Published : 18 May 2026, 04:09 PM
ছুটির দিনে বেলা ১১টা পর্যন্ত ঘুমানো, অফিস না থাকলে বিছানা ছাড়তে ইচ্ছে না করা — এই অভ্যাসগুলো অনেকের কাছে আনন্দের। মনে হয় সপ্তাহের ক্লান্তি বুঝি কাটিয়ে নিচ্ছি।
তবে চিকিৎসকেরা বলছেন, এই ভাবনাটাই ভুল।
বেশি ঘুম মানে বেশি বিশ্রাম নয়। বরং প্রতিদিন ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা ঘুমানোর অভ্যাস শরীরের ভেতরে এমন কিছু পরিবর্তন ঘটায়, যা দীর্ঘমেয়াদে মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে। এমনকি কমিয়ে দিতে পারে আয়ু।
কতটুকু ঘুম আসলে যথেষ্ট?
এই প্রশ্নের উত্তরটা আগে জানা দরকার।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের রেসিডেন্ট চিকিৎসক ডা. আফসানা হক নয়ন বলেন, “একজন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জন্য প্রতিদিন সাত থেকে আট ঘণ্টা ঘুমই যথেষ্ট। এর কম হলে যেমন ক্ষতি, এর বেশি হলেও শরীরে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে।”
যারা প্রতিদিন ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা ঘুমান এবং শারীরিকভাবে খুব কম সক্রিয় থাকেন, তাদের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যঝুঁকি অনেক বেশি।
অতিরিক্ত ঘুমের সঙ্গে শরীরচর্চার অভাব যুক্ত হলে হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, স্থূলতা এবং ক্যানসারের মতো দীর্ঘমেয়াদি রোগের ঝুঁকি বাড়তে থাকে।
হৃদযন্ত্র বিপদে পড়ে
যুক্তরাজ্যের ‘কিলি ইউনিভার্সিটি’র গবেষক দল অতিরিক্ত ঘুম এবং হৃদরোগের ঝুঁকি সম্পর্ক নিয়ে একটি বড় আকারের গবেষণা পরিচালনা করেন।
গবেষণাটি ২০২০ সালে চিকিৎসা সাময়িকী ‘জার্নাল অব দ্য আমেরিকান কলেজ অব কার্ডিওলজি’তে প্রকাশিত হয়।
প্রায় ৩৪ লাখ মানুষের ওপর করা ৭৪টি পূর্ববর্তী গবেষণার তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে, যারা প্রতিদিন নয় ঘণ্টার বেশি ঘুমান, তাদের হৃদরোগের ঝুঁকি অন্যদের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।
কারণটা শরীরের ভেতরে। দীর্ঘ সময় ঘুমের ফলে শরীরে রক্তসঞ্চালন আর বিপাকক্রিয়ায় পরিবর্তন আসে। হৃদযন্ত্র যেভাবে কাজ করার কথা, সেভাবে কাজ করতে পারে না। এই অনিয়মই থেকেই একসময় হৃদরোগ দেখা দেয়।
যারা ভাবছেন বেশি বিশ্রামে হৃদযন্ত্র সুরক্ষিত থাকবে, তাদের জন্য খবরটা উল্টো।
ওজন বাড়ে, কিন্তু শক্তি কমে
অতিরিক্ত ঘুমের সঙ্গে ওজন বৃদ্ধির সরাসরি সম্পর্ক আছে।
দীর্ঘ সময় বিছানায় থাকলে শরীরের ক্যালরি খরচ কমে যায়, শারীরিক নড়াচড়া সীমিত হয়ে পড়ে।
কানাডায় হওয়া ছয় বছর মেয়াদি ‘কুইবেক ফ্যামিলি স্টাডি’-সহ একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা প্রতি রাতে নয় থেকে ১০ ঘণ্টার বেশি ঘুমান, তাদের স্থূলতা বা মোটা হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি ২৫ শতাংশ বেশি।
এমনকি তারা যদি ডায়েট এবং নিয়মিত ব্যায়ামও করেন, তবুও তাদের ওজন বৃদ্ধির প্রবণতা থাকে।
তবে মজার বিষয় হল, এত ঘুমানোর পরেও শরীর সতেজ লাগে না। বরং উল্টোটা হয়। দীর্ঘ সময় বিছানায় কাটানোর পর উঠলে শরীর আরও ভারী লাগে, শক্তি কম মনে হয়।
কারণ শরীর বিশ্রাম পায়নি, বরং অতিরিক্ত নিষ্ক্রিয়তায় আরও অলস হয়ে গেছে।
মন বিষণ্ন হয়ে যায় আস্তে আস্তে
