই এসেছে। জুন মাসের শেষ দিকে পাকিস্তানের বেলুচিস্তানের সন্ত্রাসবিরোধী আদালত মাহরাং বালুচ ও সিবঘাতুল্লাহ শাহজিকে সন্ত্রাসবাদ, রাষ্ট্রদ্রোহ ও হত্যার অভিযোগে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে মূল অভিযোগ, একটি প্রতিবাদ সমাবেশে তারা ‘উসকানিমূলক বক্তব্য’ দিয়েছিলেন।
তবে বেলুচদের দাবি, এই অভিযোগ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং ভিন্নমত দমনের অংশ। মাত্র ৩৩ বছর বয়সী মাহরাং বালুচ কয়েক দশক ধরে চলা বেলুচিস্তান আন্দোলনের হাল ধরেছেন এবং মানবাধিকার ও ন্যায়বিচারের দাবিতে চলা সংগ্রামের প্রতীক হয়ে উঠেছেন।
রায় ঘোষণার পর, স্বাভাবিকভাবেই স্বাধীনতাকামী বালুচ জনগোষ্ঠি প্রদেশের নানা জায়গায় তীব্র আন্দোলন গড়ে তুলেছে। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সঙ্গে প্রদেশের নানা স্থানে মুক্তিকামী জনতার সংঘর্ষে অন্তত ৭৫ জন নিহত হয়েছে। সে খবর উঠে এসেছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে।
তার প্রতিক্রিয়ায় সেখানকার স্বাধীনতাকামী নেতারা বিবৃতি দিয়ে বেলুচিস্তানের স্বাধীনতার ডাক দিয়েছেন। বিবৃতিদাতাদের দাবি, গোটা বেলুচিস্তানের ৮৫ ভাগ এখন তাদের দখলে। এমনকি তারা জাতীয় পতাকা, জাতীয় সংগীত, নতুন মুদ্রা ও স্বাধীন প্রশাসনিক ব্যবস্থা চালু করেছেন বলেও দাবি জানিয়েছেন।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, তারা বেলুচিস্তানের প্রায় সব খনিজ সম্পদ নিজেদের দখলে নিয়েছেন। বেলুচিস্তান সোনা, তামা, গ্যাস, কয়লাসহ নানা খনিজে সমৃদ্ধ অঞ্চল। তারা বলছেন, প্রতিদিন পাকিস্তান সরকার বেলুচিস্তানের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে; সরকার এখন শুধু বিমানবাহিনীর ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হচ্ছে। ভূমি এখন বেলুচদের দখলে। জনগণ সরকারের বিরুদ্ধে সর্বত্র প্রতিরোধ গড়ে তুলছে।
এর সঙ্গে পুনরায় উঠে এসেছে মাহরাং বালুচের নাম। বিভিন্ন সময়ে তার দেওয়া ভাষণের খণ্ডিত অংশ সোশ্যাল মিডিয়ায় নতুন করে ছড়িয়ে পড়েছে। অনুমিতভাবেই তার সেসব বক্তব্যের কোথাও কোথাও বাংলাদেশের নামও এসেছে। এর পেছনে যৌক্তিক কারণও আছে।
বেলুচিস্তানে মানবাধিকার লঙ্ঘন, জোরপূর্বক গুম এবং সামরিক অভিযানের সঙ্গে বাংলাদেশের ১৯৭১ ও তার পূর্ববর্তী ঘটনার ঐতিহাসিক মিল রয়েছে। কিছু বক্তব্যে তিনি এরকমও ইঙ্গিত করেছেন যে, রাষ্ট্র যদি জনগণের অভিযোগ উপেক্ষা করে এবং দমন-পীড়নের পথ বেছে নেয়, তবে তার দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক পরিণতি বাংলাদেশের স্বাধীনতার মতো হতে পারে।
তাছাড়া, আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময় বেলুচিস্তানের জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক নেতৃত্বের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন এবং পাকিস্তানের সামরিক দমননীতির বিরোধিতা করেছিলেন। মূলত বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে অনুপ্রাণিত হয়েই বালুচরা একটি স্বাধীন ভূখণ্ডের স্বপ্ন দেখে আসছেন।
বাংলাদেশের সঙ্গে তুলনার আরেকটি কারণ হলো, এটিই পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় এবং প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ প্রদেশ। কিন্তু তা সত্ত্বেও এটি দেশের সবচেয়ে অনুন্নত অঞ্চলগুলোর একটি। এর পেছনের প্রধান কারণ হলো, এই অঞ্চল থেকে কেন্দ্রীয় সরকার অন্য প্রদেশে সম্পদ স্থানান্তর করে। ফলে দশকের পর দশক ধরে চলা অর্থনৈতিক শোষণ, ভিন্নমত দমন এবং ন্যায়বিচারের অভাবে মানুষ অতিষ্ঠ। এ যেন একাত্তরের আগের আরেক বাংলাদেশ।

৩.
