Published : 22 Jul 2026, 05:02 PM
কারও কাছ থেকে প্রত্যাখ্যাত হওয়া বা অবহেলা পাওয়া যেকোনো মানুষের জন্যই কষ্টদায়ক। তবে কিছু মানুষের ক্ষেত্রে এই কষ্টের তীব্রতা সাধারণের চেয়ে অনেক বেশি হয়।
কেউ মেসেজের উত্তর দিতে দেরি করলে, তাড়াহুড়ার কারণে চেনা পরিচিত কেউ সামনে দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় হাই না বললে কিংবা সামাজিক কোনো আড্ডায় আমন্ত্রণ না পেলে, তারা মানসিকভাবে পুরোপুরি ভেঙে পড়েন।
মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এই তীব্র মানসিক যন্ত্রণাকে বলা হচ্ছে ‘রিজেকশন সেনসিটিভিটি ডিসফোরিয়া’ বা আরএসডি।
সম্প্রতি মার্কিন তারকা প্যারিস হিলটন একটি পডকাস্ট সাক্ষাৎকারে এই বিষয়ে নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা তুলে ধরার পর, নেটদুনিয়ায় আরএসডি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
৪৪ বছর বয়সি এই তারকা বলেন, “নেতিবাচক ধারণার যেকোনো সামান্য চিন্তাও মনের ভেতর শারীরিক ব্যথার মতো তীব্র অনুভূতির সৃষ্টি করে, যা এক ধরনের মানসিক দানবের মতো।”
আরএসডি আসলে কী?
যুক্তরাষ্ট্রের, ওয়েইল কর্নেল মেডিকেল কলেজের সাইকিয়াট্রির সহযোগী অধ্যাপক ডা. গেইল সল্টজ সেল্ফ ডটকম’য়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলেন, “মানসিক রোগ নির্ণয়ের আন্তর্জাতিক নির্দেশিকা ‘ডিএসএম-৫’-এ, আরএসডি-কে এখনও স্বতন্ত্র রোগ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়নি। তবে চিকিৎসকদের মতে, এটি মূলত ‘অ্যাটেনশন-ডেফিসিট/ হাইপারঅ্যাক্টিভিটি ডিসঅর্ডার’ বা এডিএইচডি এবং তীব্র সামাজিক উদ্বেগের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত এক ধরনের মানসিক অবস্থা।”
একই প্রতিবেদনে, নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটি ল্যাঙ্গোন হেলথের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট ডা. থিয়া গ্যালাগার বলেন, "কারও অবহেলা বা প্রত্যাখ্যানকে প্রাকৃতিকভাবে এড়িয়ে না গিয়ে, যখন কেউ সেটিকে নিজের অস্তিত্বের ওপর আঘাত হিসেবে নেন এবং দীর্ঘ সময় ধরে তা নিয়ে তীব্র মানসিক কষ্টে ভোগেন, তখন সেটিই আরএসডি।”
‘রিজেকশন সেনসিটিভিটি ডিসফোরিয়া’র প্রধান লক্ষণ
ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকের তথ্য এবং ইউনিভার্সিটি অব বার্মিংহামের অটিজম সেন্টারের গবেষক ডা. বারবারা স্যান্ডল্যান্ড -এর মতে, আরএসডি-তে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে নিচের লক্ষণগুলো বেশি দেখা যায়।
তীব্র শারীরিক ও মানসিক কষ্ট: সামান্য সমালোচনা বা অবহেলা অনুভব করলে এদের মধ্যে তীব্র লজ্জা, ভয়, উদ্বেগ ও রাগের পাশাপাশি মাথাঘোরা, বমি বমি ভাব বা চরম শারীরিক ক্লান্তি দেখা দিতে পারে।
