Published : 21 Jul 2026, 06:10 PM
ধূমপান বা নিকোটিন গ্রহণের কারণে ফুসফুস ও হৃদযন্ত্রের ক্ষতি হয়, এটি সবারই জানা। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা নিকোটিনের আরেকটি অন্ধকার দিক উন্মোচন করেছেন, যা মানুষের ব্যক্তিগত ও দাম্পত্য জীবনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করছে।
গবেষকদের মতে, অতিরিক্ত নিকোটিন গ্রহণ বা সিগারেট খাওয়ার কারণে মানুষের স্বাভাবিক যৌন আকাঙ্ক্ষা বা ‘লিবিডো’ হ্রাস পেতে পারে।
এই বিষয়ে হেলথলাইন ডটকম’য়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়- ই-সিগারেট, ভেপ, সাধারণ সিগারেট কিংবা নিকোটিন প্যাচ, যেকোনো মাধ্যমেই শরীরে অতিরিক্ত নিকোটিন প্রবেশ করলে, তা সরাসরি যৌন হরমোন এবং প্রজনন স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে।
পুরুষদের ওপর প্রভাব এবং ‘সেক্সুয়াল ডিসফাংশন’
২০২০ সালে, তরুণদের ওপর করা, ভারতের পশ্চিম বাংলার ‘মুর্শিদাবাদ মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হসপিটাল’-এর গবেষণায় বলা হয়, ‘যারা অতিরিক্ত নিকোটিন বা সিগারেটের ওপর নির্ভরশীল, তাদের মধ্যে ‘সেক্সুয়াল ডিসফাংশন’ বা যৌন জটিলতার ঝুঁকি অনেক বেশি’।
চিকিৎসা সাময়িকী ‘অ্যান্ড্রোলজিয়া’-তে প্রকাশিত এই গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, নিকোটিন ব্যবহারের ফলে রক্তনালীগুলো সংকুচিত হয়ে পড়ে। ফলে যৌনাঙ্গে রক্ত সঞ্চালন ব্যাহত হয়। যে কারণে যৌন উদ্দীপনা, দীর্ঘক্ষণ ইরেকশন বা লিঙ্গোত্থান ধরে রাখা এবং অর্গাজম বা চূড়ান্ত তৃপ্তি পাওয়ার ক্ষমতা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যায়।
এছাড়া ২০২১ সালে প্রবীণ পুরুষদের ওপরে, জাপানের ‘কানাজাওয়া ইউনিভার্সিটি গ্রাজুয়েট স্কুল অফ মেডিকেল সায়েন্স’-এর গবেষকরা একটি গবেষণা চালান।
‘জার্নাল অফ সেক্সুয়াল মেডিসিন’-এ প্রকাশিত হওয়া, সেই গবেষণার প্রধান লেখক ডা. লিউ এবং তার সহযোগী গবেষকেরা দেখিয়েছেন যে, মধ্যবয়সী এবং প্রবীণ পুরুষদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ধূমপানের অভ্যাস গুরুতরভাবে যৌন আকাঙ্ক্ষা বা মেলামেশার তীব্র ইচ্ছা কমিয়ে দেয়।
আরও পড়ুন
সহবাসে যে পরিমাণ ক্যালরি খরচ হয়
নারীদের প্রজনন স্বাস্থ্য ও হরমোনের ওপর আঘাত
পুরুষদের তুলনায় নারীদের প্রজনন স্বাস্থ্যের ওপর নিকোটিনের প্রভাব নিয়ে গবেষণার সংখ্যা কিছুটা কম হলেও, প্রাপ্ত ফলাফল বেশ উদ্বেগজনক।
২০১৩ সালে ‘জার্নাল অফ অ্যাডিকশন মেডিসিন’-এ নারীদের মাদক ও নিকোটিন আসক্তি নিয়ে একটি গবেষণা প্রকাশিত হয়।
ব্রাজিলের ‘ফেডারেল ইউনিভার্সিটি অফ সাও পাওলোর’ করা সেই গবেষণায় দেখা গেছে, যে নারীরা তীব্র নিকোটিন নির্ভরতায় ভুগছেন, তাদের যৌন হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার এবং বিভিন্ন ‘সেক্সুয়াল ডিসফাংশনে’ আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি সাধারণ নারীদের চেয়ে প্রায় ৩ গুণ বেশি।
এছাড়া ২০১৫ সালে ‘ইউরোপিয়ান জার্নাল অফ অবস্টেট্রিক্স অ্যান্ড গাইনিকোলজি’-তে প্রকাশিত, কোরিয়ার ‘সিউল ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি কলেজ অফ মেডিসিন’-এর গবেষণায় দেখা গেছে, মেনোপজ বা পিরিয়ড স্থায়ীভাবে বন্ধ হওয়ার পূর্ববর্তী বয়সের যে নারীরা নিয়মিত ধূমপান করেন, তাদের মধ্যে শারীরিক মিলনের আকাঙ্ক্ষা, উদ্দীপনা এবং তৃপ্তির মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কম থাকে।
আরও পড়ুন
গবেষণা: বয়স বাড়ার সঙ্গে নারীদের শারীরিক মিলনে আগ্রহ হারানোর ধারণাটা ঠিক না
স্নায়ুতন্ত্রের ওপর ক্ষতি এবং হরমোনের তারতম্য
বিজ্ঞানীদের মতে, নিকোটিন মূলত মানুষের ‘সেন্ট্রাল নার্ভাস সিস্টেম’ বা স্নায়ুতন্ত্র এবং হরমোনের স্বাভাবিক গতিপ্রকৃতিকে ওলটপালট করে দেয়।
যৌন উদ্দীপনা এবং আকাঙ্ক্ষার জন্য যে হরমোন ও মানসিক প্রশান্তির প্রয়োজন হয়, নিকোটিন মস্তিষ্কে তা তৈরিতে বাধাগ্রস্ত করে।
ধূমপান ছাড়লে কি সুফল মিলবে?
গবেষকদের মতে, আশার কথা হল এই ক্ষতি স্থায়ী নয়, বরং এটি পরিবর্তনযোগ্য।
২০১৭ সালে ‘ইউরোলজি জার্নাল’-এ প্রকাশিত ‘লস অ্যাঞ্জেলেস মেডিকেল সেন্টার’-এর করা গবেষণায়, প্রোস্টেট অস্ত্রোপচার পরবর্তী পুরুষদের ওপর পরীক্ষা চালানো হয়।
গবেষকেরা দেখিয়েছেন যে, যারা নিয়মিত ধূমপান করার অভ্যাস পুরোপুরি ত্যাগ করেছেন, পরের ১ থেকে ২ বছরের মধ্যে তাদের প্রজনন ক্ষমতা ও যৌন স্বাস্থ্য আগের চেয়ে অনেক উন্নত হয়েছে এবং স্বাভাবিক আকাঙ্ক্ষা ফিরে এসেছে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
দাম্পত্য জীবনে সুখী থাকতে এবং প্রজনন স্বাস্থ্য ভালো রাখতে যে কোনো ধরনের তামাক ও নিকোটিনযুক্ত পণ্য বর্জন করা উচিত।
জীবনযাত্রার এই পরিবর্তনের পরেও যদি আকাঙ্ক্ষার ঘাটতি থাকে, তবে লোকলজ্জার ভয় না পেয়ে একজন ‘ইউরোলজিস্ট’ বা যৌন-স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উপকারী হবে।
আরও পড়ুন