এরপর আমি ওই এনজিও প্রধানের কাছে জানতে চাইলাম যে, গত পাঁচ দশকে ঠিক কত মানুষ বেলুচিস্তানের স্বাধীনতার জন্য জীবন দিয়েছে? যুগে যুগে যত মানুষ সেখানে প্রাণ দিয়েছে, সবাই কি বিদেশি চর? বালুচদের কাছ থেকে সম্পদ কেড়ে নিয়ে লাহোর আর পাঞ্জাবের উন্নয়ন করার অভিযোগ কি তাহলে মিথ্যা?
আচ্ছা, বাদ দিন গত পাঁচ দশকের কথা। শুধু ২০১১ সালের পর থেকে বেলুচিস্তানে রাজনৈতিক ভিন্নমত দমন ও বিচারবহির্ভূত হত্যার মাধ্যমে যে ১০ হাজারেরও বেশি মানুষ নিখোঁজ হয়েছেন, যাদের অনেকের মৃতদেহ পরে বিভিন্ন স্থানে পাওয়া গেছে, তাদের অপরাধটা কী ছিল? এরা সবাই কি বিদেশি দালাল? টাকা খেয়ে গুম হয়ে যাচ্ছে আর কয়েকদিন পর নিজেরাই নিজেদের লাশ রাস্তায় ফেলে রাখছে?
২০০৬ সালে প্রবীণ বালুচ রাজনৈতিক নেতা আকবর বুগতিকে পাকিস্তানি নিরাপত্তা বাহিনী হত্যা করার পর যখন মানুষের প্রতিরোধ বেড়ে গেল, তখন থেকেই জোরপূর্বক গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা এবং সশস্ত্র গোষ্ঠিগুলোর হামলা বেড়েছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ থেকে শুরু করে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের রিপোর্ট—প্রত্যেকে বলে আসছে যে, পাকিস্তান সরকার মানুষের অধিকারের জন্য লড়াই এবং সংখ্যালঘু মানুষদের অধিকারের দাবিকে সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে একাকার করে ফেলছে। এর পেছনের উদ্দেশ্য হলো, সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অপব্যবহারের মাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে বিরোধী কণ্ঠস্বরকে দমন করা। আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের তোলা এসব গুরুতর অভিযোগ কি মিথ্যা?