নেতিবাচক চিন্তার চক্র: যেকোনো একটি সাধারণ প্রত্যাখ্যানের ঘটনাকে তারা অতীতের সব ব্যর্থতার সঙ্গে মিলিয়ে ফেলেন এবং নিজেকে ‘অযোগ্য’ বা ‘ভালোবাসার অযোগ্য’ ভেবে তীব্র আত্মগ্লানিতে ভোগেন।
সবাইকে খুশি করার প্রবণতা: অন্য কেউ যেন তাকে বর্জন না করে, সেজন্য তারা নিজের ইচ্ছা বিসর্জন দিয়ে সারাক্ষণ চারপাশের মানুষকে খুশি করতে ব্যস্ত থাকেন।
কাজের আগেই হাল ছেড়ে দেওয়া: কোনো কাজ বা নতুন লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হলে যদি গুরুত্ব না পাওয়া যায়— এই ভয়ে তারা অনেক সময় নতুন কোনো কাজ শুরুই করতে চান না।
নিখুঁত হওয়ার চেষ্টা: ব্যর্থতা বা সমালোচনা এড়ানোর জন্য তারা যেকোনো কাজে অতিরিক্ত নিখুঁত বা ‘পারফেক্ট’ হওয়ার এক ক্লান্তিকর চেষ্টা চালিয়ে যান।
এডিএইচডি (ADHD)-র সঙ্গে এর সম্পর্ক
বিশেষজ্ঞদের মতে, এডিএইচডি-তে আক্রান্ত প্রাপ্তবয়স্ক এবং কিশোরদের মধ্যে আরএসডি’র প্রবণতা বেশি থাকে।
ডা. থিয়া গ্যালাগার ব্যাখ্যা করেন, “এডিএইচডি’ আক্রান্ত ব্যক্তিরা কোনো নির্দিষ্ট আবেগ বা মুহূর্তের ওপর অতিরিক্ত নজর দেন বা ‘হাইপার-ফোকাস’ করে ফেলেন। ফলে কেউ তাকে সামান্য অবহেলা করলে, তাদের মস্তিষ্ক সেই নেতিবাচক অনুভূতিকে বহুগুণ বড় করে দেখায়।”
আরএসডি থেকে মুক্তির উপায়
যেহেতু আরএসডি একটি স্বীকৃত রোগ নয়, তাই এর সুনির্দিষ্ট কোনো ওষুধ নেই। তবে থেরাপি এবং সচেতনতার মাধ্যমে এই মানসিক কষ্ট নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
মনস্তাত্ত্বিক থেরাপি: সাইকোথেরাপির মাধ্যমে রোগীকে যেকোনো সামাজিক পরিস্থিতিকে অতি-আবেগীয়ভাবে না দেখে বস্তুনিষ্ঠ ও বাস্তবসম্মতভাবে দেখতে শেখানো হয়। যেমন— কেউ দাওয়াত না দিলে ‘সে আমাকে ঘৃণা করে’, তা না ভেবে ‘হয়তো সে ভুলবশত ভুলে গেছে’, এভাবে চিন্তা করার অভ্যাস করানো হয়।
বিশ্বস্ত বন্ধুর মতামত নেওয়া: কোনো সামাজিক মিথস্ক্রিয়া নিয়ে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা হলে কোনো বিশ্বস্ত বন্ধু বা পরিবারের সদস্যের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করে বাস্তব মতামত নেওয়া উপকারী।
নিজের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া: কষ্টদায়ক অনুভূতিগুলোকে জোর করে চেপে না রেখে সেটিকে মেনে নেওয়া এবং নিজেকে বোঝানো যে, পৃথিবীর সবাই সবাইকে পছন্দ করবে না। তার মানে এই নয় যে, নিজের কোনো যোগ্যতা নেই।
বিশেষজ্ঞের পরামর্শ
যদি কারও মধ্যে অবহেলার ভয় বা সামাজিক প্রত্যাখ্যানের কারণে দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক কাজ, ক্যারিয়ার বা সম্পর্ক বাজেভাবে ব্যাহত হয়, তবে ঘরে বসে না থেকে একজন অভিজ্ঞ লাইসেন্সপ্রাপ্ত ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট বা মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
আরও পড়ুন
মন ভালো তো শরীর ভালো: মানসিক সুস্থতা যে কারণে জরুরি