শরীরের ক্ষতির পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যেও প্রভাব পড়ে অতিরিক্ত ঘুমের কারণে।
২০১৮ সালে আন্তর্জাতিক চিকিৎসা সাময়িকী ‘জার্নাল অফ বিহেভিয়র থেরাপি অ্যান্ড এক্সপেরিমেন্টাল সাইকিয়াট্রি’তে প্রকাশিত ‘বিংহামটন ইউনিভার্সিটির’ মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মেরিডিথ কোলস-এর করা গবেষণায় দেখা গেছে, যারা প্রতিদিন ১০ ঘণ্টা বা তার বেশি ঘুমান, তাদের মধ্যে বিষণ্নতা ও মানসিক অবসাদের লক্ষণ প্রায় পঁয়তাল্লিশ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে।
ব্যাপারটা অনেকটা এরকম — বেশি ঘুমালে দিনের কর্মঘণ্টা কমে যায়, কাজ কম হয়, উদ্যম কমে যায়। এই অলসতা ধীরে ধীরে হতাশায় রূপ নেয়। মানুষ সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন হতে থাকে। বন্ধুদের সঙ্গে কম সময় কাটানো হয়, পরিবারের সঙ্গেও দূরত্ব বাড়তে পারে।
শুরুটা শুধু বেশি ঘুম দিয়ে হলেও শেষটা কিন্তু অনেক জটিল হয়ে যেতে পারে।
কাজের গতি আর মনোযোগ দুটোই কমে
অনেকে ভাবেন, রাতে বেশি ঘুমালে পরদিন পড়াশোনা বা কাজে বেশি মনোযোগ দেওয়া যাবে। বাস্তবে হয় ঠিক উল্টোটা।
অতিরিক্ত ঘুমের পর উঠে মাথা ভার লাগে, চিন্তা পরিষ্কার থাকে না, কাজে আগ্রহ কমে যায়। দীর্ঘদিন এই অভ্যাস চলতে থাকলে পেশাগত জীবনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হয়, সৃজনশীলতা কমে যায়।
যুক্তরাষ্ট্রের ‘ন্যাশনাল স্লিপ ফাউন্ডেশন’য়ের তথ্যানুসারে, সাত থেকে আট ঘণ্টার ভালো ঘুমের পর মস্তিষ্ক যতটা সক্রিয় থাকে, ১০ বা ১২ ঘণ্টার ঘুমের পর সেটা থাকে না। মস্তিষ্কেরও একটা ছন্দ আছে, সেই ছন্দ ভাঙলে মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়।
আয়ু কমে যাওয়ার তথ্য যা বলছে
যুক্তরাজ্যের ‘ইউনিভার্সিটি অব ওয়ারউইক’-এর কার্ডিওভাসকুলার মেডিসিন ও এপিডেমিওলজির অধ্যাপক ফ্রান্সেসকো পি ক্যাপুচিও এবং ইতালির ফেদেরিকো দ্বিতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক দল প্রায় চৌদ্দ লাখ মানুষের ওপর করা ‘মেটা পর্যবেক্ষণে’ দেখতে পান- যারা নিয়মিত অতিরিক্ত ঘুমান তাদের অকাল মৃত্যুর ঝুঁকি অন্যদের তুলনায় বেশি।
‘স্লিপ’ সাময়িকীতে প্রকাশিত এই গবেষণার মাধ্যমে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন যে, বিশ্বজুড়ে অসংক্রামক রোগে মৃত্যুর হার যেভাবে বাড়ছে, এর পেছনে অলস ও নিষ্ক্রিয় জীবনযাপন অন্যতম কারণ হতে পারে।
অতিরিক্ত ঘুম মানে শুধু বেশিক্ষণ চোখ বন্ধ রাখা নয় — এটা আসলে শরীরকে দীর্ঘ সময়ের জন্য নিষ্ক্রিয় রাখা। আর দীর্ঘ নিষ্ক্রিয়তাই ধীরে ধীরে ভেতর থেকে দুর্বল করে দেয়।
তাহলে করণীয় কী?
সমাধানটা জটিল নয়।
ডা. নয়ন পরামর্শ দেন যে, “প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমান এবং নির্দিষ্ট সময়ে উঠুন। ছুটির দিনেও এই রুটিন ভাঙবেন না। সাত থেকে আট ঘণ্টার বেশি বিছানায় থাকার প্রয়োজন নেই। সকালে উঠে একটু হাঁটুন বা হালকা শরীরচর্চা করুন। শরীর সক্রিয় থাকলে ঘুমও ভালো হয়, আবার অতিরিক্ত ঘুমের টানও কমে।”
আর যদি দেখেন প্রতিদিন দশ বা বারো ঘণ্টা না ঘুমালে শরীর চলছে না, তাহলে সেটা আলসেমি নয়, শরীরের সংকেত। সেক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
আরও পড়ুন
বেশি ঘুমানোর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া