মাহরাংয়ের কথাই ধরুন না। পেশায় ডাক্তার এবং পরে ‘বালুচ ইয়াকজেহতি কমিটি’র অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা তিনি। এই প্রতিষ্ঠান সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ আদিবাসী, শান্তিপূর্ণ এবং নারী নেতৃত্বাধীন আন্দোলন হিসেবে বিবেচিত হয়। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের জন্য সংগঠনটি সুপরিচিত। ২০২৩ সালে তারা পাকিস্তানের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় নারী নেতৃত্বাধীন লংমার্চের আয়োজন করে।
মাহরাং স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন ব্যক্তিগত এক মর্মান্তিক অভিজ্ঞতার কারণে। তার বাবা আব্দুল গাফফার লাঙ্গোভও ছিলেন স্বাধীন বেলুচিস্তান আন্দোলনের নেতা। ২০০৯ সালে তাকে পাকিস্তান আর্মি গুম করে এবং তার ঠিক দুই বছর পর, ২০১১ সালে তার মৃতদেহ পাওয়া যায়। তার ভাইকেও পাকিস্তান আর্মি তুলে নিয়ে তিন মাস পর ফেরত দেয়। একেবারে যেন একাত্তর ও তার আগে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে চালানো পাকিস্তানি কৌশল! এসব দেখে মাহরাং ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন এবং যোগ দেন মানবাধিকার সংগঠনের সঙ্গে।
২০২৩ সালে তিনি যখন শুধু নারীদের নিয়ে বিশাল এক লংমার্চের নেতৃত্ব দেন, তখন তাকে ধরে নিয়ে যায় সেনাবাহিনী এবং পরের বছর সরকারবিরোধী বিক্ষোভ, সহিংসতায় উসকানি, রাষ্ট্রদ্রোহিতা ও হত্যা মামলায় সামরিক কোর্ট থেকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। সেই থেকে তিনি জেলে বন্দি। বিচার চলাকালে তাকে আদালতে নেওয়া হয়নি, গুরুত্বপূর্ণ কোনো প্রত্যক্ষদর্শীকে আদালতে হাজির করা হয়নি এবং তার নির্বাচিত আইনজীবীকেও অংশগ্রহণ করতে দেওয়া হয়নি; এর সঙ্গে কি আগরতলা ষড়যন্ত্রের মিল খুঁজে পাওয়া যায় না?
বর্তমান রায়ের আগেও মাহরাং বহুবার গ্রেপ্তার, হুমকি, অপহরণ ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। অবশ্য তিনি একা নন—পাকিস্তানের অন্যান্য নারী মানবাধিকারকর্মীরাও একই ধরনের দমন-পীড়নের মুখোমুখি হচ্ছেন। শান্তি প্রতিষ্ঠার কাজে যুক্ত থাকার কারণে সম্প্রতি সাম্মি দীন বালুচের বাড়িতে পরোয়ানা ছাড়াই অভিযান চালানো হয়েছে। কেন করা হচ্ছে এসব?
অকুতোভয় সাহসের জন্য মাহরাং ২০২৪ সালে টাইম ম্যাগাজিনের ১০০ উদীয়মান নেতার তালিকায় উঠে এসেছিলেন; বিবিসির সেরা ১০০ নারীর তালিকায়ও তার নাম ছাপা হয়। শুধু তাই নয়, ২০২৫ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্যও মনোনীত হয়েছিলেন তিনি। কেন? এমনিতেই?
আমি সেই বন্ধুকে জিজ্ঞেস করলাম যে, মাহরাংয়ের সঙ্গে হওয়া এসব নিপীড়ন, তার বাবার হত্যাকারী বা তার ভাইয়ের গুমকারীদের বিষয়ে আপনার অভিমত কী? এই যে ৪০ বছর ধরে এনজিও করছেন, কয়টা মামলা আছে আপনার বিরুদ্ধে? কয়বার জেল খেটেছেন?
ভদ্রমহিলা চুপ করে গেছেন, প্রশ্নের উত্তর দেননি। সপ্তাহখানেক পর মনে হলো, এই সূত্র ধরেই বেলুচিস্তান নিয়ে কিছু লেখা যাক।
স্বাধীনতার লড়াইয়ে সবচেয়ে কঠিন প্রতিপক্ষ অনেক সময় বাইরের শক্তি নয়, ঘরের মানুষই। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ সেই বাস্তবতা দেখেছে। আজ, ২০২৬ সালে বেলুচিস্তানের ঘটনাপ্রবাহেও যেন সেই একই ছায়া দেখতে পাচ্ছি।
বিশ্বরাজনীতির সমীকরণও বদলাতে পারে, বেলুচিস্তান পেতে পারে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও; কিন্তু তার আগে জয় করতে হবে নিজের ভেতরের ভয়, বিভক্তি আর ঘরের শত্রু বিভীষণদের। সেই কঠিন পরীক্ষাই এখন বেলুচিস্তানের সামনে।
রাজু নূরুল উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ ও লেখক। বর্তমানে সোমালিয়া সরকারের অর্থমন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হিসেবে কর্মরত। যোগাযোগ: [email protected]